ফুটবল বাঁচাতেই সুপার লিগ বিদ্রোহ


  • অনলাইন ডেস্ক
  • ২০ এপ্রিল ২০২১, ১৮:১৯

খালি চোখে দেখলে ইউরোপিয়ান সুপার লিগ অর্থশালী ক্লাবগুলোকে আরো বেশি বিত্তবান করবে। মধ্যম ও নিম্নসারির ক্লাবগুলোকে নামাবে আরো নিচে। যারপরনাই তুমুল সমালোচনা হচ্ছে বিদ্রোহী লিগ খেতাব পাওয়া ইউরোপিয়ান সুপার লিগ নিয়ে।

ইউরোপের শীর্ষসারির যে ১২টি ক্লাব এই টুর্নামেন্টের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য হিসেবে নাম লিখিয়েছে, তাদের নিয়ে তুলকালাম বেঁধে গেছে ফুটবল বিশ্বে। উয়েফার পাশাপাশি দলগুলোর সমর্থকরা পর্যন্ত এই সুপার লিগের বিপক্ষে নিজেদের অবস্থান তুলে ধরছে।

আগের চেয়ে বেশি অর্থকড়ি কামাতেই চ্যাম্পিয়নস লিগ খেলতে চাচ্ছে না রিয়াল-বার্সার মতো ক্লাবগুলো। বিশেষ করে করোনার কারণে গেল এক বছর যে অভাবনীয় ক্ষতি হয়েছে, তা পুষিয়ে নিতে সুপার লিগের বিকল্প দেখছে না নামে-দামে ভারী ক্লাবগুলো।

তবে সুপার লিগ চালু হলে, ছোট ক্লাবগুলোর কপাল পুড়বে। শক্তিশালী প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে খেলার কোনো সুযোগ পাবে না তারা। যার প্রভাব পড়বে অর্থনৈতিক দিক দিয়েও। এদিকে, উয়েফার খেপার কারণ তাদের কর্তৃত্ব থেকে সেরা ক্লাবগুলো বেড়িয়ে গেলে, আর্থিকভাবে বিপুল ক্ষতি দেখবে তারাও।

সুপার লিগের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেয়ার পর চলমান সমস্ত বিতর্ক নিয়ে কথা বলতে সোমবার রাতে স্প্যানিশ টিভি অনুষ্ঠান এল চিরিঙ্গিতোতে হাজির হন রিয়াল মাদ্রিদ সভাপতি ফ্লোরেন্তিনো পেরেজ। বলে রাখা ভালো, সুপার লিগের প্রথম মানে বর্তমান সভাপতিও কিন্তু এই ফুটবল প্রশাসক। এল চিরিঙ্গিতোকে পেরেজ জানিয়েছে, ফুটবলকে বাঁচিয়ে রাখতেই তারা সুপার লিগের আয়োজন করতে যাচ্ছেন। আর হঠাত্ করে এই টুর্নামেন্ট নিয়ে মুখ খোলার কারণ, কোভিড-১৯ পরিস্থিতি তাদের বাধ্য করেছে দ্রুত এই টুর্নামেন্ট চালু করতে।

করোনায় প্রায় ৪০০ মিলিয়ন বা ৪০ কোটি ইউরো ক্ষতি গুনেছে বিশ্বের অন্যতম সেরা ও সফল ক্লাব রিয়াল মাদ্রিদ। লোকসানের মধ্যে আরো বাজে খবর কেউ বিনিয়োগ করতে চাচ্ছে না এরকম ঐতিহ্যবাহী এক ক্লাবে। তবে সুপার লিগ দিয়ে সেই ক্ষতি পুষিয়ে নেয়া সম্ভব বলে জানালেন পেরেজ।

তিনি বলেন, ‘এই বাজে আর্থিক অবস্থার একটা সমাধান চাইছে স্পেন, ইতালি ও যুক্তরাজ্যের অনেক গুরুত্বপূর্ণ ক্লাব। এর একমাত্র সমাধান হলো আরও বেশি প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক ম্যাচ খেলা। চ্যাম্পিয়নস লিগ খেলার বদলে সুপার লিগ খেললে হারানো আয় পুষিয়ে নিতে পারবে ক্লাবগুলো। সুপার লিগ ক্লাবগুলোকে আর্থিকভাবে বাঁচাবে।’

চ্যাম্পিয়নস লিগ দিয়েই বিপুল পরিমাণ অর্থ ঢোকে ক্লাবগুলোর পকেটে। করোনা মহামারির মধ্যে চলা এবারেরচ্যাম্পিয়নস লিগ থেকেই কোয়ার্টার ফাইনাল থেকে বাদ পড়েও বায়ার্ন মিউনিখের আয় ছিল ১০ কোটি ইউরো। আর গত মৌসুমে চ্যাম্পিয়ন হওয়ার সুবাদে বায়ার্ন পেয়েছিল ১৩ কোটি ইউরো।

