আকাশ পথে পণ্য পরিবহনের বাজার হারাচ্ছে বিমান

আকাশ পথে পণ্য পরিবহনের বাজার হারাচ্ছে বিমান

poisha bazar

  • আব্দুল্লাহ রায়হান
  • ০৮ ডিসেম্বর ২০১৯, ১০:২৫

আকাশ পথে সারা বিশ্বে কার্গো বা পণ্য পরিবহনের পরিধি প্রতিবছর গড়ে কমপক্ষে ২০ শতাংশ হারে বাড়ছে। বিদেশি এয়ারলাইন্সগুলো প্রতিযোগিতা করে এই রমরমা বাণিজ্য করছে। তবে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স নিজস্ব উড়োজাহাজ দিয়ে যাত্রীর পাশাপাশি পণ্যও পরিবহন করছে। কিন্তু দিন দিন আকাশ পথে পণ্য পরিবহনের বাজার হারাচ্ছে বিমান।

এতে কার্গো পরিবহন ও হ্যান্ডলিং খাতে আয় অনেক কমেছে বিমানের। এজন্য বিমানের বাড়তি ভাড়া ও শাহজালাল বিমানবন্দরের স্ক্যানিং ও গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিংয়ের অতিরিক্ত চার্জকে দায়ী করছেন আকাশ পথে পণ্য পরিবহনের সঙ্গে যুক্তরা। যদিও কার্গোর বাজার দখলে প্রতিবেশি দেশের অতিরিক্ত কম মূল্যে পণ্য পরিবহনকে দায়ী করছে বিমান কর্তৃপক্ষ।

গেল বছরের একই সময়ের চেয়ে জুলাই থেকে অক্টোবর পর্যন্ত চার মাসে বিমানের কার্গো পরিবহন কমেছে ৩ হাজার ২৩৬ টন। এর প্রভাব পড়ছে গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিংয়েও। ফলে আয় কমেছে ৭৩ কোটি টাকা। হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের পরিবর্তে বিকল্প রুটে দেশের বাইরে কার্গো পাঠাচ্ছে রফতানিকারকরা।

বর্তমান বিশ্বের তুলনায় বিমানের কার্গোতে প্রতি কেজিতে ১ ডলার বেশি আদায় করা হচ্ছে চার্জ। এতে বারবার রফতানিকারকরা বিমান ও বেবিচকের কাছে হ্যান্ডলিং ও সিকিউরিটি চার্জ কমানোর প্রস্তাব দেয়ার পরও কোনো ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে না। রফতানিকারকরা বাধ্য হয়েই শুধু খরচ ও সময় বাঁচাতে বিকল্প পথে কার্গো পাঠাচ্ছেন দেশের বাইরে।

এমিরেটস, লুফথানসা, টার্কি, ক্যাথে প্যাসিফিক, চায়না ইস্টার্ন, হংকং এয়ার, কাতার, কুয়েত, ইতিহাদ ও ব্যাঙ্কক এয়ারের কার্গো ফ্লাইটগুলো রীতিমতো প্রতিযোগিতায় মেতে ওঠে ঢাকা থেকে আকাশ পথে পণ্য পরিবহনে। বিমানের নিজস্ব কার্গো উড়োজাহাজ সার্ভিস না থাকায় বিদেশি এয়ারলাইন্সগুলো এই সুযোগ নিচ্ছে।

রফতানিকারকদের অভিযোগ, হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কার্গো হাউসে গেলে প্রচুর সমস্যা চোখে পড়ে। স্থানাভাবের দরুন লোড-আনলোডে সময় লাগা, বিমানের কার্গো হ্যান্ডলিং চার্জ ও সিভিল এভিয়েশনের সিকিউরিটি ও অন্যান্য চার্জ এত বেশি যে, তা বিশ্বের সর্বদ্বিতীয়। অথচ এই কার্গো কলকাতা দিয়ে পাঠানো হলে খরচ কমে আসে কেজিপ্রতি এক থেকে দেড় ডলার। পণ্যের দাম নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ নিয়ামক পরিবহন খরচ। তাই যেখানে ছাড় পান সেখানেই ছুটেন ক্রেতারা। আগে দেশের যেসব রফতানি কার্গো পরিবহন হতো শাহজালাল বিমানবন্দর দিয়ে সম্প্র্রতি সেগুলো যাচ্ছে বেনাপোল হয়ে কলকাতা বিমানবন্দর দিয়ে। কিছু পণ্য যাচ্ছে চট্টগ্রাম বন্দর হয়ে কলম্বো বিমানবন্দর দিয়ে।

