নাসিকে আ.লীগের অ্যাসিড টেস্ট

নৌকার জয় কিংবা পরাজয়- দুটিতেই প্রশ্ন উঠবে


  • সাইফুল ইসলাম
  • ১৩ জানুয়ারি ২০২২, ১৫:৪৯,  আপডেট: ১৩ জানুয়ারি ২০২২, ১৫:৫৬

নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে কঠিন প্রতিদ্বন্দ্বিতার মুখে আওয়ামী লীগ। দলীয়ভাবে বিএনপি প্রার্থী না থাকলেও দলের সাবেক নেতা তৈমুর আলম স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে ব্যাপক নির্বাচনের মাঠকে সরকার দলের জন্য দুর্ভেদ্য করে তুলেছে। নারায়ণগঞ্জের প্রভাবশালী নেতা শামীম ওসমান এমপি ইতোমধ্যে তার অবস্থান পরিষ্কার করলেও ভোটের মাঠে এখনো চাক্ষুস সক্রিয় নন তার অনুসারীরা। নৌকার প্রার্থী আইভীও এ নিয়ে মাথা ঘামাচ্ছেন না। শেষ মুহূর্তের প্রচারণায় জনগণই ভরসা ভেবে মানুষের দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন।

এদিকে এক সময়ের প্রভাবশালী শ্রমিক নেতা তৈমুর আলমও মানুষের মাঝে ব্যাপক সাড়া পাচ্ছেন। সব মিলে সুষ্ঠু ও প্রভাবহীন নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলে কঠিন পরীক্ষার মুখোমুখি হতে পারেন সেলিনা হায়াৎ আইভী- এমনটাই আবাস দিচ্ছেন নারায়ণগঞ্জ নির্বাচন বিশ্লেষকরা।

বিশ্লেষকরা মনে করেন, জাতীয় নির্বাচনের পূর্বে সিটি করপোরেশন নির্বাচন সরকারদলীয় ও বিরোধী দলসহ সবার নজর থাকে। এই নির্বাচনে কোন দলের কে পাস করলেও তা নিয়ে সমীকরণ হয়। জাতীয় নির্বাচনেও পূর্বে সিটি করপোরেশন নির্বাচন দেশজুড়েই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু থাকে। আর সেটা যদি রাজধানীর আশপাশে হয় তাহলেও সবার নজর সেই দিকেই। তবে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নির্বাচন বর্তমান সরকার ও আওয়ামী লীগের জন্য চ্যালেঞ্জ। তাদের জয় কিংবা পরাজয়ের মধ্যেও চ্যালেঞ্জ রয়েছে।

তবে বিএনপির হারানোর কিছু নেই। তৈমুর আলম খন্দকার পরাজিত হলেও সরকারের বিরুদ্ধে ভোট ডাকাতির  অভিযোগ তুলবে বিএনপি আবার বিজয়ী হলেও আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে জনগণের আস্থা নেই বলেও দাবি করবে। আর নৌকার প্রার্থী পরাজিত হলে দলের জনপ্রিয়তা নিয়ে দেশ বিদেশে কূটনৈতিক মহল প্রশ্ন তুলতে পারে। এজন্যই নাসিক নির্বাচনকে চ্যালেঞ্জ হিসাবে নিয়েছে ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ। একদিকে নির্বাচনে দলের প্রার্থী ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভীকে বিজয়ী হতে হবে। অন্যদিকে নির্বাচন সুষ্ঠু, অবাধ ও নিরপেক্ষ করতে হবে।

নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নির্বাচন প্রসঙ্গে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী মানবকণ্ঠকে বলেন, অ্যাডভোকেট তৈমুর আলম খন্দকারকে দল থেকে অব্যাহতি দেয়া হয়েছে। আমাদের দলের কোনো প্রার্থী নেই। আমরা নির্বাচন বয়কট করেছি। তাই নাসিক নির্বাচন নিয়ে আমাদের কোনো ভাবনা নেই। ওদিকে কোনো দৃষ্টিও নেই।

সুজন এর নারায়ণগঞ্জ জেলার সম্পাদক জিমান সাহা জুয়েল মানবকণ্ঠকে বলেন, ‘এক ধরনের উদ্দীপনা ও বাকযুদ্ধের মধ্যদিয়ে নারায়ণগঞ্জ নির্বাচন হতে যাচ্ছে। এর মধ্যে কিছু সমীকরণ আছে। কিছু মেরুকরণ আছে। দুই দলের অভ্যন্তরীণ কিছু আছে, যা প্রার্থীরা বলে না। ক্ষমতাসীন দলের সাংসদ (শামীম ওসমান) প্রথম দিকে নির্বাচনে নামেন নাই। ১০ জানুয়ারি সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন এখন নামবেন। এতে বোঝা গেল তিনি আগে নামেন নেই। কেন নামেন নাই এই প্রশ্নের উত্তর তিনি দেবেন। কীভাবে নামবেন এটা স্পষ্ট করেননি। এই নিয়ে ভোটারদের মধ্যে ধূম্রজাল রয়েছে। বিএনপির মধ্যও এক ধরনের ইয়ে.. আছে। তৈমুর আলমকে দল থেকে অব্যাহতি দেয়া হয়েছে। দল থেকে অব্যাহতি দেয়া হলেও তার সাথে যা কাজ করছেন তারা সকলে কিন্তু বিএনপির স্থানীয় পর্যায়ের পদধারী ব্যক্তিত্ব। তাদের বিরুদ্ধে কোনো দল সিদ্ধান্ত নেননি। দল মুখে বলছে তৈমুর বিএনপির প্রার্থী না। আবার বিএনপির লোকজন তার পক্ষে কাজ করছে। এই দুই দলের যে মেরুকরণ, দুই ধরনের বক্তব্য সামনে চলে আসছে। ভোটাররা এক ধরনের বিভ্রান্তির মধ্যে আছে।’                 

