‘পর্যাপ্ত মজুদেও’ দাম বাড়ল পেঁয়াজের

পেঁয়াজ
পেঁয়াজ - সংগৃহীত।

poisha bazar

  • ফরহাদ শিকদার
  • ০৬ অক্টোবর ২০২০, ১৯:৩১,  আপডেট: ০৬ অক্টোবর ২০২০, ২০:২২

বাজারে সরবরাহ বাড়লেও কমছে না পেঁয়াজের দাম। আগের বেড়ে যাওয়া দামে বিক্রি হচ্ছে সব ধরনের পেঁয়াজ। খুচরা বাজারে পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে প্রতি কেজি ৯০ টাকায়। একই মানের পেঁয়াজের কলকাতায় বাজার মূল্য কেজিপ্রতি ৩৫ থেকে ৪০ রুপি। পাইকাররা বলছেন, আমদানি কমে যাওয়ার কারণেই বেড়েছে দাম। ক্রেতাদের অভিযোগ, প্রশাসনের নজরদারির অভাবেই দফায় দফায় নিত্যপন্যর দাম বাড়িয়ে দেয় বিক্রেতারা।

তবে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় বলছে, পেঁয়াজ নিয়ে আতঙ্কিত হওয়ার কারণ নেই। পেঁয়াজের অবৈধ মজুত বা কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে মূল্য বাড়ানোর চেষ্টা করা হলে সরকার প্রচলিত আইনে দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেবে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, পেঁয়াজের দাম যখন অস্বাভাবিকভাবে বাড়ল তখন ব্যবসায়ীদের অজুহাত ছিল? সরবরাহ কম। এরপর বিভিন্ন দেশ থেকে পেঁয়াজ আমদানি করে বাজারে সরবরাহ বাড়ানোর চেষ্টা করেছে সরকার। ভারত সরকার পেঁয়াজ রফতানি বন্ধ ঘোষণার পর মিয়ানমারে রফতানিমূল্য ছিল কেজিতে ৩৬-৩৮ টাকা। সেই দরে কেনা পেঁয়াজ দেশে আসার পর পাইকারি বাজারে বিক্রি হচ্ছে ৭০-৭২ টাকা দরে। কয়েক দিন আগে চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে মিয়ানমার ও পাকিস্তান থেকে আমদানি করা পেঁয়াজ দেশে ঢুকেছে। তারপরও কমছে না পেঁয়াজের দাম।

আগের মতো বাড়তি দামে বিক্রি হচ্ছে মসলাজাতীয় এ পণ্যটি। দেশের ভোগ্যপণ্যের অন্যতম বড় বাজার খাতুনগঞ্জ ও চাক্তাই মোকামে ভারতীয় পেঁয়াজ বিক্রি হয়েছে মানভেদে ৬৫ থেকে ৭০ টাকা, মিয়ানমার থেকে আমদানি করা পেঁয়াজ ৭০ থেকে ৭২ টাকা, পাকিস্তানের পেঁয়াজ ৬২ থেকে ৬৫ টাকা এবং দেশি পেঁয়াজ ৮৮ থেকে ৯০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে।

আড়তদার ও ব্যবসায়ী সূত্র জানায়, মিয়ানমার থেকে আমদানি করা পেঁয়াজের রফতানিমূল্য ছিল কেজিপ্রতি ৩৬-৩৮ টাকা। তবে ভারত সরকার পেঁয়াজ রফতানি বন্ধ ঘোষণার পর বিকল্প দেশগুলোও পেঁয়াজের রফতানিমূল্য বাড়িয়ে দিয়েছে।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দর উদ্ভিদ সংগনিরোধ কেন্দ্রের উপপরিচালক ড. মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান বুলবুল জানান, পাকিস্তান ও মিয়ানমার থেকে আসা ২২৮ টন পেঁয়াজের ছাড়পত্র দিয়েছি। পেঁয়াজ আমদানির জন্য ৩৪৫টি অনুমতিপত্র (আইপি) ইস্যু করেছি আমরা। এর বিপরীতে ১ লাখ ৫৯ হাজার ৯১২ টন পেঁয়াজ আমদানির জন্য এসব আইপি নিয়েছেন আমদানিকারকরা। আমদানি করা পেঁয়াজ এরই মধ্যে বাজারে আসতে শুরু করেছে।

এদিকে চাক্তাই আড়তদার ও সাধারণ ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি আহসান খালেদ জানান, সরবরাহ কিছুটা বাড়লেও বাজারে পেঁয়াজের সংকট রয়েছে। আমদানি কম, তবে, ক্রেতা কম থাকায় এক সপ্তাহ ধরে বাজার স্থিতিশীল রয়েছে। পাকিস্তান ও মিয়ানমার থেকে সামান্য পরিমাণে পেঁয়াজ এসেছে, তা দিয়ে দেশের এক দিনের চাহিদাও মেটানো যাবে না।

