দ্বিতীয় বিপ্লব: স্বপ্নের সোনার বাংলা গঠনের ঐতিহাসিক উদ্যোগ


  • ২৯ মে ২০২১, ১০:১৯,  আপডেট: ২৯ মে ২০২১, ১২:০৫

দীর্ঘ মুক্তিসংগ্রাম ও ৯ মাস স্বাধীনতা যুদ্ধের পর অবশেষে ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর মহান বিজয় অর্জিত হয়। কিন্তু দেশ গঠনের শুরুতেই দেখা দেয় বহুমুখী প্রতিবন্ধকতা। একদিকে যেমন দীর্ঘদিনের শৃঙ্খল থেকে মুক্ত, সদ্য স্বাধীন একটা জাতির, স্বপ্নের মতো জীবনযাপনের তীব্র আকাঙ্ক্ষা ছিল; তেমনি অন্যদিকে, তাৎক্ষণিকভাবে সাত কোটি মানুষকে তাদের স্বপ্নের মতো সমাজব্যবস্থা উপহার দেওয়ার সক্ষমতা ছিল না রাষ্ট্রের।

স্বাধীনতার পর বাঙালি জাতির একচ্ছত্র অধিনায়ক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যে বাংলাদেশ পেয়েছিলেন, সেখানে ছিল না কোনো রাস্তা-ঘাট-ব্রিজ-কালভার্ট-নদী ও সমুদ্রবন্দর, ছিল না প্রয়োজনীয় অবকাঠামো, এমনকি রাষ্ট্রের কোষাগারেও ছিল না কোনো নগদ অর্থ। শুধু আগুন ও বোমায় পোড়া এক ভূখণ্ড, ত্রিশ লাখ মানুষের লাশের স্তূপ, কমপক্ষে তিন কোটি বাস্তুচ্যুত মানুষ- এসব নিয়েই আবারো ঘুরে দাঁড়ানোর জন্য দিনরাত শ্রম দিচ্ছিলেন তিনি। দুই যুগের বেশি সময় ধরে এই জাতি যে জীবন পাওয়ার জন্য বারবার ম্যান্ডেট দিয়েছে, ১৯৭২ সালের ১২ জানুয়ারি প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে স্বাধীন বাংলাদেশে ঠিক সেরকম সমাজব্যবস্থা কায়েমের জন্য কাজ শুরু করলেন জাতির পিতা শেখ মুজিবুর রহমান।

কিন্তু দেশ গঠনের কাজ ক্রমেই কঠিন থেকে কঠিনতর হয়ে দাঁড়ায়। কারণ, যুদ্ধের সময় পাকিস্তানি জান্তারা এদেশের লাখ লাখ কর্মঠ ও সক্ষম মানুষকে যেমন হত্যা করে, তেমনি ধ্বংস করে দেয় পুরো দেশের অর্থনীতি, যোগাযোগব্যবস্থা ও শিক্ষা ও শিল্পপ্রতিষ্ঠান। যুদ্ধের ৯ মাসে বাংলাদেশ থেকে প্রায় হাজার কোটি টাকা পাচার করে পাকিস্তানিরা এবং ঢাকার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রিজার্ভে থাকা স্বর্ণ-রৌপ্যসহ সব নগদ অর্থ পুড়িয়ে ফেলে। ফলে তারল্য সংকট দেখা দেয়। প্রকৃত অর্থেই শূন্য হাতে যাত্রা শুরু হয় সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশের। হাজারো সীমাবদ্ধতা নিয়ে দেশ পুনর্গঠনের কাজ চালিয়ে যান বঙ্গবন্ধু। আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র এবং অভ্যন্তরীণ প্রতিকূলতা মোকাবালার জন্য একপর্যায়ে স্বপ্নের সোনার বাংলা বাস্তবায়ন করার জন্য দ্বিতীয় বিপ্লবের ঘোষণা দেন তিনি।

