• বৃহস্পতিবার, ২৩ জানুয়ারি ২০২০
  • ই-পেপার

আন্তর্জাতিক চাপে বিপাকে মিয়ানমার


poisha bazar

  • সেলিম আহমেদ
  • ০৬ ডিসেম্বর ২০১৯, ০২:০৪,  আপডেট: ০৬ ডিসেম্বর ২০১৯, ০২:১৩

রোহিঙ্গা গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের জন্য আন্তর্জাতিক চাপে অনেকটা বিপাকে পড়েছেন অং সান সুচির দেশ মিয়ানমার। প্রথমদিকে ঢাকা এককভাবে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে লড়াই করে ঘায়েল করতে পারেনি।  সম্প্রতি দেশটির বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক আদালতে মামলা ও তদন্ত শুরুর ঘটনায় বেশ চাপে পড়েছে দেশটি।


আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে (আইসিজে) মিয়ানমারের বিরুদ্ধে গাম্বিয়ার মামলা এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে (আইসিসি) অভিযোগ তদন্তের সিদ্ধান্তে গণহত্যার দায় যে মিয়ানমারের এড়ানোর সুযোগ নেই, সেটা বেশ স্পষ্ট।

জাতিসংঘের শীর্ষ আদালতে দায়ের করা মামলার লড়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে দেশটির রাষ্ট্রীয় উপদেষ্টা অং সান সুচির নেতৃত্বে মিয়ানমার প্রতিনিধিদল। দেশের হয়ে লড়ার প্রস্তুতি নেয়া অং সান সুচির পক্ষে মিয়ানমারে তার সমর্থকরা ব্যাপক প্রচার-প্রচারণায় নেমেছেন।

ডিসেম্বরের ১০ তারিখ থেকে নেদারল্যান্ডসের আন্তর্জাতিক আদালতে রোহিঙ্গা গণহত্যা নিয়ে দায়ের করা মামলার বিচার শুরু হবে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।

কূটনৈতিক সূত্র বলছে, দেশটির এ সিদ্ধান্তই প্রমাণ করে বৈশ্বিকভাবে কতটা চাপে পড়েছে মিয়ানমার। আগামী ১০ থেকে ১২ ডিসেম্বর এ শুনানি অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। গাম্বিয়া ও মিয়ানমার দুই দফা শুনানি এবং পাল্টা শুনানিতে অংশ নেবে।

এদিকে আন্তর্জাতিক মামলার মুখোমুখি হয়ে হঠাৎ করে বাংলাদেশে প্রতিনিধি পাঠানোর প্রস্তাব দিয়েছে দেশটি। বাংলাদেশের কূটনীতিকরা বলছেন, বৈশ্বিক চাপ থেকে বাঁচতে মিয়ানমারের এটা আরো একটি কৌশল ছাড়া কিছু নয়।

এর আগেও তারা নানা চাপের মুখে বাংলাদেশে প্রতিনিধি পাঠিয়ে বিশ্বকে দেখাতে চেয়েছিল যে, রোহিঙ্গা
প্রত্যাবাসনের বিষয়ে তারা অত্যন্ত আন্তরিক।

এদিকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা বলেন, ‘দেখুন, এটা মিয়ানমারের কৌশল। এর আগেও তারা এ ধরনের আচরণ করেছে।’ তবে এ প্রতিনিধি দলটির সফরের তারিখ এখনো চূড়ান্ত হয়নি বলে জানান তিনি।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেন বলেন, মিয়ানমারের প্রতিনিধিরা মূলত রোহিঙ্গাদের সঙ্গেই আলোচনায় বসতে চায়। কারণ, রোহিঙ্গাদেরই প্রত্যাবাসনে রাজি করাতে হবে দেশটির কর্তৃপক্ষকে। তারা যদি তাদের সঙ্গে আলোচনা করতে চায়, বাংলাদেশের কোনো আপত্তি নেই।


এদিকে আইনি অভিজ্ঞতা না থাকা সত্তে¡ও অং সান সুচি দেশের হয়ে আন্তর্জাতিক আদালতে লড়বেন-এমন খবরে হতবাক হয়েছেন পর্যবেক্ষকরা। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকরা বলছেন, একটি দেশের সর্বোচ্চ পর্যায়ের একজন নেতার এ পর্যায়ে লড়াই বিশ্ববাসীকে বিভ্রান্ত করবে।

এ প্রসঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক মুহাম্মদ রুহুল আমীন মানবকণ্ঠকে বলেন, এই প্রথমবারের মতো মিয়ানমার আন্তর্জাতিক আইনগত বাধার সম্মুখীন হলো। এতদিন থেকে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ রোহিঙ্গা ইস্যুতে মিয়ানমারকে চাপ দিলেও তারা তা গুরুত্ব দেয়নি। কিন্তু আইসিজেতে মামলা ফাইল হওয়ার পর আইনগত লড়াইয়ের দিকে মিয়ানমারকে নিয়ে যাওয়া হলো।  রোহিঙ্গা ইস্যু সমাধানের পথটা বিশ্বে আরো বিস্তৃত হলো। কতটুকু সফল হবে জানি না তবে প্রসেসটা শুরু হলো। এই বিষয়কেই সামনে নিয়েই এগিয়ে যেতে হবে।

