দায়িত্বশীল সাংবাদিকতায় আমরা অবিচল থাকব


  • অনলাইন ডেস্ক
  • ২৫ অক্টোবর ২০২১, ১৩:২২

দুলাল আহমদ চৌধুরী

১০ বছরে পা দিয়েছে দৈনিক মানবকণ্ঠ। একটি মুদ্রণ কাগজ তার অগণিত পাঠকের ভালোবাসা নিয়ে দীর্ঘ এতটা সময় দাপটের সঙ্গে টিকে আছে, এটা খুবই আনন্দের। আনন্দ এই জন্য যে, একটি দৈনিক কাগজ প্রতিদিন ভোরে তার পাঠকদের সামনে হাজির হয় একটি ‘নতুন পৃথিবী’ নিয়ে। অসংখ্য পত্রিকার মধ্য থেকে পাঠক বেছে নেয় তার পছন্দের সেরা কাগজ।

পাঠকের আস্থা অর্জনই একটি পত্রিকা চলার মূল শক্তি। মানবকণ্ঠ পাঠকের সেই আস্থা অর্জন করেই প্রতিদিন ভোরের সূর্য আলিঙ্গন করছে। ৯ম বর্ষপূর্তির এই শুভলগ্নে মানবকণ্ঠের অগণিত পাঠকের প্রতি অশেষ কৃতজ্ঞতা। পাশাপাশি লেখক, বিজ্ঞাপনদাতা, এজেন্ট, হকারসহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে অফুরান শুভেচ্ছা, আন্তরিক মোবারকবাদ।

২. ভীষণ কঠিন এক সময় অতিক্রম করছে মুদ্রণ সংবাদপত্র শিল্প। নতুন নতুন অদ্ভুত একেক সমস্যা প্রতিনিয়ত টর্নেডোর মতো আঘাত হানছে এই শিল্পে। বিশ্বজুড়ে ডিজিটাল সংবাদ মাধ্যমের দাপটে যখন অনেকটা বিপর্যস্ত প্রিন্ট মিডিয়া, ঠিক সেই মুহূর্তে মহামারীর দুস্কাল সংকটকে আরো প্রকট করে দিয়েছে। অদৃশ্য ভয়ঙ্কর জীবাণুর সঙ্গে প্রতিদিন যুদ্ধ করে কাজ করতে হচ্ছে সংবাদকর্মীদের। কঠোর লকডাউনে যখন মানুষ ঘরবন্দি, তখনও পাঠককে সঠিক খবর দিতে প্রচণ্ড ঝুঁকি নিয়ে মানবকণ্ঠের কর্মীরা ছিলেন মাঠে সক্রিয়।

আতঙ্কের এই দিনগুলোয় বিশ্বে প্রাণ হারিয়েছেন অসংখ্য মিডিয়া কর্মী। বাংলাদেশেও সংবাদপত্র অফিসগুলোতে হানা দিয়েছে করোনা। আমরা হারিয়েছি অনেক সতীর্থ, প্রিয়জন। তাদের প্রতি শ্রদ্ধা। ডিজিটাল মিডিয়ার দাপটে সঙ্কুুচিত হয়ে আসছে কাগজের সংবাদপত্রের আয়ের একমাত্র পথ বিজ্ঞাপন। তারপরও এখনো পাঠকের আস্থা দৈনিক পত্রিকার ওপরই। পাঠক এখনো সকাল শুরু করে গরম এক কাপ চায়ের সঙ্গে একটি পত্রিকা হাতে নিয়ে।

করোনা পরিস্থিতিতে সংবাদপত্র শিল্পের ওপর দিয়ে যে ঝড় বয়ে গেছে, তা এখনো বিদ্যমান। তছনছ হয়ে যাওয়া স্বাভাবিকতা এখনো ফেরেনি। বন্ধ হয়ে যাওয়া প্রায় আড়াইশ পত্রিকার অনেকগুলো এখনো প্রকাশ করা সম্ভব হয়নি। এখনো পুরোপুরি সচল হয়নি করোনায় থমকে দাঁড়ানো দেশের অর্থনীতি। সংবাদপত্র মূলত অর্থনীতি ও ব্যবসা-বাণিজ্যের ওপর নির্ভরশীল একটি শিল্প। অর্থনীতি সচল হলে এবং ব্যবসা-বাণিজ্য স্বাভাবিক হলে সংবাদপত্রের চাকা চলে, আর তা স্থবির হলে পত্রিকাও আর চলতে পারে না।

