বিশ্বময় শান্তি প্রতিষ্ঠায় ইসলামী সমাধান

মানবকণ্ঠ
ছবি - সংগৃহীত।

poisha bazar

  • মাহমুদ আহমদ
  • ০৮ ডিসেম্বর ২০১৯, ১৬:৩৮

সমগ্র বিশ্বের মানুষ যেন এক অশান্তি আর অস্থিরতার মাঝে অতিক্রম করছে। না ধর্মীয়ভাবে কেউ শান্তিতে আছে আর না সামাজিকভাবে। এক ধর্মের অনুসারী অপর ধর্মের লোকদের ওপর বিনা কারণে চড়াও হচ্ছে, জ্বালিয়ে পুড়িয়ে ধ্বংস করে দেয়া হচ্ছে শহরগুলোকে। হাজার নিরীহ মানুষকে হত্যা করা হচ্ছে। বিশ্বের সব দেশ উপর্যুপরি দুঃখ-কষ্টের সীমাহীন আজাব ও বিপদাপদের সম্মুখীন এবং অনবরত এর লক্ষ্যে পরিণত হচ্ছে।

একে সামাল দেয়ার সম্ভাব্য সব প্রকার চেষ্টা করা হয়, কিন্তু যত চেষ্টাই করা হোক না কেন ব্যাধি কেবল বাড়ছেই। প্রত্যেকটি নতুন বিপদ ও সমস্যা পূর্বের তুলনায় অনেক বেশি কষ্টদায়ক ও উৎকণ্ঠা বৃদ্ধির কারণ হয়ে থাকে। এক সমস্যার সমাধান সহস্র অস্থিরতা সৃষ্টির কারণ হচ্ছে। আর এমনটি শেষ জামানায় হওয়ারই কথা ছিল। কেননা এসব অস্থিরতা ও উৎকণ্ঠার কারণ পার্থিব নয় বরং ঐশী কোনো নিয়তি এর পেছনে কার্যকর।

ঐশী আজাব এবং শাস্তি যা বৃষ্টির ফোটার মতো বর্ষিত হচ্ছে। আর ব্যাধি যখন ঐশী হয় তখন চিকিৎসকও ঐশীই হওয়া প্রয়োজন, যিনি এসব দুঃখ-কষ্টের চিকিৎসা করতে পারেন। আজ উৎকণ্ঠিত বিশ্ববাসী এবং প্রাণ ওষ্ঠাগত আর্তমানবতার জন্য প্রয়োজন পবিত্র কোরানের শিক্ষার ওপর আমল করা, বিশ্বময় অতীব গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে ঐশী ইমামের, যিনি সমগ্র বিশ্বের শান্তির জন্য কাজ করবেন এবং অশান্তময় বিশ্বকে শান্তিময় করবেন।

ব্যক্তিগত ও জাতীয় পর্যায়ে প্রত্যেক দেশের সরকার শান্তির সন্ধানে রত আর তা অর্জনের জন্য সম্ভাব্য সব প্রকার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু নামকাওয়াস্তে যে শান্তি প্রতিষ্ঠা করা হয় তার ভিত্তি সুবিবেচনা হয় না। আন্তরিকতার সঙ্গে কৃত সুবিবেচনাই মূলত শান্তির ভিত্তি হতে পারে। পারস্পরিক ভালোবাসা ও প্রেম-প্রীতির পরিবেশ সৃষ্টির জন্য সুবিবেচনা প্রদর্শন আবশ্যক। আর সুবিবেচনা হচ্ছে, মানুষের কথা ও কাজের মধ্যে যেন কোনো ভিন্নতা না থাকে আর মানুষ যেন কখনো মিথ্যার আশ্রয় না নেয় বা ভুল কথা না বলে। কিন্তু সাধারণভাবে আমরা সত্যের এরূপ উন্নত মান দেশীয় এবং আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলের কোথাও দেখতে পাই না।

আজ যদি বিশ্বের অবস্থা পর্যালোচনা করা হয় তাহলে দেখা যাবে, একটি বিশাল শ্রেণি দরিদ্রতা ও অন্যায়-অবিচারের শিকার। পরিশেষে এসব অবিচারই ঘৃণা ও ক্ষোভে রূপান্তরিত হয়। প্রশ্ন হচ্ছে, বিশ্বের শক্তিশালী জাতিসমূহের বিশ্বের সীমাহীন দরিদ্রতা ও অন্যায়-অবিচারের কোনো সমাধান খুঁজে বের না করার কারণ কী? জাতিসংঘের উচ্চকক্ষের সভা ডেকে অন্যায় ও অন্যায্য কার্যকলাপের বিরুদ্ধে শুধুমাত্র দুঃখ ও ক্ষোভ প্রকাশ করা কোনো সমাধান নয়। ইসলামের পবিত্র প্রতিষ্ঠাতা মহানবী (সা.) এক্ষেত্রে একটি নীতিগত নির্দেশনা প্রদান করেছেন, তাহলো ‘শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য তোমাদের হƒদয়গুলোকে ঘৃণা থেকে পুরোপুরি মুক্ত করো।’ তাই আমরা যদি পরস্পরকে ভালবাসতে শিখি তাহলে সারা বিশ্ব হতে পারে শান্তিময়।

