‘সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করতে গণপিটুনিতে রেনুকে হত্যা’

‘সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করতে গণপিটুনিতে রেনুকে হত্যা’
- ফাইল ছবি

poisha bazar

  • অনলাইন ডেস্ক
  • ০১ অক্টোবর ২০২০, ০৯:৩৫

রাজধানীর বাড্ডায় ছেলেধরা সন্দেহে গণপিটুনিতে তাসলিমা বেগম রেনু হত্যায় ‘সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্নে গভীর ষড়যন্ত্র’ দেখছে পুলিশ। সূক্ষ্ম পরিকল্পনার অংশ হিসেবে আসামিরা সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্নসহ আইনশৃঙ্খলার অবনতি ঘটানোর লক্ষ্যে ছেলেধরা গুজব ছড়িয়ে গণপিটুনি দিয়ে রেনুকে হত্যা করে বলে চার্জশিটে উল্লেখ করা হয়েছে।

সম্প্রতি মামলার চার্জশিট জমা দিয়েছেন তদন্ত কর্মকর্তা মতিঝিল গোয়েন্দা বিভাগের অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার ও মাদক নিয়ন্ত্রণ টিমের পুলিশ পরিদর্শক মো. আব্দুল হক। মামলায় ১৫ জনকে অভিযুক্ত করে চার্জশিট দেন তিনি।

২০১৯ সালের ২০ জুলাই সকালে সন্তানের ভর্তির বিষয়ে জানতে উত্তর বাড্ডা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে যান তাসলিমা বেগম রেনু। সেখানে ছেলেধরা সন্দেহে বেধড়ক পেটায় কিছু উচ্ছৃঙ্খল মানুষ। গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক রেনুকে মৃত ঘোষণা করেন।

চার্জশিটভুক্ত আসামিরা হলেন- ইব্রাহিম ওরফে হৃদয় মোল্লা, রিয়া বেগম ময়না, আবুল কালাম আজাদ, কামাল হোসেন, মো. শাহিন, বাচ্চু মিয়া, মো. বাপ্পি ওরফে শহিদুল ইসলাম, মুরাদ মিয়া, সোহেল রানা, আসাদুল ইসলাম, বেল্লাল মোল্লা, মো. রাজু ওরফে রুম্মান হোসেন ও মহিউদ্দিন। তাদের মধ্যে মহিউদ্দিন পলাতক।

জাফর হোসেন পাটোয়ারী ও ওয়াসিম আহমেদ অপ্রাপ্তবয়স্ক হওয়ায় তাদের বিরুদ্ধে দোষীপত্র দেওয়া হয়েছে। আলিফ, টোকাই মারুফ, সুমন ও আকলিমা এই চারজনের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হলেও ঠিকানা না পাওয়ায় তদন্ত কর্মকর্তা তাদের অব্যাহতির আবেদন করেন। তবে ভবিষ্যতে ঠিকানা উদঘাটিত হলে কিংবা তাদের গ্রেপ্তার করা গেলে সম্পূরক চার্জশিট দেওয়ার কথা উল্লেখ করেছেন তদন্ত কর্মকর্তা।

আসামিদের মধ্যে ওয়াসিম, হৃদয় এবং রিয়া বেগম আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। তাদের মধ্যে রিয়া বেগম, বাচ্চু মিয়া, শাহীন, মুরাদ, রাজু ও বাপ্পি জামিনে রয়েছেন।

চার্জশিটে তদন্ত কর্মকর্তা বলেন, বাড্ডার থানাধীন উত্তর-পূর্ব বাড্ডা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রতিদিনের ন্যায় প্যারেড ৮টায় শেষ হওয়ার পরপরই তাসলিমা বেগম রেনু বোরকা পরে তার ছেলে তাসিন আল মাহির ও মেয়ে তাসনিম তুবার ভর্তি করানোর জন্য স্কুল গেটে যান। সেখানে অন্যান্য বাচ্চাদের অভিভাবকদের সঙ্গে তার কথা হয়। তাদের মধ্যে রিয়া বেগম ও আকলিমাও ছিলেন। তাদের এ স্কুলে বাচ্চা ভর্তি করার জন্য বললে তারা বলেন, এখন জুলাই মাস। এখন তো বাচ্চা ভর্তি করাবে না। এরপর তারা রেনুর কাছে জানতে চান, তিনি কোথায় থাকেন। উত্তরে স্কুল গেট সংলগ্ন আলীর মোড়ে থাকেন বলে জানান রেনু।

আলীর মোড়ের কার বাসায় ও কত নম্বর গেটে থাকেন- মর্মে জানতে চাইলে সঙ্গে সঙ্গে রেনু বলেন, তার বাসা মহাখালী ওয়ারলেস গেট। এতে উপস্থিত অভিভাবকদের মনে ছেলেধরা সন্দেহ হয়।

এক পর্যায়ে রিয়া বেগম স্কুলের গেটে তরকারি বিক্রেতা হৃদয়কে বলেন, ওই মহিলা (রেনু) ছেলেধরা, তাকে মার। অপরদিকে আকলিয়া সঠিক তথ্যের জন্য রেনুকে স্কুলের প্রধান শিক্ষিকার দোতলাস্থ রুমে নিয়ে যান এবং বিষয়টি তাকে অবহিত করেন। এরপর প্রধান শিক্ষিকা তাকে নাম-ঠিকানা লেখার জন্য কাগজ কলম দেন।

