লাগাম টানা যাচ্ছে না খেলাপি ঋণে

- প্রতীকী

poisha bazar

  • মৃত্তিকা সাহা
  • ২৯ নভেম্বর ২০১৯, ০১:৩৪

সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংকের নানা তৎপরতার পরও কমছে না খেলাপি ঋণ। লাগামহীনভাবে বেড়েই চলেছে ব্যাংকিং খাতের বিষফোঁড়া খ্যাত এই খেলাপি ঋণ। পাহাড় সমান খেলাপি ঋণে ডুবতে বসেছে দেশের ব্যাংকখাত। কোনোভাবেই যেন লাগাম পরানো যাচ্ছে না।


চলতি বছরের সেপ্টেম্বর প্রান্তিক শেষে ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে এক লাখ ১৬ হাজার ২৮৮ কোটি টাকা। যা মোট বিতরণকৃত ঋণের ১১ দশমিক ৯৯ শতাংশ। তিন মাসের ব্যবধানে খেলাপি ঋণ বেড়েছে প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকা। বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে।

জানা গেছে, ঋণ পুনর্গঠন ও বিশেষ সুবিধায় ঋণ পুনঃতফসিলের পরও খেলাপি ঋণের লাগাম টানা যাচ্ছে না।

দেশে পর্যাপ্ত বিনিয়োগ না থাকায় ব্যবসা-বাণিজ্যে গতি ফিরছে না। এমন পরিস্থিতিতে একদিকে যেমন ব্যাংকের ঋণ বিতরণ বাড়ছে না, অন্যদিকে আগে বিতরণ হওয়া ঋণের টাকাও ফেরত পাচ্ছে না ব্যাংক। এতে করে ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ বেড়েই চলছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, বিশেষ সুবিধাপ্রাপ্ত নিয়মিত ঋণগুলো আবার খেলাপি হতে শুরু করায় খেলাপি ঋণ বাড়ছে।

সূত্র মতে, রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ী ও শিল্পদ্যোক্তাদের বিশেষ সুবিধা দিতে ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণ পুনঃতফসিল ও পুনর্গঠনে (নিয়মিত) বিশেষ ছাড় দেয়া হয়।

২০১৩ সালের জুলাই থেকে ২০১৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে এ সুযোগ নেন দেশের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে বড় শিল্প গ্রুপের উদ্যোক্তারা। এর আওতায় বাংলাদেশ ব্যাংকের অনাপত্তি সাপেক্ষে প্রায় ৪৯ হাজার কোটি টাকার খেলাপি ঋণ নিয়মিত করা হয়েছে।

এর বাইরে বিদ্যমান নীতিমালার আওতায় ব্যাংকগুলো নিজেরা আরো ৬৪ হাজার ৮৬২ কোটি টাকার ঋণ নিয়মিত করেছে। সর্বশেষ ১৭ নভেম্বর মাত্র ২ শতাংশ ডাউন পেমেন্ট দিয়ে ৯ শতাংশ সুদহারে ঋণ পুনঃতফসিলের (রিশিডিউলিং) সুবিধার সময়সীমা বাড়িয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। হাইকোর্টের নির্দেশনা অনুযায়ী আরো ৯০ দিন সময় পাবেন আবেদনকারীরা।

সূত্রমতে এই সুবিধায় ঋণ পুনঃতফসিল করে নিয়মিত হয়েছেন অনেকে। এখন পর্যন্ত পুনঃতফসিল সুবিধা অব্যাহত রয়েছে।

তার পরও এ খাতে খেলাপি ঋণ না কমে উল্টো বেড়েছে। তবে প্রতি প্রান্তিকে হাজার হাজার কোটি টাকার খেলাপি ঋণ বৃদ্ধিকে এ খাতের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকি হিসেবে দেখছেন অর্থনীতিবিদরা।

তারা বলছেন, বাছবিচার ছাড়া ঋণ অনুমোদন, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার সর্বোত্তম পরিপালন না করা এবং ঋণ আদায় কার্যক্রম জোরদার না করার কারণেই খেলাপি ঋণ বাড়ছে। এতে ব্যাংকের তহবিল ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে। কারণ খেলাপি ঋণের বিপরীতে ব্যাংকগুলোকে প্রয়োজনীয় প্রভিশন সংরক্ষণ করতে হচ্ছে।

অন্যদিকে, তহবিল ব্যয় বাড়ায় ঋণের সুদও প্রত্যাশিত হারে কমছে না। এতে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে ব্যবসা-বাণিজ্য।

এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, খেলাপি ঋণ বেশি হলে ব্যাংকের ঋণ দেয়ার ক্ষমতা কমে যায়। ফলে সুদের হারও বাড়ে।

বর্তমানে গ্রাহকদের আমানতের সুদের হার কমিয়ে এসব সমন্বয় করছে ব্যাংকগুলো। ফলে আমানতকারীরা নিরুৎসাহিত হয়ে পড়ছেন।

