গোলাপি বলে কলকাতা টেস্টের রং বদল

মহিউদ্দিন পলাশ, কলকাতা থেকে

মানবকণ্ঠ
গোলাপি বলে কলকাতা টেস্টের রং বদল - মানবকণ্ঠ।

poisha bazar

  • মহিউদ্দিন পলাশ
  • ২১ নভেম্বর ২০১৯, ১১:৫৫

আর ১০টি টেস্টের মতোই কলকাতায় বাংলাদেশ-ভারত সিরিজের দ্বিতীয় টেস্ট অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। কলকাতাবাসীদের মাঝে ক্রিকেট নিয়ে বেজায় আগ্রহ থাকলেও টেস্ট ক্রিকেট নিয়ে সে রকম আগ্রহ কম। তাদের যত আগ্রহ রঙিন পোশাকের ক্রিকেট দুনিয়ায়। সেখানে বেশ ভালো একটা জায়গা করে নিয়েছে আইপিএল। আর ভারত যখন খেলতে আসে তখনতো কথাই নেই। হোক তা টি-টোয়েন্টি কিংবা একদিনের; টিকিট নিয়ে হুলস্থ‚ল থাকে কাণ্ড। কিন্তু এবার সেখানে সাদা পোশাকের ক্রিকেটও ব্যাপক আগ্রহ তৈরি করেছে। আর এই আগ্রহের পেছনে রয়েছে লাল বলের পরিবর্তে ‘গোলাপি’ বলের ক্রিকেট। আবার গোলাপি বলে খেলার পেছনে রয়েছেন ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডের নতুন সভাপতি সৌরভ গাঙ্গুলি।

বাংলাদেশ-ভারতের ক্রিকেট সূচি যখন ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড প্রকাশ করে, তখন এটি লাল বলের দিনের টেস্টই ছিল। তিন টি-টোয়েন্টি আর দুই টেস্টের সূচির শেষ টেস্টের ভেন্যু করা হয় কলকাতার ইডেন গার্ডেনসে। ২০০০ সালে টেস্ট পরিবারের সদস্য হওয়ার পর বাংলাদেশের এটিই ভারতে পূর্ণাঙ্গ সফর। যদিও এর আগে ২০১৭ সালে তারা একমাত্র টেস্ট খেলে গিয়েছিল হায়দরাবাদে। সে সময় অনেকেরই, বিশেষ করে বাংলাদেশের ক্রিকেটপ্রেমীদের চাওয়া ছিল টেস্টটি যাতে করে ইডেন গার্ডেনসেই হয়। এ নিয়ে বাংলাদেশের বেশ কয়েকটি সংবাদ মাধ্যমে রিপোর্টও প্রকাশ হয়েছিল। তবে ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডের সে রকম কোনো বাড়তি ভাবনা ছিল না। তাই হায়দরাবাদেই বাংলাদেশ খেলেছিল ভারতের মাটিতে তাদের একমাত্র টেস্ট। এবার যখন সফরের শেষ টেস্ট ম্যাচ সেই ইর্ডেন গার্ডেনসেই রাখা হয়, তখন বাংলাদেশের ক্রিকেটপ্রেমীদের মাঝে বাড়তি উচ্ছ¡াস প্রকাশ পায়। অনেকেই শুধুমাত্র ইডেন গার্ডেনসের টেস্ট দেখার পরিকল্পনাও করে ফেলেন। কিন্তু ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড বা কলকাতাবাসীর এ নিয়ে ন্যূনতম কোনো বাড়তি আগ্রহ ছিল না।

সবকিছু ওলট-পালট করে দেন সৌরভ গাঙ্গুলি বিসিসিআইয়ের সভাপতি হওয়ার পরই। অক্টোবরে দায়িত্ব নিয়েই তিনি বেশ কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। যেখানে অন্যতম ছিল এই গোলাপি বলের টেস্ট। ২০১৫ সালে দিবা-রাত্রির টেস্ট শুরু হওয়ার এখন পর্যন্ত বাংলাদেশ ও ভারত (আফগানিস্তান ও আয়ারল্যান্ড ২০১৭ সালে টেস্ট খেলার ছাড়পত্র পায়। তারাও খেলেনি কোনো দিবা-রাত্রির টেস্ট) ছাড়া আর সব দেশেই দিবা-রাত্রির টেস্ট ম্যাচ খেলেছে। সৌরভ গাঙ্গুলি তাই ইডেন গার্ডেনস টেস্টকেই দিবা-রাত্রির টেস্টে রূপ দেয়ার পরিকল্পনা করেন। কিন্তু তিনি চাইলেইতো আর হবে না। ভারতীয় ক্রিকেটারদের সম্মতি প্রয়োজন আবার বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডকেও রাজি হতে হবে। এর আগে দুই দেশেরই গোলাপি বলে খেলার প্রস্তাব আসলেও কোনো দেশই রাজি হয়নি। এবারো হতে পারে! কিন্তু সৌরভ গাঙ্গুলি সে শঙ্কায় না থেকে পথ চলতে শুরু করেন। একদিকে তিনি ভারতীয় দলপতি বিরাট কোহলির সাথে আলাপ করে তাদের মতামত চান। প্রস্তাব পাঠানো হয় বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডকে। দুই পক্ষ থেকেই সম্মতি আসলে দুইয়ে দুইয়ে চার হয়ে যায়। এরপর থেকে চলে আয়োজন। কিভাবে এটিকে বর্ণাঢ্য করা যায়। আমন্ত্রণ জানানো হয় দুই দেশের প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশের শেখ হাসিনা আর ভারতের নরেন্দ্র মোদিকে। আমন্ত্রণের তালিকায় রাখা হয় পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জিকেও। ভারতের প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকেও বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে আমন্ত্রণ জানানো হয় পরে। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী ও পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী আমন্ত্রণ গ্রহণ করলেও ভারতের প্রধানমন্ত্রী আসতে পারবেন না বলে জানিয়ে দেন। এর সাথে আরো নানা আয়োজন। সব মিলিয়ে দুই দেশের গোলাপি বলের প্রথম টেস্ট নিয়ে তৈরি হয় বাড়তি আগ্রহ, বাড়তি উত্তেজনা।

