নোয়াখালীতে প্রতি ৪ দিনে একটি ধর্ষণ হয়

- প্রতীকী ছবি

poisha bazar

  • অনলাইন ডেস্ক
  • ২৭ অক্টোবর ২০২০, ১০:১৬,  আপডেট: ২৭ অক্টোবর ২০২০, ১০:৩০

নোয়াখালীতে ধর্ষণ ও নারী নির্যাতনের মতো জঘন্য ঘটনা দিন দিন বেড়েই চলেছে। জেলায় একের পর এক ঘটছে ধর্ষণ। সম্প্রতি বেগমগঞ্জে নারীকে বিবস্ত্র করে নির্যাতন ও সেনবাগে তিন মাসের অন্তঃসত্ত্বা নারীকে গণধর্ষণের ঘটনায় নতুন করে আলোচনা-সমালোচনার জন্ম দেয়। গত ৫০ দিনে দেশব্যাপী সমালোচনা ও নিন্দার ঝড় সৃষ্টিকারী নারী নির্যাতনসহ ১৩টি ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে জেলায়। গড়ে প্রায় প্রতি চার দিনে একটি করে ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে।

ধর্ষণ থেকে রেহাই পায়নি শিশু ও প্রতিবন্ধীরাও। এসব ধর্ষণের মধ্যে রয়েছে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ ও ধর্ষণের ভিডিও ধারণ। গত ২ সেপ্টেম্বর থেকে ২৪ অক্টোবর পর্যন্ত ঘটে যাওয়া এসব ধর্ষণের ঘটনায় আশার আলো এটাই যে এসব ধর্ষণের ঘটনায় প্রায় সব অভিযুক্তকেই গ্রেফতার করে আইনের আওতায় এনেছে পুলিশ।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, অনৈতিক প্রস্তাবে রাজি না হওয়ায় গত ২ সেপ্টেম্বর রাতে নোয়াখালীর বেগমগঞ্জের একলাশপুর ইউনিয়ন এলাকায় রাতের আঁধারে ঘরের দরজা ভেঙে ভেতরে ঢুকে এক গৃহবধূকে (৩৫) বিবস্ত্র করে যৌন নির্যাতন ও নির্যাতনের ভিডিও ধারণ করে স্থানীয় সন্ত্রাসী দেলোয়ার বাহিনীর সদস্যরা। এর আগে দেলোয়ার ও তার সহযোগী কালাম ওই নারীকে অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে একাধিকবার ধর্ষণ করেছেন।

গত ৪ অক্টোবর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ওই নির্যাতনের ভিডিও ছড়িয়ে পড়লে স্থানীয় পুলিশ প্রশাসনে তোলপাড় শুরু হয় এবং দেশব্যাপী নিন্দার ঝড় বইতে শুরু করে। ওই নির্যাতন ও সংঘবদ্ধ ধর্ষণের ঘটনায় ভুক্তভোগী নারী বাদী হয়ে মামলা দায়ের করেন। গ্রেফতারকৃতদেও মধ্যে নিজেদের দোষ স্বীকার করে আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দেন আট জন। এ ঘটনার মূল হোতা বাহিনী প্রধান দেলোয়ার বর্তমানে পুলিশের রিমান্ডে রয়েছেন।

এরপর গত ৯ অক্টোবর সেনবাগ উপজেলার ছাতারপাইয়া ইউনিয়ন এলাকায় তিন মাসের অন্তঃসত্ত্বা নারীকে (২০) রাতের আঁধারে ঘরে ঢুকে স্থানীয় বখাটে সন্ত্রাসী পারভেজের (২৫) নেতৃত্বে সাত-আট জন যুবক ধর্ষণ করে। এ সময় ধর্ষণকারীরা ওই নারীর ধর্ষণের দৃশ্য ভিডিও ধারণ করে ৩০ হাজার টাকা চাঁদা দাবি করে। চাঁদা দিতে অপারগতা প্রকাশ করলে ধর্ষণের ভিডিও ওই নারীর স্বামীর মুঠোফোনে পাঠিয়ে দেয় ধর্ষণকারীরা। এ ঘটনায় ক্ষিপ্ত হয়ে ১০ অক্টোবর সকালে ওই নারীর স্বামী তাকে বাড়ি থেকে বের করে দেন। থানায় অভিযোগ দেয়া হলে পুলিশ তিন জনকে গ্রেফতার করে। তবে ধর্ষণ ঘটনার মূল হোতা পারভেজকে রহস্যজনক কারণে গ্রেফতার করেনি পুলিশ।

