লকডাউন এবং বিষণ্ণতা

সাবিহা খানম একা

মানবকণ্ঠ

poisha bazar

  • ০৬ জুলাই ২০২০, ১৪:১৮

চীন থেকে প্রথম উৎপত্তি হওয়ার পর বাংলাদেশের (কোভিড-১৯) রোগী শনাক্ত হয় ৮ মার্চ। আর প্রথম মৃত্যু ঘটে ১৮ মার্চ। ১৭ মার্চ থেকে বাংলাদেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা করে দেয়া হয়, শুরু হয় লকডাউন। লকডাউন শব্দটি সম্পর্কে আমরা সবাই কম-বেশি পরিচিত। কিন্তু এর আক্ষরিক অর্থটি আমাদের জানা প্রয়োজন।

লকডাউনের আক্ষরিক অর্থ হলো, জরুরি প্রয়োজনে মানুষের গতিবিধি বন্ধ করে দেয়া। প্রিভেন্টিভ বা সতর্কতামূলক লকডাউন এবং এমার্জেন্সি লকডাউন। একাধিক শহরে যে লকডাউন জারি হচ্ছে তা হলো সতর্কতামূলক লকডাউন।


করোনা ভাইরাসের প্রভাবে পৃথিবীর এক-তৃতীয়াংশ মানুষ এখন লকডাউন বা ঘরবন্দি। বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত একটি নিবন্ধে লিখেছেন- ঘরবন্দি মানুষের গুরুতর মানসিক সমস্যা হচ্ছে এবং বাড়ছে স্বস্থ্যঝুঁকি। ঘরবন্দি মানুষের সংখ্যার দিক থেকে ভারত, চীন এবং যুক্তরাষ্ট্রের পরই বাংলাদেশের অবস্থান। ড্যান হুফ এ অবস্থাকে এ যাবৎকালের সবচেয়ে বড় মনস্তাত্তি¡ক পরীক্ষা হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। গৃহবন্দি এই মানুষগুলো নানা রকম মানসিক চাপের শিকার হচ্ছে।


এর মধ্যে মন খারাপ, অনিদ্রা, বিষণ্ণতা, বিভ্রান্তি, উৎকণ্ঠা, খিটখিটে মেজাজ, অবসাদ এবং মানসিক চাপের নানা লক্ষণ দেখা দিচ্ছে।

ফেসবুকসহ বাংলাদেশের অন্যান্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে মানুষ নিজেদের ভয়, আতঙ্ক, উদ্বেগের কথা লিখছেন। যেমন-

১. বেঁচে থাকলে দেখা হবে।
২. আর কিছুদিন বাসায় থাকলে পাগল হয়ে যাব।

নানা জাতীয় হতাশগ্রস্ত স্ট্যাটাস আমরা দেখতে পাচ্ছি লকডাউন শুরু হওয়ার পর থেকে। সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে কোনো মানুষ বেশিদিন বাঁচতে পারে না। কিন্তু (কোভিড-১৯) এমন একটি রোগ যা মানুষকে সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন করছে আক্রান্ত ব্যক্তিকে তো বটেই সাথে তার পরিবারের সদস্যদের ও সমাজ থেকে একঘরে করছে।


২০১৯ সালের শেষের দিকে বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার (ডঐঙ) হিসাব অনুযায়ী প্রায় তিন কোটির বেশি মানুষ হতাশায় ভুগছে। বাংলাদেশে তা মোট জনসংখ্যার ৪.৬ শতাংশ।


(কোভিড-১৯) প্যানডেমিকে মানুষ যেসব বিষয় নিয়ে বেশি হতাশায় ভুগছেন তার মধ্যে রয়েছে করোনার ভয়, চাকরি হারানোর ভয়, ব্যবসায় ক্ষতি, স্কুল-কলেজে যাওয়া ছেলেমেয়ের আগে ছিল পারিবারিক বাধা আর এখন সমাজ এবং আইনের বাধা। সিনিয়র সিটিজেনদের সেন্স অফ ভয়েড আর ক্যারিয়ার সবেমাত্র শুরু করবে এমন স্টুডেন্টদের হতাশার যেন কোনো শেষ নেই এই সময়ে। এসব হতাশা এক এক করে বিল্ড আপ হয় এবং ক্রমে তা রাগ বা ক্রোধে পরিণত হয়।

লকডাউনরত অবস্থায় মানুষের আচরণে বিষণ্ণতার প্রতিফলন বাড়ছে প্রকট হারে এবং বিভিন্নভাবে তা ব্যক্তি, সমাজ এবং রাষ্ট্রের ওপর প্রভাব সৃষ্টি করছে।


