ক্রান্তিকাল কাটছে না চামড়া শিল্পের


poisha bazar

  • আসাদ জোবায়ের
  • ১০ আগস্ট ২০১৯, ০৮:৫৬

অনেকা আশা-আকাক্সক্ষা নিয়ে ট্যানারি শিল্প নগরীতে দুই বছর আগে ট্যানারিগুলো স্থানান্তর হলেও শিল্পের ক্রান্তিকাল যেন কাটছে না। বিশ্বের বড় বড় ব্র্যান্ড বায়ার মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। ফলে গত দুই বছরে রফতানি আয় কমেছে ১৭ শতাংশ। এখন একমাত্রা ভরসা চীন। কিন্তু সেই চীনও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে শুল্কদ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়ে বেকায়দায় আছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ১৬ বছরে তৈরি হওয়ায় চামড়া শিল্পনগরী এখনো পরিবেশবান্ধব স্বীকৃতি পায় না। কোনো ট্যানারিই লেদার ওয়ার্কিং গ্রুপের (এলডব্লিউজি) সনদ পায়নি। এ কারণেই সঙ্কট কাটছে না বলে তাদের মত।

রফতানি উন্নয়ন ব্যুরোর পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ২০১৬-১৭ অর্থবছরেও তার আগের বছরের তুলনায় চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য রফতানিতে ৬ দশমিক ২৯ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছিল। ডলারের অংকে যা ১২৩ কোটি ৪০ লাখ ডলার। ওই বছরই হাজারীবাগ থেকে ট্যানারি স্থানান্তর হয় সাভারের নতুন শিল্প নগরীতে। এরপর থেকে কমতে থাকে রফতানি আয়। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে আয় হয় ১০৮ কোটি ৫৫ ডলার। আর ২০১৮-১৯ অর্থবছরে তা আরো কমে দাঁড়ায় ১০২ কোটি মার্কিন ডলার। অর্থাৎ এই দুই বছরে রফতানি আয় কমেছে ১৭ দশমিক ৩৫ শতাংশ।

দীর্ঘদিন ধরে ট্যানারি মালিকদের দোষারোপ করা হলেও যে কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগার (সিইটিপি) হচ্ছে শিল্পনগরীর প্রাণ সেই সিইটিপির কাজ এখনো শতভাগ শেষ হয়নি। ফলে গত দুই বছরে ১৫৪টি ট্যানারির মধ্যে ১২৩টি ট্যানারি উৎপাদন কার্যক্রম শুরু করলেও সিইটিরি অসম্পূর্ণতার কারণে তারা এলডব্লিউজির সনদ পাচ্ছে না। ফলে রফতানিতে মারাত্মক সঙ্কট তৈরি হয়েছে।

সম্প্রতি সরেজমিনে পরিদর্শনে দেখা গেছে, মাঝেমধ্যেই সিইটিপি উপচে তরল বর্জ্য সরাসরি চলে যাচ্ছে নদীতে। এতে পরিবেশের জন্য মারাত্মক কেমিক্যাল মিশে যাচ্ছে নদীর পানিতে। এ ছাড়া শিল্পনগরীর ভেতরেই উন্মুক্ত স্থানে কঠিন বর্জ্য ডাম্পিং করা হচ্ছে। যাতে শিল্পনগরীর রাস্তা পর্যন্ত ঢেকে দিচ্ছে। মারাত্মক দুর্গগন্ধ ছড়িয়ে পড়ছে চারপাশে।

এ প্রসঙ্গে শিল্প মন্ত্রণালয়ের সচিব আবদুল হালিম বলেন, সিইটিপির ২১টি অঙ্গের ২১টিরই সিভিল কাজ প্রায় ৯৭ শতাংশ শেষ হয়েছে। এটি নির্মাণের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ৫টি এলসি খোলা হয়েছিল। চারটি এলসির মাধ্যমে আসা মেশিনারিজ স্থাপন করা হয়েছে। ৫ম এলসির মালামাল চট্টগ্রাম বন্দরে খালাসের অপেক্ষায় রয়েছে। এটি আসলেই বাকি কাজ শেষ হবে। এটি শতভাগ ফাংশনাল হতে আরো এক বছর লেগে যাবে বলে জানান তিনি।
এদিকে বিশ্ববাজারে চামড়ার বাজারও সঙ্কুুচিত হয়ে আসছে। বাংলদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএ) সভাপতি শাহীন আহমেদ এ প্রসঙ্গে

