বাঘবিধবা: নোনা জলের বেহুলারা


  • দীপংকর গৌতম
  • ১০ ডিসেম্বর ২০২১, ১৭:১০

সুন্দরবনকে ঘিরে কাহিনীর অন্ত নেই। এ অঞ্চলে যেসব মানুষ দীর্ঘকাল ধরে বসবাস করছে তারাও এই বনাঞ্চলের রহস্য জানে না। যে কারণে প্রাচীনকাল থেকেই এখানে পূজিত হয় মানিবপীর, সত্যপীর, বনবিবি, গাজী কালুসহ অজস লৌকিক দেবতা। তবে সুন্দরবনের ত্রাতা বনবিবি। সুন্দরবন ও এর আশপাশের মানুষ বনবিবির নাম নিয়ে তাঁর পূজা দেয় ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে। এরপর তারা বনে প্রবেশ করে। বনের ভেতরে আছে কতশত জীবজন্তু। বাইরে থেকে মানুষ যেমন পেটের জন্য বনে-বাদাড়ে যায়, ওখানেও অনেক জীবজন্তু আছে, তারাও বসে থাকে তাদের আহারের অপেক্ষায়।

তারপরও অনেক সময় শেষরক্ষা হয় না। বনে গেলে বিপদ-আপদ হতেই পারে। কিন্তু সমস্যা হলো, যেকোনো পুরুষ বনে গিয়ে কোনো জীবজন্তুর দ্বারা আহত বা নিহত হলে তার পুরো দায় টানতে হয় নারীদের। মানে আহত বা নিহতদের স্ত্রীরা এর জন্য দায়ীÑএটা সমাজ বিশ্বাস করে এখনো। বনজীবীদের স্ত্রীরা যুগ যুগ ধরে বনবিবিকে সন্তুষ্ট রাখতে ব্রতপালন করে, বনবিবির গান গায়, পাঁচালি পড়ে তারপরও তাদের নিস্তার নেই। বনজীবীরা যখন বনে যায়, ভয়ডর ফেলেই যায়। আসলে তাদের যেতে হয়। যদিও হঠাৎ বাঘের মুখে পড়লে তাদের করার কিছু থাকে না। সুবিধামতো পড়লে বাঘও বনজীবীদের সঙ্গে লড়াইয়ে হেরে যায়। তবে সে ঘটনা হাতে-গোনা। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ভাগ্যহীন মানুষগুলো বাঘের পেটে যায়। যখন এ খবর লোকালয়ে আসে, চারদিকে কান্নাকাটির রোল পড়ে। গ্রাম থেকে গ্রাম দৌড়ে আসে লোকজন।

‘কার ছেলেরে বাঘে খাইলো’-মানুষের এই একাত্মতা লক্ষণীয় হলেও, বহু মানুষের সমাগম মৃতের জন্য হলেও, তারা এক ভাগ্যাহত নারীর অপমান, যন্ত্রণা হাহাকারে কুঁকড়ে যাওয়া জীবন দেখতে আসে। স্বামী বাঘের পেটে গেলে দায়ী হবে তার স্ত্রী। সমাজের এ নিয়ম মানতে হবে, মানা হয়। যুগ যুগ ধরে চলে আসা এ নিয়মের ব্যত্যয় হবে না। স্বামী বাঘের পেটে যাওয়ার খবরে তার বিধবা স্ত্রী বৈধব্যের কষ্ট ভোগ করার চেয়ে, সদ্যমৃত স্বামীর জন্য দুঃখ-কষ্ট করার চেয়ে তার বিচারের প্রহর গোনে বেশি। দোষী সাব্যস্ত হয় মৃতের স্ত্রী! সমাজ তার নাম দেয় ‘বাঘবিধবা’। ‘অপয়া’ ‘কুলটা’ ‘রাক্ষস’- অনেক নাম হয় তখন এই বাঘবিধবাদের।

যে কারও স্বামী মারা গেলে বউ বিধবা হয় এটাই নিয়ম। আর বিধবাতো বিধবাই, স্বামী যার বাঁচলো না, যার সংসার উজাড় হলো, তার আর রইলো কি? গহীন জঙ্গলের পাশের এলাকা। এখানে বাঘের যাতায়াত নৈমিত্তিক। স্বামী বাঘের পেটে গেলে বাড়িতে তার স্ত্রী, সন্তানের যে কী অবস্থা হয় সেটা বলার মতো নয়। বড় অমানবিক, বড় নিষ্ঠুর সে জীবন ও সামাজিক আচার। স্বামীকে বাঘে খেলে স্ত্রীর তখন সমাজে ঠাঁই হয় না। দুর্ভাগ্যের বিষয় এ অবস্থায় মৃতের ছেলে-মেয়েরাও থাকে কমবয়সী। ফলে ছোট ছোট সন্তান নিয়ে অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে পা বাড়ান ‘বাঘবিধবা’ নামে অভিহিত নারীরা।

