মানবকণ্ঠ উন্নয়ন-সহযাত্রী


poisha bazar

  • দুলাল আহমদ চৌধুরী
  • ২৫ অক্টোবর ২০২০, ০০:৩৭,  আপডেট: ২৫ অক্টোবর ২০২০, ০১:০০

আট বছর অতিক্রম করেছে দৈনিক মানবকণ্ঠ। একটি মুদ্রণ কাগজের জন্য আট বছর বিশাল এক যাত্রা। দিনের হিসাবে যা ২ হাজার ৮৮০ দিন। দিনের হিসাব এ জন্য, একটি দৈনিক কাগজের জন্য প্রতিদিনই ভোটের দিন। প্রতিটি ভোরে একাধিক পত্রিকা গিয়ে পাঠকের সামনে হাজির হয়। কিন্তু পাঠক তার পছন্দের দৈনিকটিই কিনে নেন। পাঠক পছন্দ না করলে সেই কাগজটিও আর এগোতে পারে না। একটি কাগজ তাই চলার শক্তি অর্জন করে তার পাঠকদের কাছ থেকেই। পাঠক গ্রহণ করেছেন বলেই দীর্ঘ এ পথ মাড়িয়ে এসেছে মানবকণ্ঠ। আট বছর পূর্তির এই শুভলগ্নে আমাদের অগণিত পাঠকের প্রতি অশেষ কৃতজ্ঞতা। পাশাপাশি লেখক, বিজ্ঞাপনদাতা, এজেন্ট, হকারসহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে অফুরান শুভেচ্ছা, আন্তরিক ধন্যবাদ।

২. অদ্ভুত এক সময় এসেছে আমাদের সামনে। ভীষণ কঠিন এক সময়। এই সময়ে সংবাদপত্র শিল্প নানা সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। মহামারীর এই দুষ্কালে এই সংকট আরো প্রকট হয়েছে। সংবাদকর্মীরা ভয়ঙ্কর জীবাণুর সঙ্গে যুদ্ধ করে প্রতিদিন কাজ করে চলেছেন। লকডাউনের সময় সবাই যখন ঘরবন্দি তখনো সংবাদকর্মীরা মাঠে ছিলেন। নিশ্চিত মৃত্যু জেনেও প্রতিদিন আমরা ঝুঁকির মধ্যে কাজ করেছি। আতঙ্কের একেকটি দিন গিয়ে আরো ভয়ঙ্কর রূপে হাজির হয়েছে পরবর্তী দিন। কিন্তু সংবাদকর্মীরা দমেননি।

দেশে করোনা যত চোখ রাঙিয়েছে, সংবাদকর্মীরা আরো সাহস দেখিয়েছেন। পত্রিকা অফিসে প্রতিদিন হানা দিয়েছে কোভিড। হাউসে হাউসে আক্রান্ত হয়েছেন সংবাদকর্মীরা। আমরা হারিয়েছি অনেক সতীর্থ, প্রিয়জনদের। এ তালিকায় সর্বশেষ যুক্ত হয়েছেন সিলেটের প্রবীণ সাংবাদিক আজিজ আহমদ সেলিম। নিপাট ভদ্রলোক আজিজ আহমদ সেলিম সিলেটের সাংবাদিকতার বাতিঘর ছিলেন। সর্বজন শ্রদ্ধেয় এক আলোকোজ্জ্বল প্রদীপ ছিলেন সেলিম। কিন্তু অদৃশ্য এই ঘাতক এক ফুঁয়ে নিভিয়ে দিয়েছে হাস্যোজ্জ্বল সেই তাজা প্রাণ।

করোনা পরিস্থিতিতে এক জগঝম্প ঝড় বইছে সংবাদপত্র শিল্পে। তছনছ হয়ে গেছে যাবতীয় স্বাভাবিকতা। সারা দেশে অনেক পত্রিকাই বন্ধ হয়ে গেছে। চলচ্চিত্র ও প্রকাশনা অধিদপ্তরের (ডিএফপি) হিসাব বলছে ঢাকাসহ সারা দেশে ৩৪০টি পত্রিকা নিয়মিত প্রকাশিত হতো। করোনা পরিস্থিতিতে এখন আড়াই শ’রও বেশি পত্রিকা বন্ধ রয়েছে।

