৮ বছরেও শেষ হয়নি ৪৮ ঘণ্টা


poisha bazar

  • শাহীন করিম
  • ১১ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ০৯:৩৮

বহুল আলোচিত সাংবাদিক দম্পতি সাগর সরওয়ার ও মেহেরুন রুনি নৃশংস হত্যাকাণ্ডের আট বছর পূর্ণ হচ্ছে আজ। ‘৪৮ ঘণ্টার মধ্যে অপরাধী গ্রেফতার’ তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সেই আশ্বাসের পর আট বছর কেটে গেলেও কেউ জানে না কারা খুন করেছে কিংবা কেন করেছে।

দেশজুড়ে চাঞ্চল্যকর ওই জোড়া খুনের ঘটনার তদন্তের কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই। বছরের পর বছর একই বৃত্তে ঘুরছে মামলার তদন্ত। তাই বিচার তো দূরের কথা, খুনিচক্রকে গ্রেফতার করে এখন পর্যন্ত চ‚ড়ান্ত তদন্ত প্রতিবেদন বা চার্জশিটও আদালতে জমা পড়েনি। ‘চেষ্টা চলছে’ জানিয়ে আদালতে ৭১ বার সময় নিয়েছে তদন্ত সংস্থা র‌্যাব। বছরের পর বছর অপেক্ষা করতে করতে পরিবারের সদস্যরা ঐ ঘটনার বিচারের আশা ছেড়েই দিয়েছেন বলে জানা গেছে।

আদালত সূত্র জানায়, সর্বশেষ গতকাল সোমবার সাগর-রুনি হত্যা মামলার প্রতিবেদন দাখিলের জন্য দিন ধার্য ছিল। তবে নির্ধা?রিত দিনে প্রতিবেদন দাখিল করতে পারেননি তদন্ত কর্মকর্তা র‌্যাবের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার খন্দকার শফিকুল আলম। তাই ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্র্রেট দেবব্রত বিশ্বাস তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের জন্য ফের ২৩ মার্চ দিন ধার্য করেছেন। এ নিয়ে প্রতিবেদন দাখিলের তা?রিখ ৭১ বার পেছাল। তবে সংশ্লিষ্ট র‌্যাব কর্মকর্তারা দাবি করছেন, ক্লুলেস এ মামলার তদন্তে কিছু অগ্রগতি আছে। খুনি শনাক্তের চেষ্টা আছে বলেও দাবি র‌্যাবের। তবে সাগর-রুনির স্বজন ও সহকর্মীরা বলছেন, তদন্ত একেবারে স্তিমিত হয়ে পড়ে আছে।

অন্যদিকে এই সাংবাদিক দম্পতির হত্যার বিচারের চেয়ে গণমাধ্যম কর্মীদের আন্দোলনও অনেকটা স্তিমিত হয়েছে। যদিও আট বছর পূর্তি উপলক্ষে আজ কিছু কর্মসূচি পালন করবে সাংবাদিক সংগঠনগুলো। ২০১২ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি ভোরে রাজধানীর পান্থপথ সংলগ্ন পশ্চিম রাজাবাজারের ভাড়া বাসা থেকে মাছরাঙা টেলিভিশনের বার্তা সম্পাদক সাগর সরওয়ার ও এটিএন বাংলার জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক মেহেরুন রুনির ক্ষতবিক্ষত লাশ উদ্ধার করা হয়। এ সময় বাসায় ছিল তাদের একমাত্র পাঁচ বছরের ছেলে সন্তান মাহির সরওয়ার মেঘ। এই আলোচিত সাংবাদিক দম্পতি খুন হওয়ার পর তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাহারা খাতুনের একটি মন্তব্য পরবর্তীতে ব্যাপক আলোড়ন তৈরি করে। ঘটনার দিন সকালে ঘটনাস্থল পরিদর্শনে গিয়ে সাহারা খাতুন বলেছিলেন, ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে হত্যাকারীদের আইনের আওতায় আনা হবে। এর কিছুদিন পর তৎকালীন পুলিশ প্রধান (আইজিপি) দাবি করেছিলেন, সাগর-রুনি হত্যা মামলার তদন্তে প্রণিধানযোগ্য অগ্রগতি রয়েছে।

কিন্তু চাঞ্চল্যকর এ হত্যা জোড়া খুনের আট বছর পরও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও আইজিপির সেই প্রতিশ্রুতির ছিঁটেফোটাও বাস্তবায়ন দেখা যায়নি। দোষীদের আইনের আওতায় আনা তো অনেক দূরে, এখন পর্যন্ত ঐ হত্যা মামলার তদন্ত প্রতিবেদন বা চার্জশিটই জমা দিতে পারেনি র‌্যাব। হত্যাকাণ্ডের পর রুনির ভাই নওশের রোমান বাদী হয়ে মামলা দায়ের করেছিলেন, যার এখন বদ্ধমূল ধারণা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের সদিচ্ছার অভাবেই অগ্রগতি হচ্ছে না হত্যাকাণ্ডের তদন্তের।