সমাজ ও রাষ্ট্রকে অশান্তি, জুলুম ও বিশৃঙ্খলামুক্ত করার নির্দেশ ইসলামে রয়েছে বলেই ইসলাম শান্তির ধর্ম। মানুষ যদি শান্তি পেতে চায়, তাহলে তার নিজের ইচ্ছেমতো জীবনযাপন না করে আল্লাহর দেয়া বিধান মেনে চলতে হবে। তাই আল্লাহ তার প্রেরিত বিধানের নাম রেখেছেন ইসলাম বা শান্তি। কম্পিউটার চালিত অত্যাধুনিক যান্ত্রিক সভ্যতার এ যুগে মানুষ আজ কঠিনতম বাস্তবতার শিকার। সবাই চায় সচ্ছলতা, চায় শান্তি। বস্তুত মানুষ আত্মিক শান্তির পিয়াসী আর বেঁচে থাকার জন্য এটি অপরিহার্য। মহান আল্লাহর মনোনীত ধর্ম ইসলাম সেই অনন্ত শান্তির বাণীই প্রচার করছে। তাই তো শাশ্বত ধর্ম ইসলামের অনিন্দ্যসুন্দর আদর্শে মানুষ যুগ যুগ ধরে ইসলাম গ্রহণ করে আসছে।


বিশ্বের অধিকাংশ মানুষই শান্তির প্রত্যাশা রাখে আর নিরাপত্তাও চায়, কিন্তু বিশ্লেষণ করলে মনে হয়, প্রকৃতপক্ষে বিশ্বের অধিকাংশই এই শান্তি লাভ করতে চায় না, তারা সেসব পথ অবলম্বন করতে সম্মত নয় যেপথে চললে শান্তি অর্জন সম্ভব। কেননা এই পথ যতটা সহজ ততটাই বন্ধুর। এই নীতি ও সমাধানের কথা বিশ্বস্রষ্টা পবিত্র কোরানেও বর্ণনা করেছেন। আল্লাহপাক বলেন, ‘যারা ঈমান আনে এবং যাদের হৃদয় আল্লাহকে স্মরণ করে প্রশান্তি লাভ করে। শোন আল্লাহর স্মরণেই হৃদয় প্রশান্তি লাভ করে’ (সুরা আর রাদ, আয়াত: ২৮)।

বাস্তবতা এটাই যে, আজ মানবতা আল্লাহপাকের স্মরণ হতে দূরে চলে গেছে এবং আল্লাহতায়ালাকে ভুলে বসেছে। অনেকে তো আল্লাহপাকের অস্তিত্বই অস্বীকার করে আর এ কারণেই তারা এ বিষয়ের প্রতি মনোযোগ দিতে চায় না এবং যারা এতে বিশ্বাস রাখে তারাও ধর্মের নামে ধর্ম প্রবর্তকদের আনীত সত্যিকার শিক্ষামালা বিকৃত করে এমনসব মনগড়া ব্যাখ্যা করছে যা সমাজের শান্তি ও নিরাপত্তাকে বিঘ্নিত করে আলো-বাতাসকে পর্যন্ত বিষাক্ত করে ফেলেছে।

অথচ প্রত্যেক জাতিতে নবী এসেছে আর সমাজের শান্তি ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠার জন্যই তারা আবিভর্‚ত হয়েছেন। সবশেষে বিশ্বের জন্য আশীর্বাদ হিসেবে আবিভর্‚ত হন সর্বশ্রেষ্ঠ ও মানবদরদী রসুল হজরত মুহম্মদ (সা.)। তিনি বিশ্ববাসীকে ঐক্যবদ্ধ করার জন্য এসেছেন, যাতে তারা এক জাতিতে পরিণত হয় এবং ধরাপৃষ্ঠে শান্তি প্রতিষ্ঠিত হয়। শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য চাই সব ধর্মের প্রতি ভালোবাসা প্রদর্শন। হজরত মুহম্মদ (সা.) তার জীবন দ্বারা একথা প্রমাণ করে গিয়েছেন যে, ধর্মের নামে কোনো অন্যায়-অবিচার নেই। সব ধর্মের সম্মানিত ব্যক্তিবর্গ ও তাদের ধর্মীয় উপাসনালয়গুলো শ্রদ্ধার বস্তু। মহানবী (সা.)-এর শিক্ষাগুলোকে আজ আমাদের জীবনে বাস্তবায়ন করার সময় এসেছে।

