সফলতার সিঁড়িতে মেহজাবীন


poisha bazar

  • অচিন্ত্য চয়ন
  • ২৫ এপ্রিল ২০২১, ২১:৫৫,  আপডেট: ২৫ এপ্রিল ২০২১, ২১:৫২

বাংলা নাটক ভালো হচ্ছে না! নাটকের গল্প ভালো না, শিল্পীরা অভিনয় ভালো করতে পারছেন না— এমন হাজারো বাক্যে হতাশার সুর। মোটের উপরে কথা বললে প্রতিটি বাক্যে হতাশার সুর বাজবেই। ভালো নাটক নির্মাণ হচ্ছে না তা নয়— ভালো নাটকও নির্মাণ হচ্ছে, শিল্পীরা অভিনয়ও ভালো করছেন। পরিকল্পনা, পরিশ্রম ও চেষ্টা এই তিনে ভালো কাজ করা সম্ভব। এই সম্ভবের মাঝেও হতাশার সুর বাজবে— এটাই বাস্তবতা। এসব হতাশার বাক্য মিথ্যে প্রমাণ করেছেন, সব হতাশা ভেসে দিয়েছেন পরিশ্রমের স্রোতে। তবে তিনি হাঁটছেন উজানে, উজানে হাঁটার কারণেই বাংলা নাটকে দর্শক ফেরাতে পেরেছেন নীরবে। নিজের অভিনয়ের শক্তিতে নাটকের আমল পরিবর্তন করেছেন। দর্শকদের নাকটমুখি  করতে পেরেছেন। তার অভিনীত নাটক দর্শক নীরবে দেখছেন, ক্রমেই ভক্ত হচ্ছেন তার, ভক্ত হচ্ছেন অভিনয়ের। বলছিলাম লাক্স তারকা মেহজাবীন চৌধুরীর কথা— যিনি অভিনয় জীবনের এক দশক পার করেছেন দর্শকের ভালোবাসায়। শুধু সময়ই করেননি, ক্যারিয়ারে যুক্ত করেছেন সফলতার পালক। সেই পালকেই উড়ছেন।  

প্রতিটি মানুষের যাত্রা শুরু লক্ষ্য এবং স্বপ্ন নিয়ে। মানুষের জীবন-যাপনে থাকে প্রত্যাশা কিন্তু পরিপূর্ণ নয়। তারকারাও এর বাইরে নয়। ‘তুমি থাকো সিন্ধু পাড়ে’ এই নাটকই ছিল মেহজাবীনের প্রবেশ পথ। সেই যে ভালো অভিনয়ের স্বপ্ন— স্বপ্ন নিয়ে পথ চলতে চলতে পার করেছেন এক দশক। অভিনয়ে মেহজাবীন চৌধুরীর অভিষেক হয় আজ থেকে ১০ বছর আগে। ২০১০ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ইফতেখার আহমেদ ফাহমির পরিচালনায় মাহফুজ আহমেদের বিপরীতে মেহজাবীন অভিনীত প্রথম নাটক ‘তুমি থাকো সিন্ধু পাড়ে’ প্রচারিত হয়। এরপর একে একে কাজ করেন ‘মাঝে মাঝে তব দেখা পাই’, ‘কল সেন্টার’, ‘মেয়ে শুধু তোমার জন্য’, ‘আজও ভালোবাসি মনে মনে’, ‘হাসো আন লিমিটেডসহ’ বেশকিছু নাটকে। সেই থেকে নিজস্বতা কিংবা স্বকীয়তা নিয়ে অভিনয় করছেন মেহজাবীন। আজ পর্যন্ত অভিনয়ে তার নিজেকে তৈরি করার বিরামহীন ছুটে চলা। ভিন্নধর্মী গল্পের নাটকে অসাধারণ অভিনয় করে ইতোমধ্যে দর্শকমনে স্থান করে নিয়েছেন এই সুদর্শনী। তিনি এখন বাংলা নাটকের প্রিয়মুখ।

দর্শক প্রিয়তা নিয়ে এই লাক্স তারকা বলেন—  ‘প্রতিটা মানুষের জীবনে ভালো সময় আসে কিন্তু সঠিকভাবে কাজে লাগানোর বিষয় থাকে। সেই সময়টাকে সঠিকভাবে লালন করতেও জানতে হয়। আমি সব সময় এসব সময় লালন করি। সময়কে মূল্য দিয়ে পথ না চললে তার চূড়ান্ত মাশুল দিতে হয়। সময় ও কাজের প্রতি আমি কখনো অবহেলা করি না। কোনো অসত্ স্বপ্নও দেখি না। রাতারাতি বড় অভিনেত্রী হওয়ার নেশা থেকেও যোজন দূরে ছিলাম, এখনো দূরেই আছি। আমি শুধু দর্শকের ভালোবাসা চাই।’

