অজানাই রয়ে গেল ভালোবাসার কথা


  • ২৭ নভেম্বর ২০২০, ১১:১৮

সাজ্জাদ এইচ সাব্বির : খুব সম্ভবত এতটা বিতর্কিত হলে মানুষ কাউকে মনেই রাখে না। হাত দিয়ে গোল করা থেকে শুরু করে মাদক-কাণ্ডে জড়ানো-কী নেই ক্যারিয়ারে। কিন্তু নামটা ম্যারাডোনা বলেই কি না, শত বিতর্কে জড়িয়েও তিনি চির অম্লান ইতিহাসের পাতায়।

মানুষটার শরীর থেকে প্রাণ গেছে বটে, তবে শৈল্পিক ফুটবলে গোটা বিশ্বকে এতটাই মুগ্ধ করেছিলেন যে-তার মৃত্যুতে শোকে মুহ্যমান সারা বিশ্ব। শোকাতুর তাকে চেনা ও তার নাম জানা সবাই। বুয়েনস এইরেসের ছোট্ট শহর লানুসে জন্ম নেয়া ম্যারাডোনা শুধু আর্জেন্টাইনদের বরপুত্র ছিলেন না, ছিলেন সারা বিশ্ববাসীর।

তবে বাংলাদেশিদের মনে তিনি আছেন অনন্য এক জায়গাজুড়ে। কখনো বাংলাদেশে না এসেও তিন যুগ আগে থেকেই তিনি হয়ে গেছেন নিখাদ বাংলাদেশি। তবে মৃত্যুর আগে তিনি জেনে যেতে পারলেন না এ দেশের মানুষ কতখানি ভালোবাসে তাকে।

বিশ্বকাপে খেলা দলগুলোর কমবেশি সমর্থক বাংলাদেশে আছে। সন্দেহাতীতভাবে, এ দেশে দুই লাতিন দল আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিলের সমর্থক সবচেয়ে বেশি। তবে ব্রাজিলের সমর্থকরা পেলের নেতৃত্বে জিকো, সক্রেটিস, রোনালদোদের কারণে ব্রাজিল সমর্থক। উল্টোদিকে বাংলাদেশে আর্জেন্টিনার সমর্থকদের পুরোটাই ম্যারাডোনার সুবাদে। পেলের যুগে এ দেশে টেলিভিশনের ছিলই না বলা চলে। তাই বলতে গেলে ম্যারাডোনা দিয়েই ফুটবলটা চিনেছিল বাংলাদেশ। আস্বাদন করেছিল, ফুটবলের রূপ-রস-সৌন্দর্য। ছিয়াশির বিশ্বকাপ আর্জেন্টিনাকে বলতে গেলে একাই জিতিয়েছিলেন ম্যারাডোনা। সেবারই প্রথম রঙিন টেলিভিশিনের পর্দায় বিশ্বকাপ উপভোগ করেছিল এ দেশের মানুষ। একটা মানুষ যখন একাই একটা দলকে টানে, এনে দেয় বিশ্বসেরার মুকুট-তাতে মুগ্ধ না হয়ে কি পারা যায়?

তিগরেতে বুধবার স্থানীয় সময় বিকেলে যখন ম্যারাডোনার ছয় দশকের এক বর্ণাঢ্য জীবনের পরিসমাপ্তি ঘটে, তখন কান্নার রোল শুধু আর্জেন্টিনায় নয়, পরে এই বদ্বীপেও। আর্জেন্টিনায় যেমন তার স্মরণে ম্যাচ স্থগিত হয়ে পড়ে, ইউরোপিয়ান মঞ্চে নীরবতা পালন করে তার প্রতি শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করা হয়, তেমন করে বাংলাদেশ কোনো উদাহরণ না রাখলেও বলাই বাহুল্য অন্তরাত্মা কেঁদে উঠেছিল কমবেশি সবারই।

