রক্তদাতার সংখ্যা শতভাগ হতে এখনো অনেক দূর

রক্তদাতার সংখ্যা শতভাগ হতে এখনো অনেক দূর
রক্তদাতার সংখ্যা শতভাগ হতে এখনো অনেক দূর - ছবি: সংগৃহীত

poisha bazar

  • মাহমুদ সালেহীন খান
  • ১৬ নভেম্বর ২০১৯, ১১:৫৮

দেশে প্রতিবছর রক্তের চাহিদা ১০ থেকে ১২ লাখ ব্যাগ। এর মধ্যে বিভিন্ন সংগঠন ও বøাড ব্যাংকের মাধ্যমে পাওয়া যাচ্ছে প্রায় ১ লাখ ব্যাগ রক্ত। সাত থেকে সাড়ে সাত লাখ ব্যাগ সংগৃহীত হয় আত্মীয়স্বজন ও নিরাপদ রক্ত পরিসঞ্চালনের মাধ্যমে। বাকিগুলো ঘাটতি হিসেবেই গণনায় থাকছে। গত ১০ বছরে স্বেচ্ছায় রক্তদাতার সংখ্যা ৮ শতাংশ থেকে বেড়ে ৩০ শতাংশ হয়েছে। নিরাপদ রক্ত পরিসঞ্চালন কর্মসূচির পরিসংখ্যান থেকে এ তথ্য পাওয়া গেছে। ২০২০ সালের মধ্যে স্বেচ্ছায় রক্তদাতার সংখ্যা শতভাগ করার অঙ্গীকার করলেও তা থেকে অনেক অনেক দূরে আছে বাংলাদেশ। বিশেষজ্ঞরা বলছেন স্বাস্থ্য খাতের অন্য বিষয় নিয়ে সরকারের যতটা উৎসাহ দেখা যায়, স্বেচ্ছায় রক্তদাতা সৃষ্টিতে ততটা উৎসাহ দেখা যায় না। যার ফলে ২০০৯ সালে অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্নে দিয়ে আসা অঙ্গীকার বাস্তবায়ন হচ্ছে না।

২০০৯ সালে অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্নে আয়োজিত বিশ্বের বিভিন্ন দেশের স্বাস্থ্যমন্ত্রীদের নিয়ে একটি অনুষ্ঠান আয়োজন করে বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা (হু)। এতে ২০২০ সালের মধ্যে সারাবিশ্বে স্বেচ্ছায় রক্তদানের মাধ্যমে নিরাপদ রক্ত পরিসঞ্চালন নিশ্চিত করার ঘোষণা দেয়া হয়। সেই ঘোষণার প্রতি বাংলাদেশ সমর্থন দেয় এবং অঙ্গীকারও করে।

স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালক অধ্যাপক আবুল কালাম আজাদ বলেন, জনসচেতনতা সৃষ্টির মাধ্যমে স্বেচ্ছায় রক্তদানে উৎসাহী করে নিরাপদ রক্ত পরিসঞ্চালন শতভাগ নিশ্চিত করতে আরো কিছুটা সময় লাগবে। এখন দেশে রক্ত নিরাপদভাবেই পরিসঞ্চালন হচ্ছে বলে দাবি করেন তিনি।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) নিরাপদ রক্ত পরিসঞ্চালন বিভাগের সাবেক বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক আসাদুল ইসলাম বলেন, কিছু সংগঠন স্বেচ্ছায় রক্তদানের সাথে ব্লাড ব্যাংকে পরিণত হয়েছে। কিন্তু সেসব সংগঠন থেকে রক্ত পেতে অর্থ লাগছে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে দেখা যায়, রোগীর আত্মীয়স্বজনের কাছ থেকে রক্তের চাহিদা মেটানো হচ্ছে। এতে একজন কাজের সময় পাবে, কিন্তু আরেকজন পাবে না। এজন্য জাতীয় একটি জাতীয় কর্মসূচির মাধ্যমে শতভাগ স্বেচ্ছা রক্তদান নিশ্চিত করা খুবই জরুরি।

জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের রক্ত পরিসঞ্চালন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. শেখ দাউদ আদনান বলেন, রক্ত মূলত দুটো উপাদানে বিভক্ত। রক্তকণা বা কোষীয় অংশ এবং রক্তরস বা জলীয় অংশ। তিন ধরনের রক্তকণিকা রয়েছে লোহিত কাণিকা, শ্বেত কণিকা এবং অনুচক্রিকা। রক্তের শতকরা ৪৫ ভাগই রক্তকণিকা। বাকি ৫৫ ভাগ রক্তরস বা প্লাজমা যার শতকরা ৯২ ভাগই জল। রক্তকণার মধ্যে লোহিতকণা কোষে অক্সিজেন নিয়ে যায় আর কার্বন-ডাই-অক্সাইড ফিরিয়ে নিয়ে আসে হৃৎপিণ্ডে। শ্বেতকণা বিভিন্ন ধরনের জীবাণুর আক্রমণ থেকে শরীরকে রক্ষা করতে সাহায্য করে। অনুচক্রিকা রক্তক্ষরণের ক্ষেত্রে রক্তকে জমাট বাঁধিয়ে রক্তক্ষরণ বন্ধ করতে সাহায্য করে। প্লাজমা মূলত কণাগুলোকে বহন করে আর খাদ্য ও বাহ্য পদার্থ (যেমন ভিটামিন, হরমোন ইত্যাদি) পরিবহন করে। রক্তকণাগুলোর প্রত্যেকটির নির্দিষ্ট আয়ু আছে। সবচেয়ে বেশিদিন বাঁচে লোহিত কণা ১২০ দিন। বিভিন্ন ধরনের শ্বেতকণার আয়ু ২ থেকে ১০ দিন। অনুচক্রিকা দুই দিন পর্যন্ত বাঁচে। তিনি বলেন, একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ নিয়মিত ৩ থেকে ৪ মাস অন্তর রক্তদান করতে পারে। এতে শারীরিক ক্ষতির কোনো আশঙ্কা নেই বরং তা রক্তদাতার শারীরিক সুস্থতা বাড়িয়ে দেয়।

