আনভীর গ্রেফতার কেন হচ্ছে না জানতে তদন্ত কর্মকর্তাকে তলব


  • শাহীন করিম
  • ০৮ অক্টোবর ২০২১, ১২:৪৮

বীর মুক্তিযোদ্ধা কন্যা ও কলেজছাত্রী মোসারাত জাহান মুনিয়াকে ধর্ষণের পর হত্যার অভিযোগে মামলার প্রধান আসামি বসুন্ধরা গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) সায়েম সোবহান আনভীরসহ বাকি ৭ আসামিকে গ্রেফতার করতে পারেনি পুলিশ। পাশাপাশি মুনিয়া কার দ্বারা অন্তঃসত্ত্বা হয়েছিলেন, সেটি নিশ্চিত হতে এতদিনেও প্রধান আসামি ভিকটিমের প্রেমিক আনভীরের ডিএনএ ম্যাচিং করা হয়নি। গুলশানের যে বাসায় মুনিয়া থাকতেন, সেই বাসা ও আশপাশের ভবনের সিসি ক্যামেরার পর্যাপ্ত ফুটেজ জব্দও করেনি পুলিশ।

গত বুধবার ঢাকার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে-৮ এ এসব অভিযোগ করেন বাদীপক্ষের আইনজীবীরা। বিষয়টি আমলে নিয়ে তদন্তের অগ্রগতিসহ এসব প্রশ্নের জবাব দিতে মামলার তদন্ত কর্মকর্তাকে আগামী ১০ অক্টোবর আদালতে সশরীরে হাজির হয়ে ব্যাখ্যা দেয়ার জন্য তলব করেছেন ট্রাইব্যুনাল।

দেশের গণ্ডি পেরিয়ে বর্তমানে বিদেশেও বহুল আলোচিত চাঞ্চল্যকর মুনিয়া মামলার ৩ নম্বর আসামি আনভীরের স্ত্রী সাবরিনা সোবহানকে সশরীরে আদালতে হাজির হয়ে উচ্চ আদালতের দেয়া আগাম জামিনের বেইল বন্ড (জামিননামা) দাখিল করতে বলা হয়েছে। গত মঙ্গলবার আইনজীবীর মাধ্যমে ওই জামিননামার কাগজ জমা দিতে গেলে ট্রাইব্যুনাল উক্ত আদেশ দেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। অন্যদিকে দুদিনের রিমান্ড শেষে আরেক আসামি কথিত মডেল ফারিয়া মাহাবুব পিয়াসাকে গতকাল আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।

বীর মুক্তিযোদ্ধা ও কুমিল্লার প্রয়াত আওয়ামী লীগ নেতা মো. সফিকুর রহমানের কন্যা মুনিয়াকে পরকীয়ার জালে ফেলে ধর্ষণ ও হত্যার আলোচিত মামলার এক নম্বর আসামি বসুন্ধরা গ্রুপের এমডি সায়েম সোবহান আনভীর ও তার স্ত্রী ৩ নম্বর আসামি সাবরিনা আগাম জামিন পেতে গত ২৯ সেপ্টেম্বর উচ্চ আদালতে হাজির হন। এদিন প্রধান আসামিকে জামিন না দিয়ে তার স্ত্রীকে আগাম জামিন দেন বিচারপতি মোস্তফা জামান ইসলাম ও বিচারপতি কে এম জাহিদ সারওয়ারের ভার্চুয়াল হাইকোর্ট বেঞ্চ। আদালত বলেছেন, মুনিয়ার ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনে ৪টি আঘাতের চিহ্ন থাকায় মূল আসামি আনভীরের বিষয়ে হাইকোর্ট বেঞ্চ আপাতত হস্তক্ষেপ করবে না।

ভিকটিম মুনিয়ার বড় বোন ও মামলার বাদী নুসরাত জাহান তানিয়ার অন্যতম আইনজীবী অ্যাডভোকেট মাসুদ সালাউদ্দিন জানান, প্রধান আসামিকে উচ্চ আদালতও জামিন না দেয়ায় তাকে গ্রেফতারে তদন্ত সংস্থা পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) কোনো আইনি বাধা নেই। এরপরও অনেক দিন পেরিয়ে গেলেও আনভীরসহ অপর আসামিদের গ্রেফতারে পুলিশের তত্পরতা নেই।