একটি সংবাদপত্র দাঁড়িয়ে থাকে নানা সহায়ক শক্তির ওপর। সংবাদপত্র অর্থনীতি ও ব্যবসা-বাণিজ্যের ওপর নির্ভরশীল শিল্প। প্রচারসংখ্যা ও বিজ্ঞাপনের ওপরই মূলত নির্ভর করে পত্রিকার টিকে থাকা। অর্থনীতি সচল হলে এবং ব্যবসা-বাণিজ্য স্বাভাবিক হলে সংবাদপত্রের চাকা চলে, আর তা স্থবির হলে পত্রিকাও আর চলতে পারে না। করোনার এই স্তব্ধ পরিস্থিতিতে যে নিয়তির মুখে পড়েছে সংবাদমাধ্যম।

৩. করোনার এমন কঠিন পরিস্থিতিতেও মানবকণ্ঠ প্রকাশিত হয়েছে প্রতিদিন। দেশে লকডাউন এসে যে কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছিলাম সে সময়েও আমরা হতোদ্যম হইনি। বরং আরো সাহস নিয়ে সামনে এগিয়েছি আপ্রাণ। প্রতিদিনই সাহস হয়ে দাঁড়িয়েছি ঘরবন্দী অসহায় মানুষের পাশে। পরিস্থিতি এখন ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হচ্ছে। প্রথম দিকে করোনা যেভাবে চোখ রাঙিয়েছে সে তুলনায় মৃত্যুহার অনেক কম। ইউরোপের মতো ভয়াবহ সংক্রমণের কবলে পড়িনি আমরা। পরিস্থিতির ধারাবাহিক উন্নতি ঘটছে।

এ দেশের মানুষ সব সময়ই দুর্যোগ মোকাবিলায় সাফল্যের পরিচয় দিয়েছে, এবারও ব্যতিক্রম ঘটেনি। আমরা এখন আরো দায়িত্ব নিয়ে সামনে এগোতে চাই। মানবকণ্ঠের উদ্দেশ্য স্পষ্ট। দেশ, মানুষ আর মুক্তিযুদ্ধের প্রশ্নে আমরা আপসহীন। দেশ আর মানুষের সার্বিক উন্নয়নের পক্ষেই আমাদের চিন্তার প্রতিফলন ঘটছে প্রতিদিন। সোজা ভাষায় বলব, নিরপেক্ষতাও একটি পক্ষ, সেই বিবেচনায় মানবকণ্ঠ নিরপেক্ষ নয়। মানবকণ্ঠ দেশের পক্ষে। মানুষের পক্ষে। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে।

তবে পক্ষপাতহীন মতামতকে সব সময়ই গুরুত্ব দিয়ে চলেছে মানবকণ্ঠ। গঠনমূলক সমালোচনা, অদম্য সাহস আর মুক্তিযুদ্ধের চেতনাই মানবকণ্ঠের মূল পুঁজি। চারিত্রিক এই বিকাশ নিয়েই মানবকণ্ঠ এগোতে চায় যুগান্তরের পথে। শত বাধা পেরিয়ে দেশ যেমন এগোচ্ছে, মানুষের জীবনযাত্রার মান বাড়ছে। শিক্ষার হার বেড়েছে। স্বাস্থ্য খাতের উন্নতির ফলে গড় আয়ু বেড়েছে। শিশু ও মাতৃমৃত্যুর হার কমেছে। সর্বোপরি বাংলাদেশের মানুষ এগিয়ে চলেছে, মানবকণ্ঠও সেই অগ্রযাত্রার সহযাত্রী হতে চায় প্রতিদিন।

