পেঁয়াজ নিয়ে চলছে চোর-পুলিশ খেলা

পেঁয়াজ
পেঁয়াজ - ছবি : সংগৃহীত

poisha bazar

  • আসাদ জোবায়ের
  • ০৭ নভেম্বর ২০১৯, ০৮:৩০,  আপডেট: ০৭ নভেম্বর ২০১৯, ১৪:৫২

সেপ্টেম্বরের শেষ সপ্তাহে ভারত পেঁয়াজ রফতানি বন্ধের ঘোষণা দেয়ার সঙ্গে সঙ্গে বাংলাদেশের বাজারে অস্থিরতা শুরু হয়। যদিও তখন আগের আমদানি করা পর্যাপ্ত পেঁয়াজ দেশে ছিল। এরপর উদ্যোগ নেয়া হয় মিয়ানমারসহ আরো কয়েকটি দেশ থেকে পেঁয়াজ আমদানির।

কিন্তু সেই পেঁয়াজ আসলেও দাম ধারাবাহিকভাবে বাড়তেই থাকে। এর মধ্যে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় মাঠে নামলেই কিছুটা কমে। অভিযান বন্ধ করলে আবার বাড়তে থাকে। এ যেন ব্যবসায়ীদের চোর-পুলিশ খেলা।

সর্বশেষ পেঁয়াজের দাম দেড়শ’ টাকা ছাড়িয়ে গেলে ফের নড়েচড়ে বসে প্রশাসন। অভিযানে নামে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার অঞ্চলে। অমনি কেজিতে ১০ থেকে ১৫ টাকা দাম কমে এসেছে। তবুও আমদানি খরচ ও খুচরা দামের মধ্যে বিস্তর ফারাক রয়েই গেছে। বাংলাদেশ ব্যাংক ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের পর্যালোচনায় দেখা গেছে পাইকারি পর্যায়ে পেঁয়াজের দাম ৭০ টাকার বেশি হওয়া উচিত নয়। সেখানে গতকালও রাজধানীর সবচেয়ে বড় পাইকারি বাজার শ্যামবাজারে বার্মিজ পেঁয়াজ ৯৫ থেকে ১০০ টাকায় বিক্রি হয়। অভিযানে নামার দুই দিন আগে এটি ছিল ১০৫ থেকে ১১০ টাকা।

জানা গেছে, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের এক দল কর্মকর্তা এখন চট্টগ্রাম অঞ্চলে রয়েছে। তারা মূলত মিয়ানমার থেকে যে পেঁয়াজ আসছে, তার আমদানি খরচ পর্যালোচনা করে দেখছেন। গত মঙ্গলবার থেকে তারা কাজ শুরু করেছেন। এরপর তাদের রিপোর্ট এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের এলসিতে প্রদর্শিত দাম পর্যালোচনা করে খুচরা পর্যায়ে পেঁয়াজের দাম কত হওয়া উচিত তা নির্ধারণ করবে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়।

এদিকে মিয়ানমার থেকে আমদানি করা পেঁয়াজ প্রতি কেজি ৫৫ থেকে ৬০ টাকায় বিক্রি করতে হবে। এর বেশি দামে বিক্রি করলে সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে। মিয়ানমার থেকে আমদানি করা এ পণ্যের তথ্য বিশ্লেষণ করে চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয় থেকে এ নির্দেশ দেয়া হয়েছে। তবে ভারত, মিসর ও তুরস্ক থেকে আমদানি করা পেঁয়াজের বিষয়ে কিছু বলা হয়নি।

তবে সিটি গ্রুপের পরিচালক বিশ্বজিৎ সাহা মানবকণ্ঠের সঙ্গে আলাপচারিতায় বলেছেন, তুরস্ক থেকে তাদের আড়াই হাজার মেট্রিক টন পেঁয়াজ এ মাসের ২০-২২ তারিখের দিকে আসবে। যার ল্যান্ডিং কস্ট ৪২ টাকা। গত মঙ্গলবার বাংলাদেশ ব্যাংক ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বৈঠকেও এমন তথ্য উঠে এসেছে। তারা বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য পর্যালোচনা করে দেখেছেন- এখন যেসব পেঁয়াজ আসছে, সেগুলোর বেশির ভাগের এলসি খোলা দাম বাড়ার আগে। প্রতি কেজির খরচ পড়েছে সর্বোচ্চ ৪৫ টাকা।