তাছাড়া মুনিয়া যে অন্তঃসত্তা ছিল, সেজন্য মূল অভিযুক্তের ডিএনএ টেস্ট করারও উদ্যোগ নেয়া হয়নি। একইসঙ্গে হত্যাকাণ্ডের আগে মুনিয়ার গুলশানের বাসায় কারা যাতায়াত করত, তা নিশ্চিত হতে ওই বাসাসহ চারপাশের ভবনের সিসি ক্যামেরায় ফুটেজ জব্দ করার কথা ছিল। তাছাড়া মামলার তদন্তেও দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই।

এই আইনজীবী বলেন, এসব অভিযোগের বিষয়ে গত বুধবার আমরা ঢাকার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-৮ এ লিখিত অভিযোগ করেছি। এরপর তদন্ত কর্মকর্তা পিবিআইয়ের পরিদর্শককে ১০ অক্টোবর আদালতে হাজির হয়ে ব্যাখা দিতে নির্দেশ দিয়েছেন ওই ট্র্যাইব্যুনালের বিচারক জেলা ও দায়রা জজ বেগম মাফরোজা পারভীন।

মামলার বাদী নুসরাতের অভিযোগ, চলতি মাসের ১০ তারিখ থেকে তদন্ত শুরু করলেও এখন পর্যন্ত আনভীরসহ অন্য আসামিদের গ্রেফতারসহ অনেক বিষয়ে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে পারেনি তদন্ত সংস্থা পিবিআই। শুধু কারাবন্দি আসামি পিয়াসাকে রিমান্ডে নিয়েছে। ধীর গতিতে তদন্ত চলছে বলে তার অভিযোগ।

তবে চাঞ্চল্যকর এ মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পিবিআই পরিদর্শক গোলাম মোক্তার আশরাফ উদ্দিন দাবি করেছেন, যথাযথ গুরুত্ব দিয়ে মামলাটির নিবিড় তদন্ত হচ্ছে। মাত্র কিছুদিন আগে তদন্তভার পেয়েও আমরা বসে নেই। এরইমধ্যে এক আসামিকে রিমান্ডে এনে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। মুনিয়ার মৃত্যুর রহস্য উদঘাটনের আমরা আন্তরিক। এ মামলার সুষ্ঠু তদন্তের জন্য কিছুটা সময় লাগবে।

গত ৬ সেপ্টেম্বর ঢাকার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-৮ আদালতে মুনিয়াকে ধর্ষণের পর হত্যার অভিযোগে মামলার আবেদন করেন ভিকটিমের বড় বোন নুসরাত জাহান তানিয়া। ওই আদালতের বিচারক জেলা ও দায়রা জজ বেগম মাফরোজা পারভীন মামলাটি গ্রহণ করে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনকে (পিবিআই) তদন্ত করে প্রতিবেদন দাখিলে নির্দেশ দেন। এদিন দুপুরে নুসরাতের জবানবন্দি রেকর্ড করেন আদালত। এই চাঞ্চল্যকর মামলায় প্রধান আসামি বসুন্ধরার এমডি সায়েম সোবহান আনভীর (৪২)।

পাশাপাশি তার বাবা বসুন্ধরা গ্রুপের চেয়ারম্যান আহমেদ আকবর সোবহান, মা আফরোজা সোবহান, আনভীরের স্ত্রী সাবরিনা, হুইপপুত্র শারুনের সাবেক স্ত্রী সাইফা রহমান মিম, কথিত মডেল ফারিয়া মাহবুব পিয়াসা, পিয়াসার বান্ধবী ও ঘটনাস্থল গুলশানের ফ্ল্যাট মালিকের স্ত্রী শারমিন ও তার স্বামী ইব্রাহিম আহমেদ রিপনকে আসামি করা হয়েছে। এদের মধ্যে সাবরিনা ও ইব্রাহিম সম্প্রতি উচ্চ আদালত থেকে আগাম জামিন নিয়েছেন।