চিহ্নিত এসব কুলটা, অপয়া অলক্ষ্মী নারীরা। সঙ্গী হিসেবে তখন তারা কাউকে পান না। তাদের কেউ কাজ দেয় না। আশপাশে কেউ থাকলেও তাদেরকে আড়চোখে দেখা হয়। যারা বাঘের পেটে যায়, তাদের সাধারণত বনে যাওয়ার পারমিট থাকে না। পারমিট আনতে অনেক টাকা লাগে, তাই কেউ পারমিট না এনেই জঙ্গলে যায়। পারমিট থাকলে মৃত ব্যক্তিরা ১ লাখ আর আহতরা ৫০ হাজার টাকা পায়। এসব হতদরিদ্র মানুষের পারমিট নেয়ার টাকা থাকে না বলেই সব বাঘবিধবারা তাদের সন্তান নিয়ে যেন জলে ভেসে যায়। কোনো নারী বাঘের পেটে গেলে কিন্তু পুরুষ এসব শাস্তি পায় না। সে বরং আরেকটা বিয়ে করে ভালো থাকে। সংকট সব শুধু নারীর বেলায়। বাঘবিধবা নারীরা সমাজচ্যুত হয়ে অবর্ণনীয় কষ্টের মধ্যে দিয়ে দিনযাপন করতে থাকেন, যেখানে জীবিত এবং মৃত জীবনের মধ্যে তেমন পার্থক্য থাকে না।

এ কুসংস্কারের ঘন অন্ধকারে ডুবে আছে সুন্দরবনসংলগ্ন গ্রামগুলো। এখানের বিশ্বাস-অবিশ্বাসের মধ্যে পুরুতান্ত্রিকতার এক ভয়াবহ চিত্র আছে, যা কেউ দেখে না, দেখতে চায় না। ভারতবর্ষে সতীদাহ প্রথায় যেমন নারীকে তার মৃত স্বামীর সঙ্গে শ্মশানে যেতে বাধ্য করা হতো, সবার সামনে জীবন্ত নারীকে চিতা কাঠের সঙ্গে বেঁধে পোড়ানো হতো, সুন্দরবন অঞ্চলের বাঘবিধবাদের অবস্থা দেখলে সে কথাই মনে পড়ে। তবে সতীদাহে সতী হয়তো মারা যেতো।

কিন্তু বাঘবিধবাদের জীবন আরো ভয়াবহ। সুন্দরবনে প্রবেশের আগে বনজীবীরা বনবিবির পূজা করে- এটা স্থানীয় সংস্কৃতি। কিন্তু বাকিটা শুনলে বিস্মিত হতে হয়। যেমন কারও স্বামী সুন্দরবনে গেলে তার স্ত্রী অন্য পুরুষের সঙ্গে কথা বলতে পারবে না, চুল আঁচড়াতে পারবে না, প্রসাধন ব্যবহার করতে পারবে না। পায়ে স্যান্ডেল পরতে পারবে না, এমনকি তিনি চুলে তেলও মাখতে পারবে না। চুলায় কিছু ভাজতে পারবে না। স্বামী যতদিন বনে থাকবে তাদের খোলা চুলে চলাফেরা করা বারণ। এসময় তারা সাবানও ব্যবহার করতে পারেন না। রান্নার জন্য মরিচ পোড়াতে পারেন না। এত কিছু স্ত্রীরা মেনে চলা এক ধরনের ব্রত।

তবে এ ব্রতপালনেও শেষ রক্ষা হয় না। অনেক সময় স্বামী যদি বাঘের পেটে যায়, তাহলে ধরেই নেয়া হয় স্ত্রী ব্রতের নিয়ম পালনে কোনো ত্রুটি করেছে। স্ত্রীর ব্রতপালনে কোথাও হয়তো গাফিলতি করেছে। তাই স্বামীর মৃত্যুর পর সমস্ত দায় তাকেই বহন করতে হয়। এর বিরুদ্ধে কেউ কথা বলে না, বলবে না। যুগ যুগ ধরে মেনে আসা এ নিয়মের কোনো পরিবর্তন হয়নি। বাঘবিধবাদের ভাগ্যের বিড়ম্বনা এখানেই শেষ নয়। ‘অপয়া’ অপবাদ পাওয়া নারীদের দায়িত্ব কেউ নেয় না। নেবে না। শহর হলেও হয়তো বাসায় বাসায় কাজ করে খেতে পারত। ঠাঁই হয় না শ্বশুরবাড়িতে।

