যেভাবে কাটানো যাবে মানসিক চাপ

যেভাবে কাটানো যাবে মানসিক চাপ
- ফাইল ছবি

poisha bazar

  • মানবকণ্ঠ ডেস্ক
  • ২৪ মার্চ ২০২০, ০০:২০

বাংলাদেশে করোনা ভাইরাস শনাক্ত হওয়ার পর থেকেই ঢাকার বাসিন্দা ফারজানা ইয়াসমিন পরিবারের সদস্যদের নিয়ে চিন্তায় পড়েছেন। তার বাসার দুজন চাকরিজীবী সদস্যকে প্রতিদিন বাইরে যেতে হয়। বাসায় বয়স্ক স্বজন রয়েছেন।
টেলিভিশনে যেসব খবর দেখছি, অনেক দেশে প্রতিদিন মানুষ মারা যাচ্ছে। সবসময় আতঙ্ক লাগছে, ভয়ে ঠিকমতো ঘুমাতেও পারছি না। বøাড প্রেশারও বেড়ে যাচ্ছে।

তার মতো একই রকম ভয়, আতঙ্কে আর মানসিক চাপে ভুগছেন আরো অনেকেই। করোনা ভাইরাসের আক্রান্ত রোগী বেড়ে যাওয়ার কারণে অনেকের মধ্যেই ভীতি ছড়িয়ে পড়েছে। অনেকেই বাইরে যাওয়া কমিয়ে দিয়েছেন। আবার যারা বাসায় থাকছেন তারাও সারাক্ষণ চিন্তায় থাকছেন কাজের জন্য বাইরে যাওয়া পরিবারের সদস্যদের নিয়ে। জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক মেখলা সরকার বলছেন, মানসিক চাপের বিষয়টি একেকজনের ভেতর একেকরকমভাবে কাজ করে।

যখন কোনো সঙ্কটের মধ্যে আমরা পড়ি, তাতে একেকজন মানুষ একেকভাবে প্রতিক্রিয়া দেখায়। অনেকেই দেখবেন কোনো চাপ বোধ করছে না, তারা হয়তো একটা ডিনায়ালের মধ্যে আছে। তারা মনে করছে, অন্যের হবে, আমার হবে না। আবার অনেকে স্বাভাবিক উদ্বিগ্নতা বোধ করছে। আবার অনেকের মধ্যে অতিরিক্ত চাপ, একটা আতঙ্ক বিরাজ করছে। তিনি বলছেন, বর্তমান পরিস্থিতি কিছুটা ভয় পাওয়া স্বাভাবিক।

খানিকটা উদ্বিগ্নতার উপকারও আছে। সেটা আমাদের সচেতন হতে সহায়তা করে, নিজেদের রক্ষা করতে, প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে সাহায্য করে। কিন্তু উদ্বিগ্নতা যখন স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি হয়, মানুষ যখন আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পড়ে, তখন তাদের মধ্যে নানা ধরনের শারীরিক ও মানসিক প্রতিক্রিয়া তৈরি করে। সেটা তার বর্তমান সময়কে মোকাবিলা করতে দুরূহ করে তোলে। তার সিদ্ধান্ত গ্রহণ ক্ষমতা বাধাগ্রস্ত হয়ে পড়ে, মানুষ ভুল সিদ্ধান্ত নিতে পারে। কীভাবে বুঝবেন মানসিক সমস্যার তৈরি হচ্ছে।

অধ্যাপক মেখলা সরকার বলছেন, অতিরিক্ত উদ্বিগ্ন হলে উঠলে বা মানসিক চাপে ভুগলে মেজাজ খিটখিটে হয়ে ওঠে। যখন তখন রেগে উঠছেন। অল্প কিছুতেই তারা অনেক বেশি উত্তেজনা প্রকাশ করছেন। কিছু মানুষের মধ্যে শারীরিক প্রতিক্রিয়া হতে পারে। যেমন বুক ধড়ফড় করতে পারে, মাথাব্যথা করতে পারে, শ্বাসে সমস্যা হতে পারে। শারীরিক আরো কিছু সমস্যা হতে পারে। এর সাথে অনেকের ঘুমের সমস্যা হতে পারে।

যেভাবে মানসিক চাপ কাটিয়ে ওঠা যেতে পারে: মানসিক চাপ বা উদ্বেগ কাটিয়ে ওঠার জন্য বেশ কয়েকটি পরামর্শ দিয়েছেন মনোরোগবিদ অধ্যাপক মেখলা সরকার।

সমস্যাটি মেনে নেয়া: প্রথমেই সমস্যা বা সঙ্কটটিকে মেনে নিতে হবে।

অধ্যাপক মেখলা সরকার বলছেন, বিশ্বজুড়ে চলা বড় একটি সঙ্কটের মধ্যে আমরা যে আছি, প্রথমেই সেটা মেনে নিতে হবে। সেই সঙ্গে ভাবতে হবে, শুধু আমি একা নই, প্রতিটা মানুষ এই সমস্যার ভেতর রয়েছে।