পুলিশ পরিদর্শক আব্দুল হক চার্জশিটে উল্লেখ করেন, এ ঘটনা সংঘটনের কিছু দিন আগে থেকে কিছু কুচক্রী মহল সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন করাসহ প্রচলিত আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটানোর লক্ষ্যে- পদ্মাসেতুতে মানুষের মাথা লাগবে- মর্মে সারা দেশে গুজব ছড়িয়ে দেয়। ফলে এ ঘটনায় এরই মধ্যে রিয়া, হৃদয়, জাফর, কালাম, আরিফ সুক্ষ্ম পরিকল্পনার অংশ হিসেবে সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন করাসহ স্থিতিশীল আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি অবনতি ঘটানোর লক্ষ্যে ছেলেধরা, ছেলেধরা মর্মে গুজব ছড়াতে থাকে। এর প্রেক্ষিতে ব্যস্ততম স্থানের পথচারী, কাঁচাবাজারের লোকজনসহ আশপাশের ৪০০/৫০০ জন লোক স্কুল প্রাঙ্গণে জড়ো হয়ে ছেলেধরা, ছেলেধরা মর্মে চিৎকার করতে থাকে। এমন অবস্থায় প্রধান শিক্ষিকা দপ্তরি জান্নাতকে দিয়ে কলাপসিবল গেটে তালা লাগিয়ে দেন।

চার্জশিটে উল্লেখ করা হয়, উদ্ভূত পরিস্থিতি বিবেচনা করে ঘটনাটি পুলিশসহ স্কুলের পরিচালনা কমিটির সদস্যদের ও ২১নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর মাসুম গণিকে অবহিত করেন প্রধান শিক্ষক। উত্তেজিত জনতাকে স্কুল প্রাঙ্গণ থেকে চলে যাওয়ার জন্য স্কুলের এসেম্বলির মাইকে বলা হয়, ‘প্রিয় এলাকাবাসী, উনি ভালো মানুষ, ছেলেধরা না, আপনারা চলে যান।’ কিন্তু গভীর ষড়যন্ত্র ও পূর্ব পরিকল্পনার অংশ হিসেবে আসামিরা উপস্থিত জনতাকে ভুল ধারণা দিয়ে ও ছেলেধরা গুজব রটিয়ে তাদের উত্তেজিত করায় তারা প্রধান শিক্ষিকার কথা ও প্রচারণা কর্ণপাত করেনি।

চার্জশিটে আরও উল্লেখ করা হয়, এক পর্যায়ে হৃদয়, জাফর, শাহিন, বাচ্চু, বাপ্পি, কালাম, কামাল, ওয়াসিম, মুরাদ, সোহেল রানা, বিল্লাল, আসাদুল, রাজু, মহিউদ্দিন, আলিফ, টোকাই মারুফ, সুমন, রিয়াদের নেতৃত্বে ও প্রত্যক্ষ অংশ গ্রহণের মাধ্যমে অপরাপর আসামিরা রেনুকে হত্যা করার জন্য কলাপসেবল গেটের তালা ভেঙে স্কুল ভবনের দোতলার প্রধান শিক্ষিকার রুমে প্রবেশ করে। অন্যদের বাধা উপেক্ষা করে রেনুর চুলের মুঠি ধরে টানাটানি করে রুম থেকে বের করে নিয়ে আসে। ওই সময় রেনু নিজেকে ছেলেধরা না ও বাচ্চা ভর্তি করার জন্য এসেছেন- মর্মে বলতে থাকলেও তা না শুনে রেনুকে হত্যা করার জন্য কিল-থাপ্পড় মারতে মারতে সিঁড়ি দিয়ে নিচে স্কুলের মাঠে নিয়ে আসে। সঙ্গে সঙ্গে হৃদয় ও জাফর রেনুর শরীরের বিভিন্ন স্থানে লাঠি দিয়ে পিটিয়ে জখম করতে থাকে। অন্যান্য আসামিরা কিল-থাপ্পড় ও লাথি মেরে তার মৃত্যু নিশ্চিত করে।

ছেলেধরা গুজব রটিয়ে পড়ায় ঘটনার সময় উপস্থিত অধিকাংশ লোকজনই অপরাধকর্মে অংশ না নিলেও দাঁড়িয়ে থাকে। কিছু সংখ্যক লোক মোবাইলে ভিডিও করে বলে চার্জশিটে উল্লেখ করেন তদন্ত কর্মকর্তা।

এদিকে, মামলার বিচার যেন দ্রুত নিষ্পত্তি হয় এ জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাবে রাষ্ট্রপক্ষ।

রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী সহকারী পাবলিক প্রসিকিউটর আজাদ রহমান জানান, চাঞ্চল্যকর এই মামলার চার্জশিট ঢাকা সিএমএম আদালতে দাখিল করা হয়েছে। কিছু আনুষ্ঠানিকতা শেষে মামলাটি মহানগর দায়রা জজ আদালতে পাঠানো হবে। সেখানে চার্জগঠন হয়ে বিচার শুরু হবে।

চার্জগঠন হয়ে গেলে সাক্ষী হাজির করে মামলার বিচার যেন দ্রুত শেষ হয়, সেজন্য রাষ্ট্রপক্ষ কাজ করে যাবে জানান তিনি।

মামলার বাদী বলেন, সরকারের কাছে আবেদন যেন দ্রুতবিচার ট্রাইব্যুনালে মামলার বিচার হয়। বিচার বিলম্বিত হলে পরবর্তীতে এ ধরনের ঘটনা আরও ঘটতে পারে বলে মনে করেন তিনি।

মানবকণ্ঠ/আরএস





ads