করোনা প্রতিরোধে কার্যকর মাস্ক কোনটি?

মাস্ক বাংলাদেশ mask bd
- ছবি: সংগৃহীত

poisha bazar

  • মানবকণ্ঠ ডেস্ক
  • ২৪ জুন ২০২০, ১৫:৪০

প্রাণঘাতী করোনা ভাইরাস নিয়ে আতঙ্কের শেষ নেই। চীন থেকে ছড়িয়ে পড়া প্রাণঘাতী করোনা ভাইরাসে আক্রান্তের সংখ্যা ক্রমেই বাড়ছে। সর্দি-কাশি এই ভাইরাসের প্রধান উপসর্গ। এই রোগের এখন পর্যন্ত কোনো টিকা বা প্রতিষেধক আবিষ্কৃত হয়নি। তাই এই রোগ প্রতিরোধের জন্য পরামর্শ দিয়েছে ইউনিসেফ। এই ভাইরাস প্রতিরোধে মাস্ক পরা ও ভালোভাবে হাত ধোয়ার প্রতি গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। তবে মাস্ক ব্যবহার করলেও করোনা প্রতিরোধে কী ধরনের মাস্ক পরা ভালো তা আমরা অনেকেই জানি না।

করোনা প্রতিরোধে কার্যকর মাস্ক
১. ডিসপোজেবল মাস্ক, যাকে সার্জিক্যাল ফেস মাস্কও বলা হয়। হাসপাতালের চিকিৎসক, নার্স ও কর্মীরাও এটি ব্যবহার করেন। এই মাস্ক চিকিৎসক ও রোগী উভয়কেই সংক্রমণ থেকে রক্ষা করে। এই মাস্ক বাতাসের ছোট ছোট কণা আটকাতে পারে না। আর ৩-৮ ঘণ্টার বেশি পরা উচিত নয়। এটি ভয়ঙ্কর করোনা ভাইরাস প্রতিরোধ করতে পারে না।

২. N95 রেসিপিরেটর মাস্ক অস্ত্রোপচারের মাস্কের চেয়েও বেশি কার্যকর। কারণ এটি ‘ইনসাইড টু আইটসাইড’ অর্থাৎ বাইরে থেকে ভেতরে ব্যাকটেরিয়া সংক্রমণকে প্রতিরোধ করে। এই মাস্কটি করোনা, H1W1 এবং সার্সের মতো ভাইরাসের সংক্রমণে সহায়তা করে।

৩. করোনা ভাইরাসের থেকে সুরক্ষা পেতে N95 রেসিপিরেটরের ব্যবহার বেশি কার্যকর হিসেবে বিবেচিত হযয়েছে। কারণ এই মাস্কগুলো ভালো ফিট হয় এবং প্রায় ০.৩ মাইক্রোনের ব্যাসযুক্ত ছোট কণাগুলোকে ফিল্টার করে দেয়। এটি বাতাসে উপস্থিত ছোট কণার ৯৫ শতাংশকে অবরুদ্ধ করে।

তবে করোনা ভাইরাসটি প্রায় ০.১২ মাইক্রোন ব্যাস পরিমাপ করে। তাই এটি সংক্রমণ রোধে অকার্যকর হতে পারে বলে পরামর্শ দেয়া হচ্ছে।

৪. FFP1 মাস্ক মানের দিক থেকে ভালো নয়। সাধারণত এতে পরিস্রাবণ ৮০ শতাংশ এবং ছিদ্র ২০ শতাংশ হয়। এটি বাড়িতে ব্যবহার করা যেতে পারে।

৫. FFP2 মাস্ক FFP1-এর তুলনায় বেশি ভালো। এতে পরিস্রাবণ ৯৪ শতাংশ এবং ছিদ্র ৮ শতাংশ পর্যন্ত হয়। বর্তমানে এই মাস্কগুলো করোনা ভাইরাস এড়াতে পরা হচ্ছে।

৬. FFP3 সর্বোচ্চ মানের মাস্ক। যার মধ্যে পরিস্রাবণ সাধারণত ৯৯ শতাংশ এবং ছিদ্র প্রায় ২ শতাংশ পর্যন্ত হয়। করোনা, সার্স এবং অন্যান্য মারাত্মক ভাইরাস থেকে বাঁচতে বিদেশে এটি ব্যবহার করা হচ্ছে। তবে বাংলাদেশের মতো জনাকীর্ণ দেশে এটি কতটা কার্যকর হবে তা বলা যায় না। কিন্তু এটি নিশ্চিত যে মাস্কটি কাশি ও হাঁচির মাধ্যমে সংক্রমণ ছড়াতে দেবে না।
তথ্যসূত্র: বোল্ডস্কাই

