পুরুষের ডিএনএ রিপোর্টে আসছে নারী, বিপাকে পুলিশ

- ফাইল ছবি

poisha bazar

  • অনলাইন ডেস্ক
  • ১২ এপ্রিল ২০২১, ১২:১৩

পুরুষের ডিএনএ পরীক্ষার রিপোর্ট পুরুষেরই আসার কথা। কিন্তু পুরুষের ডিএনএ পরীক্ষার রিপোর্ট আসছে নারী হিসেবে। ফলে মৃতদেহের সঠিক পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব হচ্ছে না। ফরেনসিক থেকে ভুল তথ্য আসায় মামলা নিয়ে বিপাকে পড়েছে পুলিশ।

সিরাজগঞ্জ ২৫০ শয্যা বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব জেনারেল হাসপাতালে মৃতদেহের ডিএনএর নমুনা সংগ্রহ এবং তা সংরক্ষণ নিয়ে এমনই গুরুতর অভিযাগ উঠেছে।

২০২০ সালে সিরাজগঞ্জ জেলার ৪টি থানা থেকে উদ্ধারকৃত অপঘাতে নিহত অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের মৃতদেহের পরিচয় শনাক্তের জন্য হাসপাতাল মর্গ থেকে সংরক্ষিত ডিএনএর ফলাফল ভুল এসেছে। আর এতেই হাসপাতালের কর্তব্যরত ডাক্তার ও ডোমের দায়িত্বে অবহেলার প্রশ্ন উঠেছে। এ নিয়ে শুরু হয়েছে নানা সমালাচনা।

তথ্যানুসন্ধানে জানা যায়, প্রথম অভিযোগটি ওঠে ২০২০ সালে যমুনা নদী থেকে উদ্ধার করা একটি লাশ নিয়ে। সিরাজগঞ্জ সদর থানা পুলিশ যমুনা নদীর সয়দাবাদ এলাকা থেকে একজন প্রাপ্ত বয়স্ক পাঞ্জাবী ও লুঙ্গী পরা এক পুরুষের অর্ধগলিত মৃতদেহ উদ্ধার করে মর্গে পাঠায়। মর্গ থেকে ডিএনএ সংরক্ষণের আবেদন করে পুলিশ। ডাক্তার ও ডোম মৃতদেহ থেকে ডিএনএর নমুনা সংরক্ষণ করে ফরেনসিক ডিএনএ ল্যাবরেটরি অব বাংলাদেশ পুলিশ সিআইডিতে পাঠান। দীর্ঘ ৫ মাস পর ডিএনএ ফলাফলে উল্লেখ করা হয় যে মৃতদেহটি একটি নারীর। অথচ মামলা সংশ্লিষ্ট সকল কাগজপত্র এবং প্রেরিত আলামতে অজ্ঞাত পুরুষ মানুষের মৃতদেহ হতে সংগৃহীত বলে উল্লেখ করা হয়। বিষয়টি নিয়ে বিভ্রান্তির সৃষ্টি হলে একাধিকবার ডিএনএ পরীক্ষায় উক্ত আলামত হতে নারীর ডিএনএ প্রোফাইলই পাওয়া যায়।

একই ধরনের ঘটনা ঘটেছে উল্লাপাড়া থানাতেও। ফুলজোর নদী হতে এক বয়স্ক পুরুষের মৃতদেহ উদ্ধার করে ডিএনএ নমুনা সংরক্ষণ করার পর হাসপাতাল থেকে পাঠানো কাগজপত্র ও সুরতহাল প্রতিবেদনে মৃতদেহটিকে পুরুষ বলে উল্লেখ করা হয়। কিন্তু ফরেনসিক ল্যাবরেটরিতে একাধিকবার পরীক্ষা করে সেটি এক নবজাতক কন্যা সন্তানের ডিএনএ বলে প্রাফাইলে পাওয়া যায়।

এছাড়া বেলকুচি ও রায়গঞ্জ থানাতেও এমন ভুল তথ্য এসেছে। যে কারণে এসব মৃতদেহের পরিচয় শনাক্ত আর মামলা পরিচালনা করতে অনেকটাই বেগ পেতে হচ্ছে পুলিশকে।