মামুন আব্দুল্লাহ নামে একজন রফতানিকারক জানান, সম্প্র্রতি তিনি যুক্তরাজ্যে গার্মেন্টের একটি চালান সমুদ্র পথে সঠিক সময়ে পাঠাতে ব্যর্থ হয়ে দ্রুত বিমানবন্দরের কার্গো দিয়ে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেন। এতে খোঁজ নিয়ে জানতে পারেন, কার্গো দিয়ে এই ৫ হাজার কেজি পোশাক পণ্য পাঠাতে যে ব্যয় তার অর্ধেক খরচে কলকাতা বিমানবন্দর দিয়ে পাঠানো সম্ভব। শেষে তিনি সড়ক পথেই কলকাতা পাঠানোর পর সেখান থেকে আবার আকাশ পথে এই চালান পাঠান। এতে ঢাকার তুলনায় কেজিপ্রতি ৩০ সেন্টস (২৫ টাকা) কম পড়ে। সময়ও কম লাগে গড়ে প্রতি ফ্লাইটে ৫ ঘণ্টা। শুধু মনির নন, তার মতো অন্যরাও একই পথ ব্যবহারে রফতানি পণ্য পাঠাচ্ছেন ইউরোপের বিভিন্ন গন্তব্যে।

বিমান সূত্রে জানা যায়, গত বছর কার্গো হাউসে আরএ-৩ এরিয়ার স্থানসঙ্কুলান না হওয়ায় ভারতের ওই নতুন রুট ব্যবহারের বিশেষ অনুমোদন দেয়া হয়। এরপর থেকেই রফতানিকারকরা ঢাকার পরিবর্তে কলকাতা ও কলম্বো রুটের প্রতি আগ্রহী হয়ে উঠছেন। বিমানের হিসাব অনুযায়ী- প্রায় ২ লাখ বর্গফুটের রফতানি কার্গো হাউসে আরএ-৩ এরিয়ায় (ইউরোপীয় ইউনিয়ন মানের বিশেষ নিরাপদ এলাকা) মাত্র ৪১ হাজার বর্গফুট বিশেষ বেষ্টনীতে। আমদানি কার্গোতেও মাত্র দেড় লাখ বর্গফুটের স্পেস দিয়ে পরিস্থিতি সামাল দিতে হচ্ছে। সীমিত এলাকায় এত বিশাল পরিমাণের কার্গো হ্যান্ডেল করাটা খুবই কষ্টসাধ্য। এত সীমাবদ্ধতার মাঝে বিমান চলতি অর্থবছরে শুধু কার্গো শাখার রাজস্ব আদায় করেছে প্রায় হাজার কোটি টাকা। বিমানের ডেডিকেটেড কার্গো ফ্লাইট না থাকলেও শুধু নিজস্ব উড়োজাহাজ দিয়ে চলতি বছর প্রায় ৩০ হাজার টন কার্গো বহন করেছে।

সূত্র আরো জানিয়েছে, হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের আমদানি ও রফতানি কার্গো হাউস দিয়ে বছরে তিন লক্ষাধিক টন কার্গো হ্যান্ডলিং করে। শুধু চলতি অর্থবছরেই ৩ লাখ ৬০ হাজার ১৭১ টন কার্গো সেবা দিয়েছে বিমান। কার্গোর এই ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা থাকলেও অবকাঠামোগত ও অন্যান্য সুবিধা বাড়ছে না। বিশেষ করে রফতানি কার্গো হাউসের শেড এতই ছোট যে প্রায়ই সময়মতো দ্রুত কার্গো সেবা থেকে বঞ্চিত হতে হয়। প্রায়ই শেডের বাইরে খোলা আকাশের নিচে মালামাল রাখতে হয়। এতে চুরি ও হারানোর ঘটনা ঘটছে অনায়াসে।