ম্যারাডোনার মৃত্যু ছুঁয়ে গেছে সবাইকেই। বয়সভেদে যারা ম্যারাডোনার খেলা সরাসরি দেখেছেন কিংবা পরে টেলিভিশনের পর্দায় কিংবা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের কল্যাণে-আপ্লæত হয়ে পড়েন সবাই। অথচ বাংলাদেশের সঙ্গে কোনো সম্পর্ক ছিল না ম্যারাডোনার। লিওনেল মেসির আর্জেন্টিনা তো তবু ঢাকায় পা রেখেছিল, আর ম্যারাডোনা তো বাংলাদেশ নাম খুব অল্পবারই শুনেছেন। দুবার আসি আসি করেও তার আসা হয়নি বাংলাদেশে।

নেপলসবাসীর কাছে তিনি ছিলেন অবিসংবাদিত রাজা। যেভাবে ইতালির এই শহরের ক্লাব নাপোলিকে বিশ্বদরবারে তিনি পৌঁছে দিয়েছিলেন, সাফল্যমণ্ডিত করেছিলেন ক্লাবের ইতিহাস-তাতে তার প্রতি নেপলসবাসীদের ভালোবাসা থাকাটা অস্বাভাবিক কিছু নয়। কিন্তু বাংলাদেশকে তো তিনি কিছুই দেননি। তবু এদেশের মানুষ তাকে অদ্ভুত ভালোবাসে। ম্যারাডোনার সঙ্গে এ দেশে তার ভক্তদের সম্পর্কটা যেন আত্মার। ১৯৮৬ সালে বিশ্বকাপ উঁচিয়ে ধরে তিনি যেমন আনন্দের হাসি ফুটিয়েছিলেন এ দেশে তার ভক্ত-সমর্থকদের মধ্যে, তেমনি এর পরের বিশ্বকাপেই তার কান্না দেখে আবার কেঁদেছিল তার প্রতি অকুণ্ঠ সমর্থন রাখা ফুটবলপ্রেমীরা।

১৯৯০ বিশ্বকাপেও ফাইনালে উঠেছিল আর্জেন্টিনা। সেই ফাইনালে বিতর্কিত এক পেনাল্টিতে আর্জেন্টিনাকে হারায় সে সময়ের পশ্চিম জার্মানি। ম্যাচ শেষে ম্যারাডোনার কান্না চোখে জল আনে সবারই। বিশেষ করে তার কান্না ছুঁয়ে গিয়েছিল বাংলাদেশকেও। সেই ম্যাচের রেফারির বিরুদ্ধে ওই রাতে ক্ষোভে ফুঁসে উঠেছিল সারা দেশ। সেই মিছিল-সেøাগানই বলে দেয় ম্যারাডোনাকে কতখানি আপন করি নিয়েছিল এ দেশের মানুষ। ম্যারাডোনার কষ্টমাখা পোস্টার-ভিউকার্ডে ছেয়ে গিয়েছিল বাংলাদেশ। বাড়িতে দরজায়, দেয়ালে শোভা পেত ম্যারাডোনার নানা ঢঙের ছবি, যেগুলোর বেশির ভাগই তার কান্নাভরা মুখের।

পরের বিশ্বকাপ অর্থাৎ ১৯৯৪-এ বাংলাদেশিদের আবার কাঁদান ম্যারাডোনা। এবার নিজের দোষেই। যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বকাপে ম্যারাডোনার জন্য ছিল দুঃস্বপ্নের। নিষিদ্ধ ওষুধ সেবনের দায়ে তাকে বহিষ্কার করা হয় বিশ্বকাপ থেকে। গ্রæপ পর্বের তিনটি ম্যাচের মধ্যে প্রথম দুটি খেলেছিলেন। কিন্তু তৃতীয় ম্যাচের আগেই এলো সেই দুঃসংবাদ-ম্যারাডোনা নিষিদ্ধ। আর্জেন্টিনা টিকে থাকলেও, ম্যারাডোনার চলে যাওয়ায় বাংলাদেশের বিশ্বকাপও যেন শেষ হয়ে যায়! এরপর আবার মিছিল, আবার সেøাগান। সেই খবর এসেছিল আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমেও। কোনো সম্পর্ক না থেকেই ম্যারাডোনার জন্য এই আবেগের উৎস কোথায়? সেটা কি ফুটবল পায়ে ম্যারাডোনার জাদুকরী দক্ষতা, নাকি তার দর্শকপ্রিয় হওয়ার এক আশ্চর্য গুণ? হয়তো কখনো সেই প্রশ্নের সঠিক উত্তর আর খুঁজে বের করা যাবে না।

