কর্মসংস্থানে ই-কমার্সের ‘ক্লিক’


  • নিজস্ব প্রতিবেদক
  • ২৮ এপ্রিল ২০২১, ১৩:১২,  আপডেট: ২৮ এপ্রিল ২০২১, ১৩:১৬

করোনা ভাইরাস (কোভিড-১৯) এর সংক্রমণের প্রথম দিকে গত বছর সাধারণ ছুটির দিনগুলোতে রাজধানীবাসীর অনলাইন কেনাকাটার নির্ভরতায় বেড়েছে ই-কমার্সের পরিধি, যা মহামারীর উল্টো পিঠে কর্মসংস্থানের সম্ভাবনাও তৈরি করেছে। দীর্ঘ ঘরবন্দি সেই সময়ে অনলাইনে কেনাকাটা করার সেই প্রবণতা পরেও বজায় রেখেছেন অনেকে। বছর ঘুরে সংক্রমণের দ্বিতীয় ঢেউয়ের বিস্তার ঠেকানোর ‘সর্বাত্মক লকডাউনের’ এই দিনগুলোতে আগের ধারাবাহিকতাতেই যেন বেড়েছে ই-কর্মাসের লেনদেনও। এতে অন্য খাতে বেকার হয়ে যাওয়া জনবলও পাচ্ছে কাজের সুযোগ; বিশেষ করে অনানুষ্ঠানিক খাতে কর্মহীন মানুষের দুশ্চিন্তা কমছে ই-কর্মাস প্রতিষ্ঠানগুলোর কল্যাণে।

করোনা ভাইরাসের বিস্তার রোধে গত বছর সাধারণ ছুটিতে বিপাকে পড়েন মহিউদ্দিন। রাজধানীর মোহাম্মদপুরের শিয়া মসজিদ এলাকায় এক সময় ভ্যানে কাপড় বিক্রি করতেন মুন্সীগঞ্জের এই বাসিন্দা। ছুটির ঘোষণার পর তার ব্যবসা বন্ধ হয়ে যায়। বাধ্য হয়ে কিছুদিন বেকার থাকার পর খাবার ডেলিভারি দেয় এমন একটি ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানে যোগ দেন তিনি।

ধানমণ্ডির একটি রেস্তোরাঁয় কাজ করা বরিশালের হায়দার আলীমের অভিজ্ঞতাও প্রায় একই। গত বছর তিনিও বেকার হয়ে বাড়ি চলে যান। কিছুদিন পর ঢাকায় ফিরে মহিউদ্দিনের মতো তিনিও একটি ই-কমার্স সাইটে ডেলিভারি পারসনের কাজে যোগ দেন। তাদের নতুন কাজের সুযোগ তৈরি হয় ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান দুটির ব্যবসা বাড়ার ফলে। ওই সময় দেশে করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়লে রাজধানীবাসীর অনেকেই নিত্যপণ্য কেনাকাটায় অনলাইন প্লাটফর্মের ওপর নির্ভর করা শুরু করেন, যাতে লাভবান হয় প্রতিষ্ঠান দুটি। ব্যবসার পরিধি বাড়লে, কর্মীও বাড়াতে হয় তাদের। সেই ধারাবাহিকতায় এবারো লকডাউনের সময় নিত্যপণ্য সরবরাহকারী ই-কমার্স সাইটগুলোর অর্ডার বেড়েছে বলে জানিয়েছেন প্রতিষ্ঠানগুলোর কর্তাব্যক্তিরা।

লকডাউন শুরুর পর অন্য সময়ের চেয়ে অনেক প্রতিষ্ঠানের অর্ডার আগের চেয়ে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। নভেল করোনা ভাইরাসের ছোঁয়াচ থেকে গা বাঁচাতে মানুষ নিত্যপণ্যের জন্যও অনলাইন কেনাকাটায় ঝুঁকে পড়ায় এই খাতে বেড়েছে কর্মসংস্থানও। মহিউদ্দিন ও আলীমের মতো অনেকেই এখন বিভিন্ন অনলাইন প্লাটফর্মে ডেলিভারি, প্যাকেজিংসহ বিভিন্ন কাজে যোগ দিয়েছেন। শুধু কায়িক শ্রমকেন্দ্রীক নয়, প্রযুক্তি, বিজ্ঞাপন, বিপণনসহ বিভিন্ন বিভাগেই বেড়েছে কর্মসংস্থান।