২১ অক্টোবর ভোরে চাটখিল উপজেলার নোয়াখলা ইউনিয়ন এলাকায় এক প্রবাসীর স্ত্রীর (২৯) ঘরের দরজা কৌশলে খুলে ঘরে ঢুকে গৃহবধূর দুই শিশু সন্তানের গলায় অস্ত্র ধরে তাকে ধর্ষণ করেন স্থানীয় নোয়াখলা ইউনিয়ন যুবলীগের সদ্য বহিষ্কৃত নেতা মজিবুর রহমান শরীফ। এ সময় ধর্ষণের দৃশ্য ভিডিও ধারণ ও ওই নারীকে বিবস্ত্র করে ছবি তোলেন শরীফ।
এ ঘটনায় ২১ অক্টোবর দুপুরে শরীফের বিরুদ্ধে চাটখিল থানায় একটি মামলা দায়ের করেন ভুক্তভোগী নারী। পুলিশ অভিযান চালিয়ে ওই দিন দুপুরেই শরীফকে গ্রেফতার করে। রাতে শরীফকে নিয়ে অভিযান চালিয়ে তার আস্তানা থেকে বিদেশি পিস্তল, গুলি ও জš§ নিরোধক সামগ্রী উদ্ধার করে পুলিশ।

২৭ সেপ্টেম্বর কোম্পানীগঞ্জের চর এলাহী ইউনিয়নের চর ফালুয়া গ্রামের সামছুল হকের ছেলে জয়নাল আবেদীন (২২) জোরপূর্বক ১০ বছর বয়সী এক শিশুকে ধর্ষণ করে।
৪ অক্টোবর রাতে কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার চর ফকিরা ইউনিয়নের ৭ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা মাজহারুল হকের ছেলে ইমন হোসেন (২২) মোবাইল ফোনের সম্পর্কের জের ধরে কুমিল্লার দেবীদ্বার উপজেলা থেকে ১৮ বছর বয়সী এক তরুণীকে দেখা করার কথা বলে কোম্পানীগঞ্জ নিয়ে আসে। এরপর সেখানে বন্ধুদের সঙ্গে নিয়ে ওই তরুণীকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ করে।
এ ঘটনায় এলাকাবাসী চার ধর্ষক ও মেয়েটিকে আটক করে থানা পুলিশে সোপর্দ করলেও পুলিশ ধর্ষক ও ধর্ষণের শিকার মেয়েটিকে ৫৪ ধারায় আদালতে প্রেরণ করে। বিষয়টি আদালতের সন্দেহ হলে কোম্পানীগঞ্জ থানার ওসি ও মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তাকে আদালত তলব করেন।

প্রেমের সম্পর্কের জের ধরে ১০ অক্টোবর রাতে সুবর্ণচর উপজেলার মধ্য বাগ্গা গ্রামের জসিম উদ্দিনের ছেলে মো. বাবুল (২০) কবিরহাট উপজেলার ২১ বছর বয়সী এক তরুণীকে বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে দীর্ঘদিন ধর্ষণ করে। এ ঘটনায় গত ১১ অক্টোবর কবিরহাট থানায় একটি মামলা দায়ের হয়।

২১ অক্টোবর রাতে কোম্পানীগঞ্জের চর ফকিরা ইউনিয়নের চরকালী গ্রামের আবু বকর ছিদ্দিকের ছেলে রুহুল আমিন হেলাল (৩২) সম্পত্তি সংক্রান্ত বিরোধ মীমাংসা করে দেয়ার কথা বলে ২১ বছর বয়সী এক নারীকে বসুরহাট পৌরসভার ৮ নম্বর ওয়ার্ড এলাকায় ধর্ষণ করেন। এ ঘটনায় ২২ অক্টোবর থানায় মামলা দায়ের হলে পুলিশ ধর্ষককে গ্রেফতার করে।
২১ অক্টোবর দুপুরে সুবর্ণচর উপজেলার চরজব্বার ইউনিয়নের চরহাসান গ্রামের বাসিন্দা মৃত দায়মুদ্দিনের ছেলে আব্দুল হক কাজী (৫৫) বিস্কুট দেয়ার প্রলোভন দিয়ে বসতঘরে নিয়ে শিশু শ্রেণির এক ছাত্রীকে (৭) ধর্ষণ করে রক্তাক্ত করেন। শিশুটির পরিবার ঘটনাটি স্থানীয় ইউপির সংরক্ষিত মহিলা সদস্য ফাজিলাতুন নেছা ও এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তিদের জানালে তারা স্থানীয় পর্যায়ে ঘটনাটি মীমাংসা করে দেয়ার কথা বলে মামলা করতে বাধা দেন। পরে স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান তরিকুল ইসলামের সহযোগিতায় ২২ অক্টোবর রাতে শিশুটির বাবা চরজব্বার থানায় মামলা দায়ের করেন। মামলা দায়েরের তিন দিন পেরিয়ে গেলেও পুলিশ ধর্ষককে গ্রেফতার করেনি।

