বিশ্বকাপ-২০২২

গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হয়ে আর্জেন্টিনা দ্বিতীয় রাউন্ডে


  • মো. মোজাহিদুল ইসলাম নয়ন
  • ০৩ ডিসেম্বর ২০২২, ১৬:২৫,  আপডেট: ০৩ ডিসেম্বর ২০২২, ১৬:২৯

গ্রুপ পর্বের প্রথম ম্যাচে সৌদি আরবের বিরুদ্ধে অপ্রত্যাশিতভাবে হেরে আর্জেন্টিনার জন্য পরের দুটি ম্যাচই নক-আউট পর্বের ন্যাচার পায়। হিসাব দাঁড়ায়, যদি আর্জেন্টিনা পরের পর্বে যেতে চায় তাহলে তাদের পরের দুটি ম্যাচ জিততেই হবে। এমন একটি জটিল অঙ্কে পড়ে যায় আলবিসেলেস্তারা। লিওনেল স্কালোনির ম্যানেজারিতে যে আর্জেন্টিনা বিশ্বকাপে আসার আগে টানা ৩৫ ম্যাচ অপরাজিত সেই দলের কি না এমন অবস্থা? ভাবা যায় না। দলের খেলোয়াড়, দলীয় সমন্বয় এবং কোপা আমেরিকা জয়, বিশ্বকাপ বাছাই পর্বে অনেকটা আয়েশেই চূড়ান্তপর্বে জায়গা করে নেয়া-সব সত্যেও এ বিশ্বকাপে তাদের শুরুর ধাক্কাটা যে বেশ লেগেছে তা বলাবাহুল্য।

ফুটবল বিশেষজ্ঞ, সমর্থক এমনকি দলীয় খেলোয়াড়দের কাছেও বিষয়টি হজম করার ছিল না। কিন্তু এটা বিশ্বকাপ, ফুটবলের বিশ্ব আসর। এখানে জায়গা করে নেয়া প্রতিটি দলেরই যে যে কোনো দলের বিরুদ্ধে জেতার ক্ষমতা আছে সেটা কিন্তু শুরু থেকেই পরিলক্ষিত হয়েছে। জাপানের কাছে হেরেছে চারবারের চ্যাম্পিয়ন জার্মানি, গতকাল ফুটবলে অনেকটা অখ্যাত তিউনিশিয়ার কাছে ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন ফ্রান্সের হারও এই ধারাবাহিকতাকে আরও দীর্ঘ করেছে।

কিন্তু আর্জেন্টিনা, প্রথম ম্যাচে হারের মাধ্যমে যে শিক্ষা নিয়েছে সেটা কিন্তু পরের দুটি মহারণে ভালোভাবেই প্রদর্শন করেছে। তারা প্রথমে মেক্সিকোর বিরুদ্ধে জিতে প্রমাণ করেছে তারা ঘুরে দাঁড়াতে পারে। আর ওই ম্যাচ শেষে দলীয় অধিনায়ক লিওনেল মেসি সংবাদ সম্মেলনে বলেছেÑ তাদের বিশ্বকাপ নতুন করে শুরু হলো এবং তারা এখন ধাপে ধাপে এগুতো চায়। তারা যথেষ্ট শিক্ষা নিয়েছে প্রথম ম্যাচের হার থেকে। আর সেভাবেই দল প্রস্তুতি নিচ্ছে। এর প্রতিফলনও দেখা গেছে। তারা মেক্সিকোর বিরুদ্ধে জয় দিয়ে খেলা শেষ করার মাত্র বারো ঘণ্টার মধ্যে পরের ম্যাচের জন্য অনুশীলনে নেমে যায়। এতেই বোঝা যায়-তারা যে নতুন প্রাণ পেয়েছে সেটা ধরে রাখতে কতটা মরিয়া।