অধ্যাপক রুহুল আমীন বলেন, অং সান সুচি ব্যক্তিগতভাবে রোহিঙ্গা ইস্যুকে মোকাবিলা করার জন্য নির্দেশ দিয়ে দিল। এটার থেকে সুচির হীনম্মন্যতার প্রকাশ পেল। এতদিন ‘চ্যাম্পিয়ন অব ড্রেমোকেসি’ হিসেবে তাকে বিশ্বজুড়ে নন্দিত করা হচ্ছিল। এই নন্দনের জায়গা থেকে এখন তাকে নিন্দার জায়গায় আনা যাবে। কারণ এতদিন আমরা ভাবছিলাম যে, সামরিক জান্থার কারনে সুচি কথা বলতে পারছে না। এখন আমাদের ধারণার পরিবর্তন হয়েছে। বোঝা গেল মিলিটারি ও সিভিল গভর্মেন্ট এক হয়ে রোহিঙ্গাদের নির্যাতন করেছে।

তিনি আরো বলেন, এখন বাংলাদেশের রোহিঙ্গা কূটনীতিকে খুব বেগমান করতে হবে। বিশ্বজুড়ে জনমত সৃষ্টি করতে হবে। সেন্ট্রাল সিকিউরিটি কাউন্সিল ও আন্তর্জাতিক ফোরামগুলোতে আমাদের স্বেচ্ছার হতে হবে। এজন্য বাংলাদেশ সরকারকে প্রচণ্ড কাজ করতে হবে। এর বিকল্প কিছু নেই।

আন্তর্জাতিক আদালতের মামলাকে রোহিঙ্গা ইস্যু সমাধানের শুভ সূচনা হিসেবে দেখছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. শান্তনু মজুমদার। তিনি মানবকণ্ঠকে বলেন, এটা কোথায় গিয়ে পৌঁছাবে সেটা বোঝা মুশকিল। তবে আস্তে আস্তে তা প্রকাশিত হবে। বড় বিষয় হলো যে কোনোভাবেই হোক ইস্যুটিকে আন্তর্জাতিক আদালতে উঠানো গেল। মিয়ানমার নিজেকে এর বিরুদ্ধে লড়াই করতে রাজি হলো।

এরপরে আরেকটি বিষয় হবে, যে রোহিঙ্গা ইস্যু আন্তর্জাতিকভাবে আরো আলোচিত থাকবে। একটা জিনিস যখন আদালতে উঠে যায় তখন এটা একটা বড় বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। এর একটি সমাধান আসবে বলে আমি মনে করি।

গত ১৩ নভেম্বর আদালতে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ওপর হুমকি সৃষ্টির অভিযোগে মিয়ানমারের নেত্রী অং সান সুচি, সেনাপ্রধান জেনারেল মিন অং হ্লাইংসহ কয়েকজন জ্যেষ্ঠ সেনা কর্মকর্তার বিরুদ্ধে মামলা করেছে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলো। এর মাধ্যমে রোহিঙ্গাদের ওপর নৃশংসতার অভিযোগে প্রথমবারের মতো সুচিকে কাঠগড়ায় উঠতে হচ্ছে।

একইসঙ্গে আন্তর্জাতিক পরিসরে মিয়ানমারের রাজনৈতিক নেতৃত্বের ভাবমূর্তিও প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে।
তবে কূটনৈতিক ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকরা বলছেন, আন্তর্জাতিক এসব মামলায় মিয়ানমার চাপে পড়ায় রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানের প্রক্রিয়ায় বাংলাদেশের সামনে নতুন সুযোগ তৈরি হয়েছে। এ চেষ্টা অব্যাহত রাখতে হবে বাংলাদেশকে।

২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট রাখাইনে নিরাপত্তা বাহিনীর বেশকিছু চৌকিতে সন্ত্রাসীদের হামলার অভিযোগে রোহিঙ্গাদের ওপর নির্মম নির্যাতন শুরু করে মিয়ানমার সেনাবাহিনী। প্রাণ বাঁচাতে সে সময় রোহিঙ্গাদের ঢল নামতে শুরু হয় বাংলাদেশে।

কক্সবাজারে এখন নিবন্ধিত রোহিঙ্গার সংখ্যা ১১ লাখ ১৮ হাজার ৫৭৬। এর মধ্যে ২০১৭ সালের ২৫ আগস্টের পর থেকে বাংলাদেশে এসেছে ৭ লাখ ২ হাজার। ২০১৬ সালের অক্টোবরের পরের কয়েক মাসে এসেছিল ৮৭ হাজার রোহিঙ্গা। অন্যরা আগে থেকেই বাংলাদেশে অবস্থান করছেন।

 

মানবকণ্ঠ/এসআর




Loading...
ads






Loading...