যুগে যুগে মহামারী


poisha bazar

  • অনলাইন ডেস্ক
  • ২৩ জুন ২০২০, ২৩:৫৯,  আপডেট: ২৪ জুন ২০২০, ০০:১৫

কোনো সংক্রামক রোগ যখন বিশাল একটি জনগোষ্ঠীর মাঝে খুব দ্রুত সংক্রমিত হয়ে পড়ে; তখন বলা হয় রোগটি মহামারী আকার ধারণ করেছে। পৃথিবীতে যুগে যুগে অসংখ্য মহামারীর ঘটনা ঘটেছে এবং এসব মহামারীতে মৃত্যু হয়েছে কোটি কোটি মানুষের।

অনেক সময় দেখা যায়, নানা কারণে একটি ছোট অঞ্চলে প্রাদুর্ভাব ঘটা রোগ ছড়িয়ে যায় বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে। ইতিহাসে অর্ধশতাধিক মহামারীর লিখিত তথ্য খুঁজে পাওয়া যায়। মহামারীগুলোতে মানব জাতি বিভিন্ন সময়ে বড় সংকটে পড়েছিল। ২০১৯ সালে এশিয়ার কয়েকটি দেশে এডিস মশা বাহিত রোগ ডেঙ্গু ছড়িয়ে পড়ে।

ফিলিপাইনে প্রায় ৭২০ জন ডেঙ্গুতে মারা যান। থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়ায়ও ছড়িয়ে পড়েছিল ডেঙ্গু। বাংলাদেশেও ভয়াবহ অবস্থা দাঁড়িয়েছিল। ২০২০ সালে এসে করোনাভাইরাস ঘটিত কোভিড-১৯ কে প্যান্ডেমিক ঘোষণা করা হয়েছে। যুগ-যুগান্তরের বিশ্বসভ্যতার কিছু গুরুত্বপূর্ণ মহামারীর ইতিহাস ঘাটলে আমরা দেখতে পাই। যুগে যুগে মহামারী নিয়ে আজকের আয়োজন-

ইবোলা : ভয়াবহ ইবোলা ভারাসে মৃত্যু হার ৫০ শতাংশের মতো। ২০১৪ ও ২০১৬ সালের মধ্য আফ্রিকায় বড় প্রাদুর্ভাবে অন্তত ১১ হাজার মানুষ মারা গেছে। ইবোলা ভাইরাসে সংক্রমিত হলে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই মৃত্যুই অবধারিত। এই অসুখের ওষুধ বা টিকা আবিষ্কার হয়নি এখন পর্যন্ত। তবে একটা ভালো খবর হলো খুব সংক্রামক নয় এটি।

ইবোলা ভাইরাসে আক্রান্ত হলে ৯০ শতাংশ ক্ষেত্রেই মৃত্যুর হাত থেকে নিস্তার পাওয়া যায় না। মধ্য ও পশ্চিম আফ্রিকার প্রত্যন্ত অঞ্চলে বিশেষ করে কঙ্গো, সুদান, গাবন ও আইভরিকোস্টে এই ভাইরাসের প্রকোপ বেশি। এই ভাইরাসের সংক্রমণ হতে পারে কোনো সংক্রমিত পশুর রক্ত বা শরীর রস-এর সংস্পর্শ থেকে। প্রাকৃতিক পরিবেশে হাওয়ার মাধ্যমে সংক্রমণের কোনো খবর পাওয়া যায়নি। মনে করা হয় যে বাদুড় নিজে আক্রান্ত না হয়ে এই রোগ বহন করে ও ছড়ায়।

ডিজিজ এক্স : ডিজিজ এক্স নাম শুনেই বোঝা যাচ্ছে এর সম্পর্কে চিকিৎসা বিজ্ঞানীদের ধারণা নেই। আসলেই তাই। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা পৃথিবীব্যাপী মহামারী ঘটাতে পারে এমন অসুখের তালিকায় নতুন রহস্যময় অসুখ ‘ডিজিজ এক্স’ এর নাম অন্তর্ভুক্ত করেছে। ডিজিজ এক্স শুনে অপরিচিত মনে হতে পারে। এটি কোনো রোগের নামও নয়।