সমাজ থেকেও তাকে সন্তানসন্ততি নিয়ে একঘরে থাকতে হয়। একা তাকে থাকতে হয়, দূর কোনো এলাকায়। তারা যদি এ সময় যৌন নির্যাতনেরও শিকার হন, তাহলেও দোষের তীর তাদের দিকেই তাক করা থাকে। বিচারে ধর্ষকের কোনো সাজা হয় না। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ঘটে এমন ঘটনা। একবিংশ শতকের সমস্ত অন্ধকার যেন সাতক্ষীরার সুন্দরবন ঘেঁষা শ্যামনগর উপজেলার বিভিন্ন গ্রামে সজাগ পাথরের মতো শুয়ে আছে। শ্যামনগর উপজেলার মুন্সীগঞ্জ এলাকায় গিয়ে এমন অজস্র চিত্র দেখা গেছে। বিষয়গুলো এতো অমানবিক, তা বলে শেষ করা যাবে না।

তবে এখানের চেয়ারম্যান-মেম্বাররা বলেন, আমাদের মুরুব্বিরা যেটা করে গেছে, সেটা ভালোর জন্য করেছে, এতে সমাজের অবস্থা স্থিতিশীল থাকে। কয়েকজন বাঘবিধবা বলেছেন, জীবিত থেকেও মৃতের মতো জীবন কাটাতে হচ্ছে তাদের। তাদের দিনের পর দিন না খেয়ে কাটাতে হয়। এলাকার প্রভাবশালীরা কোন সাহায্যের কথা বললে সরাসরি কুপ্রস্তাব দেয়। ‘জীবনডারে শ্যাষ কইরা দিতি ইচ্ছা করে’ বলে কাঁদতে থাকে রক্ষী মাহাতো। নারী সংঠগন লিডাসের তথ্য মতে, সুন্দরবনসংলগ্ন এলাকায় প্রায় সাড়ে এগারোশ বাঘবিধবা নারী রয়েছেন। ২০০১ থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত ১০ বছরে বাঘের আক্রমণে মারা গেছেন এক হাজারেরও বেশি বনজীবী। এর পরের তথ্য আর পাওয়া যায়নি। তবে ২০১৬ সাল পর্যন্ত কাউকে বাঘে খাওয়ার কথা শোনা যায়নি।

সাতক্ষীরার শ্যামনগর সংলগ্ন সুন্দরবন এলাকায় কথা হয়েছিলো বাঘবিধবা সোনামণির (৪৫) সঙ্গে। তার দুই স্বামীকে জীবন দিতে হয়েছে বাঘের আক্রমণে। তার মুখ দেখলে কেউ ‘শুভ কাজে’ বের হন না বলে তিনি জানান। সোনামণি বলেন, ‘১৯৯৯ সালের এক দিন আমি ব্রত করছি এমন সময় খবর এলো আমার স্বামীকে বাঘ নিয়ে গেছে। সে কারণে কোলের এক মাস বয়সী বাচ্চাসহ আমার শাশুড়ি আমাকে তাড়িয়ে দেন। তখন আমাকে বাচ্চা নিয়ে পথে পথে ঘুরতে হয়েছে। পরে আমার দেবর আমাকে বিয়ে করে।

২০০৩ সালে তাকেও বাঘে ধরে। এরপর থেকেই আমাকে অপয়া, অলক্ষ্মী, স্বামীখেকো অপবাদ মাথায় নিয়ে থাকতে হচ্ছে। সকালে উঠে যেন আগে আমার মুখ দেখতে না হয়, তাই শাশুড়ি আমাকে শিকল দিয়ে বেঁধে রাখতো। এখন তেমন না হলেও এ জীবনের কোনো মূল্য নেই। উঠতে বসতে কথা, ঘরের মানুষ, পরের মানুষ সবার কথা শুনে জীবনটা থিতিয়ে আসতে চায়। এ জীবন তো মৃত্যুর মতোই। স্বামী গেল বাঘের পেটে, আমি আর কোথায় থাকলাম। কিন্তু আমি যে জীবিত থেকেও মৃত, এর শেষ কোথায়? আমরা নারী বলেই আমাদের ওপর এমন অত্যাচার চলে, এটা দেখার কি কেউ নেই? এ নিয়ম ভেঙে ফেলার কি কেউ নেই, বলে সে কাঁদতে থাকে।

