ফিল্ম রিভিউ

রাহগির : কোন দিকে বাঁক নেয় অভাব?

অঙ্কিত বাগচী

মানবকণ্ঠ
রাহগির - পোস্টার।

poisha bazar

  • অনলাইন ডেস্ক
  • ২৯ নভেম্বর ২০১৯, ১৬:২৫

যে দুর্গম পথ দিয়ে নাথুনি হেঁটে যায় তার পাশেই দাঁড়িয়ে থাকে অভাব। নাথুনি কাঠ নিয়ে এলোমেলো রাস্তা দিয়ে ফিরতে ভয় পায়। আদিবাসী আন্দোলনের কর্মী নাথুনির স্বামী সরকারি খাদানের কাজ আটকাতে গিয়ে গুলিবিদ্ধ হয়েছে। অভাবের সংসারের হাল একাই সামলাতে হচ্ছে তাকে। কাজের সন্ধানে নাথুনি শহরে যাওয়ার পথ ধরে। গান করতে করতে এক পুরুষ পিছু নেয় তার। এর আগেও নাথুনি পুরুষের আক্রমের সামনে পড়েছে, দুজন পুরুষ ধর্ষণ করতে উদ্যত হলে সে কোনোভাবে কুড়ুল বের করে নিজেকে রক্ষা করে। আগের ঘটনা মাথায় রেখে নাথুনি আবার কুড়ুল বের করে। লাখপতি জানায় যে সে সাধারণ মানুষ, ক্ষতিকারক কেউ না। পাহাড়ি পথ বেয়ে ঝর্ণার ধার দিয়ে তারা এগিয়ে চলে।

লাখপতি এক ভবঘুরে মানুষ, অভাব অনটনের মধ্যেও সে আনন্দ খুঁজে নেওয়ার চেষ্টা করে। মাঝে মাঝে নিজের নাম নিয়ে রসিকতা করতেও তার আটকায় না। কোনোদিন তার সংসার ছিলো না, তার কোনো পিছুটান নেই। নিজের মত আকাশের দিকে তাকিয়ে গান গেয়ে সে রাস্তা দিয়ে এগিয়ে যায়। অন্যদিকে নাথুনি একটা সংসার করে, নিজের সাথে স্বামী সন্তানদের ভাত জোগাড়ের দায়িত্ব তার কাঁধে। সকাল সকাল কাজ খুঁজে পয়সা রোজগার করে ঘরের জন্য খাবার, স্বামীর জন্য রেডিওর ব্যাটারি, মেয়ের জন্য লাল ফিতে নিয়ে আসতে হবে তাকে। রাস্তার এই হঠাৎবন্ধু লাখুয়া (লাখপতি) তাকে বলে শর্ট কাট রাস্তা চিনিয়ে নিয়ে যাবে।

শর্ট কাটে যাওয়ার তাগাদা থেকে নাথুনি লাখুয়ার ওপর ভরসা করে। লাখুয়া আপনমনে চড়াই উৎরাই রাস্তা পেড়িয়ে পাহাড়ি ঝর্ণার পাশ দিয়ে এগিয়ে যেতে থাকে। কিন্তু এই শর্টকাট রাস্তা যে কিভাবে ক্রমাগত কঠিন হতে থাকবে তা কি সে জানত। চলচ্চিত্রের প্রতিটা ছন্দে ছন্দে মনে হতে থাকে লাখুয়া একটা খোঁজ নিয়ে বেড়িয়েছেন। কিসের খোঁজ কেউ জানে না। কেউ জানে না সে কোন দিকে নিয়ে যাচ্ছে নাথুনিকে। রাস্তায় অপরিচিত পুরুষের যে রূপ দেখে তার বিশ্বাস নড়ে গেছিল সে বিশ্বাস লাখুয়া ক্রমাগত অর্জন করতে থাকে বন্ধু হয়ে। রাস্তা দিয়ে যেতে যেতে দুই বন্ধু নিজেদের দুঃখ দুর্দশার গল্প করতে থাকে, একে অন্যের দুঃখ কষ্ট ভাগ করে নিতে থাকে। রাস্তা দিয়ে যেতে যেতে হঠাৎ তারা একজন ভ্যান চালককে দেখতে পায়। নাথুনি সমস্যায় কথা ভেবে পিছিয়ে আসে। লাখুয়া জানায় তাদের এসব ঝুট ঝামেলায় পা দেওয়া উচিত হবে না। তারা এগিয়ে যেতে থাকে।

