পরিত্যক্ত পণ্যে ভাগ্য বদল


  • প্রতিনিধি, দৈনিক মানবকণ্ঠ
  • ১২ সেপ্টেম্বর ২০২১, ১৩:২৭,  আপডেট: ১২ সেপ্টেম্বর ২০২১, ২০:৩৭

বাবার প্লাস্টিক ব্যবসা ছিল। ছোট একটি ঘরে তিনি দীর্ঘদিন ব্যবসা করে আসছিলেন। বাবা বৃদ্ধ হয়ে যাওয়ায় অন্য কোনো দিকে চাকরির জন্য না ঝুঁকে বাবার ব্যবসাতেই কাজে নেমে পড়ি। নতুন করে হাল ধরেছিলাম। তখন থেকে ব্যবসার হাল ধরে আজ পর্যন্ত সেই ব্যবসার সঙ্গেই যুক্ত আছি। তবে বাবার সেই ছোট ব্যবসায় নতুন করে টাকা বিনিয়োগ করি। ধীরে ধীরে ব্যবসার পরিসর বাড়তে থাকে।

একজন-দুজন করে আজ আমার এই ব্যবসায় বর্তমানে প্রায় ১২ জন লোক কাজ করেন। আমিও একজন উদ্যোক্তা। কারণ চাকরির জন্য কারো হাতে-পায়ে পড়তে হয়নি। নিজের স্বাধীন ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছি। নিজের পরিবারই নয় আরো বেশ কিছু পরিবার কাজ করে তাদের জীবিকা নির্বাহ করছে।

উদ্যোক্তা হওয়ার সংকল্প থাকা চাই। হতাশ হওয়া যাবে না। ছোট থেকে অল্প পুঁজিতে শুরু এমন ব্যবসা। তবে প্লাস্টিক শিল্প ছাড়া আমি অন্য কোনো জিনিস ক্রয় করি না। কারণ বর্তমানে প্লাস্টিকশিল্প একটি সম্ভাবনার নাম। বাজারে চাহিদাও বেশ। পুরনো পাইপ, কাটিং পাইপ, ওয়েস্টেজ প্লাস্টিক, খালি প্লাস্টিকের বোতল এক সময় ফেলে দেয়া হতো। এখন আর ফেলে দেয়া হয় না। সবই বিক্রি হয়ে যায়। বাড়ির আশপাশে, রাস্তা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কোথাও আর ফেলে রাখা হয় না।

প্লাস্টিক ব্যবসায়ী হাবু শেখ বলেন, বর্তমানে বাজারে প্লাস্টিকের যথেষ্ট চাহিদা ও দাম রয়েছে। আমাদের দৈনন্দিন জীবনে বিভিন্ন ধরনের ব্যবহারিক পণ্য প্লাস্টিক দিয়ে তৈরি করা হয়। প্লাস্টিকের পণ্যগুলো মেশিনে দানা করে বিভিন্ন কারখানায় বিক্রি করা হয়। তারা আবার প্রক্রিয়াজাত করে নতুন করে পণ্য তৈরি করে বাজারে ছেড়ে দেয়। দেশের বাইরে ও ভেতরে  বিভিন্ন ধরনের পণ্য তৈরি করা হচ্ছে। এ ব্যবসায় কম পুঁজিতে মুনাফা তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি। সাশ্রয়ী, সহজে ব্যবহারযোগ্য, কম ঝুঁকি, নজরকাড়া নকশা, টেকসই প্রভৃতি কারণে আধুনিক জীবনযাপনের সঙ্গী প্লাস্টিক সামগ্রী।

