প্রধানমন্ত্রীর বাড়ি পেলেন শেরপুরের সেই ‘দানবীর ভিক্ষুক’

মানবকণ্ঠ
বাড়ির চাবি বুঝিয়ে দেয়ার পর মোনাজাত - ছবি : প্রতিবেদক।

poisha bazar

  • প্রতিনিধি, দৈনিক মানবকণ্ঠ
  • ১৭ আগস্ট ২০২০, ১১:১৩,  আপডেট: ১৭ আগস্ট ২০২০, ১১:২০

সুজন সেন, শেরপুর : প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পা ছুঁয়ে একবার সালাম করতে চান শেরপুরের সেই আলোচিত অশীতিপর ভিক্ষুক নাজিমউদ্দিন। এটাই তার এখন জীবনের শেষ ইচ্ছা। গতকাল রবিবার সকালে প্রধানমন্ত্রীর দেয়া বিশেষ উপহারের বাড়ি পেয়ে এমন অভিপ্রায় ব্যক্ত করেন ভিক্ষুক নাজিম। ভিক্ষা করে জমানো টাকা করোনাদুর্গতদের মাঝে দান করে প্রশংসা পাওয়া ভিক্ষুক নাজিমউদ্দিনকে প্রধানমন্ত্রীর প্রতিশ্রুত জমিসহ পাকা বাড়ির চাবি হস্তান্তর করা হয়েছে।

নাজিমের বাড়ি জেলার ঝিনাইগাতী উপজেলার কাংশা ইউপির গান্ধীগাঁও গ্রামে। তিনি ওই গ্রামের মৃত ইয়ার উদ্দিনের ছেলে। করোনা ভাইরাসে ক্ষতিগ্রস্তদের সাহায্যের জন্য ২১ এপ্রিল ইউএনও রুবেল মাহমুদের হাতে ভিক্ষা করে জমানো ১০ হাজার টাকা তুলে দেন এই দানবীর। নিজের ভাঙা বসতঘর মেরামত করার জন্য ভিক্ষা করে ওই টাকা জমিয়েছিলেন তিনি। এ নিয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়। তার এই দানের বিষয়টি প্রধানমন্ত্রীর নজরে এলে ইউএনওকে ফোন করেন প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত সচিব-(১) সালাহ উদ্দিন। নির্দেশনা অনুযায়ী রাতেই ভিক্ষুক নাজিমুদ্দিনের বাড়িতে যান ইউএনও।

পরে ২২ এপ্রিল দুপুরে জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে নাজিমুদ্দিনকে সংবর্ধনা দেয়া হয়। এদিন তার হাতে ২০ হাজার টাকা ও প্রধানমন্ত্রীর উপহার সামগ্রী তুলে দেন জেলা প্রশাসক। এ ছাড়া উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে নাজিমুদ্দিনকে খাদ্যসামগ্রী দেয়া হয়। খাদ্যসামগ্রীর মধ্যে ছিল চাল, ডাল, তেল ও আলুসহ অন্যান্য পণ্য।

সূত্র জানায়, এই দৃষ্টান্তমূলক ও হৃদয়গ্রাহী ঘটনাটি প্রধানমন্ত্রীর নজর কেড়েছিল এবং নাজিমুদ্দিনকে তিনি ব্যক্তিগত তহবিল থেকে একটি আধুনিক বাড়ি তৈরি করার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দেন। এমনকি প্রধানমন্ত্রী নিজেই ওই বৃদ্ধ দরিদ্র ব্যক্তির জন্য বাড়ির নকশা চ‚ড়ান্ত করেন।