মানবকণ্ঠকে বলেন, বর্তমানে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যের বিশ্ববাজারের পরিমাণ প্রায় আড়াইশ’ বিলিয়ন ডলারের। এ বাজারে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ সামান্যই। গত কয়েক বছরে এটি আরো সঙ্কুচিত হয়েছে। ২০১৩-১৪ অর্থবছরেও আমরা ১ দশমিক ১৩ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রফতানি করলেও গত অর্থবছরে এটি নেমে এসেছে ১ বিলিয়ন ডলারে। অর্থাৎ রফতানি কমেছে ৯ দশমিক ২৮ শতাংশ। বিশ্ববাজারে চামড়াজাত পণ্যের চাহিদা কমে যাওয়া, ট্যানারি শিপমেন্টের কারণে কমপ্লায়েন্স জটিলতা এবং চীন-যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্য যুদ্ধের কারণেই রফতানি কমে এসেছে।

শাহীন আহমেদ জানান, বাংলাদেশ থেকে এক সময় ইতালি, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়ার বড় বড় ব্র্যান্ড বাংলাদেশ থেকে ফিনিশড চামড়া কিনত। কমপ্লায়েন্স ইস্যুতে তারা আর কেই বাংলাদেশে নেই। ফলে বাংলাদেশকে নির্ভর করতে হচ্ছে চীন, হংকংসহ কয়েকটি দেশের নন-ব্র্যান্ড ক্রেতাদের ওপর। তিনি বলেন, চীন-যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্য যুদ্ধের কারণে চীনের ফিনিশড পণ্য যুক্তরাষ্ট্রে রফতানি কমে গেছে। ফলে সেখানকার ব্র্যান্ডগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এতে তারা আমাদের কাছ থেকে চামড়া কেনা কমিয়ে দিয়েছে। আবার আমাদের বড় ব্র্যান্ডগুলো মুখ ফিরিয়ে নেয়ায় চীনের ব্র্যান্ডগুলো যাচ্ছেতাই দামে আমাদের ফিনিশড চামড়া কিনতে চায়। আমরাও কম দামে চামড়া বিক্রি করতে এ রকম বাধ্য হচ্ছি। ফলে ডলারের হিসেবে রফতানি কমে গেছে।

এসকর্ট ফুটওয়্যারের এই মালিক বলেন, কমপ্লায়েন্স শর্ত পূরণের জন্যই আমাদের সাভারে যাওয়া। ২০১৭ সালে হাজারীবাগ থেকে জোর করে আমাদের ওখানে পাঠিয়ে দেয়া হয়েছে। অথচ এখনো সিইটিপি শতভাগ ফাংশনাল নয়। তাহলে এই দুই বছরে আমাদের ক্ষতি হলো তার দায় কে নেবে? বিটিএ সভাপতি বলেন, আমরা অর্থমন্ত্রীর কাছে আবেদন করেছি, ২০১৭ সালে যে ট্যানারিগুলো বন্ধ করে দেয়া হলো, সেই ২০১৭ সাল থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত আমাদের ব্যাংক ঋণের সুদ স্থগিত করা হোক। প্লটের লিজডিডটা দ্রুত বুঝে দেয়া হোক। এটি আমরা এখনো না পাওয়ায় ব্যাংক ঋণ থেকে বঞ্চিত হচ্ছি। কেমিক্যাল আমদানিতে বন্ডেড ও নন-বন্ডেড ট্যানারিগুলোর মধ্যে শুল্কবৈষম্য রয়েছে সেগুলো দূর করা হোক। সর্বোপরি সরকার যেন দ্রুত সিইটিপি শতভা ফাংশনাল করে সেই দাবি আমাদের। এটি সম্ভব হলে আগের বায়ারদের আমরা আবার ফিরে পাব বলে আশাবাদী।

মানবকণ্ঠ/এএম

 




Loading...
ads





Loading...