২১ অক্টোবর দুপুরে চাটখিল উপজেলার সাহাপুর ইউনিয়নের করটখিল গ্রামের মনির হোসেনের ছেলে মো. মিরাজ হোসেন (১৮) এক বুদ্ধি প্রতিবন্ধী শিশুকে (১০) ধর্ষণ করেন। এ ঘটনায় ২৪ অক্টোবর দুপুরে চাটখিল থানায় মামলা দায়ের করা হয়েছে এবং ধর্ষক পলাতক রয়েছে।

২৩ অক্টোবর রাত ১০টার দিকে পূর্ব পরিচয়ের সূত্র ধরে নোয়াখালীর বিচ্ছিন্ন দ্বীপ উপজেলা হাতিয়া পৌরসভার ৩ নম্বর ওয়ার্ড এলাকায় এক নারীর (২৫) বসতঘরে ঢুকে তাকে ধর্ষণ করা হয়। এ ঘটনায় ধর্ষকের সহযোগিতা করেন তার বন্ধু মাসুদ উদ্দিন। গত শনিবার রাতে এ ঘটনায় ধর্ষণের শিকার নারী বাদী হয়ে হাতিয়া থানায় অভিযোগ দায়ের করেন। পুলিশ অভিযান চালিয়ে ধর্ষক ট্রপেল দাস নয়নকে (২৮) গ্রেফতার করে।

বেগমগঞ্জ উপজেলার চৌমুহনী পৌরসভার করিমপুর এলাকায় ২৪ অক্টোবর গভীর রাতে ১৬ বছর বয়সী এক শিশুর ঘরের দরজা ভেঙে ভেতরে ঢুকে ধর্ষণ করে স্থানীয় বখাটে যুবক সুমন (৩২)। ধর্ষক সুমন করিমপুর মহল্লার কামাল হোসেন হুক্কা মিয়ার ছেলে। এ ঘটনায় ধর্ষণের শিকার শিশুর পিতা বাদী হয়ে বেগমগঞ্জ মডেল থানায় গত শনিবার সন্ধ্যায় একটি মামলা দায়ের করেন। পুলিশ অভিযান চালিয়ে ধর্ষক সুমনকে গ্রেফতার করে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে প্রেরণ করে।

নারী অধিকার জোট নোয়াখালী জেলা সভাপতি লায়লা পারভিন সম্প্রতি নোয়াখালীতে নারীর প্রতি সহিংসতার ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, ‘যারা ধর্ষণ ও নির্যাতনের ঘটনা ঘটাচ্ছেন তাদের বেশিরভাগই রাজনৈতিক আশ্রয়দাতা। বিচারহীনতার সংস্কৃতি চালু হওয়া, দ্রæত বিচার না হওয়া, এসব ঘঁনায় প্রভাবশালীদের ভয়ে সাক্ষী না দেয়া, অধিকাংশ ঘটনা সালিশ বৈঠকের মাধ্যমে মীমাংসা হওয়া এবং অনেক ক্ষেত্রে মেডিক্যাল রিপোর্ট পাল্টে দেয়া এর জন্য দায়ী। ধর্ষণ ও নারী নির্যাতন ঘটনা প্রতিরোধে নির্যাতনের প্রমাণ ও আলামত সংরক্ষণের সুব্যবস্থা ও গভীর নজরদারি বাড়াতে হবে।’

নোয়াখালী এনআরডিএস (নোয়াখালী রুরাল ডেভেলপমেন্ট সোসাইটির)-এর নির্বাহী পরিচালক ও বিশিষ্ট মানবাধিকার কর্মী আব্দুল আউয়াল নারীর প্রতি সহিংসতা ও ধর্ষণের ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, ‘নারীর প্রতি সহিংসতা, নির্যাতন মোকাবিলা করার জন্য যে সামাজিক শক্তি প্রয়োজন তা বর্তমান সমাজে দৃশ্যমান নয়। এটা সার্বিক ব্যর্থতার চিত্র।

নোয়াখালী পুলিশ সুপার মো. আলমগীর হোসেন বলেন, ‘ধর্ষণ ও নারীর প্রতি সহিংসতার ঘটনায় থানা পুলিশে অভিযোগ করার সঙ্গে সঙ্গে পুলিশ অপরাধীদের গ্রেফতার করে আইনের আওতায় আনছে। যার প্রমাণ বেগমগঞ্জের একলাশপুরের নারী নির্যাতনের ঘটনা। পুলিশ নারী নির্যাতনকারী ও ধর্ষকদের সঙ্গে কোনো আপোস করছে না। অভিযোগ পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আসামিদের গ্রেফতার করে কারাগারে প্রেরণ করছে। এ ছাড়া জেলার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্থিতিশীল রাখতে জেলার ৯টি উপজেলায় প্রতি রাতেই পুলিশের বিশেষ অভিযান চলমান রয়েছে। পুলিশ অপরাধীদের রাজনৈতিক পরিচয় দেখে না। অপরাধী যেই হোক না কেন তাকে আইনের আওতায় এনে শাস্তি নিশ্চিত করতে পুলিশ কাজ করছে।

মানবকণ্ঠ/এসকে






ads