ই-কমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ই-ক্যাব) বলছে, গত এক বছরে সদস্য প্রতিষ্ঠানগুলোর মাধ্যমে এক লাখ লোকের কর্মসংস্থান হয়েছে। কয়েকটি সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গত এক বছরে বিভিন্ন কাজে তাদের কর্মীসংখ্যা বাড়াতে হয়েছে। এরমধ্যে ডেলিভারি পারসনের সংখ্যা বেড়েছে বেশি।

খাবার সরবরাহকারী জনপ্রিয় প্রতিষ্ঠান ফুডপান্ডা জানিয়েছে, গত এক বছরে দেশের বিভিন্ন এলাকায় ব্যবসা সম্প্রসারণের কারণে তাদের রাইডারের সংখ্যা ৫০ শতাংশ বেড়েছে। অর্ডার বেড়ে যাওয়ায় সেগুলো যথাসময়ে পৌঁছে দিতে এ কাজে বেশি লোক নিয়োগ করছে প্রতিষ্ঠানগুলো। গত বছর লকডাউনের সময় অর্ডারের চাপে হিমশিম খেতে হয়েছিল অনেক ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানকে। দেশের শীর্ষস্থানীয় নিত্যপণ্যের অনলাইন প্লাটফর্ম চাল-ডাল ডটকম। গত বছরের অভিজ্ঞতা থেকে গুদামের পাশাপাশি ডেলিভারিপার্সনের সংখ্যাও বাড়িয়েছে তারা। একইসঙ্গে অন্যান্য কাজেও বাড়াতে হয়েছে কর্মীসংখ্যা।

প্রতিষ্ঠানটির অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা ও চিফ অপারেটিং অফিসার জিয়া আশরাফ বলেন, ‘গত বছরের ফেব্রæয়ারিতে আমাদের কর্মী ছিলেন ৮৬৭ জন। সেটা ডিসেম্বরে এসে দাঁড়ায় এক হাজার ৬০৬ জন। এ বছরের এপ্রিলে তা হয়েছে দুই হাজার ২৬৩ জন।’ তিনি জানান, বর্তমানে চাল-ডাল ডটকমে কাস্টমার রিপ্রেজেন্টেটিভ (ডেরিভালি পারসন) আছেন প্রায় ৭০০ জন। ব্যবসার বিস্তার এবং মানুষের চাহিদার কারণে দিন দিন কর্মী বাড়াতে হচ্ছে বলেও জানান জিয়া।

গত বছর বন্ধের সময়ে নিত্যপণ্য অনলাইনে বিক্রি শুরু করে সুপারশপ স্বপ্ন। পাশাপাশি টেলিফোনের মাধ্যমেও অর্ডার নিতে থাকে। প্রতিষ্ঠানটির হেড অব কাস্টমার অ্যানালিটিকস অ্যান্ড কাস্টমার রিলেশনশিপ ম্যানেজার মেহজাবিন বাঁধন জানান, গত বছর রাজধানীতে তাদের ডেলিভারি পারসন ছিলেন ৩৫ জন। এখন সেটা ৬৬ জন। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের ‘ই-বাণিজ্য করব নিজের ব্যবসা গড়ব প্রকল্পের’ হিসাব অনুযায়ী, এই প্রকল্পের অধীনে ঢাকা ও চট্টগ্রামে দেড় হাজারের বেশি তরুণকে ই-কমার্স বিষয়ক প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছে। এই প্রকল্প অব্যাহত থাকলে আরো দক্ষ জনবল তৈরি হবে।

ই-ক্যাবের পরিচালক (করপোরেট অ্যাফেয়ার্স) আসিফ আহনাফ বলেন, ‘আমাদের সদস্য প্রতিষ্ঠানগুলোর ইন্টারনাল একটা হিসাব নিয়েছিলাম, সেখানে দেখা গেছে গত এক বছরে এক লাখ লোকের কর্মসংস্থান হয়েছে। এই গ্রোথ রাখতে পারলে আগামী তিন বছরে পাঁচ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান হবে বলে আমরা আশা করছি।’


poisha bazar

ads
ads