বাঘবিধবা বলি দেশাইর সঙ্গে কথা বললে তিনি জানান, ‘আমার স্বামী ২০০২ সালে সুন্দরবনে নদীতে মাছ ধরতে গিয়ে বাঘের আক্রমণে নিহত হয়। এজন্য আমাকেই দায়ী করা হয়। এ মৃত্যুর জন্য আমি দায়ী বলে আমার ওপর নির্যাতন চলেছে দিনের পর দিন। তারপরও আমার স্বামীর ভিটায় আমাকে থাকতে দেয়নি। সবাই মিলে বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দিয়েছে। কোথায় যাবো? আমার বাবা মারা গেছে অনেক আগে। তাই ভাইয়ের বাড়ি গিয়ে উঠেছি। তার অবস্থাও ভালো নয়। তবু মাথা গোঁজার ঠাঁই পেয়েছি এখন নদীতে রেণু পোনা ও কাঁকড়া ধরে সংসার চালাই।

কোনোমতে বেঁচে আছি। অনেক কষ্ট করে ছেলে-মেয়েদের বড় করছি।’ কাঁদতে কাঁদতে বুলি দাসী বলেন, ‘এই এলাকা ঘুরে দেখেন আমার মতো এমন অনেক মেয়ে আছে, যাদের স্বামী বাঘের হাতে মারা যাওয়ার পর তাদের অপয়া বলে বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দেয়া হয়েছে। আমার স্বামীর ছোট ভাইও বাঘের আক্রমণে মারা যায়। তার বউ দিপালিকেও তাড়িয়ে দেয়া হয়েছে। এ কোন নিয়ম? মানুষের বিয়ে হয় কি স্বামীকে নিয়ে সংসার করার জন্য, না তাকে মারার জন্য? আজ সমাজ যেটা করছে এর বিরুদ্ধে কেউ কোনো কথা বলে না কেন’?

১৯৯০ সালের পর থেকে কৃষিজমিতে লবণ পানি তুলে চিংড়ি চাষ শুরু হয়। ধীরে ধীরে চিংড়ি ঘের বিস্তার লাভ করে। এখন জমি নেই, এখন সুন্দরবন আর ঘের-দুটিই আমাদের মরণ ফাঁদ। জমিতে আমার স্বামীসহ এলাকার মজুররা কাজ হারাতে শুরু করে এই লবণ জলের ঘেরের কারণে। পেটের জন্য জমি ছেড়ে যেই সবাই বনে যেতে শুরু করলো, আর আমাদের কপাল পোড়া শুরু হলো। কোনো কাজ না থাকায় সে সুন্দরবনে মধু কাটতে গিয়েছিল। আর ফেরেনি। এখন নদীতে জাল টেনে চলে আমার জীবন।

গাবুরা ইউনিয়নের চকবারা গ্রামের বাঘবিধবা খালেদা আক্তারও একই কথা বলেন, চিংড়ি ঘের বেড়ে যাওয়ায় আমার স্বামীর কাজের অভাব দেখা দেয়। ফলে বাধ্য হয়ে সে সুন্দরবনে যায়। আমি নিষেধ করেছিলাম। কিন্তু পেটের ক্ষুধা থামবে কি করে? বাঘের ক্ষুধার চেয়েও মানুষের ক্ষুধা আরো ভয়াবহ। একারণেই বনে গিয়ে বাঘের পেটে গেছে। ৪ ছেলে ও ১ মেয়ে নিয়ে আমার কষ্টের জীবন। একমাত্র মৃত্যু পারে এমন জীবন থেকে বাঁচাতে, বলে তিনি কাঁদতে থাকেন। বাঘবিধবা বিষয়টি নিয়ে একটা এনজিও কাজ করে। কিন্তু এই সংকট নিরসন কেউ করে না। নারী সংগঠন, মানবাধিকার সংগঠন কেউকি এদের কান্না শুনতে পায় না? বাঘবিধবাদের জীবন বর্ণনায় আনা কষ্টসাধ্য এই জীবনে থেকেও তারা বনজীবী মানুষের কল্যাণে বনবিবির পাঁচালি পড়েন রাতে অথচ তাদের জীবনের পাঁচালি পড়া হয় না কারো! (পিআইডি ফিচার)

-লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট


poisha bazar


ads