প্রত্যক্ষভাবে দেখা গেলে মানুষ অল্পতেই রেগে যাচ্ছে। আবার কান্নায় ভেঙে পড়ছে, কেমন একটি অসহ্য যন্ত্রণার মধ্যে পার করছে প্রতিটি মুহূর্ত।
মানুষ এতটাই একাকীত্ব বোধ করছে যে অনেক সময় মাথায় এ রকম চিন্তা-ভাবনা আসছে, সে আত্মহত্যা করবে।

গত ২৯ মার্চ, ২০২০ জার্মানির হেসে প্রদেশের অর্থমন্ত্রী টমাস শাকের আত্মহত্যা করেন। পরবর্তীতে জানা যায়, করোনা প্রভাবে অর্থনৈতিক মন্দার হতাশা নিয়েই তিনি এটি করেন। এই লকডাউনে বৃদ্ধি পেয়েছে হাজারো সম্পর্কের ভাঙন।

সম্প্রতি চায়নার একটি গবেষণায় দেখা গেছে ডিভোর্সের পরিমাণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৫ শতাংশের ওপর।
যদিও বাংলাদেশে এখনো এ গবেষণাটি করা হয়নি।

ঘরবন্দি মানুষ লকডাউনের সময়টাতে অনেকটাই নির্ভরশীল টিভি চ্যানেলের নিউজ এবং সোশ্যাল মিডিয়ার নিউজের ওপর। কিছু মিসইনফরমেশন যেমন ঘরের বাইরে দিয়া জ্বালালে সেই ঘরের মানুষ করোনামুক্ত হবে, চায়না করোনা সৃষ্টি করে দেশে দেশে ছড়িয়েছে, করোনা মুসলমানদের আক্রান্ত করবে না, পীরের ফুতে করোনা মুক্ত হবে মানুষ। এই যে এসব বিভ্রান্তিকর সংবাদ যা মানুষকে আরো হতাশাগ্রস্ত করে তুলছে।

লকডাউনরত অবস্থায় মানুষের হতাশা, রাগ বা ক্রোধ এতটাই তুঙ্গে যে ১৫ জুন খুলনার রাইসা হসপিটালে রোগীর মৃত্যুকে কেন্দ্র করে স্বজনদের হামলায় প্রাণ হারান ড. রাকিবউদ্দিন। এ রকম আরো শত শত ঘটনা ঘটছে আমাদের আশপাশেই।

আপনি বা আমি হয়তো ইচ্ছে করলেই লকডাউনরত জীবনটাকে করে তুলতে পারি কিছুটা ভিন্নতর যা আমাদের বিষণ্ণতাকে কাটিয়ে তুলতে পারে।

* পরিবারকে সময় দেয়া। হয়তো সবার ব্যস্ততার ভিড়ে আমরা পরিবারকে ভালোভাবে সময় দিতে পারি না। পারিবারিক বন্ধন সৃষ্টি করার এই সময়টি একটি সুযোগ্য সময়।
*টিভি নিউজ কম দেখে বিনোদনমূলক অনুষ্ঠান দেখলে বিষণ্ণতা একটু হলেও রিলিভড পাবে।
*গল্পের বই পড়া বা বিভিন্ন গল্পের অডিও ক্লিপ শোনা।
*পছন্দের গান শোনা, বাড়িতে গিটার বা হারমোনিয়াম থাকলে নিজেও গাইতে পারেন।
* প্রতিদিন ইয়োগা করতে পারেন ইটস রিয়েলি ওয়ার্ক ফর ডিক্রিজিং মেন্টাল স্ট্রেস।
*আপনার নিজের ক্রিয়েটিভিটি উন্মোচন করার সব থেকে বেস্ট সময় এটি।
অনেকেই কাজের প্রেশারে এবং যান্ত্রিক জীবনে এসব কাজ করতে পারে না। যা হতে পারে আপনার অন্য আরেকটি পরিচয়।
‘একজন ডক্টর যে
গায়ক হতে পারবে না’
ব্যাপারটা কিন্তু এমন নয়।

তাই এ সময়টাতে বিষণ্ণতা না থেকে কাজের মাধ্যমে আপনি, আমি এবং আমরা সবাই পারি বিষণ্ণতা শব্দটিকে দূরে ছুড়ে দিতে।

বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, যারা আগে থেকেই ভঙ্গুর মানসিকতায় বেঁচে আছেন, তাদের আত্মত্যার জন্য (কোভিড-১৯) উপস্থিত হয়েছে একটি চ‚ড়ান্ত সময় হিসেবে।
হ্যাঁ, হয়তো বা তাই। মানুষ লড়াকু প্রাণী। লড়াই করে বেঁচে থাকতে শিখেছে।
তাইতো এই বিষণ্ণতার জ্বাল থেকে আমাদের বের হয়ে আসতে হবে এবং একটি সুন্দর পৃথিবী গড়ে তোলার মানসিকতা সৃষ্টি করতে হবে।

লেখক-সাবিহা খানম একা : শিক্ষার্থী, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

মানবকণ্ঠ/এইচকে

 





ads






Loading...