করোনার থাবায় জর্জরিত অনেক প্রতিষ্ঠানে আটকে আছে বিজ্ঞাপনের পাওনা বিল। অনেক পাঠকের এখনো কাগজের পত্রিকা হাতে নিতে ‘জীবাণু’ ভয় কাজ করে। অনেকে প্রায় দেড় বছর পত্রিকার ডিজিটাল ভার্সন পড়ে অভ্যস্ত হয়ে গেছেন। সবমিলে একটা বিপর্যয়কর অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে।

৩. এহেন পরিস্থিতিতে মানবকণ্ঠ একদিনের জন্যও দমেনি। লকডাউনে কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখেও আমরা হতোদ্যম হইনি। বরং আরো সাহস নিয়ে সামনে এগিয়ে গিয়েছি। প্রতিদিনই সাহস নিয়ে দাঁড়িয়েছি ঘরবন্দি অসহায় মানুষের পাশে। বাংলাদেশের মানুষ সব সময়ই দুর্যোগ মোকাবিলায় সাফল্যের পরিচয় দিয়েছে। করোনা টিকা সংগ্রহে যখন বিশ্বের উন্নত দেশগুলো মরিয়া হয়ে উঠল, তখন বাংলাদেশও পিছিয়ে থাকেনি।  টিকা উৎপাদনকারী দেশগুলোর সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্কের মাধ্যমে তা সংগ্রহের চেষ্টা এখনো অব্যাহত রয়েছে।

এ বছরের শুরুতেই করোনার নিত্যনতুন ভ্যারিয়েন্ট যুক্তরাজ্য, ব্রাজিল, ভারতসহ বিভিন্ন দেশে মরণ ছোবল হানে। প্রতিবেশী দেশ ভারত প্রতিদিন কয়েক হাজার করে মানুষের মৃত্যু দেখছে। এ সময় করোনা সংক্রমণের হটস্পট হয়ে ওঠে বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী কয়েকটি জেলা। দ্বিতীয়বারের মতো লকডাউনে পড়ে দেশ। তবে করোনা সংক্রমণে কঠোর বিধিনিষেধ মেনে চলা ও সারা দেশে গণটিকা কর্মসূচির কারণে এখন পরিস্থিতির অনেক উন্নতি হয়েছে। এর প্রশংসা করেছে খোদ জাতিসংঘও। আমরা এখন আরো দায়িত্ব নিয়ে সামনে এগোতে চাই।

মানবকণ্ঠের উদ্দেশ্য স্পষ্ট। দেশ, মানুষ আর মুক্তিযুদ্ধের প্রশ্নে আমরা আপসহীন। দেশ আর মানুষের সার্বিক উন্নয়নের পক্ষেই আমাদের চিন্তার প্রতিফলন ঘটছে প্রতিদিন। আমরা মনে করি, নিরপেক্ষতাও একটি পক্ষ, সেই বিবেচনায় মানবকণ্ঠ নিরপেক্ষ নয়। মানবকণ্ঠ দেশের পক্ষে।  দেশের মানুষের পক্ষে। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে।

তবে পক্ষপাতহীন মতামতকে সব সময়ই সম্মান জানায় মানবকণ্ঠ। গঠনমূলক সমালোচনা, অদম্য সাহস আর মুক্তিযুদ্ধের চেতনাই আমাদের মূল পুঁজি। চারিত্রিক এই বিকাশ নিয়েই মানবকণ্ঠ এগোতে চায় যুগ-যুগান্তর। দেশ এখন উন্নয়নের মহাসড়কে। আন্তর্জাতিক নানা ষড়যন্ত্র উপেক্ষা করে দেশ যেমন এগোচ্ছে, বাড়ছে মাথাপিছু আয়, গড় আয়ু ও জীবনযাত্রার মান। বাড়ছে শিক্ষার হার, কমছে শিশু ও মাতৃমৃত্যু।

বিশ্বজুড়ে ভয়াবহ মহামারীতে স্বাস্থ্য খাতে আমাদের সক্ষমতা প্রমাণ হয়েছে- বাংলাদেশ আর পিছিয়ে নেই। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, ইতালি, স্পেন, ভারতসহ পৃথিবীর উন্নত সব দেশ যেখানে করোনায় লাশের সারি বহনে হিমশিম খেয়েছে, বাংলাদেশ সেখানে সহনীয় পর্যায়ে রাখতে সক্ষম হয়েছে। দেশের এই অগ্রযাত্রায় মানবকণ্ঠও সহযাত্রী হতে চায় প্রতিদিন।

