সব মালেককে চিহ্নিত করুন


  • সম্পাদকীয়
  • ২২ সেপ্টেম্বর ২০২০, ১৭:২৭

১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে জন্ম নেয়া দেশ আমাদের বাংলাদেশ। তরুণ, যুবা, মাঠের কৃষক, কলের শ্রমিক, ছাত্র, শিল্পী, সাংবাদিক, চিকিৎসকসহ সব ধরনের পেশাজীবীর মরণপণ সংগ্রাম ও ৩০ লাখ মানুষের আত্মদানের মধ্য দিয়ে স্বাধীন হয় এই দেশ। এত মানুষের আত্মদানের একটাই লক্ষ ছিল- সুজলা, সুফলা, শস্য-শ্যামলা বাংলাদেশ। নিপীড়ন, নির্যাতন, দুর্নীতি, অনিয়মহীন এক স্বপ্নের বাংলাদেশ। এমন বাংলাদেশ কেউ কোথাও পাবে না, এমন বাংলাদেশ।

কিন্তু সব স্বপ্নের মৃত্যু ঘটাতে আসে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট। এদিন সপরিবারে হত্যা করা হয় মুক্তিযুদ্ধের স্থপতি, স্বাধীন বাংলাদেশের রূপকার, জাতির জনক বঙ্গবন্ধু ও তার পরিবার পরিজনকে। শুধু তার দুই কন্যা বেঁচে থাকেন দেশে না থাকার কারণে। ১৯৭১ সালের একটি গণবিপ্লবকে নস্যাত করতে একটি প্রতিবিপ্লবের মাধ্যমে মৃত্যু ঘটে দেশের স্বপ্ন, সাম্য, স্বাধীনতার। তারপরে পেছন দিকে হাঁটতে থাকে দেশ। ১৯৭৫ পরবর্তী সরকারগুলো দেশে ‘মানি নো প্রবলেম’ থিওরির মাধ্যমে পথ চলতে থাকে।

দেশে দুর্নীতির প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ চলতে থাকে। সরকার দুর্নীতির প্রতি জিরো টলারেন্স দেখালেও দুর্নীতি ঢুকে গেছে রন্ধ্রে, রন্ধ্রে। তাই অভিযান চললেও একের পর এক দুর্নীতি বিস্মিত করে দিচ্ছে সবাইকে। গত বছর সরকার ক্যাসিনোবিরোধী অভিযানের মধ্য দিয়ে দুর্নীতিবিরোধী অভিযান শুরু করলেও একের একের পর এক দুর্নীতি চাপা দিচ্ছে পেছনের ঘটনাকে। বালিশকাণ্ড, রিজেন্ট হাসপাতাল ঘটনা, সিনহা হত্যাকাণ্ড ও একজন ওসি প্রদীপ, ইউএনও ওয়াহিদা হত্যা প্রচেষ্টা, সাদিয়ার বিয়ে প্রতারণা। এর পরেই আলোচনায় এলো স্বাস্থ্য অধিদফতরের পরিবহন পুলের গাড়িচালক মালেক। একজন তৃতীয় শ্রেণির কর্মচারী কিভাবে টাকার পাহাড় গড়লেন সেটা এখন ‘টক অব দ্য কান্ট্রি’। এটা কিভাবে সম্ভব? অবৈধ সম্পদ গড়তে গিয়ে অনিয়ম-অপকর্মে তিনি যেন ছাড়িয়ে গেছেন স্বাস্থ্য অধিদফতরের আলোচিত-সমালোচিত হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা আবজাল হোসেনকেও। ঢাকায় রয়েছে তার কাঠায় কাঠায় জমি, একাধিক বহুতল বাড়ি ও বিলাসবহুল ফ্ল্যাট। ডেইরি ফার্মসহ বিভিন্ন ব্যবসায় লগ্নি আছে কোটি কোটি টাকা। ব্যাংকেও আছে নামে-বেনামে টাকা। প্রাথমিক তদন্তে উঠে এসেছে এসব। সব মিলিয়ে স্বাস্থ্যের এই গাড়িচালকের সম্পদের পরিমাণ শতকোটি টাকার বেশি।

গত বছর দেশজুড়ে ক্যাসিনোসহ দুর্নীতিবিরোধী অভিযানের নামে শুদ্ধি অপারেশন শুরু করেছিল আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। কয়েক মাস ধরে ওই অভিযান স্থবির ছিল। স্বাস্থ্য বিভাগের মালেকের গ্রেফতারের বিষয়টি দুর্নীতিবিরোধী অভিযানের অংশ। শিগগির এ ধরনের আরো কয়েকজন গ্রেফতার হতে পারেন বলে পত্রিকান্তরে প্রকাশিত হয়েছে। কিভাবে এত কিছুর মালিক হলেন এই ক্ষুদ্র কর্মচারী- সে অনুসন্ধানেও বিস্মিত হতে হবে সবাইকে। ‘স্বাস্থ্য অধিদফতর ড্রাইভার্স অ্যাসোসিয়েশন’ নামে একটি সংগঠন খুলে তিনি এর সভাপতি হয়েছেন। এটাতেই তার ভাগ্য খুলে যায়। এই সংগঠনের সভাপতি পদের দাপট দেখিয়ে জিম্মি করে ফেলেছিলেন পুরো স্বাস্থ্য অধিদফতরকে। নিয়োগ-বদলি থেকে শুরু করে পদোন্নতিও হতো তার অফিস থেকেই! মালেক স্বাস্থ্য অধিদফতরের সদ্য সাবেক মহাপরিচালক আবুল কালাম আজাদের গাড়ির চালকও ছিলেন। একজন গাড়ির চালক এই পরিমাণ সম্পদের মালিক হয়েছেন একদিনে তো নয়। এত সম্পদের মালিক তিনি হয়েছেন আর কেউ সে খবর জানত না, এ কথা আমরা বিশ্বাস করি না।

স্বাস্থ্য বিভাগের ‘আসবাব পত্রেরও মুখ আছে’ এমন কথা বেশ আগে থেকেই প্রচলিত। এইসব মালেকের পেছনে কারা তাদেরও খুঁজে বের করে মূলোৎপাটন না করলে মালেকরা রক্তবীজের মতো জন্ম নিতেই থাকবে। শুধু স্বাস্থ্য বিভাগ নয়, অন্যসব বিভাগেও তল্লাশি করলে আরো অনেক মালেক ও তাদের পেছনের ব্যক্তির হদিস মিলবে। এদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনা জরুরি। এদের মূলোৎপাটন করতে না পারলে একুশ শতকের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা বাধাগ্রস্ত হবে, যেটা মোটেও কাক্সিক্ষত নয়।

মানবকণ্ঠ/এইচকে


poisha bazar

ads
ads