সাত কোটি বাঙালির স্বপ্নসাধ পূরণের পথে বঙ্গবন্ধুর অদম্য অভিযাত্রা: শূন্য সম্পদ নিয়ে ঘুরে দাঁড়ানোর প্রচেষ্টার পাশাপাশি একশ্রেণির ভ্রান্ত তারুণ্য ও উগ্রবাদীদের কারণে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থির অবনতি হলেও হাল ছেড়ে দেননি বঙ্গবন্ধু। তিনি একাধিকবার তাদের সঠিক পথে ফেরার সুযোগ দিয়েছেন, সহিংসতা ছেড়ে দেশ গঠনের কাজে নামার আহ্বান জানিয়েছেন, ক্ষমা ঘোষণা করেছেন।

কিন্তু বিপরীতে তারা আরও প্রতিক্রিয়াশীলতা দেখিয়েছে। এসব কিছুর মধ্যেও ভারত থেকে প্রত্যাগত এক কোটি শরণার্থী এবং যুদ্ধের কারণে দেশের ভেতরে বাস্তুচ্যুত ও স্থানান্তরিত আরও দুই কোটি মানুষকে পুনর্বাসন করে বঙ্গবন্ধুর সরকার। নির্মাণ করা হয় পাকিস্তানিদের পুড়িয়ে দেওয়া ৪৩ লাখ ঘরবাড়ি। নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয় ধর্ষণের শিকার দুই লাখের অধিক নারী ও তাদের গর্ভের সন্তানের।

সংস্কার করা হয় প্রয়োজনীয় রাস্তা-ঘাট; ধ্বংস হয়ে যাওয়া প্রায় ছয়শ' সড়ক ও রেল সেতু চলাচলের উপযোগী করা হয়। এই সময়ের মধ্যেই বঙ্গবন্ধুর কূটনৈতিক তৎপরতায় ১১৬টি দেশের স্বীকৃতি এবং জাতিসংঘ-ওআইসিসহ২৭ টি আন্তর্জাতিক সংস্থার সদস্যপদ অর্জন করে বিশ্বের বুকে পা রাখার জায়গা করে নেয় বাংলাদেশ। তবে প্রথমবারের মতো পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা ঘোষণা করে দেশ গঠনের যে প্রাথমিক পদক্ষেপ নিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু, অভ্যন্তরীণ অস্থিরতার কারণে তা পদে পদে বাধাগ্রস্ত হয়।

প্রায় তিন বছর ধরে ধৈর্যের সঙ্গে এসব পরিস্থিতি মোকাবিলা করেও, দেশ পুনর্গঠনের কাজ অনেকটাই গুছিয়ে আনেন বঙ্গবন্ধু। কিন্তু দেশের মানুষের স্বপ্ন ও আকাঙ্ক্ষা পূরণের মতো সমাজব্যবস্থা গড়তে যে পরিবেশ দরকার, প্রতিক্রিয়াশীলদের অন্তর্ঘাতমূলক কর্মকাণ্ডের জন্য তা কোনোভাবেই সম্ভব হচ্ছিলো না। তাই অস্থিরতা দূরীকরণ এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ঠিক করে, দেশকে দ্রুত গুছিয়ে আনার সিদ্ধান্ত নেন তিনি। এরই পরিপ্রেক্ষিতে ১৯৭৪ সালের ২৮ ডিসেম্বর তিনি সংবিধানসম্মতভাবে রাষ্ট্রপতিকে অনুরোধ জানান জরুরি অবস্থা ঘোষণা করতে। এরপর জনজীবনের নিরাপত্তা এবং রাষ্ট্রীয় ও অর্থনৈতিক কার্যক্রমের স্বাভাবিক গতি ফিরিয়ে আনতে দ্বিতীয় বিপ্লবের ঘোষণা দেন।

প্রতিবিপ্লবীদের প্রতিক্রিয়াশীলতা এবং স্বাধীনতাবিরোধিদের ষড়যন্ত্র মোকাবিলা : যুদ্ধের পর একদিকে দেশের সর্বশান্ত অবস্থা, অন্যদিকে মরার ওপর খাঁড়ার ঘা হয়ে দাঁড়ায় পরাজিত পাকিস্তানিদের দোসর ও এদেশের স্বাধীনতা বিরোধীদের চক্রান্ত। পাকিস্তানিদের দিয়ে যাওয়া অস্ত্র ব্যবহার করে দেশে অস্থিরতা ও গুপ্তহত্যা শুরু করে মাওবাদী উগ্র বামপন্থীরা।