৪. মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনা হৃদয়ে ধারণ করেই ৯ বছর আগে যাত্রা শুরু করেছিল মানবকণ্ঠ।  সেই লক্ষ্যে একটি সহিষ্ণু, ন্যায়পরায়ণ মানবিক সমাজ গড়াতে আমাদের প্রয়াস অব্যাহত রয়েছে। ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে। নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন বলেছিলেন- ‘যে দেশে গণতন্ত্র ও সংবাদপত্রের স্বাধীনতা আছে, সে দেশে দুর্ভিক্ষ হতে পারে না।’ আমরা স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারছি বলেই দেশের এই অগ্রযাত্রা। সব বাধা পেরিয়ে আমাদের অবস্থান আরো দৃঢ় হয়েছে। গণতন্ত্র, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা, ন্যায়বিচার, সামাজিক সাম্য আর অসাম্প্রদায়িকতার পক্ষে আমাদের অবস্থান আরো শক্ত হয়েছে। মানবকণ্ঠ সৎ সাংবাদিকতায় বিশ্বাসী। বস্তুনিষ্ঠ ও দায়িত্বশীল সাংবাদিকতার প্রত্যয়ে আমরা অবিচল।

একটি নিরপেক্ষ সংবাদপত্রের যেসব বৈশিষ্ট্য থাকা উচিত, মানবকণ্ঠ তার সবটুকু যথাযথভাবে পালনের চেষ্টা অব্যাহত রাখছে। বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতার মাধ্যমে দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার, সন্ত্রাস, জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে আমাদের লড়াই চলছে। সরকারি দলের বিরুদ্ধে কথা বলতেও পিছপা হচ্ছি না। রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক দুর্বৃত্তায়নের খবর আমরা ঢালাওভাবে প্রকাশ করছি। গত বছরজুড়ে দেশের আলোচিত বিভিন্ন ঘটনা অনেক সংবাদপত্র কৌশলে এড়িয়ে গেলেও মানবকণ্ঠ পাঠককে ঠকায়নি। আলোচিত এসব ঘটনা গুরুত্বের সঙ্গে প্রকাশ করে দেশে-বিদেশে ব্যাপক প্রশংসিত হয়েছে।

মানবকণ্ঠ নেতিবাচক রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড যেমন তুলে ধরছে, তেমনি তুলে ধরছে ইতিবাচক দিকও। মানবকণ্ঠ যথাসাধ্য চেষ্টা করে ভালো-খারাপ জানিয়ে জনসাধারণকে সচেতন করতে। দলমত-নির্বিশেষে সমাজের সব ভালো উদ্যোগও প্রতিদিন পাঠকের সামনে তুলে ধরে মানবকণ্ঠ। উদ্যোগী মানুষগুলোকে যা আরো এগিয়ে নিতেও উৎসাহ জোগায়।

৫. বাঙালি স্বাধীনচেতা জাতি, যুদ্ধ জয়ের জাতি। বঙ্গবন্ধু আর মহান মুক্তিযুদ্ধের স্বপ্নের অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গড়তেই আমাদের অদম্য পথচলা। লকডাউনের সময় পত্রিকা বিক্রির সংখ্যা বেশ কমেছিল, এখন আবার বাড়তে শুরু করেছে। হকাররাও কাজে যোগ দিচ্ছেন। আমরাও ঝুঁকি মোকাবিলা করে পাঠকের কাছে পত্রিকা পৌঁছে দিচ্ছি প্রতিদিন। পাশে থাকুন প্রিয় পাঠকÑ কথা দিচ্ছি যত সংকটই আসুক, মানবকণ্ঠ সৎ ও দায়িত্বশীল সাংবাদিকতা থেকে এক পা পেছাবে না। সুষ্ঠু সমাজ বিনির্মাণে সব মহলের সঙ্গে আমাদের চেষ্টা অব্যাহত থাকবে। মানবকণ্ঠ অনেক দূর এগোতে চায়। আপনাদের অব্যাহত সহযোগিতা আমাদের চলার পথ সুদৃঢ় করবে।

 

 


poisha bazar

ads
ads