এর সঙ্গে ব্যবসায়ীদের মুনাফা ১৫ শতাংশ হিসেবে প্রতি কেজিতে যোগ হতে পারে পৌনে ৭টাকা। পরিবহন ও অপচয় বাবদ খরচ আরো ১৫ টাকা। সব মিলে আমদানি খরচের সঙ্গে যোগ হচ্ছে ২২ টাকা। এ হিসেবে ৪৫ টাকার পেঁয়াজ খুচরা বাজারে ৬৭ টাকার বেশি দরে বিক্রি করা অযৌক্তিক।

এমন প্রেক্ষাপটে ঢাকার কারওয়ানবাজার ও শ্যামবাজারে খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, সরকারের দুই দিনের তৎপরতায় কেজিতে ১০ থেকে ১৫ টাকা কমেছে পেঁয়াজের দাম। শ্যামবাজারের ব্যবসায়ী নূরু মিয়া জানান, সেখানে মিয়ানমারের পেঁয়াজ পাইকারিতে বিক্রি হচ্ছে ৯৫ থেকে ১০০ টাকা। দুই দিন আগে এটি ছিল ১০০ থেকে ১০৫ টাকা। এ ছাড়া মিসরের পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে ৯০ থেকে ৯৫ টাকা। দুই দিন আগে যা বিক্রি হয়েছে ১০০ থেকে ১১০ টাকা। এ ছাড়া দেশি পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে ১০৫ থেকে ১১০ টাক। দুই দিন আগে যা ছিল ১১৫ থেকে ১২৫ টাকা।

এ ছাড়া কারওয়ানবাজারে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বুধবার সেখানে দেশি পেঁয়াজ পাইকারি হিসেবে ১২০ থেকে ১৩০ টাকা এবং বার্মিজ পেঁয়াজ ১০০ থেকে ১১০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এ বাজারেও দুই দিনে কেজিতে ১০ টাকা দাম কমেছে বলে জানিয়েছেন সেখানকার ব্যবসায়ী গৌতম বাবু। এই অনৈতিক মুনাফার পেছনে কক্সবাজারের টেকনাফ ও চট্টগ্রামের ১৫ জনের একটি সিন্ডিকেটের খোঁজ পেয়েছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় এবং চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনের ভ্রাম্যমাণ আদালত।

এসব ব্যক্তি চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারের টেকনাফভিত্তিক পেঁয়াজ আমদানিকারক, সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট ও আড়তদার। এই সিন্ডিকেট ৪২ টাকায় মিয়ানমার থেকে পেঁয়াজ আমদানি করে ৯০ থেকে ১১০ টাকায় পাইকারি বাজারে বিক্রি করে আসছিল বলে অভিযোগ ওঠে।

এ প্রসঙ্গে ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইয়ের সভাপতি শেখ ফজলে ফাহিম মানবকণ্ঠকে বলেন, হঠাৎ অভিযানে এ সঙ্কটের সমাধান করা যাবে না। পেঁয়াজের ঘাটতির কারণে যে দাম বেড়েছে তা কিন্তু নয়। ভারত রফতানি বন্ধের ঘোষণা দেয়ার সঙ্গে সঙ্গে দাম বাড়ল। তখন যে দেশে পেঁয়াজ ছিল। এটা করেছে অসৎ ব্যবসায়ীর। কিন্তু নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের চাহিদা ও মজুদ সম্পর্কে সরকারের কাছে যথেষ্ট তথ্য না থাকায় সারা বছর এটির মনিটরিং করা যায় না। এ কারণেই বিভিন্ন অজুুহাতে অসৎ ব্যবসায়ীরা অতিরিক্ত মুনাফা পকেটে ভরানোর চেষ্টা করেন। শুধু পেঁয়াজ নয়, নিত্যভোগ্য সব ধরনের পণ্য সম্পর্কে সঠিক তথ্য রাখতে হবে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়কে। তা হলেই সারা বছর এটি তদারকি করতে পারবেন তারা।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, ভারত ব্যাঙ্গালুরু অঞ্চলের পেঁয়াজ রফতানির অনুমতি দিয়েছে। তবে সাধারণত সেখান থেকে বাংলাদেশে জলপথে পেঁয়াজ আসে না। বাংলাদেশ সরকার আশা করছেন শিগগিরই মহারাষ্ট্রের পেঁয়াজ রফতানির ওপর নিষেধাজ্ঞা তুলে নেবে ভারত। এ ছাড়া এস আলমসহ কয়েকটি ব্যবসায়ী গ্রুপ বড় আকারে পেঁয়াজ আমদানি করছে। এগুলো এসে পৌঁছলেই দাম কমে আসবে। সেক্ষেত্রে আরো ১০ থেকে ১৫ দিন অপেক্ষা করতে হবে বলে জানিয়েছেন বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি।


মানবকণ্ঠ/এফএইচ




Loading...
ads





Loading...