ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা দেউলিয়া!

মানবকণ্ঠ

poisha bazar

  • নিজস্ব প্রতিবেদক
  • ১২ জুলাই ২০২০, ১১:৩১

অলোকা রায় (ছদ্মনাম)। দৈনন্দিন বাজারের খরচ থেকে কিছু কিছু সঞ্চয় করে চার বছর আগে ২৫ হাজার টাকায় একটি সেলাই মেশিন কেনেন তিনি। শুরু করেন দর্জির কাজ। সেই দর্জির কাজ করেই চার বছরে কিনেছেন আরো ছয়টি সেলাই মেশিন। গড়ে তুলেছেন ‘জেআর ফ্যাশন’। এই জেআর ফ্যাশনের আয় থেকেই চলে তার পাঁচ সদস্যের সংসার। নিজে কাজ করার পাশাপাশি চার নারীকে কাজের জায়গাও করে দিয়েছিলেন তার ছোট প্রতিষ্ঠানে। মেয়েদের জামা-কাপড় সেলাইয়ের পাশাপাশি ছোট-বড় গার্মেন্টসের পণ্য সাব-কন্ট্রাক্টে করে দিতেন অলোকা। নারী হওয়ায় অনেক গার্মেন্ট মালিক কাজ করিয়ে টাকা দেয়নি। তারপরও তাকে ব্যবসা গোটানোর চিন্তা করতে হয়নি। কিন্তু করোনা তার ব্যবসার কোমর ভেঙে দিয়েছে।

অলোকা বলেন, ‘হাজার হাজার পণ্যের কাজ করিয়ে নিয়ে বিল দিত না। ঈদের আগের অনেক রাত শেষ করেছি সেসব গার্মেন্ট মালিকের দরজায়। তারপরও লোন নিয়ে কর্মীদের বেতন পরিশোধ করেছি। এভাবে লোকসানে পড়েছি, আবার দাঁড়িয়েছি। কিন্তু এবার আর দাঁড়ানোর উপায় নেই। করোনা আমার এবং ব্যবসার কোমর ভেঙে দিয়েছে। যারা এতদিন কাজ দিত, সেসব অধিকাংশ প্রতিষ্ঠান কয়েক লাখ পাওনা টাকা না দিয়েই বন্ধ করে দিয়েছে। আমার একদিকে জমছে ঋণের কিস্তির পাহাড়, অন্যদিকে চার মাসের বাড়িভাড়া বকেয়া। পাওনাদারের ভয়ে বাসায় থাকতেও ভয় করে।’

করোনা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাবে চরম সংকটে পড়েছেন অলোকার মতো ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা, যারা ধীরে ধীরে প্রতিষ্ঠান দাঁড় করিয়েছেন। টানা ৬৬ দিন সাধারণ ছুটির সময়ে ব্যবসা-বাণিজ্য বন্ধ রাখা এবং ছুটি শেষে সীমিত আকারে খুললেও খুব একটা লাভ হয়নি। ক্রেতা নেই, তাই লেনদেনও কম। উপরন্তু কারখানা ভাড়া, কর্মচারীর বেতন ও পারিবারিক খরচ মেটাতে জমানো অর্থ খরচ করে চলেছেন এতদিন। এখন অনেকেই ব্যবসা গুটিয়ে গ্রামে যাচ্ছেন। আবার কেউ কেউ ঘুরে দাঁড়ানোর উপায় খুঁজছেন। এভাবে চলতে থাকলে প্রায় এক কোটি শ্রমিক কর্মহীন হতে পারে বলে ধারণা সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন গবেষণা সংস্থার।

‘নাইস লুক’-এর উদ্যোক্তা মাহমুদা আক্তার বলেন, ‘বছরের সবচেয়ে বড় ইনকাম হয় রোজার ঈদে। রোজার এক মাস ঘুম থাকে না। মাঝরাত পর্যন্ত কাজ করতে হয়। ঈদের সময় যে আয় করতাম তা দিয়ে পরের তিন চারমাস কর্মচারীদের বেতন ও দোকান ভাড়া ভালোভাবে চলে যেত। কিন্তু এবারের চিত্রটা একেবারেই ভিন্ন। এবার চার মাস ধরে ব্যবসা বন্ধ। এর মধ্যে রোজার ঈদও চলে গেছে। জমানো টাকা দিয়ে ১৪ জন কর্মচারীর বেতন পরিশোধ করেছি। আবার এই ১৪ জনের মধ্য থেকে আটজনকে কাজ থেকে একেবারেই বাদ দিতে হয়েছে।’

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য বলছে, দেশে ১৫ জনের কম কর্মচারী কাজ করেন এমন পাইকারি ও খুচরা বিক্রেতাদের প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা প্রায় ৫৪ লাখ। এসব প্রতিষ্ঠানে ৯৭ লাখ কর্মচারী কাজ করে। যদি এই এসব ছোট ছোট প্রতিষ্ঠান ব্যবসা গুটিয়ে নেয় তবে প্রায় এক কোটি শ্রমিক কর্মহীন হয়ে পড়বে।

বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতির সভাপতি মো. হেলাল উদ্দীন বলেন, ‘দেশে ফুটপাথে ব্যবসা করে কিংবা অতিক্ষুদ্র ব্যবসায়ীর সংখ্যা ৬০ লাখ। যাদের কোনো লাইসেন্স নেই, ব্যাংকে লেনদেন নাই। কম পুঁজি দিয়ে দিনে ইনকাম দিনে শেষ- এমন ব্যবসায়ী সবচেয়ে বেশি বিপদে রয়েছেন। গত চার মাসে তাদের কেউই ব্যবসা করতে পারেনি। উল্টো পুঁজি ভেঙে খেতে হচ্ছে।’

তিনি বলেন, ‘অনেকের তো গ্রামে যাওয়ারও উপায় নেই। আমরা সরকারের কাছে অনেকবার বলেছি, এদের একেকজনের পুঁজি ৫০ হাজার টাকার বেশি নয়। এই টাকাটা পেলে তারা দেউলিয়া হওয়ার হাত থেকে উদ্ধার পেত। ব্যবসায়ীরা কখনো দান চায় না। আমরা লোন চাই। সহজ শর্তে ঋণের ব্যবস্থা করা গেলে এদের ব্যবসা গুটাতে হতো না।’ বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. ফরাস উদ্দীন বলেন, ‘করোনা ভাইরাস পরবর্তী সময়ে অর্থনীতির পুনরুদ্ধারে ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। আর এ খাতে নজর দিলে এই সংকট দ্রুতই কাটিয়ে ওঠা সম্ভব।’ তিনি বলেন, ‘এখন যেহেতু মানুষ গ্রামমুখী হচ্ছে, তাই কৃষি খাতে বেশি জোর দিতে হবে। কারণ মানুষ পেশা পরিবর্তন করতে বাধ্য হচ্ছে। তাদের সুযোগ দিতে হবে। না হলে দরিদ্রতা বাড়বে।’

তিনি আরো বলেন, ‘যারা কৃষি কাজে যুক্ত হবেন তাদের জন্য সহজ শর্তে ঋণের ব্যবস্থা করতে হবে। আর যারা আবারও ব্যবসা করতে চান কিন্তু পুঁজি নেই, তাদের জন্যও সরকারকে এগিয়ে আসতে হবে।’

মানবকণ্ঠ/এইচকে

 





ads






Loading...