মুক্তিযুদ্ধের পর অস্ত্র জমা না দিয়ে মধ্যবিত্তদের খুন ও তাদের সম্পদ লুটতরাজ শুরু করে সর্বহারারা। মুজিব বাহিনীর একটা তরুণ অংশ ভ্রান্ত ধারণার বশবর্তী হয়ে প্রতিবিপ্লব করে জাসদ গঠন করে এবং দেশজুড়ে অরাজকতা সৃষ্টি করে। এমনকি ১৯৭৩ ও ১৯৭৪ সালের প্রলংকারী বন্যা, যুদ্ধ-পরিস্থিতি ও বন্যায় টানা কয়েক বছর ফসলহানি, চোরাচালান ও মজুতদারি, বিশ্বমন্দা ও আন্তর্জাতিক চক্রান্তের কারণে ১৯৭৪ সালে যখন তুমুল দুর্ভিক্ষ শুরু হয় দেশে; বঙ্গবন্ধু ও আওয়ামী লীগ সরকার যখন এই দুর্যোগ মোকাবিলায় ব্যস্ত সময় পার করছিলেন; ঠিক সেই সময়টাতেই সশস্ত্র গণবাহিনী গঠন করে অপহরণ-হামলা-হত্যাযজ্ঞ শুরু করে জাসদ।

স্বাধীনতার পরবর্তী দুই বছরে কমপক্ষে দুই হাজার মুক্তিযোদ্ধাকে খুন, পাঁচ হাজারের বেশি গুপ্তহত্যা এবং ৬০টির বেশি থানায় হামলা চালিয়ে অস্ত্র লুট করে এই উগ্রবাম ও প্রতিক্রিয়াশীল ঘাতক চক্র। এদের কারণে ফের সক্রিয় হয়ে ওঠে পরাজিত স্বাধীনতাবিরোধীরা। দেশের সার্বিক পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে গড়ে ওঠে একটা ফাটকাবাজ শ্রেণি।

এমনকি দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগে নিজ দলের ৪৪ জন এমএনএ এবং এমসিএকেও বহিষ্কার করেছেন বঙ্গবন্ধু। এমন একপি পরিস্থিতিতে দেশকে পুনর্গঠনের জন্য আরেকটি বিপ্লব অত্যাবশ্যকীয় হয়ে পড়ে, এই বিপ্লব দেশ গড়ার বিপ্লব। মূলত কয়েক হাজার বছরের শৃঙ্খলিত একটি জাতির প্রতিটি মানুষের কাছে স্বাধীনতার অমিয়সুধা পৌঁছে দেওয়ার উদ্যোগ ছিল এটি।

জাতীয় ঐক্যের ঘোষণা : অবশেষে, ১৯৭৫ সালের ২৫ জানুয়ারি জাতীয় সংসদের অনুমোদন নিয়ে সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনী আনেন জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। এরপর রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেন। এক নতুন ধরনের রাজনৈতিক ব্যবস্থাপনার দিকে যাত্রা শুরু করে দেশ। জাতির বৃহত্তর স্বার্থে, সাংবিধানিকভাবে সংগঠিত এবং মূলধারার সব রাজনৈতিক দলকে তিনি একত্রে একটি পাটাতনে আনেন, স্পষ্টভাবেই এটি ছিল জাতীয় ঐক্য গঠনের উদ্যোগ। এটি উল্লেখ্য যে, ১৯৭৩ সালের ৭ মার্চের নির্বাচনে ৩০০ আসনের মধ্যে ২৯৩ আসনে জেতা আওয়ামী লীগকে পর্যন্ত বিলুপ্ত করে সব দলের সমন্বয়ে বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক লীগ বা বাকশাল গঠন করেন বঙ্গবন্ধু।