একবার ব্যবহারযোগ্য পেপার মাস্ক না কাপড়ের মাস্ক ভালো?
সার্জিক্যাল মাস্ক ছাড়া আর কোনোটির সঠিক কার্যকারিতা নিয়েই সুনির্দিষ্ট তথ্যপ্রমাণ নেই। সবগুলোরই কিছু না কিছু সুবিধা রয়েছে, কিন্তু কোন মাস্কটি সেরা কিংবা কোনটির সুরক্ষা ব্যবস্থা ভালো, সে ব্যাপারে সঠিক কোনো প্যারামিটার নেই।

মুখের সঙ্গে শক্ত করে লেগে থাকে এমন মাস্কই সম্ভবত বেশি কার্যকর। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের সেন্টার ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশন (সিডিসি) বলছে, কোনো কিছু না পরার চেয়ে নিদেনপক্ষে একটি পট্টি পরিধান করাও ভালো। সিডিসির পরামর্শ, প্রতিবার ব্যবহারের পরই মাস্ক ধুয়ে ফেলতে হবে।

যে মাস্ক বেশি সুরক্ষা দেয়
নোভেল করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ এড়াতে সারা বিশ্বে এখন মুখে মাস্ক পরার হিড়িক। কেউ পরছেন উচ্চ মানসম্পন্ন মেডিকেল মাস্ক, কেউবা ফার্মেসি থেকে কেনা সাধারণ মানের মাস্ক, আর কেউবা নিজেরাই তৈরি করে নিচ্ছেন ঘরে। কিন্তু আপনি কোন ধরনের মাস্ক পরছেন, তার ওপর অনেক কিছুই নির্ভর করে।

একেক ধরনের মাস্ক একেক মাত্রার সুরক্ষা দেবে। গ্রেড N95 রেসপিরেটরস সার্জিক্যাল মাস্ক কোভিড-১৯ সংক্রমণের বিরুদ্ধে আপনাকে সর্বোচ্চ সুরক্ষার নিশ্চয়তা দেবে। যদিও এই মাস্ক অত্যন্ত ব্যয়বহুল, সরবরাহ সীমিত, আবর্জনা তৈরি করে ও দীর্ঘ সময় ব্যবহারে অস্বস্তির উদ্রেক করতে পারে। তাই যেসব দেশে সর্বসাধারণের সবার মাস্ক পরার প্রয়োজন অনুভূত হয় সেসব দেশে পরামর্শ দেয়া হয়, যেন N95 মাস্ক স্বাস্থ্যকর্মী ও উচ্চঝুঁকিতে থাকা মানুষদের জন্য সংরক্ষিত থাকে।

একবার ব্যবহারযোগ্য পেপার মাস্ক কিংবা পুনর্ব্যবহারযোগ্য কাপড়ের আবরণ সুরক্ষা দিতে পারে কিনা তার কোনো সুনির্দিষ্ট প্রমাণ নেই। কিন্তু এর পরও মুখের মাস্ক কোভিড-১৯ সংক্রমণ ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করে বলে পরামর্শ দেয়া হচ্ছে। দ্য রয়েল সোসাইটির বিশ্লেষণ বলছে, এমনকি ঘরে তৈরি মাস্কও কাজ দিতে পারে।

মাস্ক পরে কি ভাইরাসের সংক্রমণ ঠেকানো যায়?
বিশ্বের বহু দেশেই সংক্রমণ ঠেকানোর একটি জনপ্রিয় ব্যবস্থা হচ্ছে মাস্ক ব্যবহার। বিশেষ করে চীনে, যেখান থেকে শুরু হয়েছে করোনা ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার ঘটনা, সেখানেও মানুষ বায়ুর দূষণের হাত থেকে বাঁচতে হরহামেশা নাক আর মুখ ঢাকা মুখোশ পরে ঘুরে বেড়ায়।