তিনি আরো বলেন, ‘এখানে মার্কার চেয়ে ব্যক্তি বড়। ব্যক্তির ভূমিকাটা গুরুত্বপূর্ণ। এই সিটিতে মানুষ ৬৫ থেকে ৭৫ শতাংশ ভোট দেয়। শান্তিপূর্ণভাবে ভোটগ্রহণ হলে তাহলে কারচুপির কথাটা আসবে কোথায় থেকে।’

এ প্রসঙ্গে আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম মানবকণ্ঠকে বলেন, ‘বিএনপি তৈমুর আলমকে তার পদ থেকে প্রত্যাহার করা হয়েছে। তার পদ কেড়ে নেয়া হয়েছে। এগুলো আমরা দেখতে পারছি। তৈমুরের মাথার উপরে ভূতের ছায়া নাকি কার ছায়া আছে এটা বোঝা মুশকিল হয়েছে। তিনি একেক সময় একেক কথা বলেন। তিনি নানাবিধ কথা বলেন। আগের নির্বাচনের সময়ও আমরা দেখেছি, সে তখনও নানা কথা বলেছে। এবারো সে একই জায়গা যাচ্ছে। বিএনপি যে কাজগুলো করে সেই প্রভাব তার মধ্যে আছে। সেই প্রভাবে প্রভাবিত হয়ে আগের মতো কাজ করে কি-না সেটা নিয়ে শঙ্কা আছি।’

তিনি আরো বলেন, ‘আওয়ামী লীগের প্রার্থী সেলিনা হায়াৎ আইভী জনপ্রিয়তার তুঙ্গে রয়েছে। এই নির্বাচনে আওয়ামী লীগ, জনগণ ও আইভীর সমর্থক সবাই মিলে বিপুল ভোটে নৌকা বিজয়ী হবে।’   

পরাজিত হলে দলের জনপ্রিয়তা নিয়ে প্রশ্ন উঠবে কিনা- এমন প্রশ্নে জবাবে তিনি বলেন, ‘আমরা বিজয়ী হব। এটাই আমরা বিশ্বাস করি। আমরা জনগণের রায়ের প্রতি সব সময় শ্রদ্ধাশীল। বিজয়ের মধ্য দিয়েই আওয়ামী লীগের জনপ্রিয়তা কমে নাই সেটাই প্রমাণিত হবে। ১৬ তারিখ পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে।’

বাহাউদ্দিন নাছিম আরো বলেন, ‘জনগণের ভোটে নির্বাচিত হলে প্রশ্নবিদ্ধ করার জন্য বিএনপি-জামায়াত একটি খাসালত। এই খাসালতে কিছু মানুষও তাদের ভাবধারায় একই রকম কথা বলে। তাতে নির্বাচন প্রশ্নবিদ্ধ হয় না। যদি জনগণের অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন হয় তা নিয়ে কে কি বলল, বিতর্ক করার চেষ্টা করল, তা দিয়ে সেটা স্টাবলিশ হয় না। এখন জনগণের রায়কে তো আমরা পায়ে ঠেলে দিতে পারি না। ছুড়ে ফেলতে পারব না। অন্যায়ভাবে, বেআইনিভাবে, জনগণ ভোট দেয়নি তারে ডিকলারেশন দেয়া তো আরেকটা অবৈধ কাজ।’

জানতে চাইলে নারায়ণগঞ্জ নাগরিক কমিটির সাধারণ সম্পাদক জাহিদুল হক দিপু মানবকণ্ঠ বলেন, নারায়ণগঞ্জের বিগত দুইটি নির্বাচন দেখলেই বোঝা যাবে নির্বাচন সুন্দরভাবে অনুষ্ঠিত হয়। তবে অনেক রকমের স্নায়ু চাপ থাকে। অনেক রকমের গল্প থাকে, কাহিনী থাকে। কিন্তু বিগত নির্বাচনে কোনা অপ্রতিকর কোনো ঘটনা ঘটে নাই। এবারো তার ব্যতিক্রম হবে না। তিনি আরো বলেন, ‘প্রতিদ্বন্দ্বীর জন্য কয়েকটি বিষয় রয়েছে। তার মধ্যে নতুন ভোটার, মহিলা ভোটার ও সনাতনধর্মের ভোটার। এই সিটিতে সনাতনধর্মের ভোটার সংখ্যা বেশি। এই তিনটা গ্রুপকে যারা বেশি আস্থা নিতে পারবে তারা এগিয়ে থাকবে।’


poisha bazar