সবাইকে সঙ্গে নিয়ে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ঠিক করা, প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক কার্যক্রমকে গতিশীল করা, গণমানুষের দীর্ঘদিনের চাহিদা অনুযায়ী বৈষম্যহীন সমাজব্যবস্থা কায়েম, অসাম্প্রদায়িক ও সমৃদ্ধ রাষ্ট্র গড়ে তোলার জন্যই তিনি এই সংস্কারের ঘোষণা দেন। স্বাধীনতা অর্জন যেমন বাঙালির প্রথম বিপ্লব ছিল, তেমনি সেই স্বাধীনতার সুফল ভোগ করার জন্য সমৃদ্ধি অর্জনের দ্বিতীয় বিপ্লব ছিল এটি।

পূর্ণ অর্থনৈতিক মুক্তির মাধ্যমে শোষণমুক্ত অসাম্প্রদায়িক সমাজ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে বাংলার দুখি মানুষের মুখে হাসি ফোটাতে চেয়েছিলেন তিনি। এজন্যই জাতীয় ঐক্যের ঘোষণা দিয়ে জনপ্রতিনিধি, রাজনীতিবিদ, নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি, সরকারি কর্মচারী, সামরিক বাহিনীর সদস্যসহ সমাজের বিভিন্ন শ্রেণির মানুষকে বাকশালের সদস্য করা হয়।

বাকশালের মাধ্যমে বঙ্গবন্ধু যেসব কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে চেয়েছিলেন সেগুলো হলো: দেশের অর্থনৈতিক ব্যবস্থার আমূল সংস্কার, বৈষম্যহীন-অসাম্প্রদায়িক সমাজ ব্যবস্থা কায়েম, সামাজিক সাম্য ও সুবিচার নিশ্চিত, দেশের ৮০ ভাগ গ্রামীণ মানুষের জন্য কৃষিভিত্তিক উন্নয়ন, বহুমুখী সমবায়ের মাধ্যমে উৎপাদন বৃদ্ধি করে খাদ্য স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন, ভূমি ব্যবস্থা সংস্কারের মাধ্যমে দেশের কৃষক-শ্রমিকদের জন্য ভূমি ও অধিকার নিশ্চিতকরণ, শাসন ও বিচার ব্যবস্থা বিকেন্দ্রীকরণের মাধ্যমে মানুষের দুর্ভোগ কমানো এবং সুশাসন নিশ্চিত করা, বিজ্ঞানভিত্তিক শিক্ষার মাধ্যমে শক্তিশালী নতুনপ্রজন্ম গঠন প্রভৃতি।

জাতীয় ঐক্য এবং দ্বিতীয় বিপ্লবের ঘোষণা দেওয়ার পর সাড়ে চার মাসের মধ্যে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি ঘটে। ঊর্ধ্বগামী দ্রব্যমূল্য অনেক হ্রাস পায়। সার্বিকভাবেই পরিস্থিতির উত্তরণ হতে শুরু করছিল।

বাকশাল: সমাজব্যবস্থা বদলে দেওয়ার ব্যবস্থাপনা : 'বাকশাল' বাঙালি জাতির ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। দেশের মানুষের ঐতিহাসিক চাহিদা ও জনআকাঙ্ক্ষা পূরণের জন্য ১৯৭৫ সালে এই ব্যবস্থার উদ্যোগ নিয়েছিলেন দেশের প্রতিষ্ঠাতা রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমান।

এই ব্যবস্থার উল্লেখযোগ্য একটি বৈশিষ্ট্য ছিল প্রশাসন-ব্যবস্থার বিকেন্দ্রীকরণ এবং স্থানীয় পর্যায় পর্যন্ত গণতন্ত্রের সুফল পৌঁছানো। এরই অংশ হিসেবে বাংলাদেশকে পুনর্গঠনের জন্য ৬১ জেলায় ভাগ করা হয়। প্রত্যেকটি জেলার প্রধান হিসেবে ঠিক করা হয় একজন করে গভর্নর। ১৯৭৫ সালের ১৬ জুলাই তাদের নিয়োগ দেওয়া হয়। ৬১ জন গভর্নরের মধ্যে ৩৩ জন ছিলেন সংসদ সদস্য, ১৩ জন ছিলেন সরকারি চাকরিজীবী, একজন সামরিক কর্মকর্তা এবং বাকি ১৪ জন বিভিন্ন ইতিবাচক কর্মকাণ্ডের জন্য ব্যক্তি হিসেবে সুপরিচিত ছিলেন।

