উড়লেন ‘হাওয়া’য় ডুবলেন ‘বিতর্কে’


  • বিনোদন প্রতিবেদক
  • ০৪ আগস্ট ২০২২, ২০:০৭,  আপডেট: ০৪ আগস্ট ২০২২, ২০:৫০

সিনেমা হলে দর্শক ফিরছেন দর্শকের সিনেমা দেখার আগ্রহ বাড়ছে। টিকিট পাওয়া যাচ্ছে না এসব বাংলা সিনেমার জন্য আশার আলো দেখায়। যে আলোয় আলোকিত হচ্ছে চলচ্চিত্র অঙ্গন। তবে একজন শিল্পী এই আলো যেমন আরও প্রখর করতে পারে, তেমনি অন্ধকারে ভরে দিতে পারেন পুরো চলচ্চিত্র অঙ্গন।

একজন শিল্পীর চিন্তা-চেতনা-সমাজের সাধারণ মানুষের মতো নয়। ভিন্ন চিন্তা লালন করে বলেই শিল্পী। তাই সবার পক্ষে শিল্পী হওয়া সম্ভব নয়। বিনিদ্র সাধনার মধ্য দিয়েই কেবল একজন প্রতিভাবান মানুষ শিল্পী হওয়ার অধিকার অর্জন করেন। ‘শিল্প’ সত্য ও সুন্দরের প্রতিচ্ছবি। আর এই প্রতিচ্ছবি বহন করে একজন গুণী শিল্পী। একজন গুণী মানুষই গুণী শিল্পী হওয়ার অধিকার রাখেন। কিন্তু অনেকেই শিল্পী হতে চান প্রকৃত মানুষ নয়। এই কারণেই কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ‘বঙ্গমাতা’র শেষ দুই পঙ্ক্তিতে লিখেছেন, ‘সাত কোটি সন্তানেরে, হে মুগ্ধ জননী, রেখেছ বাঙালি করে, মানুষ করনি।’ সমাজের আর দশজনের চেয়ে একজন শিল্পীর সামাজিক দায়িত্ব অনেক বেশি। শিল্পী তার সৃষ্টকর্ম দিয়ে সাধারণকে প্রভাবান্বিত করার ক্ষমতা রাখেন। মতবাদ প্রতিষ্ঠিত করতে পারেন। শিল্পীসত্তার মাধ্যমে নেতিবাচক চিন্তা প্রতিহত করেন এবং ইতিবাচক চিন্তা প্রতিষ্ঠিত করেন বলেই সমাজ তাকে শ্রদ্ধার আসনে বসিয়ে আরাধনা করে। একজন শিল্পীকে হতে হয় সত্যের আলোয় আলোকিত আদর্শবান মানুষ ও সৌন্দর্যের নির্মাতা। একজন শিল্পীর কাজ যেহেতু সমাজে একটা প্রভাব তৈরি করে। সুতরাং তাদের খুবই দায়িত্বশীল আচরণ করা প্রয়োজন। অবশ্যই সব কিছুর প্রতি সহানুভূতিশীল হতে হবে। খেয়াল রাখতে হবে কোনো কাজ কারও মূল্যবোধকে আঘাত করছে কিনা, কাউকে অসম্মান করছে কিনা, কারও অনুভূতিকে আঘাত করছে কিনা। নিজের কাজ নিয়ে গর্ব করা ভালো কিন্তু অহংকার করা ঠিক নয়, অহংকারে সব সুনাম-অর্জন ডুবে যেতে পারে জলে। শুধু শিল্পীরা নয়, ভালো কাজ নিয়ে দর্শকরাও গর্ব করতে পারেন। রায়হান রাফির ‘পরাণ’ মুক্তির পরে দর্শকের মধ্যে ভিন্ন উন্মাদনা সৃষ্টি করে। উৎসবে মেতে ওঠে দর্শক।

