নতুন ওসির ‘নতুন নাটক’


poisha bazar

  • ফরহাদ ইকবাল, কক্সবাজার
  • ১৩ আগস্ট ২০২০, ০৮:৫২

“পুলিশ আমাকে থানায় নিয়ে বলে, ‘তোমার ছেলেকে জীবিত ফেরত চাইলে এই কাগজে টিপসই দাও।’ আমি জানতাম না এটি মামলার এজাহার।” কথাগুলো নুরুল আমিন অপহরণ মামলার বাদী মা খালেদা বেগমের।

আর এলাকাবাসীর ভাষ্য, ওই দিন (সোমবার) রাতে পুলিশ কয়েক দফা নূরুল আমিনসহ তার দুই সঙ্গীর বাড়িতে যায় এবং অপহরণ মামলা করার জন্য পরিবারের সদস্যদের ওপর চাপ প্রয়োগ করে। ‘অপহৃত’ এই নূরুল আমিন হচ্ছেন সিনহা হত্যার ঘটনায় পুলিশ বাদী হয়ে দায়ের করা দুই মামলার সাক্ষী। র‌্যাব এই তিনজনকে বাড়ি থেকে গ্রেফতার করে নিয়ে যাওয়ার পর সিনহা হত্যা মামলাকে কেন্দ্র করে পাল্টা একটা কিছু করার চেষ্টা থেকেই পুলিশ এই নতুন ‘অপহরণ মামলার’ নাটক সাজিয়েছে বলে জানা গেছে। টেকনাফ থানার নতুন ওসি মো. আবুল ফয়সল এ ঘটনার পেছনে কলকাঠি নেড়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।

কক্সবাজারের টেকনাফে সাবেক ওসি প্রদীপ কুমার দাস ও পরিদর্শক লিয়াকতের হাতে অবসরপ্রাপ্ত মেজর সিনহা মোহাম্মদ রাশেদ খান নিহত হওয়ার ঘটনায় র‌্যাব-পুলিশের মধ্যে এমন টানাটানি প্রকাশ্য রূপ নিয়েছে।

পুলিশের মামলার সাক্ষী টেকনাফ শামলাপুর মারিশবুনিয়া গ্রামের মো. নুরুল আমিন, নেজাম উদ্দিন ও মোহাম্মদ আয়াজ। এই তিন ব্যক্তি পুলিশের করা দুই মামলায় সাক্ষী ছিলেন। গত মঙ্গলবার র‌্যাব তাদের গ্রেফতার করে ১০ দিনের রিমান্ড আবেদন জানালে ১২ আগস্ট (গতকাল) শুনানির জন্য তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছিল। গতকাল তাদের প্রত্যেকের সাত দিন করে রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন আদালত।

অপরদিকে র‌্যাবের অভিযানে গ্রেপ্তার তিনজনের মধ্যে মো. নুরুল আমিনকে অপহরণের অভিযোগে থানায় তার মা বাদী হয়ে মামলা দায়ের করেন। তবে র‌্যাবের অভিযানে ওই তিনজনের গ্রেপ্তারের বিষয়টি গত মঙ্গলবার বিকালে আদালতে হাজির করার আগ পর্যন্ত পুলিশ জানত না বলে জানিয়েছেন টেকনাফ থানার ওসি।

মো. নুরুল আমিন টেকনাফের বাহারছড়া ইউনিয়নের মারিশবুনিয়া এলাকার নাজিম উদ্দিনের ছেলে। টেকনাফ থানার ওসি মো. আবুল ফয়সল জানান, ‘গত সোমবার রাত সাড়ে ৮টার দিকে টেকনাফের মারিশবুনিয়া এলাকা থেকে মো. নুরুল আমিনসহ তিনজনকে বাড়ি থেকে অজ্ঞাত একদল লোক জোরপূর্বক মাইক্রোবাসে তুলে নিয়ে যায়। স্বজনরা বিষয়টি পুলিশকে অবহিত করলে রাতেই থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) নথিভুক্ত করা হয়। পরদিন মঙ্গলবার সকাল ৭টা ৩৫ মিনিটে থানায় সেটি মামলা হিসেবে নথিভুক্ত হয়েছে।’

