করোনা ভাইরাসের প্রভাবে সঙ্কটে পড়বে শিল্প খাত

মানবকণ্ঠ
করোনা ভাইরাসের প্রভাবে সঙ্কটে পড়বে শিল্প খাত - মানবকণ্ঠ।

  • মৃত্তিকা সাহা
  • ০৬ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ১০:৩৫,  আপডেট: ০৬ ফেব্রুয়ারি ২০২০, ১১:৩০

প্রাণঘাতী করোনা ভাইরাসের প্রভাবে চীনের সঙ্গে পণ্য আমদানি-রফতানিতে ধীরগতি তৈরি হয়েছে। যদিও দেশের তৈরি পোশাক খাতসহ গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন শিল্পের প্রয়োজনীয় কাঁচামালের জন্য চীনের ওপরই সবচেয়ে বেশি নির্ভরশীল। ফলে সঙ্কটে পড়বে দেশের উৎপাদনমুখী শিল্প খাত। এদিকে, চীন থেকে ছড়িয়ে পড়া প্রাণঘাতী করোনা ভাইরাস আতঙ্কে সারা বিশ্ব। তাই বিশ্বের বেশকিছু দেশ ইতোমধ্যে চীনের সঙ্গে নানা ধরনের সংযোগ বিছিন্ন করেছে। বর্তমানে দেশটির সঙ্গে সবচেয়ে বেশি আমদানি-রফতানি বাণিজ্য হওয়ায় আতঙ্কিত বাংলাদেশও। এ বিষয়ে করণীয় ঠিক করতে আজ বৃহস্পতিবার প্রথমবারের মতো জরুরি বৈঠকে বসছে সরকার। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।

জানা গেছে, চীন থেকে মূলত তৈরি পোশাক শিল্পের অধিকাংশ কাঁচামাল, শিল্পের মূলধনী যন্ত্রপাতি, পদ্মাসেতুসহ সরকারি প্রকল্পের প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম, মসলা জাতীয় পণ্য আদা-রসুন, মোবাইল ফোনসহ বিভিন্ন ইলেকট্রনিক্স পণ্যসহ আরো অনেক পণ্য আসে। বাংলাদেশের প্রধান রফতানি পণ্য তৈরি পোশাক। তৈরি পোশাকের কাঁচামাল ফেব্রিকস, রাসায়নিক পদার্থ, কারখানার যন্ত্রপাতির প্রধান উৎসও চীন। এসব দিক বিবেচনা করলে আমাদের দেশের আমদানির বড় বাজার হচ্ছে চীন। এ ছাড়া, দেশের পোশাক কারখানায় সুপারভাইজারি ও টেকনিক্যাল পদে অনেক চীনা নাগরিক কাজ করেন। নববর্ষের ছুটি কাটাতে তারা চীনে গেছেন। এখন তাদের আর বাংলাদেশে আসতে দেয়া হচ্ছে না।

গুরুত্বপূর্ণ পদে কাজ করা ওই কর্মীদের অনুপস্থিতিতে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। এ ছাড়া পদ্মা সেতুসহ বিভিন্ন বড় প্রকল্পে চীনা নাগরিকরা কাজ করছেন। ফলে করোনা ভাইরাসের প্রভাব এসব প্রকল্পেও পড়তে পারে। সব মিলিয়ে চীনের এই করোনা ভাইরাস সঙ্কটের কারণে আমাদের দেশের শিল্পখাত তথা অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে বলে মন্তব্য করছেন সংশ্লিষ্টরা। এই সঙ্কট দীর্ঘায়িত হলে কাঁচামাল সঙ্কটে উৎপাদন বন্ধ রাখতে বাধ্য হবে দেশের শিল্পগুলো। এজন্য বিকল্প বাজারের খোঁজ করা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন তারা। তাদের মতে, চীনের এই সঙ্কট দেশের রফতানি খাতের জন্য সুযোগ হিসেবে দেখা দিতে পারে।

এই প্রসঙ্গে তৈরি পোশাক শিল্প মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএর সভাপতি রুবানা হক বলেন, চীনের কারোনা ভাইরাস আতঙ্কে বাংলাদেশের পোশাক খাতে নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। তিনি বলেন, তৈরি পোশাকের কাঁচামালের বড় একটি অংশ আমদানি হয় চীন থেকে। বর্তমানে চীনের শিপমেন্ট বন্ধ থাকায় কাঁচামাল আসতে পারছে না। এতে তৈরি পোশাক খাতের অনেক প্রতিষ্ঠানে উৎপাদন ব্যাহত হবে।