অজানা ভাইরাসের সংক্রমণে হওয়া এই রোগের ব্যাপারে ব্যাখ্যা করা হয়েছে, ডিজিজ এক্স হলো এমন কোনো রোগ যা মানবজাতির কাছে এখনো অজানা, কিন্তু তা আন্তর্জাতিকভাবে মহামারীর রূপ নিতে পারে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা জানিয়েছে, একটা অজানা রোগে পৃথিবীজুড়ে ব্যাপক মহামারী দেখা দিতে পারে।

এদিকে বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন আগামী ২০-৩০ বছরের মধ্যে বিশ্বজুড়ে একটি রোগ মহামারী আকার ধারণ করবে, যাতে মানব জাতি বড় এক সংকটে পড়তে পারে।

করোনা: চীন থেকে ছড়িয়ে পড়া করোনা ভাইরাস ঘিরে ক্রমেই ছড়াচ্ছে আতঙ্ক। করোনা ভাইরাসের থাবায় লাফিয়ে লাফিয়ে মৃত্যুর সংখ্যা বাড়ছে চীনে। ইতিমধ্যেই এই ভাইরাস থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম, সিঙ্গাপুর, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, তাইওয়ান, নেপাল, মালয়েশিয়া, ফ্রান্স ও আমেরিকায় পাওয়া গেছে।

যে গতিতে আক্রান্ত ও মৃতের সংখ্যা বাড়ছে চীনে, তা সামাল দিতে রীতিমতো চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হচ্ছে চীনা সরকারকে। ভাইরাসটিকে পরীক্ষা করে মনে করা হচ্ছে, করোনা ভাইরাসের উৎস হতে পারে বাদুড় ও সাপ। বেইজিংয়ের ‘চাইনিজ একাডেমি অব সায়েন্স’ এমনই মনে করছে।

আক্রান্তদের জ্বর, কাশি, শ্বাসকষ্ট, গলা ফুলে যাওয়া কিংবা সর্দির মতো উপসর্গ দেখা দিচ্ছে সার্স আক্রান্তদের মতোই। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এই অসুখের প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণের নির্দেশিকা সব হাসপাতালে পাঠিয়ে দিয়েছে।

সার্স ও মার্স : সার্স অর্থাৎ সিভিয়ার একিউট রেসপিরেটরি ভাইরাসের উৎপত্তি চীনে। বিজ্ঞানীরা বলছেন খাটাশ জাতীয় বিড়াল থেকে ভাইরাসটি এসেছে। তবে এটি বাদুড়ের দেহেও পাওয়া গেছে। ২০০২ থেকে ২০০৪ সালের মধ্যে দুবার এর প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়। আট হাজারের বেশি আক্রান্তের মধ্যে ৭৭৪ জনের মৃত্যু হয়।

ভাইরাসটিতে আক্রান্ত হলে ভয়াবহ শ্বাসকষ্ট দেখা দেয়। এ রকম আরেকটি ভাইরাস হচ্ছে মার্স। এটি সার্সের একই গোত্রীয় একটি ভাইরাস। ২০১২ সালে প্রথম সৌদি আরবে এই ভাইরাসের অস্তিত্ব আবিষ্কৃত হয় এবং সেখানে আক্রান্তদের ৩৫ শতাংশ মারা গেছেন।

এই রোগের নাম দেয়া হয় মিডল ইস্ট রেসপিরেটরি সিনড্রোম বা সংক্ষেপে মার্স। করোনা ভাইরাস গোত্রীয় বলে ভাইরাসটির নাম মার্স করোনা ভাইরাস। সৌদি আরব ছাড়াও এর উপস্থিতি লক্ষ্য করা গেছে বিভিন্ন দেশে।

জিকা : জিকা ভাইরাস হচ্ছে ফ্ল্যাভিভাইরিডি পরিবারের ফ্ল্যাভিভাইরাসগণের অন্তর্ভুক্ত। এই পরিবারের অন্যান্য ভাইরাসের মতো এটি আবরণযুক্ত ও আইকসাহেড্রাল আকৃতির একসূত্রক আরএনএ ভাইরাস।

