ভিকটিমের ডিএনএ ও পোস্টমর্টেম রিপোর্টে মামলায় নতুন মোড়


  • শাহীন করিম
  • ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২১, ১৩:৪৬,  আপডেট: ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২১, ১৪:১২

বহুল আলোচিত কলেজছাত্রী মোসারাত জাহান মুনিয়ার (২২) রহস্যজনক মৃত্যুর পর ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনে উঠে আসে ২-৩ সপ্তাহের অন্তঃসত্ত্বা থাকার তথ্য। ডিএনএ পরীক্ষায় ভিকটিমের পরনের সব কাপড়ে মেলে পুরুষের ডিএনএ। তাছাড়া ডাক্তারি পরীক্ষায় মৃত্যুর পূর্বে মুনিয়ার সঙ্গে যৌন সম্পর্ক অর্থাৎ মৃত্যুর পূর্বে ধর্ষিত হওয়ার কথাও বলা হয়।

এমন ভয়ঙ্কর তথ্য-প্রমাণ সামনে আসার ফলে নতুন করে তদন্তে যাওয়া ধর্ষণ এবং হত্যা মামলাটি নতুন মোড় নেয় ও সমৃদ্ধ হয়েছে বলে মনে করেন বাদীপক্ষের অন্যতম প্রধান আইনজীবী মাসুদ সালাউদ্দিন।

তিনি বলেন, মুনিয়ার প্রেমিক ও মামলার প্রধান আসামি বসুন্ধরা গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) সায়েম সোবহান আনভীরসহ আটজনের বিরুদ্ধে নারী নির্যাতন ট্রাইব্যুনালে যে মামলাটি হয়েছে, মূলত এটি নতুন মামলা নয়। গুলশান থানার পূর্বের মামলাটিই এখতিয়ারভুক্ত সংশ্লিষ্ট ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে প্রতিস্থাপিত হয়েছে। ঘটনার পর বাদী এ মামলা দিতে চাইলেও ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করতে তখন এই ধারায় মামলা নেয়নি পুলিশ।

এদিকে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে গুলশান থানায় রেকর্ড হওয়া মুনিয়াকে ধর্ষণের পর হত্যার অভিযোগে দায়ের হওয়া মামলাটির তদন্ত শুরু করেছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। চাঞ্চল্যকর এ মামলার তদন্তভার পেয়েছেন পিবিআইয়ের পুলিশ পরিদর্শক গোলাম মোক্তার আশরাফ উদ্দিন। তিনি গতকাল রবিবার বিকালে গুলশানের সেই ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন বলে জানা গেছে। আলোচিত এ মামলাটির সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্তের জন্য প্রয়োজনীয় সকল ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

অন্যদিকে কয়েকদিন ধরে নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন মামলার বাদী ও নিহত মুনিয়ার বড় বোন নুসরাত জাহান তানিয়া ও তার স্বামী মিজানুর রহমান। বিষয়টি জানিয়ে গত শনিবার কুমিল্লা কোতোয়ালি মডেল থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি-নম্বর-৬৭৭) করেছেন মিজান।

এতে তিনি উল্লেখ করেছেন, মুনিয়াকে হত্যার ঘটনায় তার স্ত্রী নুসরাত গত ৬ সেপ্টেম্বর ঢাকার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-৮ এ বসুন্ধরা গ্রুপের এমডি সায়েম সোবহান আনভীরসহ আটজনের বিরুদ্ধে মামলা (১০৮/২১) করেন। এই মামলার পর আসামিরাসহ মহি উদ্দিন মোল্লা (৫০), সাং চাঁনপুরসহ আরো অজ্ঞাতনামা ৬-৭ জন সহযোগী তাকে (মিজান) তার বাসা এলাকায় খোঁজাখুঁজি করছে। যদিও তারা ব্যাংকের লোক হিসেবে মিথ্যা পরিচয় দেয়। আশঙ্কা প্রকাশ করছি, মামলার আসামি পক্ষ আমাদের পরিবারের সদস্যদের কিংবা সাক্ষীদের ক্ষতিসাধন করতে পারে।

দেশজুড়ে আলোচিত এ নতুন মামলা প্রসঙ্গে মুনিয়া হত্যা মামলা বাদী তার বোন নুসরাত জাহান তানিয়ার অন্যতম প্রধান আইনজীবী মাসুদ সালাউদ্দিন বলেন, এই মামলাটির তথ্য-প্রমাণের কোনো অভাব নেই। ময়নাতদন্ত ও ডিএনএ পরীক্ষায় মুনিয়া অন্তঃসত্ত্বা, তার পোশাকে পুরুষের ডিএনএ পাওয়া এমনকি মৃত্যুর পূর্বে ধর্ষিত হওয়ার চাঞ্চল্যকর তথ্য পাওয়ার পর প্রধান সন্দেহভাজন আসামি আনভীরের ডিএনএ পরীক্ষা করাই অত্যাবশ্যক ছিল। সেটি না করে আগের তদন্ত কর্মকর্তা দায়িত্বহীনতা ও পক্ষপাতদুষ্ট আচরণ করছেন বলে মনে করেন এই আইনজীবী।