একই বিষয়ে গবেষণা প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজের (বিআইডিএস) সিনিয়র গবেষক অথনীতিবিদ ড. নাজনীন আহমেদ মানবকণ্ঠকে বলেন, চীনের করোনা ভাইরাসের প্রভাবে দেশের তৈরি পোশাকখাতসহ অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। কেননা তৈরি পোশাক শিল্পের প্রয়োজনীয় কাঁচামালের অধিকাংশই চীন থেকে আমদানি করা হয়। বর্তমানে চীনের হলিডে উপলক্ষে আমদানি বন্ধ থাকায় এসব প্রতিষ্ঠানের উৎপাদন ব্যাহত হবে। আর উৎপাদন ব্যাহত হলে আমাদের পণ্য যেসব দেশে রফতানি করা হয় সেখানেও সমস্যা তৈরি হবে। তবে চীন থেকে যেসব দেশ আমদানি করতো সেসব দেশে বাংলাদেশের সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে।

বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্র জানায়, বাংলাদেশ পণ্য আমদানির জন্য এককভাবে চীনের ওপর সবচেয়ে বেশি নির্ভরশীল। গত অর্থবছর বাংলাদেশ চার লাখ ৩৮ হাজার ৫৪০ কোটি টাকার পণ্য আমদানি করেছে। এর মধ্যে চীন থেকেই আমদানি হয়েছে এক লাখ ১৪ হাজার ৫৯৩ কোটি টাকার পণ্য। অর্থাৎ মোট আমদানির ২৬ শতাংশের বেশি হয়েছে চীন থেকে। চলতি অর্থবছরের জুলাই-ডিসেম্বরে আমদানি কমেছে ৩ শতাংশ এবং রফতানি কমেছে প্রায় ৬ শতাংশ। চীনের এই সঙ্কটের কারণে আমদানি-রফতানি আরো কমবে। এতে দেশের রাজস্ব আদায়ে ব্যাপক ঘাটতি দেখা দেবে।

পোশাক শিল্প মালিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তাদের কাছে যে কাঁচামাল রয়েছে, তা দিয়ে এক মাস থেকে সর্বোচ্চ ২ মাস উৎপাদন করা যাবে। এখন সব ধরনের আমদানি বন্ধ হয়ে গেছে। কাঁচামাল ফুরিয়ে গেলে কারখানা বন্ধ করতে বাধ্য হবেন মালিকরা। এতে পোশাকের রফতানি কমে যাবে। শ্রমিকরা বেকার হবেন। পোশাক রফতানি কমে গেলে রফতানির নেতিবাচক প্রবণতা আরো ভয়াবহ আকার ধারণ করবে।

এ প্রসঙ্গে ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইয়ের সহ-সভাপতি ও বিজিএমইএর সাবেক সভাপতি সিদ্দিকুর রহমান বলেন, উৎপাদনশীল সব খাতেই এর প্রভাব পড়বে। হলিডের কারণে বর্তমানে শিপমেন্ট দেরি হবে। এতে উৎপাদন বন্ধ হয়ে যাবে। তিনি আরো বলেন, নিত্যপ্রয়োজনীয় যেসব পণ্য আমদানি করা হয়, সেখানেও বড় বাঁধা তৈরি হবে। এসব পণ্যের দাম বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

চীনের সঙ্গে বৈদেশিক বাণিজ্যের ওপর দেশের ব্যাংক খাতও নির্ভরশীল। ইতোমধ্যে পণ্য আমদানি ঋণপত্র (এলসি) খোলা অনেক কমে গেছে। এতে ব্যাংকের ব্যবসায় নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। এই প্রসঙ্গে সোনালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও আতাউর রহমান প্রধান বলেন, চীনের সঙ্গে আমাদের অনেক আমদানি-রফতানি হয়। মূলধনী যন্ত্রপাতির বেশিরভাগই আসে চীন থেকে। বর্তমান পরিস্থিতিতে নতুন করে কোনো এলসি খোলা হচ্ছে না। সেক্ষেত্রে বিকল্প বাজার খোঁজা হচ্ছে।

মানবকণ্ঠ/জেএস



poisha bazar

ads
ads