এটি প্রথম ১৯৪৭ সালে উগান্ডায় রেসাস ম্যাকাক বানরের দেহে পাওয়া যায়। পরবর্তীতে ১৯৫২ সালে উগান্ডা ও তানজানিয়াতে মানবদেহে প্রথমবারের মতো শনাক্ত করা হয়। এই ভাইরাস যে রোগ সৃষ্টি করে তার সঙ্গে ডেঙ্গু জ্বর এর কিছুটা মিল রয়েছে। বিশ্রাম নেওয়া হলো প্রধান চিকিৎসা। এখনো এর কোনো ওষুধ বা টিকা আবিষ্কৃত হয়নি।

যে সব নারী জিকা জ্বরে আক্রান্ত তাদের গর্ভের সন্তান মাইক্রোসেফালি বা ছোট আকৃতির মাথা নিয়ে জন্মগ্রহণ করে। এ ছাড়া বড়দের ক্ষেত্রে গিলেন বারে সিনড্রোম করতে পারে। ১৯৫০ সাল থেকে এই ভাইরাস আফ্রিকা থেকে এশিয়া পর্যন্ত বিস্তৃত।

এইডস : এইচআইভি সংক্রমণে মানবদেহে এইডস রোগের সৃষ্টি হয়। মূলত এইডস একটি রোগ নয় এটি রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার অভাবজনিত নানা রোগের সমাহার।

এইচআইভি ভাইরাস মানবদেহের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা নষ্ট করে দেয়, ফলে নানা সংক্রামক রোগ ও কয়েক রকম ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে রোগী মৃত্যু মুখে ঢলে পড়ে। এইচআইভি ভাইরাস শরীরে ঢোকার পর অনাক্রম্যতা কমতে কমতে এইডস ঘটাবার মতো অবস্থায় পৌঁছতে অনেক বছর লাগে।

তবে শরীরে এই ভাইরাস একবার সংক্রমিত হলে তা কমানো সম্ভব হলেও সম্পূর্ণ দূর করা এখনো সম্ভব নয়, তাই শেষ পর্ষন্ত সেই রোগীর এইডস হওয়া বন্ধ করা সম্ভব নয়। তবে বিশ্বের খুব অল্প সংখ্যক অঞ্চলের কিছু লোকেদের শরীরে কিছু জিনে খুঁত থাকে যার ফলে এইডস ভাইরাস তাদের শরীরে সফলভাবে সংক্রমণ করতে পারে না।

গুটিবসন্ত : গুটিবসন্ত বা স্মল পক্স ভ্যারিওলা ভাইরাস দ্বারা সংক্রমিত হতো এবং এটি অত্যন্ত মারাত্মক এক ব্যাধি ছিল। মানবদেহে প্রথমে এক ধরনের গুটি বের হয় যা পরবর্তী সময়ে তিল বা দাগ, কুড়ি, ফোস্কা, পুঁজবটিকা এবং খোসা বা আবরণ ইত্যাদি পর্যায়ের মাধ্যমে দেহে লক্ষণ প্রকাশ করে।

গুটিবসন্তের টিকা আবিষ্কৃত হয়েছিল ১৭৯৬ সালে। অথচ টিকা আবিষ্কারের প্রায় ২০০ বছর পরও এই রোগে আক্রান্ত হয়ে হাজার হাজার মানুষ মৃত্যুবরণ করে ভারতে। ১৯৭০ সালে লক্ষাধিক মানুষ রাতারাতি এ রোগে আক্রান্ত হয়ে পড়ে।

পরবর্তী কয়েক বছরে ভারত সরকার এবং জাতিসংঘের সহায়তায় গঠিত একটি স্বাস্থ্য বিষয়ক আন্তর্জাতিক সংগঠনের আন্তরিক প্রচেষ্টায় ১৯৭৫ সালেই ভারতকে গুটিবসন্ত মুক্ত ঘোষণা করা সম্ভব হয়।

ডেঙ্গু : গত বছরে এশিয়ার কয়েকটি দেশে এডিস মশাবাহিত রোগ ডেঙ্গু ছড়িয়ে পড়ে। ফিলিপাইনে প্রায় ৮০০ থেকে ৯০০ মানুষ মারা গেছে। বাংলাদেশের মতো থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়াতেও ছড়িয়ে পড়ে ডেঙ্গু। একটি এডিস মশা বাহিত ডেঙ্গু ভাইরাসজনিত গ্রীষ্মমণ্ডলীয় রোগ।

