মুস্তাক আলী-দ্রাবিড়-লতা মুঙ্গেশকরের শহর ভুলেই যেতে চাইবে বাংলাদেশ!

মহিউদ্দিন পলাশ, ইন্দোর থেকে 

মানবকণ্ঠ
নাফিস রেস্টুরেন্ট - ছবি : প্রতিবেদক।

poisha bazar

  • মহিউদ্দিন পলাশ
  • ২০ নভেম্বর ২০১৯, ১১:৫০

দেখতে দেখতে ভারতের পরপর তিনবারের পরিচ্ছন্ন শহরে পুরস্কার পাওয়া ইন্দোরে ছয়টি দিন কেটে গেছে। ১৪ তারিখ বাংলাদেশ-ভারতের প্রথম টেস্ট শুরু হয়েছিল। তিন দিনেই খেলা শেষ হয়ে যায়। কিন্তু কলকাতায় যাওয়ার বিমানের টিকিট করা ১৯ নভেম্বরের। তাই আগে টেস্ট শেষ হলেও কলকাতায় যাওয়া সম্ভব হয়নি। বাংলাদেশ দলকেও এই দুই দিন ইন্দোরে থাকতে হয়েছে এখানেই তারা কলকাতায় দিবা-রাত্রির টেস্টকে সামনে রেখে অনুশীলন করেছেন গোলাপি বলে। ভারতীয় দলও একই কাজ করেছে। কলকাতায় ২২ নভেম্বর শুরু হবে দিবা-রাত্রির টেস্ট।

একটি নতুন শহরে আসার পর নানা রকমের অসুবিধার মুখে পড়তে হয়। ধীরে ধীরে তা কেটেও যায়। ইন্দোরে আসার পর একমাত্র খাবার সমস্যা ছাড়া আর সে রকম কোনো সমস্যায় পড়তে হয়নি। খাবার থাকলেও শুধু নিরামিষ পাওয়া যেত। কিন্তু এই সমস্যাও পরে আরে থাকেনি। ভোজনপ্রিয় জাতি হিসেবে মুখরোচক খাবারের সন্ধানে গিয়ে পরে অনেক খাবারের দোকানের সন্ধানই পেয়েছি। যেখানে মনের স্বাদ মিটিয়েই খাবার খেয়েছি। এ রকম একটি ছিল নাফিস রেস্টুরেন্ট। হোটেলে গিয়ে নাম লিখিয়ে সিরিয়াল দিতে হয়। এই হোটেলে ইন্দোরের সন্তান বলিউডের ‘ভাইজন’ সালমান খান এলেই ঢুঁ মেরে যান। ভারতীয় ক্রিকেটারদের খাবারো প্রায় সময় যায় এই হোটেল থেকে। বাংলাদেশের ক্রিকেটারদের অনেকেও এই হোটেলের খাবারের স্বাদ নিয়েছেন। ইন্দোরে খাবারের জন্য সবচেয়ে পরিচিত ছিল ছাপ্পান্ন দোকান নামক এলাকা। অসংখ্য ‘স্ট্রিট ফুড’র দোকান। উঠতি বয়সী তরুণ-তরুণীদের সংখ্যাই বেশি। অগণিত মোটরসাইকেল পার্ক করা। খাওয়া আর আড্ডা দুটিই চলে এক সাথে।