মহানবী হজরত মুহম্মদ মুস্তফা (সা.) সমাজের সর্বক্ষেত্রে এবং সব জাতির মাঝে শান্তি, শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করেছেন। খ্রিস্টানদের নাগরিক ও ধর্মীয়-অধিকারকেও তিনি নিশ্চিত করেছেন এবং কেয়ামত পর্যন্ত যেন তা বলবত থাকে, সে ব্যবস্থাও করেছেন। খ্রিস্টানদের নাগরিক ও ধর্মীয়-অধিকার নিশ্চিতকারী মহানবী (সা.) প্রদত্ত ৬২৮ খ্রিস্টাব্দের ঘোষণা পত্র: এটি মুহম্মদ বিন আবদুল্লাহ (সা.) প্রণীত কাছের এবং দূরের খ্রিষ্টীয় মতবাদ পোষণকারী প্রত্যেকের জন্য ঘোষণা পত্র: আমরা এদের সঙ্গে আছি। নিশ্চয়ই আমি নিজে আমার সেবকরা মদিনার আনসার এবং আমার অনুসারীরা এদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করছি। কেননা, খ্রিস্টানরা আমাদের দেশেরই নাগরিক আর আল্লাহর কসম! যা কিছুই এদের অসন্তুষ্টি ও ক্ষতির কারণ হয়, তার আমি ঘোর বিরোধী। এদের প্রতি বলপ্রয়োগ করা যাবে না, এদের বিচারকদেরকে তাদের দায়িত্ব থেকে অপসারণ করা যাবে না আর এদের ধর্মযাজকদেরকেও এদের আশ্রয়স্থল থেকে সরানো যাবে না। কেউ এদের উপাসনালয় ধ্বংস বা এর ক্ষতিসাধন করতে পারবে না। কেউ যদি এর সামান্য অংশও আত্মসাৎ করে সেক্ষেত্রে সে আল্লাহর সঙ্গে কৃত অঙ্গীকার ভঙ্গকারী এবং তার রাসুলের অবাধ্য সাব্যস্ত হবে। নিশ্চয়ই এরা (অর্থাৎ খ্রিস্টানরা) আমার মিত্র এবং এরা যেসব বিষয়ে শঙ্কিত, সেসব বিষয়ে আমার পক্ষ থেকে এদের জন্য রয়েছে পূর্ণ নিরাপত্তা। কেউ এদেরকে জোর করে বাড়ি ছাড়া করতে পারবে না অথবা যুদ্ধে অংশগ্রহণ করতেও এদেরকে বাধ্য করা যাবে না। মুসলমানরা এদের জন্য যুদ্ধ করবে। কোনো খ্রিস্টান মেয়ে যদি কোনো মুসলমানের সঙ্গে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়, সেক্ষেত্রে তার (অর্থাৎ সে মেয়ের) অনুমোদন ছাড়া এটি সম্পাদিত হতে পারবে না। তাকে তার গির্জায় গিয়ে উপাসনা করতে বাধা দেয়া যাবে না। এদের গির্জাগুলোর পবিত্রতা অবশ্যই রক্ষা করতে হবে। এগুলোর সংস্কার ও রক্ষণাবেক্ষণ করতে বাধা দেয়া যাবে না। আর এদের ধর্মীয় অনুশাসনগুলোর পবিত্রতাহানি করা যাবে না। এ উম্মতের কোনো সদস্য এ ঘোষণাপত্র কিয়ামত দিবস পর্যন্ত লঙ্ঘন করতে পারবে না। [অগ্রপথিক সীরাতুন্নবী (সা.) ১৪১৬ হিজরী, ১০ বর্ষ, ৮ সংখ্যা, ইসলামী ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ-এর প্রকাশনা, ১ম সংস্করণ, আগস্ট ১৯৯৫]

আজ বিশ্ববাসী শান্তি ও নিরাপত্তা লাভ করতে চাইলে পরষ্পরের ভেতর প্রেম-প্রীতি, আন্তরিকতা এবং বিশ্বস্ততার সম্পর্ক গড়ে তুলুক এবং এই সম্পর্ক ততক্ষণ পর্যন্ত সুদৃঢ় হতে পারে না যতক্ষণ পর্যন্ত নিজেদের সর্বস্রষ্টা খোদা ও বিশ্ব জগতের প্রভু-প্রতিপালকের সঙ্গে সম্পর্ক গড়া না হবে। খোদার সঙ্গে দূরত্ব বৃদ্ধিই এসব অস্থিরতা ও অশান্তির মূল কারণ। তাই আমরা সবাই যদি উঠতে বসতে সব সময় আল্লাহপাককে স্মরণ করে তাকওয়া অবলম্বন করি তাহলে হয়তো আল্লাহতায়ালা আমাদের ব্যাকুল হƒদয়ের প্রার্থনা কবুল করে পরিবার, দেশ এবং বিশ্বে শান্তির শীতল বাতাস প্রবাহিত করতে পারেন। বিশ্বময় শান্তির জন্য আল্লাহর দিকে ঝুকা ছাড়া দ্বিতীয় আর কোনো রাস্তা খোলা নেই।

লেখক-মাহমুদ আহমদ : ইসলামী গবেষক ও কলাম লেখক

মানবকণ্ঠ/এইচকে





ads






Loading...