প্রতিকূলতাকে জয় করার ম্যাচ বাংলাদেশের

প্রতিকূলতাকে জয় করার ম্যাচ বাংলাদেশের
প্রতিকূলতাকে জয় করার ম্যাচ বাংলাদেশের - ফাইল ছবি।

poisha bazar

  • মহিউদ্দিন পলাশ
  • ০৩ নভেম্বর ২০১৯, ১২:২৮

অভাব যখন দ্বারে এসে দাঁড়ায়
ভালোবাসা তখন জানালা দিয়ে পালায়।
কবিতার এই চরণগুলোর যেন বাংলাদেশের ক্রিকেটের বর্তমান অবস্থার সাথে খুব ভালোভাবে মিল খুঁজে পাওয়া যায়। কবিতার লাইনগুলোকে একটু পরিবর্তন করে এভাবে লেখা যায়-
দুঃখ যখন দ্বারে এসে দাঁড়ায়
সুখ জানালা দিয়ে পালায়।

বাংলাদেশের ক্রিকেট যেন একটি দুঃখী পরিবার। যেদিকে দৃষ্টি যাবে শুধুই দুঃখের স্মৃতি মর্ম যাতনা হয়ে নয়নে এসে ভিড় করে। ভারত সফরে কুড়ি ওভারের ম্যাচ দিয়ে আজ পর্দা তুলতে যাচ্ছে, তখন সর্বত্রই শুধু দুঃখের কালো থাবা। যেখানে নেই আলোর কোনো সন্ধান।

আজ ভারতের বিপক্ষে বাংলাদেশ খেলতে নামবে শুধুই হাহাকার নিয়ে। এমনিতেই ভারতের বিপক্ষে কুড়ি ওভারের ম্যাচে বাংলাদেশের নেই কোনো সাফল্য। ৮ ম্যাচের সব ক’টিতেই শুধুই হার। দুই দুইবার জয় এসেও ধরা দেয়নি। তীরে এসে তরী ডুবেছিল। একটি ২০১৬ সালের কুড়ি ওভারের বিশ্বকাপে। জয়ের জন্য ৩ বলে ২ রানের প্রয়োজন ছিল। সেখানে বাংলাদেশ কোনো রানই করতে পারেনি। উল্টো ৩ উইকেট হারিয়ে ম্যাচ হাত ছাড়া করেছিল ১ রানে হেরে। পরেরটি ২০১৮ সালের নিদাহাস ট্রফিতে। শেষ বলে ছক্কা মেরে ভারত ম্যাচ জিতে নিয়েছিল। তারও আগে শেষ ২ ওভারে প্রয়োজন ছিল ৩৪ রানের। অবিশ্বাস্য হার ছিল লাল-সবুজের।
২০০০ সালে টেস্ট মর্যাদা পাওয়ার পর মাঠে ও মাঠের বাইরে পরাশক্তি ভারতে বাংলাদেশের প্রথম পূর্ণাঙ্গ সিরিজ। তিন ফরম্যাটের ক্রিকেটের মাঝে কুড়ি ওভারের ক্রিকেটে ভারত একটু বেশিই শক্তিশালী। সেই শক্তি জানার পরও বাংলাদেশের লক্ষ্য ছিল ভারতের মাটিতেই ভারত ‘বধ’। কিন্তু সে লড়াইয়ে নামার আগে সাকিব ঘটনায় ঝড়ে লণ্ডভণ্ড বাংলাদেশের ক্রিকেট। ছোট খাটো ঝড় নয়। প্রলয়ঙ্করী ঝড়। যে ঝড়ে ভারতের বিপক্ষে খেলার আগে নিজেরাই টালমাটাল।