প্রথম ম্যাচের শিক্ষা নিয়ে দ্বিতীয় ম্যাচে মেক্সিকোর বিরুদ্ধে তারা মাঠের সব জায়গায় উন্নতি করেছে। বাড়িয়েছে দলীয় সমন্বয়। জয়ের জন্য মরণপণ লাড়াই করেছে। আবার তৃতীয় ম্যাচে পোল্যান্ডের বিরুদ্ধে আর্জেন্টিনাকে যেন আরও কয়েকধাপ উন্নত ফুটবল খেলতে দেখা গেছে। দ্বিতীয় ম্যাচের যে পরিবর্তিন স্কোয়াড সেখানেও তারা পরিবর্তন এনেছে তৃতীয় ম্যাচে। সেটা যদিও টেকটিক্যাল কারণ কিন্তু প্রতিপক্ষে যখন লেভানদোভস্কির মতো গোলমেশিন থাকে তখন তো বিশেষ কৌশল নেয়ার প্রয়োজন রয়েছেই। খেলার পূর্বে সাংবাদিকদের সাথে কথা বলার সময় দলীয় কোচ এ বিষয়ে কোনো রাখঢাক করেনি। তিনি বলেছেন-লেভার মতো আন্তর্জাতিক মানের খেলোয়াড়কে সামলানোর জন্য তাদের বিশেষ মনোযোগ থাকবে।

হয়েছেও তাই। দলে রক্ষণে রোমেরোকে ফিরিয়ে আনা হয়েছে। রক্ষণের চারজন বিশেষ করে লেফট ও রাইট ব্যাক দুজনই ছিলেন লেভাকে আটকানোর বিশেষ দায়িত্বে। যখনই পোল্যান্ড লেভার কাছে বল দিয়েছে তখনই আর্জেন্টিনার বিশ্বস্ত রক্ষণ যেন দেয়াল হয়ে দাঁড়িয়ে গেছে। ফলে, পুরো নব্বই মিনিটে তারা লেভার নেতৃত্বে কার্যকর কোনো আক্রমণ রচনা করতে পারেনি। লেভানদোভস্কিকে ছাড়া যে বিচ্ছিন্ন কিছু আক্রমণ হয়েছে তা কাজের কাজ কিছু করতে পারেনি। ফলে, পোল্যান্ডের খেলোয়াড়রা আর্জেন্টিনার গোলরক্ষণ মার্টিনেজের কোনো পরীক্ষাও নিতে পারেনি।

অন্যদিকে মেসির নেতৃত্বে আর্জেন্টিনা যেন ছিল অন্যরকম একটি দল। খেলার বাঁশি বাজার সাথে সাথে তারা যে গতিতে খেলতে শুরু করে তা পুরো খেলাতেই অব্যাহত রেখেছিল। বললে হয়তো অত্যুক্তি হবে না যে, সেই গতিময় আর সমন্বিত ফুটবল একটি মুহূর্তের জন্য ছন্দ হারায়নি। তাদের রক্ষণ, মধ্যমাঠ, ফরোয়ার্ড সবক্ষেত্রেই তারা ছিল পোল্যান্ড থেকে যোজন যোজন দূরে। পরিসংখ্যান বলছে আর্জেন্টিনা মোট ২৩টি শর্ট নিয়েছে প্রতিপক্ষের গোলকে লক্ষ্য করে।

এরমধ্যে ১২টি শর্ট ছিল সুনির্দিষ্টভাবে গোলের জন্য। বল পজিশনে তারা রেখেছিল প্রায় ৭৫ শতাংশ সময়। দলটি মোট ৮৬৭টি পাস দিয়েছে। অন্যদিকে পোল্যান্ড শিবির যেন ছিল একেবারেই বিবর্ণ। তারা গোলের সুনির্দিষ্ট টার্গেটে একটি শর্টও নিতে পারেনি। সাধারণ লক্ষ্য নিয়ে শর্ট করেছে মোট ৪টি। বল পজিশনে রেখেছিল মাত্র ২৬ শতাংশ সময় আর পাস কমপ্লিট করেছে মাত্র ৩১৭টি।

