কিংবদন্তির বিদায়

মানবকণ্ঠ
আলাউদ্দিন আলী - ফাইল ছবি

poisha bazar

  • অচিন্ত্য চয়ন
  • ১০ আগস্ট ২০২০, ১৬:২৪

আলাউদ্দিন আলী। একই সঙ্গে সুরকার, সংগীত পরিচালক, বেহালাবাদক ও গীতিকার। বাংলাদেশের সংগীতে সত্তর দশক থেকেই একটি পরিচিত নাম। বাংলা গান তথা বাংলা চলচ্চিত্রের গানে কিংবদন্তি তিনি। সুর, সংগীত ও বেহালাসহ জীবনের সব কিছু রেখেই চলে গেলেন ওপারে।

কিংবদন্তী আলাউদ্দিন আলী আর নেই এমন বাক্য বেদনা দেয়। তবুও মেনে নিতে হয়। এভাবেই সবার চলে যেতে হয় বা হবে। গতকাল বিকেল ৫টা ৫০ মিনিটে রাজধানীর মহাখালীর আয়েশা মেমোরিয়াল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন।

অনেক দিন ধরেই নানা অসুখে ভুগছিলেন আলাউদ্দিন আলী। ২০১৫ সালের ৩ জুলাই তাকে ব্যাংকক নেয়া হলে সেখানে পরীক্ষার পর জানা যায়, তার ফুসফুসে একটি টিউমার রয়েছে। এরপর তার অন্যান্য শারীরিক সমস্যার পাশাপাশি ক্যান্সারের চিকিৎসাও চলছিল। এর আগে বেশ কয়েক দফায় তাকে আয়েশা মেমোরিয়াল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল।

দেশ-বিদেশে চিকিৎসা নিয়ে খানিকটা সুস্থ ছিলেন আলাউদ্দিন আলী। ফিরেছিলেন গানেও। তবে শনিবার ভোর পৌনে ৫টায় হঠাৎ করে তার শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটে। পরে তাকে মহাখালীর আয়েশা মেমোরিয়াল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসক তার শ্বাসকষ্টের সমস্যা দেখে লাইফ সাপোর্টে রাখার পরামর্শ দেন।

গতকাল প্রস্রাব আটকে যাওয়াসহ বেশকিছু নতুন জটিলতা দেখা দেয়। সব রোগ আর জটিলতাকে কাটিয়ে এবার না ফেরার দেশে পাড়ি জমালেন আটবার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারজয়ী এই গীতিকার ও সুরকার। তার মৃত্যুতে শোকের ছায়া নেমে এসেছে সংগীত-চলচ্চিত্রসহ বাংলাদেশের শোবিজে। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিলো ৬৮ বছর।

তার কিংবদন্তি হওয়ার গল্প
কিংবদন্তিদের জীবনের গল্প ইতিহাস, ইতিহাস তার সৃষ্টি। ১৯৫২ সালের ২৪ ডিসেম্বর পুরান ঢাকার নাজিমউদ্দিন রোডে বাবার ভাড়া বাসায় জন্মগ্রহণ করেন আলাউদ্দিন আলী। তার পৈতৃক ভিটা মুন্সীগঞ্জের টঙ্গীবাড়ি উপজেলার বাঁশবাড়ি গ্রামে। বাবাও ছিলেন গানের মানুষ। নাম ওস্তাদ জাদব আলী। চাকরি করতেন বাংলাদেশ বেতারে। মায়ের নাম জোহরা খাতুন।

দেড় বছর বয়সে পুরান ঢাকা থেকে পরিবারের সঙ্গে ঢাকার মতিঝিলের এজিবি কলোনিতে চলে আসেন আলাউদ্দিন আলী। তিন ভাই ও দুই বোনের সঙ্গে সেই কলোনিতেই বড় হন এই গুণী শিল্পী। সংগীতে তার প্রথম হাতেখড়ি বেহালায়, ছোট চাচা সাদেক আলীর কাছে। ছোটবেলাতেই বেহালা বাজানোর জন্য ‘অল পাকিস্তান চিলড্রেনস প্রতিযোগিতায়’ পুরস্কার পান ঢাকার এ শিল্পী।

১৯৬৮ সালে আলতাফ মাহমুদের সঙ্গে বেহালাবাদক হিসেবে চলচ্চিত্রজগতে পা রাখেন। প্রখ্যাত সুরকার আনোয়ার পারভেজসহ বিভিন্ন সুরকারের সহযোগী হিসেবেও কাজ করেছেন। বিভিন্ন চলচ্চিত্রে বেহালা বাজাতে গিয়ে সংগীত পরিচালনার ওপর আগ্রহ সৃষ্টি হয় এই সংগীত পরিচালকের। ১৯৭২ সালে দেশাত্মবোধক গান ‘ও আমার বাংলা মা’ গানের মাধ্যমে জীবনে প্রথম সংগীত পরিচালক হিসেবে আত্মপ্রকাশ ঘটে তার। তারপর বাংলাদেশ টেলিভিশনে নিয়মিত কাজ করলে একই বছর ‘সন্ধিক্ষণ’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে প্রথম সিনেমাতে সংগীত পরিচালনা শুরু করেন তিনি। তিনি ১৯৭৫ সালে সংগীত পরিচালনা করে বেশ প্রশংসিত হন। খ্যাতিমান পরিচালক গৌতম ঘোষ পরিচালিত ‘পদ্মা নদীর মাঝি’ চলচ্চিত্রে সংগীত পরিচালনা করেছেন। এ ছাড়াও তিনি গোলাপী এখন ট্রেনে (১৯৭৯), সুন্দরী (১৯৮০), কসাই এবং যোগাযোগ চলচ্চিত্রের জন্য সংগীত পরিচালনা করেছেন।