তিনি আরো জানান, মিয়ানমার থেকে আমদানি করা পেঁয়াজ বন্দর থেকে খালাসের আগেই ৬৫ টাকায় বেচাকেনা হয়েছে। পাইকারি বাজারে মিয়ানমারের পেঁয়াজ ৬৫-৭০ টাকায় বিক্রি হয়েছে। চাহিদার তুলনায় সরবরাহ সংকট থাকায় দাম কমছে না। তবে সরবরাহ বাড়ায় দেশি পেঁয়াজের দাম ৭৮-৮০ টাকা থেকে দুই টাকা কমেছে। আমদানি বাড়লে আরো কিছুটা কমবে।

সূত্র মতে, দেশে বছরে পেঁয়াজের চাহিদা ৩০ থেকে ৩২ লাখ টন। উৎপাদনের পরিমান গড়ে ২২ থেকে ২৩ লাখ টন। ব্যবসায়ীরা প্রতি বছর ৮ থেকে ১০ লাখ টন পেঁয়াজ আমদানি করেন। দেশে বরবারই পেঁয়াজ মজুদ থাকে। যেহেতু পণ্যটি পচনশীল তাই অনেকে বেশি দামের আশায় পেঁয়াজ মজুদ করেন। এতে বিপুল পরিমাণ পেঁয়াজ নষ্ট হয়। বাংলাদেশের পেঁয়াজের ঘাটতির বাজারটি ভারতের দখলে। পাকিস্তান ও মিয়ানমার থেকে পেঁয়াজ আসলেও তা পরিমাণে ভারতের সমান না। সংকটকালে কেউ আমদানি করলে এ দুই দেশ থেকে পেঁয়াজ আসে।

ভারতের পেঁয়াজের সরবরাহ সবসময় স্বাভাবিক থাকে বলে পেঁয়াজ ব্যবসায়ীরা অন্য কোনো দেশের দিকে নজর দেন না। আর পেঁয়াজ ভারত থেকে আনতে যত বেশি সুবিধা অন্য দেশ থেকে আনার ক্ষেত্রে সে রকম সুবিধা নেই। পচনশীল বলে ব্যবসায়ীরা ঝুঁকি নেন না। আর এ সুযোগটি সাময়িক সময়ের জন্য গ্রহণ করে পেঁয়াজ সিন্ডিকেট। গত বছর এ সময়ে একই পরিস্থিতি সৃষ্টি করা হয়েছে। গত বছর ২৯ সেপ্টেম্বর এবং এ বছর ১৪ সেপ্টেম্বর ভারত সরকার অভ্যন্তরীণ বাজারে সংকট ও মূল্যবৃদ্ধির অজুহাত দেখিয়ে বাংলাদেশে পেঁয়াজ রফতানি বন্ধ করে দেয়। ভারত সরকার পেঁয়াজ রফতানি বন্ধ ঘোষণার পর পাইকারি বাজারে ৩৫-৩৬ টাকায় বিক্রি করা পেঁয়াজ দুই দিনের ব্যবধানে ৭০ টাকা ছুঁয়ে যায়। খুচরা বাজারে ৯০ থেকে ১০০ টাকা ছাড়িয়ে যায়। কম-বেশি সেই দামই এখনো চলছে।

এদিকে মঙ্গলবার (৬ অক্টোবর) বাণিজ্য মন্ত্রণালয় থেকে পাঠানো এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, ক্রেতাদের সাশ্রয়ী মূল্যে পেঁয়াজ সরবরাহের উদ্দেশ্যে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অধীন ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি) দেশব্যাপী ট্রাক সেলের পাশাপাশি ই-কমার্সের মাধ্যমেও পেঁয়াজ বিক্রি করছে। এতে ক্রেতাদের ব্যাপক সাড়া পাওয়া যাচ্ছে। ক্রেতাদের চাহিদা পূরণে প্রতি কেজি ৩০ টাকা মূল্যে পেঁয়াজ বিক্রির পরিধি আরও বাড়ানো হচ্ছে।

চাহিদা মোতাবেক বাজারে পেঁয়াজের মজুত, সরবরাহ ও মূল্য স্বাভাবিক রাখতে গত বছরের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে সরকার প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে জানিয়ে বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অধীন জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতরসহ দেশব্যাপী স্থানীয় প্রশাসনের নেতৃত্বে বাজার অভিযান জোরদার করা হয়েছে।

এতে আরও বলা হয়, সরকার পেঁয়াজ আমদানির ওপর শুল্ক প্রত্যাহার করেছে। আমদানিকারকদের চাহিদা মোতাবেক সব ধরনের সহযোগিতা দেয়া হচ্ছে। অভ্যন্তরীণ বাজারে পেঁয়াজের সরবরাহ, পরিবহনসহ সকল ক্ষেত্রে সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়ে কাজ করা হচ্ছে। সরকারের নানামুখী পদক্ষেপ গ্রহণের ফলে বাজারে এর ইতিবাচক প্রভাব পড়েছে। বিভিন্ন দেশ থেকে পেঁয়াজ আমদানি অব্যাহত রয়েছে। অল্প সময়ের মধ্যে বিপুল পরিমাণ পেঁয়াজ দেশে পৌঁছাবে।

 






ads
ads