অনন্ত জলিলের ‘দিন-দ্য ডে’ নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা দুটিই হয়। এসব সিনেমা নিয়ে আরেক দিন লেখা যাবে। আজ হাওয়া নিয়েই লিখতে চাই। ২০১৯ সালে শুটিং শুরু হয়েছিল মেজবাউর রহমান সুমন পরিচালিত ‘হওয়া’ সিনেমার। কক্সবাজারে ৪৫ দিন সিনেমাটির শুটিং হয়। পরে করোনার জন্য মুক্তি পিছিয়ে যায়। অবশেষে ২৯ জুলাই সিনেমাটি মুক্তি পায়। এতে অভিনয় করেছেন চঞ্চল চৌধুরী, শরীফুল রাজ, নাজিফা তুষি, সুমন আনোয়ার, সোহেল মণ্ডল, নাসির উদ্দিন খান প্রমুখ।

‘হাওয়া’ দেশের সিনেমায় ঝড় তোলে। সিনেমাটি মুক্তির পর থেকে টানা হাউসফুল যাচ্ছে। এখনও অধিকাংশ সিনেমা হলে চলছে টিকিট সংকট। দুই-তিন দিন আগে টিকিট সংগ্রহ করে সিনেমাটি দেখার সুযোগ পাচ্ছেন দর্শক। বিষয়টি সিনেমা অঙ্গনের জন্য ইতিবাচক নতুন ইতিহাস। তবে এই সিনেমার শিল্পীদের অহংকারে ইতিহাস পাল্টে যাওয়ার পথে। হাওয়ায় উড়তে উড়তে ডুবে গেলেন ‘বিতর্কে’। সাফল্যের মাঝে ‘হাওয়া’র গায়ে কিছু বিতর্ক লেগেছে। এতে অভিনয় করা শিল্পীদের একাধিক মন্তব্য নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় সমালোচনা হচ্ছে।

প্রথমে সিনেমাটির পরিবেশক, জাজের কর্ণধার আব্দুল আজিজের একটি মন্তব্য বিতর্কের জন্ম দেয়। এরপর ক্রমান্বয়ে বিতর্কে পড়েন ‘হাওয়া’র অভিনেতা চঞ্চল চৌধুরী, সুমন আনোয়ার প্রমুখ। এবার বিতর্কের স্রোতে গা ভাসালেন ‘হাওয়া’র নায়িকা নাজিফা তুষি। নাজিফা তুষি ছোট পর্দার অভিনেত্রী। শোবিজে তার শুরুটা মডেলিং দিয়ে। ২০১৪ সালে লাক্স-চ্যানেল আই সুপারস্টার প্রতিযোগিতায় প্রথম রানারআপ হয়েছিলেন তিনি। এরপর নাম লেখান নাটকে। ২০১৬ সালে ‘আইসক্রিম’ সিনেমা দিয়ে তার বড় পর্দায় অভিষেক হয়। তারপর আর নতুন সিনেমায় পাওয়া যায়নি তাকে। প্রথম সিনেমার পর নাটক-ওয়েব সিরিজে কাজ করলেও অভিনয়ের দ্যুতি ছড়াতে পারেননি তুষি। নাটক দিয়ে ক্যারিয়ার শুরু হলেও নাটককে অবহেলা করছেন তিনি। নাটকে অভিনয় করবেন কিনা, এমন প্রশ্ন করলেই তার উত্তর হয় নাটকে কাজ করবেন না। দীর্ঘ ৬ বছর বিরতির পর নতুন সিনেমা ‘হাওয়া’ দিয়ে আবারও বড় পর্দায় তুষি। এই সিনেমার ‘সাদা সাদা কালা কালা’ গানটি রীতিমতো ভাইরাল। এই গানটি শোনেনি এমন মানুষ দেশে খুঁজে পাওয়া কঠিন। সিনেমাটিতে ‘গুলতি’ চরিত্রে অভিনয় করে ভূয়সী প্রশংসা পাচ্ছেন তিনি। তবে সিনেমার চেয়ে নেতিবাচক সমালোচনায় জড়িয়ে আলোচনায় তুষি। তরুণ এই নায়িকা বেশ বিতর্কে জড়িয়ে গেছেন।

