হারমোনিয়ামের জাদুকর শাকুর

মানবকণ্ঠ
হারমোনিয়ামের জাদুকর মো. শাকুর

poisha bazar

  • হাসনাত কাদীর
  • ০৬ আগস্ট ২০২০, ১২:৩২

করোনাকালে থেমে আছে স্টেজ শো। স্টুডিওতে রেকর্ডিং বন্ধ। কেমন আছেন সঙ্গীতাঙ্গনের বাদকেরা? উত্তর খুঁজতে গিয়ে হারমোনিয়ামের জাদুকর শাকুরের সঙ্গে কথা বলেছেন হাসনাত কাদীর

মাত্র সাত বছর বয়সে হারমোনিয়ামের সাথে প্রেম। তারপর ১৯৮৯ সালে গুরুমুখী শিক্ষার শুরু ওস্তাদ জাকির হোসেনের কাছে। সমৃদ্ধ হয়েছেন ওস্তাদ নিয়াজ মোহাম্মদ চৌধুরীর সান্নিধ্যে। আর এখন তিনি সংগীতাঙ্গণে অপরিহার্য বাদক। সমানতালে বাজিয়ে চলেছেন স্টেজ, টিভি, স্টুডিও প্রোগ্রাম আর রেকর্ডিং সেশনে। বলছিলাম হারমোনিয়ামের জাদুকর মো. শাকুরের কথা।

হারমোনিয়ামে লিকার্ডো স্টাইলে বিমোহিত করে রেখেছেন তিনি। দখল আছে তবলা, ঢোল, নালের উপরও। মগ্ন আছেন শাস্ত্রীয় সংগীত চর্চায়। করোনাকাল কেমন কাটছে জানতে চাইলে বললেন, সময়টা কঠিন। অন্যান্য সেক্টরের মতো মিউজিক ইন্ডাস্ট্রিও রিদম হারিয়েছে। কিন্তু রুটি-রুজির বিপর্যয়ের চেয়ে ইদানিং অন্য ভাবনা মনকে পীড়া দিচ্ছে।

কী সেই ভাবনা? তিনি বললেন, হারমোনিয়াম আমার কাছে রাঁধার মতো। আমি কৃষ্ণ। আমার তো বয়স হচ্ছে। আমি নশ্বর। কিন্তু হারমোনিয়াম চিরযৌবনা। আমার পরে কে তাঁর কোমল অঙ্গে আঙুল বুলিয়ে প্রেমের সুর তুলবে? রাঁধাকে কে ভালোবেসে বাঁচিয়ে রাখবে?

শাকুর এক মুহূর্ত থেমে বললেন, ৯০ দশকের পর থেকে হারমোনিয়াম কমতে শুরু করে। আর এখন হারমোনিয়াম যে সাধনার বস্তু অনেকেই বিশ্বাস করেন না। ক্রমাগত চর্চা কমছে। খুব দুঃখ হয় এই ভেবে যে, আমার পরে হারমোনিয়ামের প্রেমিক হবে কে? হলে তো তার স্টমাক থাকা চলবে না।

বললাম, হায়দার হোসেনের তুমুল জনপ্রিয় গান 'আমি ফাইসা গেছি'। তাতে মনে দোলা দেয়া হারমোনিয়ামের সুর আপনার আঙুলে তোলা। অনেক গানেরই সাফল্যের নেপথ্যে আছে হারমোনিয়াম। কিন্তু একজন হারমোনিয়াম বাদকের জীবনে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা কেমন?

মো. শাকুরের ঠোঁটের কোণে হাসি। তিনি বললেন, হারোমোনিয়াম বাজিয়ে জীবন ধারণ দুরূহ। তবে আমার হারমোনিয়াম বাদে অন্য পেশা নাই। ক্ষুধা না সুর, জীবন না প্রেমের গুরুত্ব বেশি- এ প্রশ্ন অনেকবার মনে হয়েছে। ২০০২-এর এক সন্ধ্যায় পথে হাঁটতে হাঁটতে মনে হলো হারমোনিয়ামের কদর কমে যাচ্ছে। কীবোর্ড কিনলাম কিছু বাড়তি উপার্জনের জন্য। কিন্তু বাজাতে গিয়ে বুঝলাম প্রেম পাচ্ছি না। হারমোনিয়াম যেন করুণ চোখে আমাকে ডাকছে। সেই রাতে মনে হলো- হারমোনিয়াম ছাড়া জীবন মৃত্যুর সমান। শত কষ্টেও একে ছাড়ব না।

হারমোনিয়াম বাজিয়ে ২০১২ সালে রাজধানীর আজিমপুরে একটি ফ্ল্যাট কেনেন মো. শাকুর। এই তাঁর সম্বল। তিনি বলেন, হারমোনিয়াম আমাকে অর্থনৈতিক প্রাচুর্য দেয়নি। তবে ঐশ্বরিক আনন্দ দিচ্ছে। আমার স্ত্রী, পুত্র-কন্যা সুরসাধনাকে সম্মান করেন। আর স্ত্রী রান্না ঘরের অভাব আটকে দিয়েছেন দরজায়। তাঁর প্রতি আমার আন্তরিক কৃতজ্ঞতা।

শাকুর যখন গুনগুনিয়ে গান করেন তখন গোপনে কান খাড়া করে শোনেন তাঁর স্ত্রী। বরাবরই মুগ্ধ হন আর উৎসাহ দিয়ে তাকে গাইতে বলেন। স্ত্রীর ইচ্ছা পূরণে প্রথমবারের মতো মৌলিক গান গাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন শাকুর। সেই গানে ব্যবহৃত সকল বাদ্যযন্ত্র বাজাবেন তিনি একাই। হোসাইন রনির লেখা 'আবার যদি হারিয়ে যাই' শিরোনামের গানটির সুর ও সঙ্গীত পরিচালনা করছেন মুনতাসির তুষার।

মো. শাকুর নিজ ওস্তাদদের সঙ্গে ছাড়াও বাজিয়েছেন ওস্তাদ অনিল কুমার সাহা, ওস্তাদ অসিত দে, ওস্তাদ করিম শাহাবুদ্দিন, ওস্তাদ আক্তার সাদমানসহ বিভিন্ন গুণীজনের সঙ্গে। এছাড়া শিল্পী আরিফুল ইসলাম মিঠু, সানি জুবায়ের, প্রিয়াঙ্কা গোপ, রাজশ্রী দাস, সারথী চ্যাটার্জীসহ দুই বংলার তরুণ প্রজন্মের অনেকের সঙ্গেই তিনি নিয়মিত বাজাচ্ছেন।

১৯৬৫ সালে পুরান ঢাকায় মো. শাকুরের জন্ম। বাবা মো হারুন কাওয়াল ও চাচা আশরাফ কাওয়াল নিজ নামে পরিচিত ছিলেন সঙ্গীতাঙ্গণে। কাওয়াল পরিবারের এই সন্তান বললেন, বাদ্যযন্ত্রে গান হয়ে ওঠে মিঠে। কিন্তু বাদকেরা বরাবরই অবহেলিত। তাই যন্ত্রশিল্পীদের জন্য সরকারি-বেসরকারি পৃষ্ঠপোষকতা এখন সময়ের দাবি।

মানবকণ্ঠ/এইচকে





ads







Loading...