মৃত্যু জানিয়ে গেল ম্যারাডোনা সবার

ম্যারাডোনা
ম্যারাডোনা

poisha bazar

  • ২৭ নভেম্বর ২০২০, ১০:২১

আনোয়ার হোসেন সোহাগ : ব্রাজিলের রাজধানী রিও ডি জেনিরোর ফাভেল্লা বস্তি। দেয়ালে হেলান দিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে ছোট্ট রাউল। একজন এগিয়ে গিয়ে কান্নার কারণ জানতে চাইতেই সেই চাপাকান্না রূপ নিল বিলাপে। অস্ফুট স্বরে কী বলছে বোঝা না গেলেও শুধু শোনা যাচ্ছে ‘মারাদোনা, মারাদোনা’।

পাশ থেকেই ছুটে এলো এক যুবক, ছোট ভাইয়ের কান্নার কারণ জানাতে গিয়ে সে নিজেও চোখ মুছতে মুছতে বলছে, ‘ইউ আমু তে মারাদোনা’। অর্থাৎ আমি তোমায় ভালোবাসি ম্যারাডোনা। ফুটবলের দেশ ব্রাজিল, ম্যারাডোনার চিরপ্রতিদ্ব›দ্বী পেলের দেশ ব্রাজিল, ফুটবলে আর্জেন্টিনার চিরশত্রু দেশ ব্রাজিল। সেই দেশটির আনাচ-কানাচের কান্নাই বুঝিয়ে দেয় ম্যারাডোনার শোকে বাকি বিশ্বের অবস্থা। এই ফুটবল মহানায়কের শোকে অঝরে কাঁদছে সারা বিশ্ব।

২০২০ সালটা যেন বিষে ভরা বিশ। সব অর্থেই যেন এটি ভুলে যাওয়ার বছর হয়ে থাকল গোটা বিশ্ববাসীর কাছে। প্রথমে করোনা ভোগাল সবাইকে, আর বছর শেষের আগে বিষাদে পূর্ণ করল ফুটবল কিংবদন্তি ডিয়েগো ম্যারাডোনার মৃত্যুতে। গত বুধবার বাংলাদেশ সময় পৌনে ১১টায় ম্যারাডোনার মৃত্যুর খবর প্রকাশ হলে শোকের আঁধার নেমে আসে।

আর্জেন্টাইন পত্রিকা ক্লারিন সর্বপ্রথম ম্যারাডোনার মৃত্যুর খবর প্রকাশ করে চোখে জল এনে দেয়া এক শিরোনামে- ‘ডিয়েগো ম্যারাডোনা আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন।’ তখনো ম্যারাডোনার পরিবারের পক্ষ থেকে কোনো বিবৃতি না আসায় ক্লারিনের বরাত দিয়েই বড় বড় গণমাধ্যমগুলো সে খবর ছড়াতে থাকে। পরে আর্জেন্টাইন ফুটবল ফেডারেশন আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে ম্যারাডোনার মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করে। এএফএ লেখে, ‘আর্জেন্টিনা ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন ও সভাপতি ক্লদিও তাপিয়া আমাদের কিংবদন্তি ডিয়েগো আরমান্দো ম্যারাডোনার মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করছেন। আপনি (ম্যারাডোনা) সব সময় আমাদের হৃদয়ে থাকবেন।’

গত মাসে নিজের ৬০তম জন্মদিন পালন করতে গিয়ে অসুস্থ হয়ে পড়েন ম্যারাডোনা। জরুরি ভিত্তিতে তাকে হাসপাতালে নেয়া হয়। এ মাসেই তার মস্তিষ্কে জরুরি অস্ত্রোপচার করা হয়। মস্তিষ্কে জমাট বেঁধে থাকা রক্ত (ক্লট) সফলভাবে অপসারণ করাও হয়েছিল। আর্জেন্টাইন গণমাধ্যম টিআইসি স্পোর্টস জানায়, তিগ্রে-তে নিজ বাসায় হার্ট অ্যাটাকে মারা যান ম্যারাডোনা।