এডিস মশার কামড়ের মাধ্যমে ভাইরাস সংক্রমণের তিন থেকে পনেরো দিনের মধ্যে সচরাচর ডেঙ্গু জ্বরের উপসর্গগুলো দেখা দেয়। উপসর্গগুলোর মাঝে রয়েছে জ্বর, মাথাব্যথা, বমি, পেশিতে ও গাঁটে ব্যথা এবং গাত্রচর্মে ফুসকুড়ি।

দুই থেকে সাত দিনের মাঝে সাধারণত ডেঙ্গু রোগী আরোগ্য লাভ করে। কিছু কিছু ক্ষেত্রে রোগটি মারাত্মক রক্তক্ষয়ী রূপ নিতে পারে যাকে ডেঙ্গু রক্তক্ষয়ী জ্বর (ডেঙ্গু হেমোরেজিক ফিভার বলা হয়)।

ইনফ্লুয়েঞ্জা : ইনফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাস অর্থোমিক্সোভিরিডি ফ্যামিলির একটি ভাইরাস, যা ইনফ্লুয়েঞ্জা রোগের জন্য দায়ী। বিভিন্ন সময়ে এটা লাখ লাখ মানুষের মৃত্যুর কারণ হিসেবে চিহ্নিত হয়ে এসেছে।

১৯১৮ থেকে ১৯১৯ সাল সময়ে ইনফ্লুয়েঞ্জাতে বিশ্বব্যাপী প্রায় ৫ কোটি মানুষ মারা যায়। ভয়াবহ এই মহামারীকে তখন নাম দেওয়া হয় ‘স্প্যানিশ ফ্লু’। এটি ‘দ্য ইনফ্লুয়েঞ্জা প্যানডেমিক’ নামেও পরিচিত। গ্রিক বিজ্ঞানী হিপোক্রেটিস প্রথম ২৪,০০ বছর আগে ইনফ্লুয়েঞ্জা রোগের লক্ষণ লিপিবদ্ধ করেন।

এরপর বিশ্বব্যাপী ইনফ্লুয়েঞ্জা ঘটিত নানা মহামারী ঘটার প্রমাণ রয়েছে। মাত্র এক বছরেই ইনফ্লুয়েঞ্জা প্যানডেমিক কেড়ে নেয় কোটির বেশি মানুষের প্রাণ! সে সময় দেশে দেশে সরকার সাধারণ মানুষকে মাস্ক পরিধানের জন্য আইন পাস করে, দীর্ঘদিনের জন্য বড় জমায়েত নিষিদ্ধ করা হয়।

পোলিও : পোলিওমাইলিটিজ এক ধরনের ভাইরাসজনিত সংক্রামক রোগ। সচরাচর এটি পোলিও নামেই সর্বাধিক পরিচিত। এক ব্যক্তি থেকে অন্য ব্যক্তি এ ধরনের ভাইরাসের মাধ্যমে আক্রান্ত হন।

এ রোগে আক্রান্ত ব্যক্তি সাময়িক কিংবা স্থায়ীভাবে শারীরিক ক্ষতির সম্মুখীন হন ও তার অঙ্গ অবশ বা পক্ষাঘাতে আক্রান্ত হয়ে পড়ে। ১৯১৬ সালে পোলিও রোগ প্রথম মহামারী আকারে ছড়িয়ে পড়ে। সে বছর নিউইয়র্কে ৯ হাজার মানুষ পোলিওতে আক্রান্ত হয় যার মধ্যে ৬ হাজার মানুষই মৃত্যুবরণ করে!

নিউইয়র্ক শহর থেকে ক্রমে পোলিওর প্রাদুর্ভাব বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়ে। প্রতি বছর বিশ্বে কত শত মানুষ পোলিওতে আক্রান্ত হয়ে মারা যায় তার কোনো সঠিক তথ্যও পাওয়া যায় না। অবশেষে ১৯৫০ সালে জোনাস সাল্ক পোলিও টিকা আবিষ্কার করেন।

মানবকণ্ঠ/এফএইচ




Loading...
ads






Loading...