নিরাপত্তার ফাঁক গলে ভালোবাসা নিবেদন অতঃপর মারধর করে থানায়!

সাকিবকে ভালোবাসা নিবেদন - ছবি: সংগৃহীত।

poisha bazar

  • মহিউদ্দিন পলাশ
  • ০৭ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ১৮:৫৭

বাংলার জমিনে যখনই আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের আসর বসে, তখনই নেয়া হয় নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা। ক্রিকেটারদের দেয়া হয় সর্বোচ্চ নিরাপত্তা। দর্শক-শোভাকাক্সক্ষীদের কাছেই ভিড়তে দেয়া হয় না। তা যেমন খেলার মাঠে, তেমনি হোটেলেও। তবে হোটেলের চেয়ে মাঠের নিরাপত্তা থাকে চোখে পড়ার মতো। এই ক্রিকেটারদের নিরাপত্তা দিতে গিয়ে দর্শকদের কম হয়রানি হতে হয় না। মাঠে কোনো রকম ছুড়ে মারা বস্তু নিতে দেয়া হয় না। পানির বোতল, খাবার তো দূরের কথা, হেড ফোন, চাবির রিং, লিপস্টিক, সিগারেট পর্যন্ত নিতে দেয়া হয় না। এখানে বিসিবি আবার আইসিসির চেয়ে এক কাঠি সরস। আইসিসির কোনো আসরে দর্শকরা এ সব নিয়ে অবলীলায় ঢুকতে পারেন। সর্বশেষ ইংল্যান্ডে অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপ ক্রিকেটে বিভিন্ন ভেন্যুতে হরহামেশা দর্শকদের এ সব নিয়ে ঢুকতে দেখা গেছে। কিন্তু তাদের নিরাপত্তা থাকে নিশ্ছিদ্র। দর্শকরা যাতে করে কোনো কিছু মাঠে ছুড়ে মারতে না পারেন কিংবা অযাচিতভাবে ঢুকে পড়তে না পারেন তার জন্য মাঠে নিরাপত্তা কর্মীরা গ্যালারির দিকে মুখ করে দায়িত্ব পালন করে থাকেন।

কিন্তু বাংলাদেশে এর সম্পূর্ণ বিপরীত। দর্শকদের দেহ তল্লাশি করে ঢুকানো হয়। কিন্তু সাথে থাকে না বিসিবির নিষিদ্ধ তালিকায় থাকা কোনো বস্তু। ব্যস, এই পর্যন্তই যেন শেষ নিরাপত্তা বেষ্টনী! মাঠে নিরাপত্তাার দায়িত্বে থাকা পুলিশ ও বিসিবির নিজস্ব কর্মীরা বাউন্ডারির লাইনের পাশে থাকেন ঠিকই, কিন্তু তাদের দৃষ্টি থাকে মাঠের দিকে; গ্যালারির দিকে নয়। তাদের এ রকম দায়িত্ব পালনের কারণে চাইলেই যে কোনো দর্শক অনায়াসেই মাঠে ঢুকে পড়তে পারেন। এই সুযোগটি গতকাল নিয়েছেন এনায়েত নগরের বাসিন্দা ফয়সাল নামের এক দর্শক। আফগানিস্তানের ইনিংসের ১০৭তম ওভার। সাকিবের দিনের প্রথম ওভারে চতুর্থ বল করার আগে হঠাৎ করে পূর্ব পাশের গ্যালারি থেকে ফেঞ্চিং টপকে ভেতরে প্রবেশ করেন ফয়সাল নামের সেই দর্শক। এরপর এক দৌড়ে সোজা চলে যান সাকিবের কাছে। গিয়েই সাকিবকে স্যালুট দেন। তারপর প্রেম নিবেদনের মতো করে হাঁটু গেড়ে সাকিবের দিকে হাতে থাকা গোলাপ ফুল বাড়িয়ে দেন। একটু হতচকিত সাকিব পরে ফয়সালের ভালোবাসার প্রতিদান দেন ফুলটি গ্রহণ করে। কিন্তু এখানেই শেষ নয়। এরপর তিনি চান সাকিবের সাথে কোলাকুলি করতে। কিন্তু এতে সাকিবের অনীহা ছিল। কিন্তু নাছোড় বান্দা ছিলেন ফয়সাল। তিনি বার তিনেক চেষ্টা করলেন। কিন্তু প্রতিবারই তাকে সাকিব হতাশ করেন। শেষ পর্যন্ত সাকিব সায় দিলে তার সাথে কোলাকুলি করেন। এরপর নিরাপত্তা কর্মীরা সেই ফয়সালকে ধরে নিয়ে আসেন। সাকিব বলেন, ‘ফুল নিতে বলেছিল। এমনভাবে ফুল নিতে বলল, আমি ভাবলাম বিয়ের প্রস্তাব দেবে কিনা (হাসি)।’