ম্যারাডোনার মৃত্যুর খবর রীতিমতো বজ্রাঘাতের মতো হয়েই আসে। হাসপাতাল থেকে তো সুস্থ হয়েই বাড়ি ফিরছিলেন, তাই ম্যারাডোনার হঠাৎ মৃত্যুর খবর শুরুতেই কেউই মেনে নিতে পারেনি। আর্জেন্টিনার প্রেসিডেন্ট আলবার্তো ফার্নান্দেজও তার দেশের সবচেয়ে বড় তারকার মৃত্যুতে হকচকিত হয়ে পড়েন। ঘোষণা করেন তিন দিনের রাষ্ট্রীয় শোক। গতকাল বৃহস্পতিবার ম্যারাডোনার মৃতদেহ আনা হয় প্রেসিডেন্ট আলবার্তোর বাসভবন, বুয়েনস এইরেসের কাসা রোসাদাতে। এখানেই হবে তার শেষকৃত্যানুষ্ঠান। প্রথমেই ম্যারাডোনাকে দেখে গেছেন সাবেক স্ত্রী ক্লদিয়া ভিয়াফেন ও দুই কন্যা দালমা ও জিয়ান্নিনা। কিন্তু সেই সৌভাগ্য হয়নি ছেলে ডিয়েগো জুনিয়রের। করোনা আক্রান্ত হওয়ায় ইতালির এক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন তিনি।

স্থানীয় সময় বিকেল ৪টা পর্যন্ত কিংবদন্তি এই ফুটবলারকে শেষশ্রদ্ধা জানান সর্বস্তরের মানুষ। ম্যারাডোনার কফিন একপলক দেখতে ঢল নামে বুয়েনস এইরেসের রাস্তায়। ১০ লাখের বেশি লোক জড়ো হয় তাদের স্বপ্নের নায়ককে শ্রদ্ধা জানাতে।

আমজনতাকে সামলাতে বেগ পেতে হয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকেও। পুলিশের সঙ্গে কয়েক দফা সংঘর্ষেও জড়ান তারা। রক্তাক্ত হন বেশ কয়েকজন, তার পরও সরে যাননি তারা। একটি বারের জন্য হলেও শ্রদ্ধার্ঘ্য অর্পণ করে যেতে চান প্রিয় মানুষটির কফিনে।

ঘুম থেকেই চিরঘুমে: প্রাথমিক ধারণা অনুযায়ী, কিংবদন্তি ফুটবলারের মৃত্যুর কারণ ছিল হদরোগ। ময়নাতদন্ত শেষেও বদলায়নি মৃত্যুর কারণ। সান ইসিদ্রো অ্যাটর্নি জেনারেলের অফিস থেকে জানানো হয়েছে গতকাল স্থানীয় সময় সাড়ে ১১টায় ম্যারাডোনাকে তার বিছানায় পাওয়া যায়। তাকে জাগানোর চেষ্টা করা হলেও শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ হয়েছেন উপস্থিত লোকজন। ২০০০ সাল থেকেই হদরোগের জটিলতায় ভুগছিলেন ম্যারাডোনা।

ম্যারাডোনার জীবনরেখা: জীবনে যেমন পেয়েছেন তেমনি হারিয়েছেনও ম্যারাডোনা। ১৯৬০ সালের ৩০ অক্টোবর জন্ম নেন এক শ্রমিকের ঘরে। বাল্যকাল থেকেই কষ্ট তার নিত্যদিনের সঙ্গী। কিন্তু পায়ে বল থাকলেই হয়ে যান বিশ্বের সবচেয়ে সুখী মানুষ। দুর্দান্ত প্রতিভার কারণে মাত্র ১২ বছর বয়সেই সুযোগ পেয়ে যান স্থানীয় আর্জেন্টিনো জুনিয়র্স টিমের মূল দলে। এরপর আর পেছনে ফিরে তাকাননি। পাঁচ বছরে ক্লাবটির হয়ে ১৬৬ ম্যাচে করেন ১১২ গোল। তার পরও সুযোগ পাননি ১৯৭৮ বিশ্বকাপ দলে। তবে থামেননি ম্যারাডোনা। হতাশায় মুষড়ে না পড়ে পায়ের জাদু দেখিয়েছেন অবিরত। ১৯৮১ সালে যোগ দেন স্বপ্নের ক্লাব বোকা জুনিয়র্সে। আর্জেন্টিনার জার্সি গায়ে তোলার সুযোগ হয় ১৯৮২ বিশ্বকাপে। তবে ব্রাজিলের বিপক্ষে সেবার লাল কার্ডে হয়েছিল তার সমাপ্তি। সেই ক্ষোভেই হয়তো ১৯৮৬ বিশ্বকাপটা নিজের করে নেন ম্যারাডোনা। একাই যে একটা দেশকে বিশ্বকাপ এনে দেয়া যায়- সৃষ্টি করেন সেই অনন্য উদাহরণ। পরবর্তী বিশ্বকাপেও বজায় রাখেন ধারা। তবে সেবার ‘রেফারির কারসাজিতে’ শিরোপা ধরে রাখতে পারেননি। ১৯৯৪ বিশ্বকাপে তো নিষিদ্ধ ড্রাগ সেবন করায় বাদই পড়েন টুর্নামেন্ট থেকে। যে কারণে আজীবন ঘৃণা করে এসেছেন আয়োজক যুক্তরাষ্ট্রকে। বিশ্বকাপে নাইজেরিয়ার বিপক্ষে খেলা ম্যাচটিই আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ছিল তার শেষ ম্যাচ।