সোমবার (১ আগস্ট) সন্ধ্যায় একটি মন্তব্য করে পড়েছেন বিপাকে। এদিন সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায় ‘হাওয়া’ সিনেমার টিম শ্যামলী স্কয়ারে যায় দর্শক প্রতিক্রিয়া দেখার জন্য। এসময় গণমাধ্যমের মুখোমুখি হন নাজিফা তুষি। এসময় সিনেমার অভিনয়শিল্পী নাজিফা তুষি সেখানে থাকা ‘পরাণ’ এবং ‘দিন: দ্য ডে’ সিনেমার পোস্টার সরিয়ে দেয়ার নির্দেশ দেন প্রেক্ষাগৃহ কর্তৃপক্ষকে। তুষি সেখানে উপস্থিত সাংবাদিকদের সামনে বলেন, এখানে ‘পরাণ’, ‘দিন: দ্য ডে’ সিনেমার পোস্টার কেন? এগুলো এখান থেকে সরানোর বিষয়টি নিয়ে শ্যামলী প্রেক্ষাগৃহের ম্যানেজার বলেন, ‘যখন এই কথা বলে আমি সেখানে ছিলাম না। পরে আমার একজন কর্মকর্তা জানান যে, ‘হাওয়া’ সিনেমার অভিনয়শিল্পী ‘পরাণ’ আর ‘দিন: দ্য ডে’ সিনেমার পোস্টার সরিয়ে দেয়ার কথা বলেন।’ যদিও বিষয়টা খুব অস্বাভাবিক নয়। নিজের সিনেমার পোস্টারের সামনে দাঁড়িয়ে বক্তব্য দেয়াতে দোষের কিছু নেই। তবে তুষির এমন কাণ্ড সহজভাবে নেয়নি নেটিজেনরা। ফেসবুকের বিভিন্ন গ্রুপ, পেজে তার ওই ঘটনার ভিডিও ছড়িয়ে পড়েছে। অনেকেই তুষির এমন কাণ্ডের তীব্র সমালোচনা করছেন।
চিত্রনায়িকা পরীমণি এক ফেসবুক স্ট্যাটাসে লিখেন, এটা সরান! মনে হয় গায়ে ‘গু’ লাগছে ম্যাডামটি। তিনি কারও নাম উল্লেখ না করলেও স্ট্যাটাসটি তুষিকে ইঙ্গিত করে তা স্পষ্ট। অনেকেই এই বিষয় নিয়ে সমালোচনা করেছেন।

দুটি সিনেমার পোস্টার সরিয়ে ফেলার কারণ ব্যাখ্যা করে গণমাধ্যমে তিনি বলেন, ‘আমি একজন শিল্পী। তাই অন্য শিল্পীর কাজকে কেন অসম্মান করব? যাদের সিনেমার পোস্টার আমি সরানোর কথা বলেছি, ব্যাপারটি বুঝে তারা কিন্তু কিছুই বলছেন না। অথচ বাইরের কিছু মানুষ এটিকে রংচং লাগিয়ে বিতর্ক ছড়াচ্ছে। তাদের উদ্দেশ্য ভালো নয়।’ তুষির এমন যুক্তিতে বোঝা যাচ্ছে মানুষের কোনো কাজ নেই তার বিরুদ্ধে লেগে থাকাই তাদের কাজ। বিষয়টি খুবই দুঃখজনক।

অন্য সিনেমার পোস্টারের সামনে সাক্ষাৎকার দিতে যদি এতো সমস্যা হয়, বা নিজের সঙ্গে অন্যের সিনোমার প্রচার হয় এমনটাই যদি ভেবে থাকেন এই নায়িকা, তাহলে অন্যভাবে চিন্তা করতে পারতেন। অন্যের সিনেমার পোস্টার না সরিয়ে ‘হাওয়া’ সিনেমার পোস্টার নিরাপদ জায়গায় নিয়ে মিডিয়ায় কথা বলতে পারতেন। মানুষকে কষ্ট দিয়ে ব্যাখা দেয়ার আগেই ইতিবাচক চিন্তা করলে ব্যাখ্যা দিতে হয় না। সব কিছুতেই ছোট মানুষ বলে পার পাওয়া যায় না।