এমজিএইচ গ্রুপ ব্যবস্থাপনা পরিচালক সুভাস দেব বলেন, প্রথমত স্ক্যানিং চার্জ, দ্বিতীয়ত হ্যান্ডলিং চার্জ সব মিলিয়ে বাংলাদেশে খরচ হয় ১৮-২০ সেন্ট ইউএস ডলারের মতো, কলকাতা বা কলম্বোতে ১২ সেন্টে হয়ে যায়। তাই অনেকেই কম খরচ যেখানে পাচ্ছেন সেখানেই ছুটছেন।

এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ফ্রেইট ফরোয়ার্ড অ্যাসোসিয়েশন্স পরিচালক বখতিয়ার জানান, সাধারণত ঢাকা বিমানবন্দর থেকে সরাসরি কার্গো ফ্লাইটে কেজিপ্রতি ২ থেকে সোয়া ২ ডলার লাগে। এ ছাড়া আরো দিতে হয়- বিমানের হ্যান্ডলিং চার্জ বাবদ ৮ সেন্ট ও সিভিল এভিয়েশনের বিভিন্ন সিকিউরিটি চার্জ বাবদ কেজিপ্রতি ৬ সেন্টস। সেই আরো ৬ সেন্টস লাগে স্পিড মানি ও অন্যান্য চার্জ বাবদ। অথচ কলকাতা বিমানবন্দরে টার্মিনাল হ্যান্ডলিং ও সিকিউরিটি চার্জ বাবদ মোট লাগে মাত্র ৪ সেন্টস। সে তুলনায় বলা চলে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কার্গো ব্যয় বিশ্বের সর্বোচ্চ দ্বিতীয় ব্যয়বহুল। এ দিক থেকে হিসেব করলে ঢাকার পরিবর্তে কলকাতা বিমানবন্দর দিয়ে কার্গো পাঠালে মোট ব্যয়ের ২৫ ভাগ সাশ্রয় হয়।

বাংলাদেশ এয়ার ফ্রেইট ফরোয়ার্ড অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মাহবুব আনাম বলেন, ঢাকা থেকে কলকাতা ও কলম্বো হয়ে নতুন এই রুটে প্রতিমাসে কমপক্ষে গড়ে ২৫ শত টন গার্মেন্টস পণ্য রফতানি করা হয়। এটা পিক সিজনে আরো বাড়ে। এখানকার কার্গোতে নানাবিধ সীমাবদ্ধতার দরুন বাধ্য হয়েই নতুন রুটের দিকে ঝুকছে গার্মেন্টস ব্যবসায়ীরা। বিমানের উচিত জরুরি ভিত্তিতে কার্গোর অবকাঠামোগত ও অন্যান্য লজিস্টিক সাপোর্ট বাড়ানো। তিনি জানান, তার নিজস্ব প্রতিষ্ঠান এক্সপো ফ্রেইট লিমিটেড এককভাবে দেশের গার্মেন্টস পণ্য আকাশ পথে রফতানি করছে। দৈনিক যেখানে শাহজালাল বিমানবন্দর দিয়ে ৫শ’ টন কার্গো রফতানি করা হচ্ছে- সেখানে তার প্রতিষ্ঠান এককভাবেই কলকাতা রুট দিয়ে দৈনিক ৫০ টন কার্গো বহন করছে।

বিমান সচিব মহিবুল হক বলেন, আমরা চার্জ কমানোর বিষয়টি বিবেচনায় রেখেছি। যেভাবে বলা হচ্ছে-কার্গো কমছে সেটা ঠিক নয়। কিছু রফতানিকারক দ্রুত মালামাল পাঠানোর জন্য ঢাকার পাশাপাশি কলকাতা বিমানবন্দর ব্যবহার করছেন। উন্নত মানের সেবা দিতে গিয়ে চার্জ কিছুটা বেশি পড়লেও সুযোগ সুবিধার কোনো অভাব নেই। আন্তর্জাতিক মানের সুবিধা এখানে সর্বোচ্চ রয়েছে। চার্জ একটু কম বেশি হতেই পারে। একটু ভাল কিছু পেতে গেলে চার্জ বেশি হতেই পারে।

বিমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোকাব্বির হোসেন বলেন, কলকাতা এয়ারপোর্টে তেমন কোনো কার্গো নেই, ফলে যে ফ্লাইট আসছে, তারা যে দামে পাচ্ছে সে দামেই কার্গোগুলো বহন করছে।

মানবকণ্ঠ/আরবি




Loading...
ads






Loading...