বেলকুচি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) গোলাম মোস্তফা জানান, গত বছরের ১ জুলাই বেলকুচি থানার একটি অজ্ঞাতনামা কিশোরীর লাশের বাবা-মা দাবি করে থানায় এজাহার করেন লালচান শেখ ও তার স্ত্রী পারভিন খাতুন। বিষয়টি নিশ্চিত করতে পুলিশ ওই দু’জনের ডিএনএর নমুনা সংগ্রহ করে ঢাকায় পাঠায়। প্রথম দফায় ডিএনএ নমুনার পরীক্ষার ফলাফলে নমুনাটি একজন প্রাপ্ত বয়স্কের বলে উল্লেখ করা হয়। পরবর্তীতে আদালতের অনুমতি নিয়ে পুলিশ নিহত কিশোরীর মাথার খুলির পাজরের হাড়, দাঁত ও চুল কবর থেকে সংগ্রহ করে পুনরায় পাঠায়। একই সাথে পুনরায় লালচান শেখ ও তার স্ত্রী পারভিন খাতুনের ডিএনএর নমুনা সংগ্রহ করে। কিন্তু সংশ্লিষ্ট চিকিৎসক এই দম্পতির নমুনা সঠিকভাবে সংগ্রহ না করার কারণে ফরেনসিক বিভাগ তা গ্রহণ করেননি।

একই সাথে ফরেনসিক কর্তৃপক্ষ পুনরায় মৃত ব্যক্তির ২ আত্মীয়ের নমুনা নতুন করে সংগ্রহ কিংবা তাদের সরাসরি ঢাকা পাঠানোর পরামর্শ দেন। যে কারণে মামলার তদন্ত বিঘ্নিত হচ্ছে বলে তিনি জানান।

উল্লাপাড়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) দীপক কুমার দাস জানান, গত বছরের ১১ জুলাই উল্লাপাড়া থানার সড়াবিল এলাকা থেকে একটি অর্ধগলিত পুরুষের লাশ উদ্ধার করে তার ডিএনএ হাসপাতালে সংরক্ষণ করা হয়। পরবর্তীতে গত ২১ জুলাই সলঙ্গা থানার চরগোজা গ্রামের গৃহবধূ সেলিনা খাতুন লাশটি তার স্বামীর বলে দাবি করেন। বিষয়টি নিশ্চিত হতে পুলিশ তার সাত বছরের জমজ দুই ছেলে রিফাত ও সিফাতের নমুনা সংগ্রহ করে ডিএনএ ল্যাবরেটরি অফ বাংলাদেশ পুলিশ দফতরে পাঠায়।

কিন্তু ফরেনসিক বিভাগ নমুনাটি পরীক্ষা করে গত বছরের ৫ অক্টোবর মৃত ব্যক্তির ডিএনএ’র নমুনাটি একজন মহিলার বলে শনাক্ত করে। বিষয়টি নিয়ে তিনি হাসপাতালে যোগাযোগ করলে তাকে জানানো হয় মৃত ব্যক্তির সংগৃহীত নমুনা নষ্ট হয়ে গেছে। যে কারণে পুলিশকে পুনরায় বাধ্য হয়ে আদালতের অনুমতি নিয়ে অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিটির লাশ কবর থেকে উত্তোলন করে ডিএনএ পরীক্ষা করতে হয়।

সিরাজগঞ্জ ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব জেনারেল হাসপাতালের কর্তব্যরত সুইপার রানা হরিজন বলেন, আমিতো সুইপার, ডোম না। হাসপাতালে ডোম না থাকায় সুইপার হয়েও আমাকে ডোমের কাজ করতে হয়। ডাক্তাররা কখনই মৃতদেহ স্পর্শ করেন না। আমাকেই সব করতে হয়। যে কারণে ভুল হলে হতেও পারে।

ডাক্তাররা কেন আলামত সংরক্ষণে দায়িত্ব পালন করছেন না এমন প্রশ্নের জবাবে সিরাজগঞ্জ ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব জেনারেল হাসপাতালের মেডিকেল অফিসার (আরএমও) ডাক্তার ফরিদুল ইসলাম কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।

হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডাক্তার সাইফুল ইসলাম জানান, এই ধরনের ভুল হওয়ার কথা না। তবে কেন এমন হলো তা হাসপাতালের আরএমও'র সঙ্গে কথা বলে খতিয়ে দেখা হবে।

এদিকে ডিএনএ রিপোর্ট ভুল আসায় মামলার তদন্ত কাজ এবং মামলা নিষ্পত্তিতেও বিঘ্ন ঘটছে জানিয়ে এ বিষয়ে স্বাস্থ্য বিভাগকে কঠোর নজরদারির মধ্যে দায়িত্ব পালনে আহ্বান জানান সিরাজগঞ্জের পুলিশ সুপার হাসিবুল আলম।

মানবকণ্ঠ/এসকে






ads
ads