পরিচ্ছন্ন ইন্দোর শহর আইনশৃঙ্খালও নিয়ন্ত্রণে। রাত-বিরাতে চলাচলে নেই কোনো ভয়ের কারণ। ছেলে-মেয়েদের অনেক রাত অবধি বাইরে চলাফেরা করতে দেখা যায়। মোটরসাইকেলের ব্যবহার খুব বেশি। এতই বেশি যে এটিকে অনেকেই পারিবারিক বাহনে পরিণত করেছেন। অধিকাংশ মোটরসাইকেলে চালক ছাড়াও দুজনকে দেখা গেছে। আবার কেউ কেউ স্ত্রী-সন্তান নিয়েও চালাচ্ছেন। কারো কারো পেছনে বয়স্ক মহিলাদেরও দেখা গেছে। কখনো কখনো বয়স্ক মহিলা দুজনও ছিলেন পেছনে। তবে সবারই গতি নিয়ন্ত্রিত। ইন্দোর শহরে আরেকটি বিষয় ছিল লক্ষণীয়। বাস চলাচলের জন্য রাস্তার মাঝে আলাদা লেন। নির্দিষ্ট স্টপেজ। অনেকটা রেল স্টেশনের মতো। টিকিট কেটে সেই স্টপেজে ঢুকতে হয়। তারপর বাস আসলে খুলে দেয়া হয় গেট। অন্য কোনো যানবাহন যাতে প্রবেশ করতে না পারে সে জন্য ফেন্সিংও আছে। শহরে কোথায়ও ট্রাক চলাচল করতে দেখা যায়নি। রোড ডিভাইডারের মাঝে সবুজের সমারোহ। পর্যটন শহর নয়। যে কারণে শহরে দেখার মতো তেমন কিছু নেই। তারপরও ইচ্ছে করলে ঘুরে আসা যায় দেবী অহল্যা বাই হোলকারের বাসভবন, কাচ মন্দির (পুরো মন্দিরই কাচে ঘেরা। যা দেখতে খুবই দৃষ্টিনন্দন লাগে), পাতালপানি জলপ্রপাত, লালাবাগ প্লেস। শহরে সিএনজিতে চলাচলেই সুবিধা বেশি। সাশ্রয়ী। কোনো ড্রাইভার কখনো যেতে না করে না। ভাড়াও বাংলাদেশের তুলনায় অনেক কম। তিন/চার কিলোমিটারের দূরত্ব ৬০ থেকে ৭০ রুপিতে যাওয়া যায়। তবে এখানে একটি বিষয়ে বেশ বিড়ম্বনায় পড়তে হয়েছে। কাউকে কোনো জায়গার কথা জিজ্ঞেস করলে এইতো সামনে বলে দেন। মনে হবে ৫/৭ মিনিটের রাস্তা। কিন্তু সেই সামনে যে আসলে কত দূর তা বলে বোঝানো যাবে না। কখনো কখনো হাঁটতে গিয়ে এক কিলোমিটারও হাঁটা হয়ে গেছে।

এই ইন্দোরে কিন্তু ভারতের বিভিন্ন অঙ্গনের বিখ্যাত লোকদের জন্ম দিয়েছে। এই মুহূর্তে ইন্দোর সালমান শহর হিসেবেই পরিচিত। বলিউডের এই সুপার স্টারের ছোট বেলা ও স্কুল জীবন কেটেছে এখানেই। বলিউডে ব্যস্ততার মাঝেও সালমান খান মাঝে মাঝে জন্মস্থানে আসেন। তবে তা খুবই কম সময়ের জন্য। কমেডিয়ান জনি ওয়াকারের জš§ও ইন্দোরে। ভারতের জনপ্রিয় সংগীতশিল্পী লতা মুঙ্গেশকর তার সুরের মায়াজালে সবাইকে মোহচ্ছন করেছেন এই ইন্দোরের মাটিতেই জন্ম নিয়ে। হালের জনপ্রিয় সংগীতশিল্পী পলক মোচালও ইন্দোরে জন্ম নিয়ে বেড়ে উঠেছেন। সংগীতশিল্পী ও অভিনেতা কিশোর কুমারের ছোঁয়া আছে ইন্দোরে। তিনি ইন্দোরের ক্রিশ্চিয়ান কলেজের হোস্টেলে থেকে পড়ালেখা করেছেন। মকবুল ফিদে হোসেনের মতো চিত্রকরেরও ছোটবেলা কেটেছে ইন্দোরে। কিন্তু এদের আগে ইন্দোরকে পরিচিতি এনে দিয়েছিলেন সৈয়দ মুস্তাক আলী।