এছাড়া প্রান্তিক মানুষের কাছে গণতন্ত্র পৌঁছে দিতে গঠন করা হয় উপজেলা এবং জেলা পর্যায়ে গঠন করা হয় প্রশাসনিক কাউন্সিল। স্থানীয়ভাবে পরিকল্পিতভাবে উন্নয়নকাজ বাস্তবায়ন করার জন্য সরকারি-বেসরকারি কর্মচারি, রাজনৈতিক নেতানেত্রী, সংসদ সদস্য, নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি এবং স্থানীয় তরুণ-যুবকদের সদস্য করে এসব জেলা ও উপজেলা কাউন্সিল গঠনের বিধান করা হয়। এমনকি বিচারব্যবস্থার সংষ্কার করে উপজেলা পর্যায়ে ট্রাইব্যুনাল গঠনের মাধ্যমে সুবিচার নিশ্চিতের ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল।

এই বিপ্লবের অন্যতম আরেকটি দিক ছিলো জাতীয় অর্থনৈতিক মুক্তি। এজন্য দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অংশ হিসেবে গ্রামভিত্তিক সমবায় উৎপাদনব্যবস্থা চালু করার প্রস্তাব করা হয়। যার উদ্দেশ্য দেশের ৬৫ হাজার গ্রামের প্রতিটিতে বহুমুখী সমবায় গঠন এবং জমির মালিকানা হস্তান্তর না করে যৌথ উৎপাদনব্যবস্থা গড়ে তোলা, যাতে জমির মালিকেরা ছাড়াও গ্রামের প্রতিটি কর্মক্ষম মানুষ সমবায়ের সদস্য হয়ে উৎপাদন কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করতে পারেন।

সরকারি বরাদ্দের অর্থ, সার, টেস্ট রিলিফ ও ওয়ার্কস প্রোগ্রাম সরাসরি সমবায়ের কাছে পৌঁছানো, যাতে সেগুলো প্রকৃত প্রাপকদের কাছে পৌঁছায় এবং মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য বিলোপ করা যায়। উৎপাদিত ফসল জমির মালিক, সমবায় এবং রাষ্ট্রের মধ্যে আনুপাতিক হারে বণ্টন করার মাধ্যমে কৃষিভিত্তিক সমাজকাঠামোকে শক্তিশালী করা।

১৯৭৫ সালের ২১ জুলাই বঙ্গবন্ধু নবনির্বাচিত গভর্নরদের জন্য প্রশিক্ষণ উদ্বোধন করেন। তিন সপ্তাহ পর, ১৬ আগস্ট, নিজ নিজ জেলার প্রশাসনিক দায়িত্ব নেওয়ার কথা ছিল তাদের। মূলত সেদিন থেকেই এই দ্বিতীয় বিপ্লবের বাস্তবায়ন শুরু হতো। কিন্তু ১৫ আগস্ট দেশবিরোধী চক্র কর্তৃক বঙ্গবন্ধুকে বর্বরোচিতভাবে সপরিবারে হত্যার পর দেশ ও মানুষের ভাগ্য বদলের এই বিপ্লব বিনষ্ট হয়ে যায়। সংবিধানকে পদদলিত করে দেশকে অন্ধকারের চাদরে ঢেকে ফেলে সামরিক জান্তা এবং তাদের সহযোগী স্বাধীনতাবিরোধীরা। পরবর্তীতে এই চক্রই মানুষকে দুর্ভোগের মধ্যে রেখে দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকার লোভে 'সমাজব্যবস্থা বদলের ব্যবস্থাপনা' তথা 'বাকশাল' নিয়ে অপপ্রচার চালাতে শুরু করে।

বাকশাল গঠনের মাধ্যমে, বঙ্গবন্ধু- দেশ ও মানুষের দীর্ঘ দিনের আকাঙ্ক্ষা পূরণের জন্য, সংবিধানের চার মূলনীতির ওপর ভিত্তি করে, একটি সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়তে চেয়েছিলেন। কিন্তু এটি বাস্তবায়িত হলে গণতন্ত্রকে অবদমন করা রাখা সম্ভব হতো না, অর্জিত হতো সামাজিক ন্যায় ও সাম্য, ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সম্প্রীতির বাংলাদেশ প্রতিটি নাগরিক তীব্র জাতীয়তাবোধে উন্মুখ হয়ে কাজ করতো দেশের জন্য; যার দ্বারা উন্নত জীবনের সুবিধা পেতো প্রতিটি পরিবার।