জেলা প্রশাসকের কার্যালয় সূত্র জানায়, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় নাজিমুদ্দিন জমি এবং পাকা বাড়ি পেয়েছেন। এ ছাড়া জীবিকা নির্বাহের জন্য জেলা প্রশাসনের তরফ থেকে দেয়া হবে একটি মুদি দোকান। নাজিমুদ্দিন যে ঘরটিতে এত দিন ছিলেন সেটি মূলত সরকারের খাসজমি ছিল। এ তথ্যটি ভিক্ষুক নাজিমুদ্দিনও এত দিন জানতেন না। সরকারের এই খাসজমিটি ভিক্ষুক নাজিমুদ্দিনের নামে বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। যদিও সরকার অন্য একটি উপযুক্ত জায়গায় নতুন বাড়ি তৈরি করতে চেয়েছিল, নাজিমুদ্দিন এখন যে জায়গাটিতে বাস করছেন, সেখান থেকে যেতে চাননি তিনি। তাই নতুন বাড়িটি তার বর্তমান জায়গায় নির্মিত হয়েছে। নাজিমুদ্দিন যে ঘরে থাকতেন সেই জমি কিছুটা সম্প্রসারণ করে ১৫ শতাংশ জমি তার নামে বরাদ্দ দিয়েছে সরকার। প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে নাজিমুদ্দিনের হাতে এ নতুন বাড়ির চাবি তুলে দেন জেলা প্রশাসক আনার কলি মাহবুব।

এদিন গণমাধ্যমকর্মীদের সামনে প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করতে গিয়ে নাজিমুদ্দিন বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পা ছুঁয়্যা একবার সালাম করতে চাই। এটাই এখন আমার জীবনের শেষ ইচ্ছা।’

শেখ হাসিনার দীর্ঘায়ু কামনা করে তিনি বলেন, ‘এ রকম প্রধানমন্ত্রী আমার বিরাশি বছর বয়সে আর কহনো দেহি নাইকা। আমি তো করোনার জন্যে ট্যাহাডা দিছি। সেই হানে খুশি হইয়া প্রধানমন্ত্রী আমারে যে উপহার দিছে, আমি খুব খুশি হইছি।’

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘ভিক্ষা করতে করতে খাইয়ে-খুইয়ে ১০ হাজার ট্যাহা ডাইনে হইল (জমা হলো)। ট্যাহাডি ঘর-দরজা ঠিক করবার জন্যে থুইছিলাম। কিন্তু এহন দেশে আইলো করোনা, শুরু হইল দশের অভাব। ভাবলাম বয়স হইয়া গেছে, মইরাই যামুগা। এই ট্যাহাগুলান যদি মাইনসের কাজে লাগে, এই চিন্তার থ্যাইক্কা দশের জন্যে ট্যাহাগুলান ইউএনওরে দিমু। কিন্তু আমি তো ইউএনওরে চিনি না। তাই বকুল মেম্বার আর লতিফা মেম্বারনীরে কইলাম আমারে ইউএনও সাবের কাছে নিয়া যাও। পরে ইউএনওর হাতে দশের জন্যে ট্যাহাগুইলে দিলাম।’

এর আগে অন্য কোথাও দান করেছেন কি না জানতে চাইলে নাজিমুদ্দিন বলেন, ‘অনেক দিন আগে যহন কামাই-টামাই করছি তহন জুম্মাঘর, মাদরাসায় ১০০, ২০০, ৫০০ ট্যাহা দান করছি। কিন্তু যহন বয়স হইল, বুইড়ে হইলাম তহন তো আমার কামাই করবার উপায় নাই। খড়ি-টড়ি (লাকড়ি) কাইটে আর কোদালের আছাড়ি বানায়ইয়ে বাজারত বিক্রি কইরা সংসার চালাইতাম। একদিন পাহাড়ের ড্রেনে পইড়ে গেয়ে পা ভাঙল, কাম-কাজ করবার পাই না। মানুষ কামলাও নেয় না। পরের থেইক্যা ভিক্ষা কইরে খাওয়া শুরু করলাম। তাই আর দান করবের পাই নাই।’

গত ২৭ এপ্রিল সকালে করোনা ভাইরাস বিষয়ে সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে শেরপুরসহ আরো কয়েকটি জেলার সঙ্গে ভিডিও কনফারেন্সে সংযুক্ত হন প্রধানমন্ত্রী। এদিন তিনি বলেন, ভিক্ষুক নাজিমুদ্দিন সারা বিশ্বে একটি মহৎ দৃষ্টান্ত সৃষ্টি করেছেন। এ সময় তিনি সবার উদ্দেশ্যে ভিক্ষুক নাজিমুদ্দিন প্রসঙ্গে আলোচনা করেন।

