সোনার বেচাকেনা কমে গেছে

মানবকণ্ঠ
- ছবি: সংগৃহীত

poisha bazar

  • ০৯ আগস্ট ২০২০, ১১:০০

এসএম মুন্না : লাগাতার দাম বাড়ায় দেশে কমে গেছে সোনা বেচাকেনা। ব্যবসায়ীদের মতে, গেল বছরের তুলনায় বিক্রি প্রায় ৭৫ শতাংশ নেমে গেছে। খুব সহসা দাম কমার কোনো লক্ষণ বা সম্ভাবনাও নেই। বরং বাড়ার আভাস দিয়েছে আন্তর্জাতিক বাজার।

বিলাসি ও মূল্যবান ধাতু হিসেবে বছরজুড়ে চাহিদা থাকে সোনার। মূলত বিয়ে-শাদি উপলক্ষে তুলনামূলক বাড়ে স্বর্ণালঙ্কারের বিক্রি। কিন্তু এবারের চিত্র ভিন্ন। করোনা ভাইরাস (কোভিড-১৯) রোধে সামাজিক দূরত্ব রাখতে প্রায় ৫ মাস ধরে বিয়ে-শাদি বন্ধ। তাই স্বর্ণের দোকানগুলোতে তেমন একটা ক্রেতা নেই। যারা আসছেন, তারাও বাড়তি দামের সঙ্গে সমন্বয় করে কম পরিমাণে কিনছেন।

বিক্রি কমের কারণ হিসেবে দফায় দফায় দাম বাড়াকে চিহ্নিত করছেন ব্যবসায়ীরা। দেশের বাজারে গেলো সেপ্টেম্বরে দাম একবার সামান্য কমলেও জুন থেকে লাগাতার বাড়ছে মূল্যবান এই ধাতুর দাম।

বাংলাদেশ জুয়েলার্স সমিতির (বাজুস) সাধারণ সম্পাদক দিলীপ কুমার আগরওয়ালার মতে, সাধারণত অন্যান্য সময় আন্তর্জাতিক বাজারে স্বর্ণের দাম এতোটা বাড়ে না। কিন্তু এবার অনেকটাই অস্থির। বিক্রিও কমে গেছে। সাম্প্র্রতিক দরের গতিবিধি লক্ষ্য করে দেখা গেছে, গত বছরের তুলনায় দেশে প্রায় ৭৫ শতাংশ বেচাকেনা কমে গেছে।

বায়তুল মোকাররম ও মৌচাক মার্কেটের একাধিক স্বর্ণব্যবসায়ী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘সেই বাপ-দাদার আমল থেকে পরস্পরায় ব্যবসা করে আসছি। কিন্তু এবারের মতো ক্রেতার খরা আর কখনোই দেখিনি। দাম বেশি হওয়ায় সোনার ব্যবহার কমিয়ে দিয়েছেন দেশীয় ক্রেতারা। আবার দেশে সোনার গহনাসামগ্রীর প্রধান ক্রেতা উচ্চবিত্ত ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির লোকজন এখন বিকল্প হিসেবে প্রয়োজনীয় চাহিদা মিটাতে বিদেশ নির্ভরতার ওপর ঝুঁকে পড়ছেন। বিশেষ করে ভারত থেকে ব্যাপকভাবে সোনার অলঙ্কার আমদানি হচ্ছে। সোনার দাম প্রথমবারের মতো আউন্স প্রতি ২ হাজার ডলার ছাড়িয়েছে গত বুধবার বিশ্ববাজারে। এখন স্বর্ণের দাম ২ হাজার ২৬ ডলার। মহামারী সংকটের মধ্যেও বিশ্বজুড়ে চাঙা সোনার বাজার।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিনিয়োগ স্থবিরতা, তেল ও ডলারের দরপতনের প্রভাবে অস্থির হয়ে উঠেছে সোনার বাজার। বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনায় অন্যান্য খাত অনিরাপদ বিবেচনায় বিনিয়োগকারীরাও ঝুঁকছেন সোনার দিকে। ব্যাংকগুলোর সুদের হার ও বন্ডের সুবিধা কমে যাওয়ায়, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী কিংবা ব্যক্তি পর্যায়েও সঞ্চয় হিসেবে স্বর্ণ বেছে নেয়ার প্রবণতা বেড়েছে। চলতি মাসের শুরুতেই ২০১১ সালে রেকর্ড ভাঙে সোনার দাম।

পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, দুবাই, সৌদি আরব, মালয়েশিয়াসহ অন্যান্য মধ্যপ্রাচ্য এবং ইউরোপ-আমেরিকার দেশগুলোর চেয়ে ভারতে যাতায়াত সহজ এবং খরচ কম হওয়ায় এখন ভারতই হয়ে ওঠেছে দেশীয় সোনার চাহিদা পূরণের প্রধান বাজার। এতে মার খাচ্ছে দেশীয় পাকা সোনার বাজার।

বাংলাদেশ জুয়েলারি সমিতির মতে, দেশে প্রতিদিন গড়ে ৪০ হাজার ভরি সোনার চাহিদা রয়েছে। চাহিদা কমে যাওয়ায় এবং ক্রেতা না পাওয়ায় তা প্রায় ৭৫ শতাংশ নেমে গেছে। স্বর্ণ ব্যবসায়ীরা এ পরিস্থিতিকে দেশের স্বর্ণশিল্পের জন্য অশনিসংকেত বলে মনে করছেন।