বাংলাদেশের সাবেক তারকাদের স্মৃতিচারণা: ম্যারাডোনার মৃত্যুতে প্রিয়হারা বেদনার ঢেউ আছড়ে পড়েছে বাংলাদেশের ফুটবল অঙ্গনেও। এই ফুটবল মহানায়ককে নিয়ে স্মৃতিচারণা করেছেন সাবেক তারকা ফুটবলাররা। গোলাম সারোয়ার টিপু, হাসানুজ্জামান বাবলু, সালাম মুর্শেদী সামনে আনলেন জমে থাকা স্মৃতি। কেউ ম্যারাডোনাকে পরিয়ে দিলেন ‘রাজার মুকুট’, কারো চোখে তিনি ‘চিরস্মরণীয়’, কেউ বললেন, ‘ফুটবলের নিখাদ শিল্পী’। তার চলে যাওয়া কারো কাছে ‘অপূরণীয় ক্ষতি’।

জাতীয় দলের সাবেক তারকা মিডফিল্ডার গোলাম সারোয়ার টিপুর মানসচোখে ভেসে উঠেছে ম্যারাডোনার জাদুর ঢেউ আর্জেন্টিনা ছাপিয়ে কিভাবে এই ভ‚খণ্ডে আছড়ে পড়েছিল, কিশোর সমাজকে জাগিয়ে তুলেছিল এক লহমায়। তিনি বলেন, ‘একজন দর্শক হিসেবে বলব, একেকজন আসে-সাংস্কৃতিক অঙ্গনকে সমৃদ্ধ করে। আশির দশকে সে বিরাট একটা জনগোষ্ঠীকে ফুটবলের প্রতি আকৃষ্ট করেছে। বিশাল একটা কিশোর জনগোষ্ঠীকে সে ফুটবলের প্রতি টেনেছে...এই কিশোরদের অনেকের খেলাধুলার প্রতিই হয়তো কোনো আকর্ষণ ছিল না-সে তাদের ফুটবলের দিকে নিয়ে এসেছে। সে একজন শিল্পী।’

জাতীয় দলের সাবেক তারকা মিডফিল্ডার হাসানুজ্জামান বাবলুকে জেঁকে ধরেছে দুই শোক। ক’দিন আগে হারিয়েছেন দীর্ঘদিনের সতীর্থ বাদল রায়কে। এবার চলে গেলেন ম্যারাডোনা। বাবলুর আক্ষেপ, ম্যারাডোনা যদি আরেকটু সতর্ক হতেন, জীবন নিয়ে ছিনিমিনি না খেলতেন, তাহলে হয়তো আরো কিছুদিন বেঁচে থাকতে পারতেন।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্ম শতবার্ষিকী উপলক্ষে ব্রাজিলের তারকা গোলরক্ষক জুলিও সিজারকে এনেছিল বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন। শোনা গিয়েছিল ম্যারাডোনাকে নিয়ে আসার কথাও।

কিন্তু আর্জেন্টাইন গ্রট পৃথিবীর মায়া ছেড়ে চলে যাওয়ায় আক্ষেপে পুড়ছেন ১৯৮২ সালের লিগে রেকর্ড ২৭ গোল করা সালাম মুর্শেদী। তিনি বলেন, ‘গত রাত ছিল ফুটবলের জন্য কালোরাত। ফুটবলের জন্য সবচেয়ে বড় দুঃসংবাদের রাত। ফুটবলের যিনি রাজা, তিনি রাজত্ব ছেড়ে যে এত দ্রæত চলে যাবেন, এই বয়সে সারা পৃথিবীকে দুঃখে ভাসিয়ে চলে যাবেন, এটা কেউ ভাবতে পারিনি।’

মানবকণ্ঠ/এইচকে



poisha bazar

ads
ads