কিন্তু এই বিপ্লব সফল হলে পাকিস্তানিদের জান্তাদের ভূত হয়ে চেপে বসা স্বৈরাচারেরা সুবিধা করতে পারতো না, ধর্মের অপব্যবহার বন্ধ হয়ে যেতো কট্টর উগ্রবাদীদের, বাংলাদেশকে মাথা উঁচু করে বিশ্বের বুকে চলতে দেখলে পরাজিত রাজাকারদের ঘুম হতো না। তাই সবাই চক্র একসঙ্গে হাত মিলিয়ে বঙ্গবন্ধুহীন বাংলাদেশে দমনপীড়ন চালাতে শুরু করে আওয়ামী লীগ নেতাদের ওপর।

এরপর একচেটিয়াভাবে বছর পর বছর ধরে দেশজুড়ে অপপ্রচার চালায় বাকশাল নিয়ে। এই অশুভ শক্তির প্রোপাগাণ্ডার কারণে বাকশালে সম্পর্কে সঠিক কোনো তথ্যই আর জানতে পারেনি মানুষ। নতুন প্রজন্মের অধিকাংশই বাকশালের লক্ষ্য-উদ্দেশ্য এবং এর সঙ্গে জনগণের ঐতিহাসিক আকাঙ্ক্ষার সম্পর্কের ব্যাপারে কিছুই জানে না।

বাঙালির ঐতিহাসিক আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে বাকশালের সম্পর্ক : বাঙালির মুক্তিসংগ্রামের ইতিহাসের বাঁকে বাঁকে, দীর্ঘ সময়ের শোষণ ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে গণমানুষ সবসময় যা চেয়েছে; সেই আকাঙ্ক্ষা পূরণের জন্যই বাকশাল করতে হয়েছিল। ১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর থেকে শোষিত মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনের জন্য যেসব প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, কিন্তু শোষকদের কারণে তা বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি। মানুষের সেই দাবিগুলো পূরণ করাই ছিল বাকশালের উদ্দেশ্য। বাংলার মানুষের ঐতিহাসিক চাহিদা এবং বাকশালের সম্পর্ক খুঁজতে, আসুন একবার ইতিহাসের পাতা থেকে ঘুরে আসি।

পশ্চিম পাকিস্তানিদের বৈষম্য ও আগ্রাসনের শিকার হয় সাত কোটি বাঙালি। ধর্মের নামে আমাদের সঙ্গে যে ফাটকাবাজি করা হয়েছে, তা স্পষ্ট হতে থাকে। দীর্ঘ প্রায় দুই যুগের শোষণে, শ্মশানে পরিণত হয় সোনার বাংলা। একপর্যায়ে পশ্চিম পাকিস্তানি জান্তা ও মুসলিম লীগের শোষণ থেকে বাঁচার জন্য একতাবদ্ধ হয় সবাই।

১৯৫৪ সালে সোহরাওয়ার্দী, শেরে বাংলা, ভাসানী ও বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে নৌকা প্রতীক নিয়ে প্রাদেশিক নির্বাচনে অংশ নেয় যুক্তফ্রন্ট। আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে পূর্ব বাংলার ২৩৭টি মুসলিম আসনের মধ্যে ২১৫টিতে জয়লাভ করে এই জোট। মানুষ কেনো এতো ভোটে বিজয়ী করেছিল যুক্কফ্রন্টকে? যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনের ইশতেহারে মানুষের জন্য করতে চেয়েছিল, তা দেখলেই কারণটা স্পষ্ট হয়ে যাবে।