তার চিন্তা-চেতনায় বলে দেয় কতটুকু যত্ন নিয়ে নিজের কাজ করেন। যেভাবেই পেরেছেন তিনি মগ্ন ছিলেন অভিনয়ে নিজেকে দক্ষ করে গড়ে তোলার। ফলে মেহজাবীন অভিনয়ে এক দশকের পথচলায় হয়ে উঠেছেন এ প্রজন্মের সেরা একজন অভিনেত্রী। প্রায় অর্ধযুগ ধরে শীর্ষ অভিনেত্রী এবং একইসঙ্গে সবচেয়ে চড়া মূল্যের অভিনেত্রী হিসেবে চাহিদাসম্পন্ন তারকার নাম মেহজাবীন। ‘তুমি থাকো সিন্ধু পাড়ে’ থেকে দূরে, বহু দূরে আলোকিত অভিনেত্রীর আসনে তার স্থান। প্রবাসে জন্ম ও বেড়ে ওঠা হলেও সুন্দরী প্রতিযোগিতার শীর্ষ মুকুট পরার পর যে একজন শিল্পী হিসেবে দায়িত্ব দাঁড়ায় তা দারুণভাবে মেনে চলেছেন তিনি। এ কারণেই মেহজাবীন অনন্যা। বাংলা নাটকের কথা আসলেই তার অভিনয়ের কথা চলে আসে। পরিচালক বা দর্শক কেউই তাকে ছাড়া বাংলা নাটকের চরিত্র ভাবতে পারেন না। একজন অভিনয় শিল্পী হিসেবে মেহজাবীনের স্বপ্ন ভালো অভিনয় দিয়ে দর্শকদের মন জয় করা। তিনি এই কাজে সফল।

সফলতা নিয়ে মেহজাবীন বলেন— ‘আমি কতদূর এসেছি দর্শকদের ভালোবাসার কারণে। তারা প্রতিনিয়তই উত্সাহ দিয়ে যাচ্ছেন ভালো কাজের জন্য, আর আমি সেটাই চেষ্টা করছি। চেষ্টা করলে ভালো কাজ করা অসম্ভব কিছু না। দর্শকরা আমার কাজ দেখে নানাভাবে সেগুলোর প্রতিক্রিয়া জানান। তাদের এ ভালোবাসাই আমাকে সবসময় ভালো কাজের অনুপ্রেরণা দেয়। দর্শকদের ভালোবাসা নিয়েই কাজ করে যেতে চাই। তাদের এই ভালোবাসা যেন সবসময় পাই— এটাই আমি সব সময় প্রত্যাশা করি।’

জীবনের অপর নাম যুদ্ধ, যুদ্ধের অপর নাম পেশা। আর সেই পেশা যদি হয় ক্রিয়েটিভ বা অভিনয়, তাহলে তো আরো কঠিন যুদ্ধে সামিল হতে হয়। মেহজাবীন সেই যুদ্ধে সফল, সফলভাবে দর্শকদের মনে জায়গা করে নিয়েছেন। সেই লাক্স সুন্দরী থেকেই একটু একটু করে নিজেকে গড়ে তুলেছেন। ইউটিউবের ভিউ বিচারের দিক থেকেও সবার চেয়ে এগিয়ে রয়েছেন এ অভিনেত্রী। বাংলা নাটকের ইতিহাসে প্রথম কোটি ভিউয়ের মাইলফলক ছুঁয়েছিল মিজানুর রহমান আরিয়ান পরিচালিত ‘বড় ছেলে’ নাটক। এ নাটকের মধ্য দিয়ে ২০১৭ সালে জিয়াউল ফারুক অপূর্বর সঙ্গে জুটি বেঁধে রেকর্ড গড়ে দর্শকদের কাছে অন্য মাত্রায় পৌঁছে যান মেহজাবীন চৌধুরী। এরপর থেকে ক্রমেই যেন দ্যুতি ছড়াচ্ছেন। সেই থেকে শুরু। এরপর একে একে ভিউয়ের দিক থেকে রীতিমতো চমক দেখাচ্ছেন পর্দার এ সুপারস্টার। তিনিই বাংলাদেশের প্রথম নাট্য অভিনয়শিল্পী যার ২০টি নাটক ইউটিউবে ১ কোটি বারেরও বেশিবার দেখা হয়েছে, যা এখন পর্যন্ত কোনো অভিনয়শিল্পীর জন্য সর্বোচ্চ। সবই পরিশ্রমের ফল।

প্রজন্মের মেধাবী নির্মাতারা যেমন তাকে নিয়ে কাজ করতে আগ্রহী, ঠিক তেমনি অনেক সিনিয়র নির্মাতারাও তাকে নিয়ে কাজ করতে আগ্রহী। আবার খুব ভালো গল্প আছে কোনো নতুন নির্মাতার কাছে তারাও মেহজাবীনকে নিয়ে কাজ করতে আগ্রহী। তার পরও মেহজাবীন এখন অনেক ভেবেচিন্তে কাজ করছেন। কারণ বেশ কয়েকটা বছরে অভিনয়ে নিজেকে ভেঙেচুরে নিজের নতুন এক রূপ দাঁড় করিয়েছেন তিনি। এরই মধ্যে নতুন বছরে মেহজাবীন অভিনীত ভিকি জাহেদের ‘ভুলজন্ম’ ও ‘মজনু’, রুবেল হাসানের ‘মহব্বত’, মহিদুল মহিমের ‘শিল্পী’ নাটকগুলোয় তার অনবদ্য অভিনয় দর্শককে মুগ্ধ করেছে। এই মুগ্ধতা ধরে রাখতেই দেখে-শুনে কাজ করছেন।