অবশ্য বায়ুবাহিত ভাইরাসের সংক্রমণ ঠেকাতে এই মাস্ক কতটা কার্যকর সে ব্যাপারে যথেষ্টই সংশয়ে আছেন ভাইরাস বিশেষজ্ঞরা, যাদেরকে বলা হয় ভাইরোলজিস্ট। তবে হাত থেকে মুখে সংক্রমণ ঠেকাতে এই মাস্ক ব্যবহার করে সুফল পাওয়ার কিছু নজির আছে। আঠারো শতকে প্রথম সার্জিক্যাল মাস্কের চল শুরু হয়। কিন্তু ১৯১৯ সালে স্প্যানিশ ফ্লু মহামারীর আগ পর্যন্ত এই মাস্ক আমজনতার হাতে এসে পৌঁছায়নি।

ইউনিভার্সিটি অব লন্ডনে সেন্ট জর্জেসের ডঃ ডেভিড ক্যারিংটন এর মতে, ‘সাধারণ সার্জিক্যাল মাস্ক বায়ুবাহিত ভাইরাস ও ব্যাকটেরিয়ার বিরুদ্ধে সুরক্ষা দিতে যথেষ্ট নয়’। ‘বেশিরভাগ ভাইরাসই বায়ুবাহিত’। তিনি বলেন এবং এই মাস্কগুলো এতই ঢিলেঢালা থাকে যে এটা বায়ুকে ফিল্টার করতে পারে না ঠিকঠাক। তাছাড়া যিনি এই মাস্ক ব্যবহার করছেন, তার চক্ষু থাকছে উন্মুক্ত।

তবে হাঁচি বা কাশি থেকে ভাইরাসের সংক্রমণের ঝুঁকি কিছুটা কমাতে সাহায্য করতে পারে এই মাস্ক। আর হাত থেকে মুখের সংক্রমণের বিরুদ্ধেও কিছু সুরক্ষা এটা দেয়।

২০১৬ সালে নিউ সাউথ ওয়েলসের একটি সমীক্ষায় বলা হয়, মানুষ প্রতি ঘণ্টায় গড়ে ২৩ বার হাত দিয়ে মুখ স্পর্শ করে।

ইউনিভার্সিটি অব নটিংহ্যামের মলিক্যুলার ভাইরোলজির অধ্যাপক জোনাথন বল এর মতে, হাসপাতালের মধ্যে একটি নিয়ন্ত্রিত সমীক্ষায় দেখা গেছে রেসপিরেটর হিসেবে তৈরি ফেস মাস্ক ইনফ্লুয়েঞ্জা ঠেকাতে পারে।

রেসপিরেটর হচ্ছে এমন এক ধরনের কৃত্রিম শ্বাসযন্ত্র যার মধ্যে থাকে একটি বিশেষায়িত ফিল্টার। মূলত বায়ুবাহিত ক্ষতিকর ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র পদার্থের হাত থেকে শ্বাসনালিকে সুরক্ষা দেয়ার জন্য রেসপিরেটর তৈরি করা হয়। অধ্যাপক বল বলেন, ‘সাধারণ জনগোষ্ঠীর মধ্যে এই সমীক্ষা চালালে যে তথ্য পাওয়া যাবে, সেটা একইরকম হবে না, কারণ দীর্ঘসময় ধরে টানা একটি মাস্ক পরে থাকা বেশ চ্যালেঞ্জের ব্যাপার’।

কুইন্স ইউনিভার্সিটি অব বেলফাস্টের ওয়েলকাম-উল্ফসন ইনস্টিটিউট ফর এক্সপেরিমেন্টাল মেডিসিনের ডঃ কনর বামফোর্ড বলেন, সাধারণ স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলেই ছোঁয়াচে ভাইরাসের সংক্রমণ থেকে কার্যকরভাবে সুরক্ষা পাওয়া সম্ভব।

তিনি বলেন, ‘যখন হাঁচি দিচ্ছেন তখন মুখটি ঢাকুন, তারপর হাতটি ধুয়ে নিন এবং ধোয়ার আগ পর্যন্ত মুখের ভেতরে হাত না ঢোকান- শুধুমাত্র এটুকুতেই নিঃশ্বাসের মাধ্যমে ছড়ানো ভাইরাসের সংক্রমণের ঝুঁকি যথেষ্ট নিয়ন্ত্রণের মধ্যে রাখবে’।

মানবকণ্ঠ/এইচকে 




Loading...
ads






Loading...