ভারতের হয়ে বিদেশের মাটিতে প্রথম টেস্ট সেঞ্চুরিয়ান ছিলেন সৈয়দ মুস্তাক আহমেদ। তার স্টাইলিশ আর মারমুখী ব্যাটিং ছিল ক্রিকেট দর্শকদের প্রাণের উচ্ছ¡াস। পরবর্তিতে এই শহরে জন্ম নিয়ে ভারতীয় ক্রিকেট তথা বিশ্ব ক্রিকেট শাসন করেছেন রাহুল দ্রাবিড়। লেগ স্পিনার নরেন্দ্র হিরওয়ানী উইন্ডিজের বিপক্ষে অভিষেকেই মাদ্রাজে উভয় ইনিংসে ৮টি করে উইকেট নিয়ে রেকর্ড গড়েছিলেন। তারও জš§ হয়েছিল ইন্দোরে। কিন্তু সৈয়দ মুস্তাক আলীর উচ্চতায় যেতে পারেননি কেউ। ভারতীয় দলে খেলা নোমান ওজাও ইন্দোরে জন্ম নিয়েছেন। ভারতের জাতীয় হকি দলের গোলকিপার মীর রঞ্জন নাগিও ইন্দোরের সন্তান। ভারতীয় টেস্ট দলের প্রথম অধিনায়ক সিকে নাইড়–রও পদধূলি পড়েছিল ইন্দোরের। এখানকার রাজা হোলকার তাকে অন্ধ্রপ্রদেশ থেকে ইন্দোরে নিয়ে এসেছিলেন ক্রিকেট প্রসারের জন্য। তার হাত ধরেই আবিষ্কার হয়েছিলেন সৈয়দ মুস্তাক আলী। হোলকার পরিবারের বধূ দেবী অহল্যা বাই ইন্দোরের জন্য অনেক কাজ করে সম্মানীয় হয়ে আছেন। তার নামে বিমানবন্দর, ক্রিকেট স্টেডিয়ামের নামকরণ যেন সেই সম্মানই বহন করছে।

মুস্তাক আলীর, রাহুল দ্রাবিড়-লতা মুঙ্গেশকরের শহরে বাংলাদেশ এসেছিল ভালো একটা কিছু করার বুক ভরা আশা নিয়ে। আশার পালে হাওয়া লেগেছিল কুড়ি ওভারের সিরিজে প্রথম ম্যাচে বাংলাদেশ ৭ উইকেটে জয়ের পর। সিরিজ নির্ধারণী ম্যাচেও তারা লড়াই করেছিল। কিন্তু সাদা পোশাকের ক্রিকেটে বাংলাদেশ আশার কোনো সম্ভাবনার বীজই বপন করতে পারেনি। ব্যাটিং-বোলিং দুই বিভাগেই চরম হতাশাজনক! সেই মুস্তাক আলী-দ্রাবিড়-লতা মুঙ্গেশকরের শহর থেকে বিদায় নিয়েছে বিষণ্ণ বদনে। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ভুলেই যেতে চাইবে এই টেস্ট। কারণ এই টেস্ট যে বাংলাদেশকে নিয়ে গিয়েছিল তাদের শিশুকালে। ভারতের বিশ্বসেরা বোলিং আক্রমণের বিপক্ষে ব্যাটসম্যানদের ছিল কাঁপাকাঁপি। যেটি টেস্ট অভিষেকের যাত্রাপথে দেখা যেত। বাংলাদেশের ঘরোয়া ক্রিকেটে খেলে যাওয়া জাতিন সাক্সেনা বলেন, ‘এটা ঠিক ভারতের বোলিং বিশ্বমানের। কিন্তু বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানরা বিগ শট খেলতে গিয়ে উইকেট দিয়ে এসেছেন। তাদের এখানে আরো ধৈর্য ধরে খেলা উচিত ছিল।’

মানবকণ্ঠ/এইচকে




Loading...
ads





Loading...