তাদের কানে বার বার বাজতে থাকে ভ্যান চালকের সাহায্যের আর্তনাদ। অনাহারে থাকা দুটো মানুষ যাদের একদিন কাজ না করলে অভুক্ত থাকতে হয়, তাদের কাছে বিবেকের দিকে তাকানোর থেকে অনেক গুরুত্বপূর্ণ শহরের দিকে কাজের জন্য এগিয়ে যাওয়া। তবুও তারা বিবেকের কথা শোনে, অনিশ্চয়তার দিকে এগোয়। ভ্যানচালক চোপাট লাল তাদের দেখে বলে যে, দুজন অসুস্থ মানুষকে শহরে নিয়ে যাওয়ার সময় তার মোটরচালিত ভ্যানটি কাদা রাস্তায় পড়ে চাকা আটকে গেছে। তারা দুজন শহর পর্যন্ত ঠেলে সাহায্য করলে তিনি উপকৃত হবেন। যে গরিবের বাড়িতে পেটের চিন্তার থেকে আর বড় কিছু থাকে না সেখানে দাঁড়িয়ে নাথুনি আর লাখুয়া মানবিকতার রাস্তা ধরে।

সামাজিক জীবনে মনুষ্যত্ব যেভাবে তলানিতে এসে ঠেকেছে, সেখানে রাহাগির অত্যন্ত সফল একটি প্রকাশ। প্রতিটা দৃশ্যায়নে নির্মাতা যে নিজের আগের কাজ থেকে সরে সম্পূর্ণ নতুন এক ধারার দিকে এগিয়ে যাচ্ছেন তার প্রমাণ মেলে 'রাহগির' ছবিতে।

প্রফুল্ল রায়ের একটি কাহিনীর ওপর ভর করে তৈরি হয়েছে চিত্রনাট্য। পরিচালক এবং তার সন্তান চিত্রগ্রাহক ঈশান ঘোষ ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে যে দিগন্ত বিস্তৃত ফ্রেম দেখেছেন তা দর্শকের কাছে ক্রমশ সিনেমা থেকে দর্শন হয়ে উঠেছে। শব্দের ক্ষেত্রে অনির্বাণ সেনগুপ্তের কাজ অনবদ্য। এর আগে পরিচালক যখন ছবি বানিয়েছেন তখন ভারতবর্ষের আর্থ সামাজিক সমস্যা, দুর্দশা, রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব প্রকটভাবে পর্দায় ধরা দিয়েছে। কিন্তু রাহগির সব কিছুকে ছাপিয়ে জীবনের দিকে এগিয়ে গেছে। সিনেমায় দুটো পা সম্পূর্ণ অকেজো হয়ে যাওয়ার পরেও আদিবাসী আন্দোলনের কর্মী নাথুনির স্বামী ওমকারদাস মানিকপুরি এখনও নিজের ছেলে মেয়েকে ঐক্যবদ্ধ লড়াইয়ের কথা বলেন। অভিনেত্রী তিলোত্তমা সোম সম্পূর্ণরূপে নাথুনি হয়ে সংসারের সাথে ঠেলে নিয়ে গেছেন ভ্যানটি আর সাথে আদিল হোসেন নাচতে নাচতে জীবনের সমস্ত স্থিরতাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে লাখুয়া রূপে খুঁজে বেড়িয়েছেন আনন্দ। নিরোজ কবি চোপাট লাল হয়ে দু'জন মুমূর্ষু মানুষকে বাঁচিয়ে তোলার সাহস দেখিয়েছেন আর দর্শক তার ব্যাগ থেকে আয়না বের করে দেখে নিয়েছে তারা কে কোথায় আছেন।

আপাতত চলচ্চিত্রে শেষমেশ কি হচ্ছে তা না বলাই থাক। মানবিকতার গন্তব্যে ঠিক কোন দিকে বাঁক নিচ্ছে অভাব আর আমরা প্রত্যেকে ঠিক কোন অবস্থান থেকে সেটা প্রত্যক্ষ করছি সেটাই বিবেচ্য। ছবিটা দেখার সময় ব্যাগের মধ্যে হাত ঢুকিয়ে থাকলে একটা অদৃশ্য আয়না খুঁজে পাওয়ার সম্ভাবনা থাকবে।

লেখক- অঙ্কিত বাগচী : ফিল্ম কিউরেটর, ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল কনসালটেন্ট।

মানবকণ্ঠ/এইচকে




Loading...
ads





Loading...