একই ঘটনায় একাধিক মামলা প্রসঙ্গে অ্যাডভোকেট মাসুদ সালাউদ্দিন বলেন, মুনিয়ার মৃত্যুর পর তার বোন যেভাবে গুলশান থানায় অভিযোগ দিয়েছেন, সে অনুসারে মামলা নেয়নি পুলিশ। এটি মূলত সংশ্লিষ্ট ট্রাইব্যুনালের এখতিয়ারভুক্ত মামলা। পুলিশের উচিত ছিল, সেভাবে মামলা গ্রহণ করে নারী ও শিশু ট্রাইব্যুনালে পাঠানো।

তিনি বলেন, যাহোক নতুন করে আবেদনের ফলে মূলত প্রথম এজাহার দেয়া মামলাটিই প্রতিস্থাপিত হয়েছে। এ ছাড়া মুনিয়ার ভাই আশিকুর রহমান সবুজ যে হত্যা মামলার আবেদন করেছিলেন, সেটি মামলা হিসেবে রেকর্ড হয়নি। একটি মামলা চলমান থাকায় সেটি স্থগিত রেখেছিলেন আদালত।

ফলে মুনিয়া হত্যার ঘটনায় তিনটি নয়, মাত্র একটি মামলাই রয়েছে, এ নিয়ে বিভ্রান্তির অবকাশ নেই। আসামি বিচারিক প্রক্রিয়ায় খালাস পাইনি এটি মনে রাখতে হবে- যোগ করেন এই আইনজীবী।

ঢাকার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-৮ আদালতে মুনিয়ার বড় বোন নুসরাত জাহান তানিয়া বাদী হয়ে গত সোমবার এই মামলা করেন। ওই আদালতের বিচারক জেলা ও দায়রা জজ বেগম মাফরোজা পারভীন মামলাটি গ্রহণ করে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনকে (পিবিআই) তদন্ত করে প্রতিবেদন দাখিলে নির্দেশ দেন। এদিন দুপুরে নুসরাতের জবানবন্দি রেকর্ড করেন আদালত।

ধর্ষণের পর হত্যার এই চাঞ্চল্যকর মামলায় প্রধান আসামি বসুন্ধরার এমডি সায়েম সোবহান আনভীর (৪২)। পাশাপাশি তার বাবা বসুন্ধরা গ্রুপের চেয়ারম্যান আহমেদ আকবর সোবহান (৭০), মা আফরোজা সোবহান (৬০), আনভীরের স্ত্রী সাবরিনা (৪০), হুইপপুত্র শারুনের সাবেক স্ত্রী সাইফা রহমান মিম (৩৫), কথিত মডেল ফারিয়া মাহবুব পিয়াসা, পিয়াসার বান্ধবী ও ঘটনাস্থল গুলশানের ফ্ল্যাট মালিকের স্ত্রী শারমিন (৪০) ও তার স্বামী ইব্রাহিম আহমেদ রিপনকে (৪৭) আসামি করা হয়েছে।

আদালতের নির্দেশে গত মঙ্গলবার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের ৯(১) (২)/৩০ ধারা এবং ৩০২/৩৪ ধারার মামলাটি (নম্বর-৫) রেকর্ড হয়। তদন্তের জন্য ওই দিনই পাঠানো হয় পিবিআইতে।

গত ২৬ এপ্রিল রাতে গুলশানের একটি ফ্ল্যাট থেকে মোসারাত জাহান মুনিয়ার লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। সেই রাতেই বসুন্ধরা গ্রুপের এমডি আনভীরের বিরুদ্ধে গুলশান থানায় মামলা করেন ভিকটিমের বোন নুসরাত জাহান তানিয়া।

সেখানে বলা হয়, বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে সায়েম সোবহান আনভীর দীর্ঘদিন শারীরিক সম্পর্ক গড়ে তুলেছিলেন মুনিয়ার সঙ্গে। ওই বাসায় তার নিয়মিত যাতায়াত ছিল। কিন্তু বিয়ে না করে তিনি উল্টো মেরে ফেলার হুমকি দিয়েছিলেন মুনিয়াকে। নুসরাত দাবি করেন, তার বোনকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করেছে আনভীর।

তদন্ত শেষে গত ১৯ জুলাই আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দিয়ে গুলশান থানা পুলিশ জানায়, আসামির আনভীরের সঙ্গে ঘটনার সম্পৃক্ততা না পাওয়ায় তাকে অব্যাহতি দেয়া হোক। এর বিরুদ্ধে আদালতে না-রাজি দেন বাদী নুসরাত। গত ১৮ আগস্ট পুলিশ প্রতিবেদন গ্রহণ করে ও বাদীর আবেদন খারিজ করে আসামিকে অব্যাহতি দেন ঢাকার সিএমএম আদালত।

মানবকণ্ঠ/এমএইচ


poisha bazar

ads
ads