এই আগ্রহ এমন পর্যায়ে গিয়ে পৌঁছেছে যে ইন্দোরে বাংলাদেশ তিন দিনেই হেরে যাওয়ার পরও ৬৬ হাজার দর্শকের ইডেন গার্ডেনস স্টেডিয়ামের টেস্টের প্রথম তিন দিনের সব ক্রিকেট বিক্রি হয়ে গেছে। শুধু বিক্রি হয়ে গেছে লিখেই এই উত্তেজনা পুরোপুরি আঁচ করা যাবে না। উত্তেজনা আন্দাজ করতে পেরে পশ্চিমবঙ্গ ক্রিকেট অ্যাসোসিয়েশন (সিএবি) সরাসরি কাউন্টার থেকে টিকিট বিক্রির ব্যবস্থা করার সাহস পায়নি। দর্শকদের চাহিদা পূরণ করা সম্ভব হবে না। পরে এ নিয়ে কোনো বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হতে পারে এই আশঙ্কায় তারা সাধারণ দর্শকদের জন্য অনলাইনে টিকিট বিক্রি করেন। ইডেন গার্ডেনসের প্রধান ফটকের পাশে টিকিট বিক্রির কাউন্টারে লিখে রাখা হয়েছে ‘নো ক্যাশ সেইল’, ‘নো অফ লাইন টিকিট সেইল’। কিন্তু তাতেই কি আর কলকাতার ক্রিকেটপ্রেমীরা থেমে যাবেন। ঐতিহাসিক টেস্ট ম্যাচের সাক্ষী হতে যে তারা চান-ই চান।

তাইতো শেষ ভরসা হিসেবে সশরীরে স্টেডিয়ামে এসে হাজির। টিকিট কাউন্টার থেকে অনলাইনে কেনা দর্শকদের প্রিন্ট কপি সরবরাহ করা হচ্ছিল। সেই ফাঁকে কেউ কেউ গিয়ে টিকিট আছে কিনা জানতে চাচ্ছেন। ‘না’ শব্দটি শোনার পর হতাশ হয়ে পড়েন। পরে আবার জানতে চান কিভাবে পাওয়া যাবে? এবারো উত্তর শুনতে হয় ‘জানি না’। এখানে কোনো টিকিট বিক্রি করা হবে না বলে সাফ জানিয়ে দেয়া হয়। এদিকে দুপুরের পর সাংবাদিকদের সাথে কথা বলতে এসে সৌরভ গাঙ্গুলি জানান চতুর্থ দিনেরও সব টিকিট বিক্রি হয়ে গেছে। গোলাপি বলের টেস্ট ম্যাচ নিয়ে দর্শকদের এ রকম আগ্রহে তিনি নিজেও রোমাঞ্চিত। বলেন, ‘আমরা দেখেছি চার দিনের সব টিকিট বিক্রি হয়ে গেছে।’

ইডেনে টেস্ট মানেই স্টেডিয়ামের কাউন্টার থেকে টিকিট বিক্রি করা। কিন্তু এবারই প্রথম টেস্ট ম্যাচকে সামনে রেখে কোনো টিকিট বিক্রির ব্যবস্থা রাখা হয়নি। আসলে রাখার সাহস পাননি সিএবির কর্তারা। এ রকম আগ্রহী দর্শকদের চাপ সামলাতে রীতিমতো হিমশিম খাচ্ছিলেন কলকাতার পুলিশরা। প্রধান ফটকের সামনে দর্শকদের জটলা। সেই গেট দিয়েই আবার দায়িত্বরতদের প্রবেশ করতে হচ্ছে। তখনই বেশি চাপ আসে পুলিশের উপর। ভেতরে প্রবেশের সময় কঠোর নজরদারি। এক্রিডেটেশন কার্ড ছাড়া কাউকেই ঢুকতে দেয়া হচ্ছে না। অনেকেই আগে যেখানে বিনা বাধায় ঢুকে পড়েছেন কিংবা যারা ইডেনের পরিচিত মুখ তারা এক্রিডেটেশন কার্ড ছাড়া ঢুকতে গিয়ে বাধাগ্রস্ত হচ্ছেন। কলকাতার এক পুলিশ জানান অনেকদিন থেকেই তিনি ইডেনে দায়িত্ব পালন করছেন। কিন্তু টেস্ট ম্যাচ নিয়ে এ রকম আগ্রহ তিনি আগে কখনো দেখেননি। সবকিছুর মূল কারণ দিবা-রাত্রির টেস্ট।

এদিকে এই টেস্টকে সামনে রেখে গতকাল থেকেই অনেকে আসতে শুরু করেছেন। এমনিতেই কলকাতার নিউমার্কেট এলাকা বাংলাদেশিদের পদভারে মুখরিত থাকে। ক্রিকেটপ্রেমীদের উপস্থিতি সেখানে আরো বেশি মুখরিত হয়ে উঠেছে।

মানবকণ্ঠ/এইচকে




Loading...
ads
ads





Loading...