বাংলাদেশ জাতীয় দলের ক্রিকেটাররা এখন দেশের কোটি কোটি মানুষের ভালোবাসার পাত্র। তাদের এক নজর দেখতে, একটা সেলফি তুলতে সব সময় মুখিয়ে থাকেন। সুযোগ পেলে হাত ছাড়া করেন না। কখনো কখনো নিজেরাই সুযোগ তৈরি করে নেন। যেমনটি করেছেন গতকাল ফয়সাল নামের সেই দর্শক। দর্শকদের এই ভালোবাসা নির্ভেজাল। নেই কোনো খাদ। কিন্তু খাদ থেকে গেছে নিরাপত্তা ব্যবস্থায়! গ্যালারি থেকে মাঠে ঢুকে সাকিবের কাছে পৌঁছা এবং ফুল দেয়া ও কোলাকুলির চেষ্টা করা, সব মিলিয়ে কয়েক মিনিট লেগেছে। কিন্তু এতক্ষণ সময় নিয়ে তিনি এই কাজটি করেছেন বিনা বাধায়। আর এখানেই প্রশ্ন উঠেছে নিরাপত্তা ব্যবস্থার ত্রুটি নিয়ে। ফয়সাল যখন সাকিবের সাথে কোলাকুলি করতে যান, তখন দেখা যায় এক নিরাপত্তা কর্মী ছুটে আসছেন মাঠের দিকে। পরে আরো ২/৩ জন। তারা সবাই তখন সেই দর্শককে ধরে অনেকটা টেনে-হেঁচড়ে মাঠের বাইরে নিয়ে যাচ্ছেন।

কিন্তু এখানেই শেষ নয়। নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেয়ার পর বিসিবির নিজস্ব নিরাপত্তা কর্মীরা ফয়সালের দেহ তল্লাশি করে মানিব্যাগে থাকা একশ টাকা ছাড়া আর কিছুই পাননি। কিন্তু এরপর তাকে বেধড়ক মারধর করেন বলে উপস্থিত থাকা একজনের সূত্রে জানা গেছে। সেই সূত্র জানায় এমনিতেই তিনি সাকিবের ভক্ত। এবারের বিশ্বকাপ ক্রিকেটে সাকিবের নজর কাড়া নৈপুণ্যের পর সাকিবের সাথে দেখা করার জন্য তার মন উদগ্রীব হয়ে উঠে। আবার সাকিব হজ করে আসাতেও দেখা করার বাড়তি আগ্রহ তৈরি হয়। তার ভেতর আবেগ এতটাই কাজ করছিল যে গ্যালারি থেকে ফেঞ্চিং টপকে তিনি কিভাবে সাকিবের কাছে ছুটে গিয়েছেন বলতেই পারেন না। মাঠে ঢুকতে গিয়ে কাঁটাতারে লেগে তার শরীরের বেশ কয়েকটি জায়গা কেটেও গিয়েছে বলে জানানো হয়। পরে তাকে পাহাড়তলী থানায় পুলিশের কাছে দেয়া হয়। তাকে মারধরের বিষয়টি অস্বীকার করা হয়েছে। এ ব্যাপারে বিসিবির নিরাপত্তা বিভাগের প্রধান অবসরপ্রাপ্ত মেজর হোসেন ইমামের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি ফোন রিসিভ করেননি। তার ব্যক্তিগত সহকারী ফোন রিসিভ করে জানান হোসেন ইমাম পুলিশের কর্মকর্তাদের সাথে বৈঠকে ব্যস্ত আছেন। এ ব্যাপারে তিনি কিছু জানেন কিনা জানতে চাওয়া হলে বলেন ফয়সালকে মারধর করা হয়নি। পূর্ব গ্যালারিতে দায়িত্ব পালনরত মান্নান নামে পুলিশের এসআইকে বরখাস্ত করা হয়েছে।

এই ঘটনার পরই নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়। মাঠের ভেতর দায়িত্ব পালনরতরা খেলা দেখা বাদ দিয়ে গ্যালারির দিকে মুখ ফিরিয়ে দায়িত্ব পালন করতে থাকেন। কিন্তু এই ঘটনা যে এবারই প্রথম ঘটেছে, তা কিন্তু নয়। এর আগে ২০১৬ সালে এই আফগানিস্তানের বিপক্ষেই মিরপুরে মাশরাফিকে এবং গত বছর সিলেটে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে পরপর দুইবার মুশফিককে নিয়েও ভক্ত সমর্থকরা এ রকম কাণ্ড ঘটিয়েছিলেন। তখনো নিরাপত্তা ব্যবস্থা ছিল হালকা। কিন্তু ঘটনা ঘটার পর আবার জোরদার করা হয়। কিছুদিন এ রকম কঠোরতা থাকে। পরে আবার সেই আগের জায়গায় ফিরে যায়। এবারো সে রকম কিছু হওয়ার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেয়া যায় না! যদিও সাকিব আল হাসান চান এ রকম ঘটনা যাতে একেবারে না ঘটে। তিনি বলেন, ‘ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম। আমি চাই না এমন করে ভক্তরা মাঠে ঢুকে পড়ুক। এটা আমাদের ক্রিকেটের জন্য কখনোই ভালো কিছু নয়।’

মানবকণ্ঠ/এইচকে




Loading...
ads




Loading...