করোনা নিয়ে আলাউদ্দিন আলীর লেখা গানটি ‘‘ফিরে যাও শান্তি দাও, আমরা বাঁচতে চাই/ তোমার কারণে বন্দি আমরা, এইবার মুক্তি চাই। মুক্ত আকাশ মুক্ত বাতাস, আমাদের খুব প্রিয়/ অনেক হয়েছে এবার তুমি/ মুক্তি এনে দিও। জ্ঞানী-গুণী হারিয়েছি আমরা এবার তুমি থামো/ বাঁচার অধিকার আছে সবার, এ কথাটি মানো।’’

সর্বশেষ গত ৪ জুনেও একটি গান লিখেছেন আলাউদ্দিন আলী। গানটি রোমান্টিক। ফারজানা আলী বলেন, সেদিন বৃষ্টি হচ্ছিলো। এই মুডই সেই গানটিতে তিনি রেখেছেন। গানের মুখ এরকম: ‘‘ঝিরে ঝিরি বৃষ্টি ঝরে, মেঘ বয়ে যায়/ হারানো প্রিয়তমা মন খুঁজে তোমায়। কোনো এক বৃষ্টি রাতে, হারিয়েছিলে তুমি/ সেই থেকে একা হয়ে আজও আছি আমি।’’ সব মিলিয়ে প্রায় ৩০০টিরও অধিক চলচ্চিত্রে সংগীত পরিচালক হিসেবে ৭ বার এবং শ্রেষ্ঠ গীতিকার হিসেবে ১ বারসহ মোট ৮ বার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার অর্জন করেছেন আলাউদ্দিন আলী। এ ছাড়াও দীর্ঘ ক্যারিয়ারে ভূষিত হয়েছেন নানা সম্মাননা ও স্বীকৃতিতে।

তিনি যেসব গানে অমর হয়ে থাকবেন
বাংলা গান তথা বাংলা চলচ্চিত্রের গানে কিংবদন্তি আলাউদ্দিন আলী। দীর্ঘ ক্যারিয়ারে বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তানের বহু নন্দিত কণ্ঠশিল্পী তার সুরে গান করে নিজেদের সমৃদ্ধ করেছেন। তার লেখা, সুর করা ও সংগীত পরিচালনায় অসংখ্য গান শ্রোতাপ্রিয় হয়েছে। চলচ্চিত্র, বেতার, টেলিভিশন মিলে প্রায় হাজার পাঁচেক গান তৈরি করেছেন তিনি। সে সব গান আজও মুখে মুখে ফেরে। আলাউদ্দিন আলীর জনপ্রিয় ও কালজয়ী কিছু গানের মধ্যে উল্লেখযোগ্য- একবার যদি কেউ ভালোবাসতো, যে ছিল দৃষ্টির সীমানায়, ইস্টিশনের রেলগাড়িটা, দুঃখ ভালোবেসে প্রেমের খেলা খেলতে হয়, হয় যদি বদনাম হোক আরো, ও আমার বাংলা মা তোর, আছেন আমার মোক্তার আছেন আমার ব্যারিস্টার, সুখে থাকো ও আমার নন্দিনী হয়ে কারও ঘরনি, সূর্যোদয়ে তুমি, সূর্যাস্তেও তুমি ও আমার বাংলাদেশ, বন্ধু তিন দিন তোর বাড়ি গেলাম দেখা পাইলাম না, যেটুকু সময় তুমি থাকো কাছে, মনে হয় এ দেহে প্রাণ আছে, এমনও তো প্রেম হয়, চোখের জলে কথা কয়, সবাই বলে বয়স বাড়ে, আমি বলি কমে রে, আমায় গেঁথে দাওনা মাগো, একটা পলাশ ফুলের মালা, শত জনমের স্বপ্ন তুমি আমার জীবনে এলে, তোমাকে চাই আমি আরও কাছে, এই দুনিয়া এখন তো আর সেই দুনিয়া নাই, কেউ কোনোদিন আমারে তো কথা দিল না, পারি না ভুলে যেতে, স্মৃতিরা মালা গেঁথে, জন্ম থেকে জ্বলছি মাগো, ভেঙেছে পিঞ্জর মেলেছে ডানা। আরও আছে আমার মনের ভেতর অনেক জ্বালা আগুন হইয়া জ্বলে, হায়রে কপাল মন্দ চোখ থাকিতে অন্ধ, ভালোবাসা যতো বড়ো জীবন তত বড় নয়, প্রথম বাংলাদেশ, আমার শেষ বাংলাদেশ, বাড়ির মানুষ কয় আমায় তাবিজ করেছে, আকাশের সব তারা ঝরে যাবে, এ জীবন তোমাকে দিলাম, কেন আশা বেঁধে রাখি, সাগরিকা বেঁচে আছে তোমারই ভালোবাসায়, দিন কি রাতে, আমার মতো এত সুখী নয় তো কারো জীবন ইত্যাদি।

বাংলা গানের কিংবদন্তির প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা।

মানবকণ্ঠ/এইচকে

 





ads







Loading...