কোয়ান্টাম ফাউন্ডেশনের কো-অর্ডিনেটর ডা. মনিরুজ্জামান বলেন, নিরাপদ ও স্বেচ্ছায় রক্তদান কার্যক্রমকে এগিয়ে দিতে তরুণ-তরুণীদের রক্তদানে বেশি উৎসাহিত করতে হবে। এটা আসলে ইমোশনের ব্যাপার। তারা যদি উপলব্ধি করতে পারে যে তাদের দানের রক্তে একজনের জীবন বাঁচছে, তাহলে তারা দ্বিগুণ উৎসাহে এসব কার্যক্রমে জড়াবে। এ জন্য নবম-দশম শ্রেণি ও কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের নিয়মিত রক্তদানে উৎসাহিত করতে বিশেষ কার্যক্রম গ্রহণ করা উচিত। যেমন হতে পারে, ১৮ বছর বয়স হলেই শিক্ষার্থীরা তাদের ১৯তম জন্মদিনে রক্তদান করবে। এভাবে যদি মেসেজটা আমরা সারাদেশের স্কুল-কলেজগুলোতে ছড়িয়ে দিতে পারি যে ১৯তম জন্মদিন স্মরণীয় হোক রক্ত দানে বিশাল সাফল্য আসবে। জন্মদিনে তারা কেক কাটতে পারে, পার্টি দিতে পারে, ঠিক তেমনি রক্তদানের মতো আরো একটা মহতী কার্যক্রম গ্রহণ করতে পারে।

ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ব্লাড ট্রান্সফিউশন মেডিসিন বিভাগের প্রধান ডা. মো. মাজহারুল হক জানান, ২০১৪ সালে সারাদেশের ২১৩টি কেন্দ্র থেকে সর্বমোট ৬ লাখ ১৮ হাজার ব্যাগ রক্ত সংগ্রহ করা হয়। সংগৃহীত রক্তের ৭০ শতাংশের বেশি নিকটাত্মীয়ের কাছ থেকে পাওয়া। বাকিটা স্বেচ্ছায় রক্তদাতাদের কাছ থেকে সংগ্রহ করা।

বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির রক্ত কর্মসূচির পরিচালক ডা. মো. তারিক মেহেদী বলেন, গত এক দশকে বাংলাদেশে স্বেচ্ছায় রক্তদাতাদের সংখ্যা কিছুটা বাড়লেও নিয়মিত স্বেচ্ছায় রক্ত দেয়ার মানসিকতায় ঘাটতি রয়েছে। সমস্যার স্থায়ী সমাধানের জন্য এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণ প্রয়োজন।

বিশেষজ্ঞদের মতে, রক্তস্বল্পতা, ওজন কম, অস্বাভাবিক রক্তচাপ, হেপাটাইটিস বি ও সি, ম্যালেরিয়া, এইডস অথবা কোনো যৌন রোগাক্রান্ত, বহুগামী বা সমকামী, ইনজেকশনের মাধ্যমে মাদকদ্রব্য গ্রহণকারী ব্যক্তিরা রক্তদান করতে পারেন না। কম ঝুঁকিপূর্ণ রক্তদাতা থেকে রক্ত সংগ্রহ করে প্রয়োজনীয় স্ক্রিনিং পরীক্ষার মাধ্যমে যে রক্ত পরিসঞ্চালন করা হয়, তাকে নিরাপদ রক্ত পরিসঞ্চালন বলে। নিয়মিত রক্তদানের মাধ্যমে একজন রক্তদাতা শারীরিক সুস্থতার পাশপাশি হƒদরোগ, স্ট্রোকের মতো প্রাণহরণকারী রোগ থেকেও নিরাপদ থাকতে পারে।

স্বাস্থ্য অধিদফতর বলছে, ছেলেদের শরীরে ওজনের কেজিপ্রতি ৭৬ মিলিলিটার এবং মেয়েদের শরীরে ওজনের কেজিপ্রতি ৬৬ মিলিলিটার রক্ত থাকে। এক্ষেত্রে প্রত্যেকেরই কেজিপ্রতি ৫০ মিলিলিটার রক্ত সংবহনের কাজে লাগে, বাকিটা অতিরিক্ত। ফলে ৫০ কেজি ওজনের একটি ছেলের শরীরে উদ্বৃত্ত রক্তের পরিমাণ ১৩০০ মিলি এবং একই ওজনের একটি মেয়ের শরীরে উদ্বৃত্ত রক্তের পরিমাণ ৮০০ মিলি। স্বেচ্ছা রক্তদানে একজন দাতার কাছ থেকে ৩৫০ থেকে ৪০০ মিলিলিটার রক্ত সংগ্রহ করা হয়, যা তার শরীরের উদ্বৃত্ত রক্তের অর্ধেকেরও কম। ফলে রক্তদানে শারীরিক ক্ষতি হওয়ার কোনো আশঙ্কাই নেই।

মানবকণ্ঠ/এআইএস




Loading...
ads





Loading...