ওসি ফয়সল বলেন, ‘স্বজনরা মো. নুরুল আমিনসহ তিনজনকে অপহরণের বিষয়টি থানায় অবহিত করার পর গত সোমবার রাত ৩টার দিকে টেকনাফের মারিশবুনিয়া এলাকায় ঘটনাস্থল পরিদর্শনে যান। পরে ঘটনার সত্যতা পাওয়া যাওয়ায় মঙ্গলবার সকালে নুরুল আমিনের মা খালেদা বেগম বাদী হয়ে অজ্ঞাতনামা আসামিদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেন। অজ্ঞাত লোকজন কর্তৃক তুলে টেকনাফের মারিশবুনিয়া এলাকার মো. নুরুল আমিন, মো. নাজিমুদ্দিন ও মোহাম্মদ আয়াজ সিনহা নিহত হওয়ার ঘটনায় পুলিশ বাদী হয়ে দায়ের করা দুটি মামলার সাক্ষী।’

তদন্তকারী কর্তৃপক্ষ র‌্যাবের পক্ষ থেকে তিনজনকে গ্রেফতার করে ১০ দিনের দিনের রিমান্ড চাওয়া হলে আদালত সাত দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। অন্যদিকে গ্রেফতারকৃত ওই তিন আসামির পক্ষে থানায় গ্রহণ করা অপহরণ মামলায় ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি চাওয়া হলে আদালত তা আমলে না নিয়ে নাকচ করে দেন। এ নিয়ে র‌্যাব ও পুলিশের সমন্বয়হীনতা এবং ক্ষেত্রবিশেষে তদন্তকারী সংস্থা র‌্যাবের কাজ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে বলে আলোচনা চলছে।

জানা যায়, সিনহা হত্যা মামলায় জেলে থাকা চারজন পুলিশ ও তিনজন সাক্ষীসহ মোট সাতজনের প্রত্যেকের সাত দিন করে রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন আদালত। টেকনাফের সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত-৩-এর বিচারক, সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট তামান্না ফারাহ্ রিমান্ড আবেদনের শুনানি শেষে গতকাল বুধবার সকালে এ আদেশ দেন।

রিমান্ডের সেই সাত আসামি হলেন- পুলিশের বহিষ্কৃত তিন কনস্টেবল সাফানুর করিম, কামাল হোসেন ও আবদুল্লাহ আল মামুন এবং এএসআই লিটন মিয়া। আর পুলিশের মামলার সাক্ষী টেকনাফ শামলাপুর মারিশবুনিয়া গ্রামের মো. নুরুল আমিন, নেজাম উদ্দিন ও মোহাম্মদ আয়াজ। এই তিন ব্যক্তি পুলিশের করা দুই মামলায় সাক্ষী ছিলেন।

গত মঙ্গলবার র‌্যাব তাদের গ্রেফতার করে ১০ দিনের রিমান্ড আবেদন জানালে ১২ আগস্ট (গতকাল) শুনানির জন্য তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছিল। মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা র‌্যাব-১৫-এর সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি) জামিল আহমদ গত ১০ আগস্ট পুলিশের চার আসামির প্রত্যেকের জন্য ১০ দিন করে আদালতে রিমান্ড আবেদন করেছিলেন। সেই রিমান্ড আবেদনের শুনানিও ছিল গতকাল। এর আগে এই চার আসামিকে কক্সবাজার জেলা কারাফটকে গত ৮ ও ৯ আগস্ট পর পর দুদিন জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়।

এদিকে র‌্যাব জানিয়েছে, সিনহা হত্যার ঘটনায় জড়িত সন্দেহে র‌্যাবের একটি দল গত সোমবার রাতে টেকনাফের মারিশবুনিয়া এলাকা মো. নুরুল আমিনসহ তিনজনকে গ্রেপ্তার করে। পরে গত মঙ্গলবার বিকালে তাদের আদালতে হাজির করা হয়। আর গতকাল তাদের রিমান্ড মঞ্জুর করা হয়।

উল্লেখ্য, এর আগে গত ৬ আগস্ট আদালত থেকে রিমান্ডের আদেশ পাওয়া এই মামলার অপর তিন আসামি যথাক্রমে বরখাস্ত হওয়া টেকনাফের সাবেক ওসি প্রদীপ কুমার দাশ, বাহারছড়া পুলিশ তদন্ত কেন্দ্রের প্রত্যাহারকত ইন্সপেক্টর লিয়াকত আলী (বরখাস্ত) ও এসআই নন্দলাল রক্ষিতকে (বরখাস্ত) রিমান্ডের জন্য এখনো তদন্তকারী কর্মকর্তার হেফাজতে নেয়া হয়নি বলে জানিয়েছেন কক্সবাজার জেলা কারাগারের সুপার মোহাম্মদ মোকাম্মেল হোসেন।

 

 

 





ads







Loading...