তিনি আরো বলেন, খেলাপিদের বিভিন্ন সুবিধা দেয়ার ফলে ভালো গ্রাহকদের কাছে খারাপ সংকেত যাচ্ছে। আর অবলোপন করা হচ্ছে জনগণের আমানতের অর্থ দিয়ে। এর প্রভাব পড়েছে গ্রাহকদের ওপর।

একই বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক সিরাজুল ইসলাম বলেন, ২ শতাংশ সুবিধা দিয়ে ঋণ পুনঃতফসিলের যে প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছে, তা এখনো কার্যকর হয়নি। এর প্রভাব আগামী ডিসেম্বরে পাওয়া যাবে। সে সময় খেলাপি অনেক কমে আসবে।

খেলাপি ঋণ কমাতে বাংলাদেশ ব্যাংকের পাশাপাশি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকেও কার্যকর ভূমিকা পালন করতে হবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের তৃতীয় প্রান্তিক শেষে (জুলাই- সেপ্টেম্বর) মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে এক লাখ ১৬ হাজার ২৮৮ কোটি ৩১ লাখ টাকা, যা ব্যাংকগুলোর বিতরণ করা ঋণের ১১ দশমিক ৯৯ শতাংশ।

এর আগের প্রান্তিক অর্থাৎ জুন মাস শেষে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ১ লাখ ১২ হাজার ৪২৫ কোটি ১৭ লাখ টাকা, যা ওই সময়ের বিতরণ করা ঋণের ১১ দশমিক ৬৯ শতাংশ।


প্রতিবেদনে দেখা যায়, বেসরকারি ব্যাংকগুলোতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ অনেক বেড়েছে।

তিন মাসের ব্যবধানে বেসরকারি ৪০ ব্যাংকে খেলাপি ঋণ ২ হাজার ৬৫০ কোটি টাকা
বেড়েছে। সেপ্টেম্বর শেষে বেসরকারি ব্যাংকে মোট খেলাপি ঋণ ৫৪ হাজার ৫৪৭ কোটি ১৬ লাখ টাকা, যা এসব ব্যাংকের বিতরণ করা ঋণের ৭ দশমিক শূন্য ৪৩ শতাংশ।

গত জুন শেষে বেসরকারি ব্যাংকে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ৫১ হাজার ৯২৪ কোটি টাকা, যা ওই সময়ে তাদের বিতরণ করা ঋণের ৭ দশমিক ১৩ শতাংশ।

সেপ্টেম্বর শেষে রাষ্ট্র মালিকানাধীন বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৫ হাজার ৯২২ কোটি টাকা, যা তাদের বিতরণ করা ঋণের ৩১ দশমিক ৫২ শতাংশ।

এর আগের প্রান্তিকে এসব ব্যাংকের মোট খেলাপি ঋণ ছিল ৫৩ হাজার ৭৪৪ কোটি টাকা, যা ওই সময়ের বিতরণ করা ঋণের ৩১ দশমিক ৫৮ শতাংশ। সে হিসেবে গত মাসে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ১ হাজার ১৭৮ কোটি টাকা। সেপ্টেম্বর শেষে বিদেশি ৯ ব্যাংকের খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ৯১ কোটি ২৪ লাখ টাকা, যা ব্যাংকগুলোর বিতরণ করা ঋণের ৬ দশমিক ১ শতাংশ।

গত জুন শেষে এসব ব্যাংকে মোট খেলাপি ঋণ ছিল ২ হাজার ৫৭ কোটি ৬২ টাকা, যা
বিতরণ করা ঋণের ৫ দশমিক ৬২ শতাংশ। আর দুই বিশেষায়িত ব্যাংকের (কৃষি ও রাকাব) খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৪ হাজার ৭০০ কোটি ৪১ লাখ টাকা, গত জুন শেষে যা ছিল ৪ হাজার ৬৯৮ কোটি ৮৩ লাখ টাকা। ব্যাংক দুটির বিতরণ করা ঋণের ১৭ দশমিক ৮১ শতাংশ খেলাপি।


এদিকে, আহম মুস্তফা কামাল অর্থমন্ত্রীর দায়িত্ব নেয়ার পরই খেলাপি ঋণ আর এক টাকাও বাড়বে না বলে ঘোষণা দিয়েছিলেন। কিন্তু তার এমন ঘোষণার পরই গত মার্চ প্রান্তিকে খেলাপি ঋণের নতুন রেকর্ড সৃষ্টি হয়েছে।

সম্প্রতি খেলাপি ঋণ এবং ঋণের সুদহার কমাতে বাংলাদেশ ব্যাংকে তফসিলি ব্যাংকগুলোর সঙ্গে বৈঠক করেন অর্থমন্ত্রী। এই বৈঠকেও তিনি বলেছিলেন যে, জুন প্রান্তিকে খেলাপি ঋণ কমে আসবে। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেছে, জুন প্রান্তিকে এমনকি সেপ্টেম্বর প্রান্তিকেও বেড়েছে খেলাপি ঋণ।




Loading...
ads






Loading...