কফিন এখন রফতানি পণ্য

মানবকণ্ঠ

poisha bazar

  • সম্পাদকীয়
  • ৩১ অক্টোবর ২০১৯, ১০:৪৩

দেশ থেকে অনেক পণ্যই বিদেশে রফতানি হয়। এসব রফতানি পণ্য দেশের অর্থনীতির জন্য সুসংবাদ বয়ে আনে। কিন্তু যদি শোনা যায়, মানুষের লাশ বহনের জন্য কফিন রফতানি হচ্ছে, তাও আবার অপ্রয়োজনীয় কোনো উদ্ভীদ জাতীয় উপকরণ ব্যবহার করে তৈরি, তাহলে হতবাক হওয়ার পরিসীমা থাকে না। এমনই একটি অবাক করা সংবাদ মানবকণ্ঠে প্রকাশিত হয়েছে।

প্রকাশিত সংবাদে বলা হয়েছে, উত্তরের জেলা নীলফামারীতে পরিত্যক্ত কলাগাছ ও কচুরিপানা দিয়ে তৈরি হচ্ছে পরিবেশবান্ধব কফিন। এই কফিন তৈরি করছে ইকো সাপ্লাইজ (ইএসএন) নামে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান। এটি উত্তরা ইপিজেডের ওয়েসিস ট্রান্সফরমেশন লিমিটেড নামে একটি কফিন কারখানার শাখা। এই কারখানার শাখাটি নিজেদের তৈরি করা কফিন বিদেশে রফতানি করে বছরে আয় করছে ২৫ কোটি টাকা।

এসব কফিন চলে যাচ্ছে ইংল্যান্ড, নেদারল্যান্ডস, ইউএস, হল্যান্ডসহ উন্নত বিশ্বের দেশগুলোয়। নীলফামারী শহর থেকে ১০ কিলোমিটার দূরে শিশাতলী গ্রামে মাত্র তিন একর জমিতে গড়ে উঠেছে এই কফিন কারখানা। দৈনিক ২৫০ টাকা পারিশ্রমিকে এই কারখানায় নারী-পুরুষ মিলে কাজ করছেন ৪৬ জন শ্রমিক।

গ্রামীণ জনপদে শিল্পখারখানা গড়ে উঠলে মানুষের কর্মপরিধি বৃদ্ধি পায়- এতে কোনো সন্দেহ নেই। আর এসব শিল্পকারখানার উৎপাদিত পণ্য যদি হয় রফতানিমুখী, তাহলে তা অর্থনীতির জন্য হয় আরো সহায়ক। রফতানিমুখী পণ্য বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভকে শুধু সমৃদ্ধই করে না, সেই সঙ্গে দেশের আমদানি সক্ষমতাও বৃদ্ধি করে। বিদেশে কফিন রফতানি তাই অর্থনীতিতে ভিন্ন মাত্রা যোগ করেছে।

তার চেয়ে বড় কথা, কফিন যেসব কাঁচামাল দিয়ে তৈরি হচ্ছে, এসব কাঁচামাল আসলে গ্রামীণ জনপদের পরিত্যক্ত আবর্জনা। প্রকৃত বিবেচনায় এসব জিনিসের কোনো অর্থনৈতিক মূল্যমান নেই। প্রকৃতির নিয়মে সৃষ্টি হওয়া এসব উদ্ভীজ্জ পদার্থ প্রকৃতিতেই বিলীন হয়ে যায়। এসব মূল্যমানহীন পদার্থকে কাঁচামালে পরিণত করে তা থেকে যদি রফতানিমুখী পণ্য তৈরি করা যায়, তাহলে এটা অর্থনীতির জন্য বড় ধরনের সুখবর।

গ্রামের পুকুরগুলোতে কচুরিপানা এমনিতেই জন্মায়। এই কচুরিপানা এক ধরনের আবর্জনা। যেসব পুকুরে কচুরিপানা জন্মে সেসব পুকুরে মাছচাষ, গোসলসহ যাবতীয় দৈনন্দিন কর্ম ব্যাহত হয়। এ কারণে পুকুরের মালিকদের মাঝে মাঝে পুকুর থেকে কচুরিপানা পরিষ্কার করতে হয়। তাছাড়া কচুরিপানা কোনো কাজেই আসে না। সেই কচুরিপানা থেকে যদি রফতানি পণ্য তৈরি হয়- তাহলে একে বলতে হবে প্রকৃতিরই আশীর্বাদ।

কলা বারোমাসী পুষ্টিকর ফল হলেও একবার ফল দিয়ে কলাগাছ আর কোনো কাজে আসে না। ফল আহরণ শেষে এই গাছ একরকম কেটেই ফেলা হয়। প্রকৃতিতে জন্ম নেয়া গাছ আবার প্রকৃতিতেই বিলীন হয়ে যায়। ফেলে দেয়া এই কলাগাছ যদি কোনো শিল্পপণ্যের কাঁচামাল হয়ে যায়, আর উৎপাদিত ওই পণ্য যদি রফতানিমুখী হয়, তাহলে এর চেয়ে সস্তা শিল্পপণ্য আর কী হতে পারে? একবারে ফেলনা আবর্জনা থেকে শিল্পপণ্যের কাঁচামাল, বিষয়টি সত্যি অবিশ্বাস্য? তারপরও কলাগাছের ক্ষেত্রে তাই হয়েছে। কলাগাছ থেকে কফিন তৈরি করে সংশ্লিষ্টরা এটাই প্রমাণ করেছে, যা আমাদের গ্রামীণ অর্থনীতির জন্য সুসংবাদ।

কচুরিপানা ও কলাগাছের তৈরি কাঁচামালের শিল্পপণ্য আমাদের দেশকে নিয়ে যাচ্ছে অর্থনীতির অন্য দিগন্তে। এতে স্বল্পমাত্রার হলেও কিছু মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে আর বেড়েছে রফতানির ভিন্নতা। এই ধরনের ব্যতিক্রমী কাঁচামালের মাধ্যমে নতুন নতুন শিল্পপণ্য তৈরির কথা ভাবতে হবে। তাহলে আমাদের অর্থনীতিতে আসবে বহুমুখী প্রভাব। আমরা আশা করি, সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগ এসব সম্ভাবনাময় শিল্প খাতগুলোকে আরো উৎসাহিত করবে, প্রসারিত করবে সহযোগিতার হাত, যেন উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পায় আমাদের অর্থনীতির পরিধি।

মানবকণ্ঠ/জেএস




Loading...
ads





Loading...