ভাবতে হবে, এই খারাপ সময়টা কোনো অবস্থাতেই স্থায়ী নয়। সবাইকে শুধু অপেক্ষা করতে হবে কখন এই সমস্যাটি কাটবে এবং নিশ্চিতভাবে একসময়ে সমস্যাটি কেটে যাবে। ভীত বা বিহŸল না হয়ে বরং নিজের ওপর আস্থা রাখুন।

শারীরিক দূরত্ব গড়ে তুলুন: তবে মানসিকভাবে কাছে থাকুন: করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ থেকে বাঁচার জন্য সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।

তবে মেখলা সরকার বলছেন, শারীরিকভাবে অবশ্যই দূরত্ব বজায় রাখতে হবে কিন্তু মানসিকভাবে নয়। সবার সঙ্গে টেলিফোনে, ম্যাসেঞ্জারে নিয়মিত কথা বলতে হবে, পরস্পরের প্রতি খোঁজখবর নিতে হবে। তাদের প্রতি আন্তরিকতার বিষয়টি প্রকাশ করতে হবে। তাহলে একা থাকলেও, বিচ্ছিন্ন থাকলেও সেটি মানসিকভাবে নেতিবাচক প্রভাব তৈরি করবে না। অন্যদের মধ্যেও একটা আস্থা তৈরি হবে যে, আমার পাশে কেউ রয়েছে।

পরিবারের সঙ্গে কোয়ালিটি সময় কাটান: ব্যস্ততার কারণে পরিবারের সঙ্গে অনেকের ঠিকমতো সময় কাটানো হয় না। এখন বাধ্য হয়ে বাড়িতে থাকতে হলেও পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সময় কাটান।

অধ্যাপক সরকার বলছেন, শুধু মোবাইলে বা কম্পিউটারের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে না থেকে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে গল্প করুন, সময় দিন। সামাজিক মাধ্যম থেকে বেরিয়ে পরিবারের সঙ্গে বাস্তব সময় কাটান। সবাইকে বুঝতে দিন যে, সবাই মিলে একটা সঙ্কট মোকাবিলা করছেন।

সবসময় করোনা ভাইরাস নিয়ে চিন্তা না করা, এসব তথ্যের পেছনে ঘুরে না বেড়ানোই ভালো। বরং নিজেকে করোনা ভাইরাসের চিন্তা থেকে, খবর থেকে দূরে সরিয়ে রাখার চেষ্টা করুন।

নির্ভরযোগ্য সূত্রের তথ্য গ্রহণ করুন: সঙ্কটের সময়, উদ্বেগের সময় অনেক রকম গুজব ছড়িয়ে পড়তে দেয়া যায়। বিশেষ করে সামাজিক মাধ্যমগুলোতে নানা ধরনের তথ্য ঘুরে বেড়ায়। এক্ষেত্রে সবার সব ধরনের তথ্য বিশ্বাস করা উচিত হবে না। যাচাই করে সঠিক সংবাদ বিশ্বাস করতে হবে। গুজব বা অচেনা সূত্রের তথ্য বিশ্বাস না করে নির্ভরযোগ্য সূত্র বা মাধ্যমের তথ্য গ্রহণ করতে হবে। ফেসবুকে বা সামাজিক মাধ্যমে যে কোনো তথ্য এলেই সেটা বিশ্বাস করা যাবে না, শুধু নির্ভরযোগ্য সূত্রের তথ্য বিশ্বাস করতে হবে।

মেখলা সরকার বলছেন, সারাক্ষণ এসব তথ্যের পেছনে ছুটে না বেরিয়ে নির্দিষ্ট একটা ঠিক করে নিয়ে তখন এসব তথ্যের খোঁজ করা যেতে পারে।

অধ্যাপক মেখলা সরকার বলছেন, বাসায় থাকতে বাধ্য হলে বা কোয়ারেন্টাইনে থাকলে সময়টা ফেলে রাখা কাজের পেছনে লাগানো যেতে পারে। আপনি ভালো কয়েকটা বই পড়তে পারেন, সিনেমা দেখতে পারেন। বাসায় বাগান থাকলে বাগানের পরিচর্যা করতে পারেন। ঘরের সাজসজ্জা করা যেতে পারে। পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে ইনডোর গেমস খেলা যেতে পারে। এসব কাজের মাধ্যমে একদিকে যেমন নিজেকে ব্যস্ত রাখা যাবে, তেমনি পজিটিভ কাজের স্মৃতি তৈরি হবে। পরিবারের সঙ্গেও সম্পৃক্ততা বাড়বে।

প্রতিদিন কিছুক্ষণ মেডিটেশন করার পরামর্শ দিয়েছেন মেখলা সরকার। যারা ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠান করে থাকেন, তাদের নিয়মিতভাবে সেগুলো করারও পরামর্শ দিয়েছেন। এর ফলে শারীরিক ও মানসিক যতœ হবে। ফলে মানসিকভাবে ভালো থাকা হবে, সেই সঙ্গে সময়টাও ভালো কাটবে।

মানবকণ্ঠ/এআইএস

 




Loading...
ads






Loading...