প্রথমত সাকিবের নেতৃত্বে ক্রিকেটারদের ধর্মঘট। পরে বিনা অনুমতিতে সাকিবের মুঠোফোন প্রতিষ্ঠানের সাথে বিজ্ঞাপনের চুক্তি। সবশেষে ফিক্সিং প্রস্তাবের গোপন রাখার কারণে সাকিবকে আইসিসি ২ বছরের জন্য নিষিদ্ধ করা (শর্ত সাপেক্ষে এক বছরের সাজা মওকুফ হবে)। ধর্মঘটের ঘটনায় ঝড় উঠেছিল। বিজ্ঞাপনের ঘটনায় ঝড়ের বাতাস বেড়েছিল। ম্যাচ ফিক্সিং পোপন করার ঘটনায় সেই ঝড় প্রলয়ঙ্করী রূপ ধারণ করে প্রচণ্ড আঘাত হেনেছিল বাংলার আকাশে। ৪ দিন আগে ঘটে যাওয়া সেই প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড়ের ক্ষত এখনো দগদগে করছে বাংলার জমিনে। সাকিব বিহীন বাংলাদেশ সাধারণ ক্রিকেট ভক্তরা মেনে নিতে পারছেন না।

ভারতের বিপক্ষে কোনো ম্যাচ জিততে না পারা, দলনেতা সাকিবকে ছাড়া খেলতে নামা-শুধু এ সব ‘নেই’ না। আরো ‘নেই’ আছে। পঞ্চপাণ্ডবের বাংলাদেশও নেই। মাশরাফি কুড়ি ওভারের ক্রিকেট থেকে আগেই অবসর নিয়েছেন। সাকিব নিষিদ্ধ হওয়ার আগেই তামিম এই সফর থেকে পারিবারিক কারণে নিজেকে সরিয়ে নিয়েছেন। হারাধনের ১০টি ছেলের মতো পঞ্চপাণ্ডবের বাকি আছেন মাত্র দুজন। দুই ভায়রা মুশফিক ও মাহমুদউল্লাহ। শেষ জন দায়িত্ব পেয়েছেন সাকিবের জায়গায় নেতৃত্বের। নেই আরো আছে।

দিল্লির আবহাওয়াও বাংলাদেশের প্রচণ্ড রকমের প্রতিকূলে। দূষণীয় আবহাওয়ার কারণে বাংলাদেশের ক্রিকেটারদের মাস্ক পরেই অনুশীলন করতে হয়েছে। আজ খেলতেও নামবেন মাস্ক পরে। এদিকে মাঠের ক্রিকেটে বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ফলাফলও ভালো নয়। বিশ্বকাপে ক্রিকেটে ১০ দলের মাঝে আট নম্বর হওয়া।
বিশ্বকাপ শেষে শ্রীলঙ্কা সফরে তিন ম্যাচের একদিনের সিরিজে ধবলধোলাই হওয়া, ঘরের মাঠে আফগানিস্তানের মতো নবীশ দলের কাছে টেস্ট ম্যাচ হারা। এদিকে কুড়ি ওভারের ক্রিকেটে বাংলাদেশের অবস্থাও অন্য দুই ফরম্যাটের তুলনায় বিবর্ণ খুব বেশি। যে কারণে কুড়ি ওভারের বিশ্বকাপে সরাসরি খেলার সুযোগ হারিয়েছে। র‌্যাঙ্কিংয়ে আছে আফগানিস্তানেরও নিচে। ৮৯ ম্যাচ খেলে জয় মাত্র ২৯টিতে। যেখানে শক্তিশালী প্রতিপক্ষের জয় আবার খুবই কম। অর্থাৎ কোনো কিছুই নেই বাংলাদেশের অনুক‚লে। তারপরও সেই আঁধারের বুক চিরে আলোর দেখা পেতে ২২ গজের জমিনে ক্রিকেটারদেরই লড়তে হবে। জিততে হবে। একটি জয়ই বদলে দিতে পারে বাংলার ক্রিকেটের আকাশ। দূরে সরিয়ে দিতে পারে জমে থাকা কালো মেঘ।