আলোচনায় প্রধানমন্ত্রী বলেছিলেন, ‘এত বড় মানবিক গুণ অনেক বিত্তশালীর মাঝেও দেখা যায় না। একজন নিঃস্ব মানুষ যার কাছে এই টাকা অতি গুরুত্বপূর্ণ। ওই টাকা দিয়ে তিনি দুটো জামা কিনতে পারতেন, ঘরের খাবার কিনতে পারতেন। এ ছাড়া করোনা ভাইরাস নিয়ে যে অসুবিধা, ওই টাকা দিয়ে তিনি নিজের কাজে ব্যবহার করতে পারতেন। আর এ অবস্থায় ঘুরে ঘুরে ভিক্ষা পাওয়াও মুশকিল। কিন্তু সেসব চিন্তা না করে নাজিমুদ্দিন তার শেষ সম্বলটুকু দান করে দিয়েছেন।’

প্রধানমন্ত্রী এ সময় আরো বলেছিলেন, ‘বাংলাদেশের মানুষের মাঝে এখনো সেই মানবিকতা বোধ আছে। সেটা পাই আমরা নিঃস্বদের কাছ থেকেই। দেখা যায় অনেক বিত্তশালী হা-হুতাশ করেই বেড়ায়, তাদের নাই-নাই অভ্যাসটা যায় না। তাদের চাই-চাই ভাবটাই সব সময় থেকে যায়।’ জেলা প্রশাসক আনারকলি মাহবুব বলেন, ‘নাজিমুদ্দিন ভিক্ষুক হলেও হৃদয়ের দিক দিয়ে অনেক ধনশালী। মানুষ হিসেবে মানুষের পাশে থাকার দৃষ্টান্ত স্থাপন করে তিনি আবার প্রমাণ করলেন মানুষ মানুষের জন্য।’ প্রাণঘাতী করোনা পরিস্থিতিতে নাজিমুদ্দিনের সেই অবদানে সম্পদশালীরাও আর্তমানবতার সেবায় এগিয়ে আসবেন বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

তিনি জানান, জেলা প্রশাসনের তরফ থেকে সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর আওতায় নাজিমুদ্দিনকে বয়স্ক ভাতা দেয়া হচ্ছে। এবং তিনিসহ তার স্ত্রী আবেদা খাতুন ও সন্তানদের চিকিৎসার দায়-দায়িত্ব নেয়া হয়েছে। প্রসঙ্গত, ১৯৪০ সালে জন্ম নেয়া নাজিমুদ্দিন দুই ভাই আর দুই বোনের মধ্যে তৃতীয়। ব্যক্তিজীবনে তিনটি বিয়ে করেছেন তিনি। তার প্রথম স্ত্রীর নাম ময়না খাতুন। ওই ঘরে মমেন আলী নামে তার এক ছেলে রয়েছে। দ্বিতীয় স্ত্রীর নাম হালেমা বেগম। ওই ঘরে নজেদা খাতুন নামে এক কন্যাসন্তান আছে তার। মেয়েটি মানসিক রোগী। ওই দুই স্ত্রীর সঙ্গে অনেক আগেই তার ছাড়াছাড়ি হয়ে গেছে। আর বর্তমান স্ত্রীর নাম আবেদা খাতুন। আবেদা বিকলাঙ্গ ও মানসিক রোগী। এ ঘরে আসকর আলী, সুন্দরী, তানজিলা ও আব্দুল্লাহ নামে চারজন সন্তান রয়েছে। এর মধ্যে ছেলে আসকর আলী বিয়ে করে আলাদা থাকেন। আর মেয়ে সুন্দরীর বিয়ে হয়েছে বেশ কিছুদিন আগে।

মানবকণ্ঠ/এইচকে





ads