তবে সুপার লিগে নাম লিখিয়েই প্রতিষ্ঠাতা ক্লাবগুলো পাচ্ছে ৩.৫ বিলিয়ন বা ৩৫ হাজার কোটি ইউরো। টুর্নামেন্টে সেরা ছয়ের ভেতর থাকতে পারলে তো মিলবে আরো প্রায় ৪০ কোটি ইউরো। আর এই বিপুল পরিমাণ অর্থের যোগান দেবে আমেরিকার বিনিয়োগকারী ব্যাংক জেপি মরগান।

পেরেজ দাবি করেছেন, চ্যাম্পিয়নস লিগ থেকে বর্তমানে যে আয় হয় তা শীর্ষসারি ক্লাবগুলোর জন্য যথেষ্ট নয়। খেলোয়াড় দলবদলের বাজার এখন যে চড়া আর মেসি-রোনালদোদের যে বেতনে পুষতে হচ্ছে, তাতে বিকল্প ভাবা ছাড়া আর কোনো পথ খোলা ছিল না তাদের সামনে। কম আয় ছাড়াও আয় বণ্টনের ক্ষেত্রে ইউরোপের অভিভাবক সংস্থা উয়েফার দুর্নীতির দিকটি তুলে ধরেছেন রিয়াল সভাপতি পেরেজ।

‘উয়েফার ভাবমূর্তি কখনোই তেমন ভালো ছিল না। উয়েফা একনায়কতন্ত্র চালাচ্ছে। ওদের মধ্যে আরো স্বচ্ছতা আনার প্রয়োজন আছে বৈকি। করোনা মহামারির কারণে আমি (রিয়ালে) বেতন কমিয়েছি, আমার তো মনে হয় না উয়েফার সভাপতি বা লা লিগার সভাপতি সেটা করেছে। এমনকি আমাদের স্পনসররা ভালো বিপদে আছে।

অ্যাডিডাস ও এমিরেটসেরও আর্থিক দিক থেকে সমস্যা হয়েছে। আমরা তাদের পাশে ছিলাম। অথচ এমন অনেকেই আছে যারা ভাবে মহামারির কারণে কিছুই হয়নি। এটা অর্থের জন্য লড়াই নয়, এটা ফুটবলের জন্য লড়াই। এমন মহাবিপদের মধ্যে আমরা আগামী ২০ বছরের জন্য ফুটবল বাঁচিয়ে রাখতে চাই। আমরা ফুটবল বাঁচানোর চেষ্টা করছি এবং কারো (উয়েফা, ফিফা) এ ব্যাপারে কোনো আগ্রহ নেই। কারণ, আর্থিক দিক থেকে এতে ওরা লাভবান হবে না’—বলেন সুপার লিগ ইতিহাসের প্রথম সভাপতি এবং এই টুর্নামেন্টের অন্যতম উদ্যোক্তা।

বড় ক্লাব সুপার লিগে খেললে তারা আর্থিকভাবে আরো সচ্ছল হবে এবং ছোট ক্লাবগুলো হবে আরো দুর্বল—সুপার লিগের এই নেতিবাচক দিকের প্রসঙ্গ তুলতে পেরেজ উত্তরে যা বলেছেন, তাতে তিনি হয়তো হাসির খোরাকই হবেন। পেরেজ বলেন, ‘ফুটবলের আকর্ষণীয় দিক হলো বড় ক্লাবের মধ্যকার ম্যাচ।

টিভির জন্য মূল্য বাড়ে এসবে এবং আরো বেশি আয় নিশ্চিত হয়। এটা অনেকটা পিরামিড মডেলের মতো হবে। কারণ, বড় ক্লাবের বেশি অর্থ থাকবে এবং সেটা আমরা বিনিয়োগ করতে পারব খেলোয়াড় কেনার মাধ্যমে (ছোট ক্লাব থেকে)। যদি সব বড় ক্লাব এখনকার মতো অর্থ হারাতে থাকে, তবে গোটা ফুটবল ব্যবস্থা একটা সময় ধসে পড়বে। চ্যাম্পিয়নস লিগও।’

পেরেজের এমন কথাতেই বোঝা যাচ্ছে সদর্পে সুপার লিগের ঘোষণা দেয়ার পর যত সমালোচনা আর বাধাই সামনে আসুক না কেন, আর পিছু হটছেন না তিনি ও তার সঙ্গে হাত মেলান রাঘব-বোয়ালরা।


poisha bazar

ads
ads