প্রযুক্তির সঙ্গে তাল মিলিয়ে পরিবর্তন ঘটছে এসব পুরনো প্লাস্টিকের। যদিও ব্যবহার হয়ে যাওয়া প্লাস্টিক পণ্য রাস্তায় পড়ে থাকে। তবে এই ফেলে দেয়া প্লাস্টিকই খুলে দিয়েছে নতুন ব্যবসার পথ। আমাদের দেশে সাদা, লাল, নীল, সবুজসহ নানা রঙের বাহারি প্লাস্টিক বোতল রিসাইক্লিং করা হয়।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, হাবু শেখের প্লাস্টিকের ভাঙারির দোকানে প্রায় ১০-১২ জন শ্রমিক কাজ করে। আগে পুরো ধামরাই উপজেলাসহ তার পার্শ্ববর্তী উপজেলায় থেকেও ফেরিওয়ালারা এসব প্লাস্টিকের পণ্য কুড়িয়ে আনত প্রথম দিকে। কিন্তু ধীরে ধীরে চাহিদা বেড়ে যাওয়ার কারণে আরো অনেকে নতুন করে ভাঙাড়ির দোকান দেয়ার কারণে পুরনো প্লাস্টিক এখন দাম দিয়ে কিনতে হয়। প্রতি কেজি প্লাস্টিকের বোতল ১৫-২০ টাকায় কিনতে হয়। শুধু প্লাস্টিক ৩০ বা ৪০ এমনকি ৫০ টাকায়ও ক্রয় করতে হয় ।

এখন এসব প্লাস্টিক বিভিন্ন কারখানা থেকে কিনে আনি আবার অনেক কারখানা থেকে পুরনো প্লাস্টিক জাতীয় মালামাল দিয়ে যায়। হাবু শেখ নিজের ভাঙাড়ির দোকানে মেশিনের দ্বারা সব প্রকার প্লাস্টিক ছোট ছোট দানা করে তা আবার বস্তায় ভরে প্রক্রিয়াজাত করে বিভিন্ন কারখানায় বিক্রি করে থাকেন।

বর্তমানে আরএফএল, আকিজ, নারায়ণগঞ্জের একটি কারখানা, গাজীপুরের ডাট কারখানায় পুরনো প্লাস্টিকের দানা বিক্রি করে। হাবু শেখ বলেন, তুলনামূলক কম পুঁজিতে এই ব্যবসা করা যায়। পণ্য সহজে নষ্ট হয় না। ডিজাইনও দেখতে অনেক সুন্দর।

ধামরাই উপজেলার সুতিপাড়া ইউনিয়নের বাথুলি বাসস্ট্যান্ডের উত্তর পাশে প্রায় চার বিঘা জমি ভাড়া নিয়ে এই ব্যবসা চালাচ্ছেন হাবু শেখ। তিনি বলেন, সব শ্রমিকদের থাকা খাওয়া আমার ওপর। তারপরও কারো আট হাজার, ১৯ হাজার, আবার কারো বেতন ১২ হাজারও আছে।

প্লাস্টিকের কোন কোন জিনিস ক্রয় করে থাকেন- এমন প্রশ্ন করা হলে হাবু শেখ বলেন, আগে প্লাস্টিকের ঝুড়ি, প্লেট, জগ, মগ, চেয়ার, বালতি, চামচ, টেবিল, হ্যাঙ্গার, প্লাস্টিক ক্লিপ, বোতাম, বিভিন্ন ধরনের বোতল, পুতুল, গাড়ি প্রভৃতি দ্রব্য ক্রয় করে থাকি। কিন্তু এখন বিভিন্ন কারখানা থেকে ভাঙারি মাল ক্রয় করে থাকি।

গৃহনির্মাণ সামগ্রী, গাড়ি ও সাইকেলের যন্ত্রাংশ। কি জিনিস তৈরি করা হয় এসব ফেলনা দ্রব্য কম্পিউটারের উপকরণ হিসেবে প্লাস্টিক পণ্য থেকে। তখন হাবু শেখ বলেন, অফিসে ব্যবহারের জন্য পেপারওয়েট, স্কেল, বলপেন, ফাইল কভার, সাইকেলের বাম্পার, লাইটের কভার প্রভৃতি।  আগে অল্প কয়েকটি কারখানা ছিল। কিন্তু বর্তমানে কামরাঙ্গীরচর, লালবাগ, নারায়ণগঞ্জ, চট্টগ্রাম, খুলনা, কুমিল্লা, রাজশাহীসহ বিভিন্ন জায়গায় রিসাইক্লিং কারখানা গড়ে উঠেছে। তারপরও ভাঙাড়ি পুরনো মালের চাহিদা প্রচুর।

মানবকণ্ঠ/এমএইচ



poisha bazar

ads
ads