৪. মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনা হৃদয়ে ধারণ করেই আট বছর আগে যাত্রা শুরু করেছিল মানবকণ্ঠ। সময়ে আমাদের অবস্থান আরো দৃঢ় হয়েছে। বেড়েছে শুধু কনটেন্ট। গণতন্ত্র, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা, ন্যায়বিচার, সামাজিক সাম্য আর অসাম্প্রদায়িকতার পক্ষে আমাদের অবস্থান আরো শক্ত হয়েছে। মানবকণ্ঠ সৎ সাংবাদিকতায় বিশ্বাসী। বস্তুনিষ্ঠ ও দায়িত্বশীল সাংবাদিকতার প্রত্যয়ে আমরা অবিচল।

আমরা একটি সহিষ্ণু, ন্যায়পরায়ণ মানবিক সমাজ গড়ার প্রয়াস চালিয়ে যাচ্ছি। সেই ধারা অব্যাহত থাকবে ভবিষ্যতেও। আশার কথা, আমরা স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারছি। নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন বলেছিলেন- ‘যে দেশে গণতন্ত্র ও সংবাদপত্রের স্বাধীনতা আছে, সে দেশে দুর্ভিক্ষ হতে পারে না।’ আমরা স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারছি বলেই দেশ এগোচ্ছে।

বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতার মাধ্যমে দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার, সন্ত্রাস, জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে আমাদের লড়াই চলছে। সরকারি দলের বিরুদ্ধে কথা বলতেও পিছপা হচ্ছি না। রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক দুর্বৃত্তায়নের খবর আমরা ঢালাওভাবে প্রকাশ করছি। সরকার স¤প্রতি যে শুদ্ধি অভিযান চালিয়েছে, নিজ দলের দুর্নীতিবাজদের ধরে আইনের আওতায় নিয়ে এসেছে- তা সংবাদ প্রকাশের কারণেই।

মানবকণ্ঠ নেতিবাচক রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড যেমন তুলে ধরছে, তেমনি তুলে ধরছে ইতিবাচক দিকও। মানবকণ্ঠ যথাসাধ্য চেষ্টা করে ভালো-খারাপ জানিয়ে জনসাধারণকে সচেতন করতে। দলমত-নির্বিশেষে সমাজের সব ভালো উদ্যোগও প্রতিদিন পাঠকের সামনে তুলে ধরে মানবকণ্ঠ। উদ্যোগী মানুষগুলোকে যা আরো এগিয়ে নিতেও উৎসাহ জোগায়।

৫. বঙ্গবন্ধু আর মহান মুক্তিযুদ্ধের স্বপ্নের বাংলাদেশ গড়তেই আমাদের অদম্য পথচলা। যদিও এই চলায় আমরা বাধাগ্রস্ত হচ্ছি প্রতিদিন। স্বাধীনতার দীর্ঘ সময় পরও স্বাধীনতাবিরোধী পুরনো সেই শকুনদের চক্রান্তের শিকার হচ্ছি আমরা। তবে আমাদের গতি রোধ করতে পারেনি কেউ।

বাঙালি যুদ্ধ জয়ের জাতি। করোনার এই দুষ্কালও আমরা অদম্য সাহসে মোকাবিলা করে যাচ্ছি। লকডাউনের সময় পত্রিকা বিক্রির সংখ্যা বেশ কমেছিল, এখন আবার বাড়তে শুরু করেছে। হকাররাও কাজে যোগ দিচ্ছেন। আমরাও ঝুঁকি মোকাবিলা করে পাঠকের কাছে পত্রিকা পৌঁছাচ্ছি প্রতিদিন। এই সংকটময় পরিবেশেও মানবকণ্ঠ দায়িত্বশীল ও সৎ সাংবাদিকতা চর্চা চালিয়ে যাচ্ছে। রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক কিংবা সাংস্কৃতিক- সব ক্ষেত্রেই এই চর্চা অব্যাহত থাকবে। মানবকণ্ঠ অনেক দূর এগোতে চায়। পাশে থাকুন প্রিয় পাঠক।

 






ads