ব্যবসায়ীরা জানান, ২০১১ সালের পর বাংলাদেশের বাজারে সোনার দাম ৭৭ হাজার টাকা ছাড়িয়েছে। ২০০৩ সালে ইরাকে মার্কিন হামলার পর সোনার দাম প্রতি ভরি ৭০ হাজার ছাড়িয়েছিল বাংলাদেশের বাজারে। গেল বছরের ১৮ ডিসেম্বর ডলারের দাম বাড়ার কারণে মূল্যবান এই ধাতুটির দাম বাড়ানোর কথা জানিয়েছিল বাংলাদেশ জুয়েলারি সমিতি। তখন এক মাসের কম সময়ের ব্যবধানে ভালো মানের সোনার দাম ভরিতে ১ হাজার ১৬৬ টাকা করে বাড়িয়েছিল ব্যবসায়ীরা। তখন প্রতি ভরি (১১ দশমিক ৬৬৪ আউন্স) সবচেয়ে ভালো মানের সোনার (২২ ক্যারেট) দর ৫৯ হাজার ১৯৫ টাকা, ২১ ক্যারেটের দর ৫৬ হাজার ৮৬২ টাকা এবং ১৮ ক্যারেটের দর ৫১ হাজার ৮৪৬ টাকা নির্ধারণ হয়েছিল।

গত ২৩ জুলাই বাজুসের পক্ষ থেকে সোনার দাম বাড়ানোর ঘোষণা দেয়া হয়। তখন আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতি আউন্সের (৩১.১০৩৪৭৬৮ গ্রাম, ২.৬৫ ভরি) দাম ছিল ১৮৯০ ডলার। গত বুধবার তা ২০৩৬ ডলারে উঠেছে। অর্থাৎ কয়েক দিনের ব্যবধানে প্রতি আউন্স স্বর্ণের দাম ১৪৬ ডলার বেড়েছে। বাজুস জানায়, ‘আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সমন্বয় করতে আমাদের স্থানীয় বাজারে দাম বাড়াতে হচ্ছে’।

স্বর্ণ ব্যবসায়ীরা বলেন, সহসা দাম কমার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না বরং সামনে আরো বাড়বে। বাজুসের সাধারণ সম্পাদক দিলীপ আগওয়ালার মতে, ‘করোনা ভাইরাস (কোভিড-১৯) মহামারীতে সবাই এখন নিরাপদ বিনিয়োগ ভেবে সোনা কিনে মজুত রাখছে। তাই বোঝা যাচ্ছে না আন্তর্জাতিক বাজারে সোনার গোল্ডের দাম বাড়তে বাড়তে কোথায় গিয়ে ঠেকবে।’

পর্যালোচনায় দেখা গেছে, করোনা ভাইরাসের কারণে সৃষ্ট অর্থনৈতিক সংকট, চীন-যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য যুদ্ধের কারণে ইউএস ডলারের প্রাধান্য খর্ব, জ্বালানি তেলের দর পতন এবং নানাবিধ অর্থনৈতিক সমীকরণের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে স্বর্ণের মূল্য ইতিহাসের সর্বোচ্চ উচ্চতায় অবস্থান করছে। তারই ধারাবাহিকতায় দেশীয় বুলিয়ন মার্কেটেও সোনার দাম বাড়ানো হয়েছে।

সর্বশেষ গত ২৩ জুলাই সব ধরনের সোনার দাম প্রতি ভরিতে তিন হাজার টাকা বাড়ানো হয়েছিল। তার এক মাসে আগে ২২ জুন সোনার দাম বাড়ানো হয় ভরিতে ৫ হাজার ৭১৫ টাকা। দেশের বাজারে সোনার দাম সাধারণত ভরিতে এক হাজার থেকে দেড় হাজার টাকা হ্রাস-বৃদ্ধি করা হয়। তবে বিশ্ব বাজারে অস্বাভাবিক দাম বৃদ্ধির কারণে এখন বেশি দাম বাড়াতে হচ্ছে জানায় বাজুস।

গত বৃহস্পতিবার থেকে সারা দেশে সোনার নতুন দর কার্যকর হয়েছে। ২২ ক্যারেটের এক ভরি (১১ দশমিক ৬৬৪ গ্রাম) সোনার অলঙ্কার (সবচেয়ে ভালো মানের সোনা) কিনতে লাগবে ৭৭ হাজার ২১৬ টাকা। ২১ ক্যারেট ৭৪ হাজার ৬৬ টাকা, ১৮ ক্যারেট ৬৫ হাজার ৩১৮ টাকা এবং সনাতন পদ্ধতির সোনার ভরি বিক্রি হবে ৫৪ হাজার ৯৯৬ টাকায়।

তথ্যমতে, প্রতি ভরি ২২ ক্যারেটে ৯১ দশমিক ৬ শতাংশ, ২১ ক্যারেটে ৮৭ দশমিক ৫ শতাংশ, ১৮ ক্যারেটে ৭৫ শতাংশ বিশুদ্ধ সোনা থাকে। সনাতন পদ্ধতির সোনা পুরনো অলঙ্কার গলিয়ে তৈরি করা হয়। এক্ষেত্রে কত শতাংশ বিশুদ্ধ সোনা মিলবে তার কোনো মানদণ্ড নেই। অলঙ্কার তৈরিতে সোনার দরের সঙ্গে মজুরি ও মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) যোগ করে দাম ঠিক করা হয়।

মানবকণ্ঠ/এইচকে





ads







Loading...