উপরোক্ত পরিসংখ্যান দেখে সহজেই বোঝা যায় খেলা কেমন হয়েছে, কতোটা একপাক্ষিক হয়েছে। পোল্যান্ড দলের কৌশই ছিল যেনতেনভাবে গোল খেয়ে ম্যাচটিকে ড্র করা। আর তাতেই তাদের দ্বিতীয় রাউন্ডে ওঠা নিশ্চিত হয়ে যাবে। যদিও তারাই শেষ পর্যন্ত দ্বিতীয় রাউন্ডে গেছে। কিন্তু সেটাতে তাদের কৃতিত্বের চেয়ে আরেকটি খেলায় মেক্সিকোর কৃতিত্ব বেশি। ওই খেলায় দলটি প্রথম ম্যাচে আর্জেন্টিনাকে হারানো সৌদি আরবকে ২-১ গোলে হারিয়েছে। ফলে, তিন খেলায় চার পয়েন্ট নিয়ে পোল্যান্ড নকআউট পর্বে চলে গেছে। আর দ্বিতীয় রাউন্ডে তাদের প্রতিপক্ষ বর্তমান চ্যাম্পিয়ন এমবাপ্পেদের ফ্রান্স।

প্রথমার্ধে আর্জেন্টিনা অনেক বেশি আক্রমণ করেছে এবং বেশ কয়েকটি সহজ সুযোগও তারা পেয়ে যায়। কিন্তু গোল পাচ্ছিল না। কিন্তু বিরতিতে যাবার দশমিনিট আগে গোলরক্ষকের ভুলে মেসিকে বল দেখতে বাধা দেয়ায় প্যানাল্টি পেয়ে যায় আর্জেন্টিনা। কিন্তু এমন একটি মোহন সুযোগ কাজে লাগাতে ব্যর্থ হন সাতবারের ব্যালন ডি’ওর জয়ী ও দলীয় অধিনায়ক মেসি। প্রতিপক্ষের গোলরক্ষক সিজনী অনেকটা ঝাঁপিয়ে পড়ে বলটি ঠেকিয়ে দেয়। এমন একটি অবস্থায় দলীয় সমর্থকসহ পুরোমাঠে নেমে আসে হতাশা। কিন্তু মেসি সেই হতাশাকে স্থান দিতে চায়নি। মুহূর্তের ভ্রান্তি কাটিয়ে দ্রুত সে খেলায় মনোনিবেশ করে। দলকে পূর্বের মৎইো উজ্জীবিত করে রাখে।

বিরতি থেকে ফিরে এসে আর্জেন্টিনা যেন আরও রুদ্রমূর্তি ধারণ করে। আক্রমণের ধারা বাড়ায় এবং এ পর্যায়ে তাদের লক্ষ্য জয়। শুধুই জয়। এরজন্য গোল চাই গোল। দ্বিতীয়ার্ধের খেলা এক মিনিট গড়াতেই ডি-বক্সে বল পেয়ে তা জালে জড়ান মিডফিল্ডার ম্যাক অ্যালিস্টার। সঙ্গে সঙ্গে পুরো স্টেডিয়াম যেন প্রকম্পিত হতে থাকে। মুহুর্মুহু তালিতে, চিৎকারে দর্শক দিগি¦দিক একাকার করে ফেলে। যেখানে জয় ছাড়া আর কোনো উপায় নেই সেখানে জয়সূচক একটি গোল মানে তো নিশ্চয়ই মহার্ঘ্য কিছু। সেটাই যেন দলকে, দেশকে এনে দিলেন অ্যালিস্টার। এরপর আরও গোলের জন্য পূর্ণ শক্তি ও মনোযোগ নিয়ে খেলতে থাকে আর্জেন্টিনা। প্রথম গোলের ঠিক কুড়ি মিনিট পরে জুলিয়ান আলভারেজ দ্বিতীয় গোলটি করে দলের জয়ের ভিতকে আরও শক্তিশালী করে। শেষমেশ আর কোনো গোল না হলেও ২-০ ব্যবধানে জিতে আর্জেন্টিনা চলে যায় পরের পবে। যেখানে তাদের প্রতিপক্ষ অস্ট্রেলিয়া।

দ্বিতীয় অন্য খেলায় ডেনমার্ক হেরে যায় অস্ট্রেলিয়ার কাছে। যদিও খেলায় এরিকসেনের ডেনমার্কেরই বেশি প্রাধান্য ছিল কিন্তু তারা শেষমেশ হেরে যেতে বাধ্য হয়। এবং এর মাধ্যমে শেষ হয় তাদের বিশ্বকাপ যাত্রা।

লেখক: অধিকারভিত্তিক উন্নয়ন সন্ধানী ও ক্রীড়া বিশ্লেষক


poisha bazar