মামলায় অভিযোগ করা হয়, সায়েম সোবহান আনভীর ফুসলিয়ে বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে মুনিয়ার সাথে শারীরিক সম্পর্ক গড়ে তোলেন। দীর্ঘদিন স্বামী-স্ত্রীর মতো বসবাস করেও পরে তাকে বিয়ে না করে নৃশংসভাবে হত্যা করেন। আর এতে তার পরিবারের সদস্যসহ অন্য আসামিরা সাহায্য করেন। ঘটনার কিছুদিন আগে পিয়াসার মাধ্যমে মুনিয়াকে তুলে নিয়ে প্রাণনাশের হুমকি দিয়ে গ্রামিতে বাড়িতে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন আনভীরের মা ও স্ত্রী। মুনিয়ার মৃত্যুর অভিযোগটি নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের ৯ (১) (২)/৩০ এবং দণ্ডবিধির ৩০২/৩৪ ধারা মতে বিচার্য্য। সংশ্লিষ্ট ট্র্যইবুনাল এ বিষয়ে সিন্ধান্ত নেয়ার এখতিয়ারভুক্ত। অথচ থানা পুলিশ ইচ্চাকৃতভাবে দুর্বল মামলা নিয়ে আসামিকে রক্ষা করতে চেয়েছেন।

মামলার বাদী নুসরাত দাবি করেন, তার ছোট বোন মুনিয়াকে প্রেমের জালে ফেলে কয়েক বছর ভোগ করেন আসামি আনভীর। এক পর্যায়ে অন্তঃসত্তা হয়ে পরে। পরবর্তীতে মুনিয়াকে দূরে ঠেলে দিতে আসামির পরিবার ষড়যন্ত্র করে। এরই ধারাবাহিকতায় ধর্ষণের পর হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটিয়ে আত্মহত্যার নাটক সাজানো হয়। আসামিদের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করলে নেপথ্যের ঘটনা জানা যাবে।

তার আগে গত ১৮ আগষ্ট মুনিয়া ‘আত্মহত্যা প্ররোচনা’ মামলায় পুলিশের দেয়া চূড়ান্ত প্রতিবেদন গ্রহণ করেন আদালত। একইসঙ্গে আসামি আনভীরকে অব্যাহতি দিয়ে বাদীপক্ষের না-রাজি আবেদন খারিজ করে দেন ঢাকার মহানগর হাকিম রাজেশ চৌধুরী। মামলার বাদী জানান, এ মামলায় পুলিশের দেয়া চূড়ান্ত প্রতিবেদনের বিরুদ্ধে তিনি ১৭ আগস্ট নারাজি আবেদন করেছিলেন। তখন মুখ্য আদালত হাকিমকে আবেদনটি গ্রহণ করে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে পাঠানোর জন্য আর্জি করেছিলেন। এর আগে গত ১৯ জুলাই আদালতে চুড়ান্ত রিপোর্ট দিয়ে গুলশান থানা পুলিশ জানায়, ঘটনার সঙ্গে আসামি আনভীরের সম্পৃক্ততা না পাওয়ায় অব্যাহতির সুপারিশ করা হয়। এ নিয়ে দেশের বিশিষ্ট নাগরিকসহ বিভিন্ন মহলে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়।

গত ২৬ এপ্রিল সন্ধ্যায় গুলশানের একটি ফ্ল্যাট থেকে মোসারাত জাহান মুনিয়ার লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। সেই রাতেই বসুন্ধরা গ্রুপের এমডি আনভীরের বিরুদ্ধে গুলশান থানায় মামলা করেন তার বোন নুসরাত জাহান তানিয়া। সেখানে বলা হয়, বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে সায়েম সোবহান আনভীর দীর্ঘদিন শারীরিক সম্পর্ক গড়ে তুলেছিলেন মুনিয়ার সঙ্গে। ওই বাসায় তার নিয়মিত যাতায়াত ছিল। কিন্তু বিয়ে না করে তিনি উল্টো মেরে ফেলার হুমকি দিয়েছিলেন মুনিয়াকে। পরবর্তীতে নুসরাত দাবি করেন, তার বোনকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করেছেন আনভীর। ওই সময় পুলিশও জানিয়েছিল, মুনিয়ার ফ্ল্যাটে আনভীরের যাতায়াতের তথ্য মিলেছে।


poisha bazar

ads
ads