নিহত দম্পতির স্বজনরা জানান, মা-বাবা খুনের সময় পাঁচ বছরের শিশু মেঘের বয়স এখন ১৩ বছর। রাজধানীর ইন্দিরা রোডে নানার বাসায় মামার সঙ্গে থাকছে সে। গুলশানের একটি স্কুলে সপ্তম শ্রেণিতে পড়ছে মেঘ। এবার বাংলাদেশ ক্রীড়া শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে (বিকেএসপি) ক্রিকেট বিভাগে ভর্তির আবেদন করে ক্যাম্পেও গেছে মেঘ। একই সূত্রমতে, সাকিবের মতো বড় ক্রিকেটার হতে চায় সে। চিকিৎসকের পরামর্শে স্বজনরা মেঘকে মা-বাবার স্মৃতি আঁকড়ে থাকতে দেন না। তবে প্রায়ই মা-বাবার কথা বলে সে।

এদিকে সস্প্রতি পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) ভিন্ন মামলায় মেহেরুন রুনির পরিচিত সন্দেহভাজন শান্ত ওরফে ডন ও তার সহযোগী সারোয়ার হোসেনকে গ্রেফতার করেছে। সাগর-রুনি খুনের সঙ্গে এরা জড়িত কি না তা খতিয়ে দেখছে সিআইডি। ডন ও সারোয়ারের আরেক সহযোগীকেও সিআইডি খুঁজছে বলে সূত্র জানায়।

তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, এর আগে সাগর-রুনি হত্যা মামলায় কয়েক বছর আগে র‌্যাব ও পুলিশের হাতে সন্দেহভাজন আটজন গ্রেফতার হয়। এদের মধ্যে রফিকুল, বকুল, সাইদ, মিন্টু ও কামরুল হাসান ওরফে অরুণসহ পাঁচজন মহাখালীর বক্ষব্যাধি হাসপাতালের চিকিৎসক নারায়ণ চন্দ্র রায় হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত। ঘটনার কিছুদিন পরই গ্রেফতার দেখানো হয় পারিবারিক বন্ধু তানভীর ও বাসার নিরাপত্তাকর্মী পলাশ রুদ্র পাল ও হুমায়ূন কবীর। এদের মধ্যে তানভীর, মিন্টু ও পলাশ হাইকোর্ট থেকে জামিন পেয়েছে। বাকিরা এখনো কারাগারে আছে।

আদালত ও র‌্যাব সূত্র জানায়, আদালতে দাখিল করা র‌্যাবের ৭০টি অগ্রগতি প্রতিবেদনেই গুরুত্ব সহকারে তদন্ত চলছে বলে দাবি করা হয়েছে। প্রায় ২০০ জনের সাক্ষ্য গ্রহণ করার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। ঘটনাস্থল থেকে জব্দ হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত ছুরি, বঁটি, ছুরির বাঁট, সাগর-রুনির পরণের কাপড়, সাগরের হাত-পা যে কাপড় দিয়ে বাঁধা হয়েছিল সেই কাপড় ও রুনির পরণের টি-শার্ট পাঠানো হয়েছিল যুক্তরাষ্ট্রের ল্যাবরেটরিতে। ২০১৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে আদালতে দাখিল করা প্রতিবেদনে বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্রের পরীক্ষাগার থেকে ডিঅক্সিরাইবোনিউক্লিক এসিড (ডিএনএ) পরীক্ষার রিপোর্টগুলো পাওয়া গেছে। সে রিপোর্ট ও অপরাধচিত্রের প্রতিবেদন (ক্রাইম সিন রিপোর্ট) পর্যালোচনায় দুজন পুরুষের ডিএনএর পূর্ণাঙ্গ প্রফাইল পাওয়া গেছে। তবে পরবর্তীতে নতুন করে আর কিছু জানানো হয়নি। ২০১২ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি গভীর রাতে সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ডের মামলা হওয়ার পর প্রথমে এর তদন্তে নামে শেরে বাংলা থানা পুলিশ। চারদিনের মাথায় মামলা হাতবদল হয়ে গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) কাছে। এর ৬২ দিনের মাথায় ডিবি আদালতে ব্যর্থতা স্বীকার করে। ঘটনার দুই মাস পর হাইকোর্টের আদেশে মামলাটির তদন্তের দায়িত্ব দেয়া হয় র‌্যাবকে। সেই থেকে আট বছর পেরিয়ে গেলেও এখনো তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করতে পারেনি সংস্থাটি।

মানবকণ্ঠ/এইচকে




Loading...
ads






Loading...