নাপোলির ঈশ্বর: ১৯৮২ বিশ্বকাপের পর বার্সেলোনায় সুখেই ছিলেন ম্যারাডোনা। প্রথম খেলোয়াড় হিসেবে বাহবা পেয়েছিলেন চিরপ্রতিদ্ব›দ্বী রিয়াল মাদ্রিদের মাঠে। কিন্তু ইনজুরি আর উদ্দাম জীবনযাপনের কারণে দুই মৌসুম খেলে আর মন টেকেনি তার। রেকর্ড ট্রান্সফার ফিতে যোগ দেন ইতালির নাপোলিতে। রেলিগেশনের পর্যায়ে থাকা ক্লাবটিকে সেই একা হাতে মাত্র দুই বছরে মধ্যে লিগ শিরোপা এনে দেন তিনি।

১৯৮৯-৯০ মৌসুমে জিতেছেন আরো একটি লিগ শিরোপা, কোপা ইতালিয়া জিতেছেন ১৯৮৯-৯০ মৌসুমে, ইউরোপিয়ান মর্যাদার আসর উয়েফা কাপের (ইউরোপা লিগ) শিরোপা জিতেছেন ১৯৮৮-৮৯ মৌসুমে এবং ১৯৯০ সালে জিতেছেন সুপারকোপা। মাত্র সাত বছরে এতসব শিরোপা এনে দেয়ায় নাপোলির মানুষরা তাকে ঈশ্বর ব্যতীত কোনোকিছু ভাবে না। তাই তো ১০ নম্বর জার্সিটা আজীবনের জন্য তুলে রেখেছে ক্লাবটি। নাপোলির পর সেভিয়া, নিউওয়েলস বয়ে ঘুরে স্বপ্নের ক্লাব বোকা জুনিয়র্সে ১৯৯৭ সালে ক্যারিয়ার শেষ করেন ম্যারাডোনা।

অনিয়ন্ত্রিত জীবন: ম্যারাডোনার জীবনে সবচেয়ে বিতর্কিত অধ্যায় মাদক আর নারী। বার্সেলোনায় খেলার সময় কোকেনে আসক্ত হয়েছিলেন। ইতালিতে যাওয়ার পর কোকেন নেয়ার মাত্রা বেড়ে যায়। ১৯৯১ সালে নাপোলিতে খেলার সময় ১৫ মাস এ জন্য নিষিদ্ধ হন তিনি। মাদকাসক্তির কারণেই ১৯৯৪ বিশ্বকাপ থেকে ছিটকে যান। খেলা ছাড়লেও মাদক, নারী ও আমুদে জীবন ছাড়তে পারেননি ম্যারাডোনা।

ব্যর্থ কোচ: ফুটবলার হিসেবে যতটা সফল, ততটাই কোচ হিসেবে ব্যর্থ ম্যারাডোনা। ২০০৮ সালে জাতীয় দল আর্জেন্টিনার দায়িত্ব নিয়ে শুরু হয় কোচিং অধ্যায়। ২০১০ বিশ্বকাপে ভরাডুবির পর বরখাস্ত হন দায়িত্ব থেকে। আন্তর্জাতিক কোচিংয়ের পাট চুকিয়ে তিনি চলে যান সংযুক্ত আরব আমিরাতে। সেখানেও পাননি সাফল্যের দেখা। সবশেষ গত বছরের সেপ্টেম্বরে নিজ দেশের ক্লাব জিমনেশিয়া লা প্লাতার দায়িত্ব নেন ম্যারাডোনা। ক্লাবটির সঙ্গে ২০২০-২১ মৌসুমের পর্যন্ত চুক্তি ছিল তার।

মানবকণ্ঠ/এইচকে






ads