পূর্ব বাংলার স্বায়ত্তশাসন ও রাষ্ট্রভাষা বাংলা ছাড়াও এই ইশতেহারে সমাজব্যবস্থা পরিবর্তনের অঙ্গীকার করা হয়। মানুষের জীবনমান বদলের জন্য যেসব প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয় তারমধ্যে অন্যতম হলো: ভূমি ব্যবস্থার সংস্কার করে কৃষকদের অধিকার নিশ্চিত করা, কৃষিতে সমবায় প্রথা চালুর মাধ্যমে উৎপাদন বৃদ্ধি, খাল খনন ও সেঁচ ব্যবস্থার মাধ্যমে ভূমির সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিতকরণ, কুটির ও লবণ শিল্পের উন্নয়ন, আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলা, দুর্নীতির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া প্রভৃতি।

কিন্তু বিশাল ভোটে জেতার পর সরকার গঠনের দুই সপ্তাহের মাথায় ষড়যন্ত্র করে পূর্ব বাংলায় কেন্দ্রের শাসন জারি এবং বঙ্গবন্ধুকে গ্রেফতার করা হয়। ফলে কোটি কোটি বাঙালির তীব্র আকাঙ্ক্ষাগুলো আর পূরণ হলো না। পরবর্তীতে আরও শোষণ বাড়তে থাকে। ফলে স্বয়ংসম্পূর্ণ বাংলায়, ১৯৬৪ সাল থেকে খাদ্যঘাটতি শুরু হয়। অর্থনেতিক ও প্রশাসনিক আগ্রাসনে শ্মশানে পরিণত হতে থাকে আমাদের জন্মভূমি।

এরপর দীর্ঘ মুক্তি সংগ্রামের একপর্যায়ে ১৯৭০ সালের জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এবার বঙ্গবন্ধুর একক নেতৃত্বে শোষণমুক্ত সমাজ গঠনের ইশতেহার ঘোষণা করে আওয়ামী লীগ। এই ইশতেহারে যেসব বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া হয় সেগুলো হলো: মানুষের মর্যাদাময় জীবন, সামাজিক ন্যায় ও সাম্য, গ্রামের জনগণের উন্নয়নের অগ্রাধিকার, কৃষি ও ভূমি পদ্ধতির আমূল সংস্কার, সমবায়ের মাধ্যমে কৃষি বিপ্লব, বন্যা নিয়ন্ত্রণ এবং পানি ব্যবস্থাপনা সংস্কার, কৃষক ও শ্রমিকদের অধিকার নিশ্চিতকরণ। এসব আকাঙ্ক্ষা পূরণের জন্য এবারও স্বতঃস্ফূর্তভাবে জনগণ নৌকা মার্কায় ভোট দেয়। যার ফলে জাতীয় পরিষদে মোট ১৬৭ আসনে জিতে অখণ্ড পাকিস্তানের একক সংখ্যাগরিষ্ঠ দল হিসেবে সরকার গঠনের অধিকার লাভ করে আওয়ামী লীগ। কিন্তু এবারও বিধিবাম! পাকিস্তানি জান্তারা সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালিকে সরকার গঠন করতে না দিয়ে, উল্টো রাতের অন্ধকারে শুরু করে ইতিহাসের বর্বরোচিত হত্যাযজ্ঞ।

মোট কথা, বাংলার মানুষ যেসব অধিকার ও দাবি আদায়ের জন্য ১৯৫৪, ১৯৭০ ও ১৯৭৩ এর নির্বাচনে একচেটিয়াভাবে নৌকা মার্কা ও বঙ্গবন্ধুকে ভোট দিয়েছে, সেসব দাবি পূরণের চূড়ান্ত উদ্যোগ ও মহাপরিকল্পনার নামই ছিল ‘বাকশাল’। কিন্তু যারা বাংলাদেশের স্বাধীন অস্তিত্ব মেনে নিতে পারেনি; তারাই উন্নয়ন, সমাজব্যবস্থা ও মানুষের জীবনমান বদলানোর বিরুদ্ধে পরিকল্পিতভাবে ষড়যন্ত্র করে গেছে। তাই তারা দেশ গঠনের মহাপরিকল্পনা নিয়ে নিয়মিত অপপ্রচার চালিয়েছে। অথচ এই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হলে বাংলাদেশ হয়তো অনেক আগেই কৃষি ও শিল্প বিপ্লবের মাধ্যমে উন্নত দেশের কাতারে পৌঁছে যেতো।

 



poisha bazar

ads
ads