বিনোদন সাংবাদিকের অভিযোগও কম নয়। ফোন দিলে কথা বলার সময় পান না। বিষয়টি নেতিবাচক হিসাবেই নেবেন তারা। এই তরুণ নায়িকা গণমাধ্যমে আবার বলছেন, ‘আমাকে যদি সবাই সহযোগিতা না করেন, টেনে ধরেন, তাহলে তো এখানে কাজ করতে পারব না।’ তুষির জানা উচিত আজকের ‘তুষি’ মিডিয়ার কারণে। সাংবাদিকরাই তুষি হয়ে ওঠার জন্য সহযোগিতা করেছেন। এমন আচরণ কিসের ইঙ্গিত দেয়? তাহলে কি তুষি অতীত ভুলে গিয়েছেন? অতীত ভুলে বড় হওয়া যায়, কিন্তু প্রকৃত শিল্পী বা মানুষ হওয়া যায় না। ধরে নিলাম ছোট মনুষ হিসাবে এসব ভুল করেছেন। কিন্তু নাজিফা তুষির বিতর্ক এবার প্রথম নয় এর আগে গত ফেব্রুয়ারি মাসে বইমেলায় গিয়ে বিতর্কে পড়েছিলেন নাজিফা তুষি। স্বাস্থ্যবিধি না মেনে মেলায় প্রবেশের কারণে তাকে জরিমানা করেন ভ্রাম্যমাণ আদালত। ওই সময় ম্যাজিস্ট্রেটের সঙ্গেও বাকবিতণ্ডায় জড়ান তুষি। এমনকি জরিমানাকে ‘হেনস্তা’ বলেও দাবি করেছিলেন তিনি। শুধু তুষি নয় প্রচারণায় গিয়ে সিনেমার কলাকুশলীরা অনেকেই বাধিয়েছে সমালোচনা। নিজের সিনেমার প্রশংসা করতে গিয়ে সম্প্রতি ছোট পর্দার অভিনেতা চঞ্চল চৌধুরী বড় পর্দার সব সিনেমা নিয়ে আক্রমণমূলক বিস্ফোরক মন্তব্য করে সমালোচিত হয়েছেন।

তারপর ‘মেধাশূন্য আর দখলদারিত্বের রাজত্বে নতুন হাওয়া বইছে। বাংলার আপামর মানুষ মেধাবীদের বুকে টেনে নিয়েছে। পরচর্চা আর ঈর্ষান্বিত না হয়ে আপনার মেধার বিকাশ ঘটান।’ ফেসবুক স্ট্যাটাসে এভাবেই খোঁচা দেন নির্মাতা ও অভিনেতা সুমন আনোয়ার। তাহলে কি ইন্ডাস্ট্রিতে সবাই মেধাশূন্য? সব মেধা কি হাওয়ায় উড়ে যাচ্ছে? ‘হাওয়া’ সিনেমা ভালো হয়েছে, সিনেমা হয়ে উঠেছে। কিন্তু এমন না যে এই সিনেমায় যারা কাজ করেছেন তারাই মেধাবী এমন যুক্তি মানতে নারাজ। সুমন আনোয়ার ও চঞ্চল চৌধুরীর মত গুণী শিল্পীদের কাছে এমন কথা কারও কাম্য নয়। তুষি ছোট মানুষ বলে পার পেলে কিন্তু তারা কি বলে ব্যাখা দেবেন তা শুধু তারাই জানেন।

হিসেবটা সরল অঙ্কের একজন অভিনয় শিল্পীকে সরল ও বুদ্ধিদীপ্ত হতে হয়। একজন শিল্পীর জীবনদর্শণে সাধারণ মানুষ সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় চিন্তা দেখতে পায়। তার জীবনযাপনের পুরো চিত্র সমাজে প্রভাব ফেলে। সে ইতিবাচক হোক, আর নেতিবাচক হোক। শিল্পীদের সামাজিক দায় সাধারণ মানুষের চেয়ে একটু বেশি। তাই তাদের খুবই দায়িত্বশীল আচরণ করা প্রয়োজন শিল্পী হওয়ার আগে মানুষ হওয়া জরুরি। মানুষ হতে না পারলে সব অর্জন হাওয়ায় উড়ে যাবে। ‘হাওয়া’ শুধু আকাশে নয় জমিনেও উড়ায় ‘মানুষের চিন্তা’। যোগ-বিয়োগ যতই করি না কেন দিন শেষে ভালো সিনেমার প্রত্যাশা সবার। বাংলা সিনেমায় শুভ চিন্তার হিসাব হোক সরল অঙ্কে। বিশুদ্ধ হাওয়ার স্পর্শে জয় হোক দর্শকের হৃদয়। ‘হাওয়া’য় উড়ে কেউ যেন ডুবে না যায় বিতর্কে, ভুলে। 

 

মানবকণ্ঠ/পিবি


poisha bazar