সময়-স্রোত যেমন কারো জন্য বসে থাকে না, তেমনি বাংলাদেশের ক্রিকেটাররাও ধীরে ধীরে পরিস্থিতির সাথে নিজেদের মানিয়ে নিয়ে ময়দানি লড়াইয়ে জেতার জন্য মানসিকভাবে চাঙ্গা হয়ে উঠছেন। সাকিবের অভাব নয়, অনুপস্থিতিকে কাজে লাগাতে বদ্ধ পরিকর। কিন্তু কিভাবে? এক সাকিবের বিকল্প যে তিনজনকে দিয়ে পূরণ করতে হবে। ব্যাটসম্যান, বোলার ও অধিনায়ক। সাকিবের তিনে আফিফকে দিয়ে পরিকল্পনা সাজানো হয়েছে। বোলিংয়ে তাইজুলকে পরে ডাকা হয়েছে দলে। আর টস করতে নামবেন মাহমুদউল্লাহ। সাকিব থাকলে বাংলাদেশ একজন ব্যাটসম্যান বেশি নিয়ে খেলতে পারতো। এখানে ঘাটতি থেকেই যাচ্ছে। ছোট হয়ে গেছে ব্যাটিং লাইন। কুড়ি ওভারের ক্রিকেটে ভারতের আগে ব্যাটিং মানেই লম্বা ইনিংস। তাদের ছোট ইনিংসের তালিকা খুবই ছোট্ট। তামিমের জায়গায় লিটন ও সৌম্য সরকার গোড়াপত্তন করবে।

কিন্তু সৌম্য পার করছেন বাজে সময়। মুশফিক, মাহমুদউল্লাহ, মোসাদ্দেক হবেন বাকি ব্যাটসম্যান। এখানে আফিফ, সৌম্য, মাহমুদউল্লাহ, মোসাদ্দেক বোলিং করতে পারার কারণে বাংলাদেশ আরেকজন ব্যাটসম্যান বাড়াতে পারে। তিনি হতে পারেন মোহাম্মদ মিঠুন। আবার পিচ দেখে ব্যাটিং স্বর্গ মনে করছেন দলপতি মাহমুদউল্লাহ। তিনি বলেন, ‘পিচ দেখে মনে হয়েছে কিছুটা ঘাস আছে। আমার মনে হয়, ভালো উইকেট হবে। ব্যাটিংয়ের জন্য ভালো হবে। আমাদের ব্যাটসম্যানদের জন্য অনেক বড় একটা দায়িত্ব যেন ভালো একটা রান বোলারদের আমরা দিতে পারি। এমন রান যেটা তারা ডিফেন্ড করতে পারবে।’

পেস বোলিংয়ে মোস্তাফিজের সাথে আল আমিন, শফিউল ও আবু হায়দার রনির যে কোনো একজনকে দেখা যেতে পারে। ঘরের মাঠে তিন জাতির সিরিজের আবিষ্কার আমিনুল ইসলাম বিপ্লব থাকছেন সেরা একাদশে। তার সাথে আরাফাত সানি ও তাইজুলের যে কোনো একজনকে দেখা যেতে পারে।

ভারত কিন্তু আজ নামবে তাদের নিয়মিত দলপতি বিরাট কোহলিকে ছাড়াই। তিনি বিশ্রামে আছেন। দায়িত্বপ্রাপ্ত অধিনায়ক রোহিত শর্মা পূর্ণ শক্তির দল না হওয়ার পরও বাংলাদেশকে দেখছেন যথেষ্ট সমীহর দৃষ্টিতেই। তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ খুবই ভালো একটা দল। আমরা দেখেছি তারা এখন কেমন প্রতিদ্বন্দিতা করে। শুধু দেশেই নয়; দেশের বাইরেও। বিশেষ করে আমাদের বিপক্ষে। তারা সব সময় আমাদের চাপে রাখে। এই দলকে ভিন্ন চোখে দেখার কোনো উপায় নেই।’

দিল্লির ফিরোজ শাহ কোটলা স্টেডিয়াম নাম বদলে হয়ে গেছে অরুণ জেটলি স্টেডিয়াম। এই ম্যাচ দিয়েই নতুন নামের যাত্রা শুরু হবে। আগের নামে ম্যাচ হয়েছে ৫টি। যেখানে খেলেছে একটি মাত্র ম্যাচ। ২০১৭ সালে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে সেই ম্যাচ তারা জিতেছিল ৫৩ রানে। বাকি চারটি ম্যাচই অনুষ্ঠিত হয়েছিল ২০১৬ সালে কুড়ি ওভারের বিশ্বকাপে। বাংলাদেশ আজ এই স্টেডিয়ামে খেলবে প্রথম ম্যাচ।

মানবকণ্ঠ/এআইএস




Loading...
ads
ads





Loading...