এ সময়ের টিভি নাটক, ওয়েব সিরিজ, ইউটিউব নির্ভর প্রডাকশন বা বিজ্ঞাপনে যে কোনোটিতেই তার ভিন্নতার চিহ্ন। প্রত্যেক অভিনেত্রী একটি নিজেস্ব ঢঙে সেরা পারফর্মেন্স করার চেষ্টা করেন। মেহজাবীন প্রতিনিয়ত নিজেকে ভেঙে এগিয়ে যাচ্ছেন। বিভিন্ন চরিত্রে নিজেকে পর্দায় এনে দর্শক থেকে শুরু করে নির্মাতা-প্রযোজকদের অন্যরকম আস্থা অর্জন করেছেন। শুধু তাই অভিনয়ই নয়, যাপিত জীবনেও বিতর্কবিহীন, নির্মাতাদের ভোগান্তিতে না রেখেও যে শীর্ষ অবস্থানে থাকা যায় দীর্ঘদিন— তার প্রমাণ মেহজাবীন।

করোনাকালে এবারের ঈদেও সর্বাধিক নাটকে দেখা যাবে তাকে। তাই মেহজাবীন অভিনয় জগতে এক আদর্শের নাম। করোনাকালীন সময়ে তৈরি মেহজাবীনের নিজেস্ব ইউটিউব চ্যানেলেও দারুণ ভিন্নতা দেখিয়েছেন। সর্বাধিক দর্শকদের ভালোলাগার, মুগ্ধতার জায়গা দখল করেছেন মেহজাবীন।

করোনায় লকডাউনের কারণে আপাতত মেহজাবিন কাজ থেকে বিরতি নিয়েছেন। আগামী ঈদের জন্য এরই মধ্যে তিনি অপূর্বর বিপরীতে মিজানুর রহমান আরিয়ানের ‘ভাগ্যক্রমে’, নিশোর বিপরীতে মাহমুদুর রহমান হিমির ‘মারুন’, ‘দ্বিতীয় সূচনা’ এবং তাহসানের বিপরীতে ভিকি জাহেদের ‘ক্রেডিট শো নাটক’ এ তিনি অভিনয় করেছেন।

ঈদের আগে আর কাজ করবেন কিনা জানতে চাইলে মেহজাবীন বলেন— ‘করোনার সার্বিক পরিস্থিতি এখন যে অবস্থায় রয়েছে, তাতে কাজ করতে পারছি না। সবার আগে সুস্থ ও বেঁচে থাকা। বেঁচে থাকলে অনেক কাজ করা যাবে। তাই আপতত কাজ করছি না। তবে আগামীতে অবস্থা যদি কিছুটা ভালো হয়, তাহলে ভেবে দেখব। সবাই সুস্থ থাকলে আবার কাজ করা যাবে।’

আগামী ঈদ উপলক্ষে যে চারটি নাটকের কাজ শেষ করেছেন তার মধ্যে কোনটি দর্শক প্রিয়তা বেশি পেতে পারে, এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন— ‘এখন পর্যন্ত যে চারটি নাটকে কাজ করেছি তার মধ্যে কোনটা বেশি ভালো বা দর্শক প্রিয়তা পাবে, সেটা আসলে বলা খুব কঠিন। প্রচারের পর দর্শকই সিদ্ধান্ত নিক কোনটা ভালো হয়েছে। তবে আমি চাই সব নাটকই দর্শক অন্তত দেখুক।’

একজন ভালো মানুষই সত্যিকারের অভিনেত্রী হতে পারে। সেই দর্শণেই মেহজাবীন আজকের মেহজাবীন হয়েছেন। তার মতো অধ্যবসায়ী, যার আছে সময়জ্ঞান, সময় মতো শুটিংয়ে যাওয়া যিনি দায়িত্ব হিসাবে দেখেন— সফলতা তো তার জীবনেই উঁকি দেবে। তাই সকলের প্রত্যাশা ছোটপর্দা বিজয়ী এই তারকা অনায়াসেই বড়পর্দা জয় করবেন। নাটকের মতো দর্শকদের বাংলাদেশি ছবির প্রতি মুগ্ধতা তৈরি করবেন মেহজাবীন। এক দশক নয়, তিনি ভালো অভিনয়ের মাধ্যমে দশকের পর দশক দর্শকদের মুগ্ধতায় রাখবেন— এমন প্রত্যাশা সবার।

মানবকণ্ঠ/এসকে






ads
ads