• বৃহস্পতিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২০
  • ই-পেপার

ঘুষ না পেয়ে খতিয়ান বাতিল করেন বাউফলের সেই তহশীলদার!

মানবকণ্ঠ
আশরাফ আলী খান

poisha bazar

  • প্রতিনিধি, দৈনিক মানবকণ্ঠ
  • ০৫ আগস্ট ২০২০, ১২:২৮

মোঃ জসীম উদ্দিন, বাউফল : পটুয়াখালীর বাউফলের সেই ইউনিয়ন ভূমি কর্মকর্তা (তহশীলদার) আশরাফ আলী খানের বিরুদ্ধে এবার ঘুষ নেয়ার অভিযোগ এক ভূক্তভোগী পরিবারের।

গত বৃহস্পতিবার বরিশাল বিভাগীয় কমিশনারের কাছে এ অভিযোগ জানান ভূক্তভোগী পরিবারের পক্ষে মোঃ মোছলেম উদ্দিন। কালাইয়া ইউনিয়ন ভূমি অফিসে কর্মরত থাকা অবস্থায় তহশীলদার আশরাফ আলী খান বিপাকে ফেলে এ ঘুষ প্রদানে ভূক্তভোগীকে বাধ্য করেন বলে লিখিত অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।

অভিযোগ সূত্রে জানা গেছে, কালাইয়া ইউনিয়ন ভূমি অফিসে ভূমি সহকারী কর্মকর্তা (তহশীলদার) থাকাকালীন অবস্থায় চরব্যারের মৌজার সাবেক এসএ সৃজিত ২৯৬ নং খতিয়ানে ১২৬ নং দাগে তিন একর জমির দলিল মূলে অভিযোগকারীর স্ত্রী ফেরদৈসী বেগম, ভায়রা আবু জাফর ও শালী হাসিনা পাভিন বেগমের নামে রেকর্ড মিউটিশনসহ জমা খারিজ করে খাজনা দিয়ে ভোগ দখল করে আসছে। দিয়ারা জরিপ ৭২৪ ও ৭৬৫ নং দাগের নামজারি জমা খারিজ খতিয়ান নং ১৪৮৩ সঠিক নয় মর্মে তহশীলদার আশ্রাব আলী খান ৩০হাজার টাকা ঘুষ দাবি করে। অন্যথায় নামজারি জমা খারিজ কেস নং ১৪৮৩ খতিয়ান বাতিল করার হুমকি দেয়। কোন উপায় না পেয়ে ২০হাজার টাকা তাকে ঘুষ দেয়া হয়। ওই তহশীলদার তার দাবীকৃত ৩০ হাজার টাকা না পাওয়ায় ১৪৮৩ নং খতিয়ান বাতিল করা হয়েছে মর্মে লাল কালি দিয়ে বাতিল করে ভলিয়ম বইয়ের পাতায় তার নামের সীল স্বাক্ষর করে রাখেন। পরবর্তীতে জমির মালিক খাজনা দিতে গেলে খাজনা না নিয়ে খতিয়ান বাতিল করা হয়েছে বলে জানিয়ে দেয়।

অফিস সূত্রে জানা যায়, সহকারী কমিশনার ভূমি অফিসে ১৫০ ধারায় মামলা না করে সহকারী কমিশনার (ভূমি) আদেশ ব্যতিরেকে তহশীলদার কোন খতিয়ান বাতিল করার এখতিয়ার রাখে না। সেক্ষেত্রে তহশীলদার আশরাফ আলী খান তার দাবিকৃত টাকা না পেয়ে ক্ষমতা অপব্যাবহার করে খতিয়ান বাতিল করেছেন বলে জানা গেছে।

অভিযোগ সূত্রে আরো জানা যায়, নামজারি জমা খারিজ কেসের ক্ষেত্রে প্রত্যেকের কাছ থেকে ১০ হাজার থেকে ৫০ হাজার টাকা ঘুষ নিতেন অভিযুক্ত তহশীলদার। এভাবেই ঘুষ দুর্নীতির মাধ্যমে রাতারাতি অঢেল সম্পদ ও নগদ অর্থের মালিক হয়ে যান তহশীলদার আশরাফ আলী খান।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, অভিযুক্ত তহশীলদার আশরাফ আলী খান উপজেলার নওমালা ইউনিয়নের বটকাজল গ্রামের আঃ রহমান খানের ছেলে। আশরাফ আলী খান ১৯৯৪ সালে ইউনিয়ন ভূমি উপ সহকারী কর্মকর্তা হিসেবে যোগদান করেন। ওই সময়ে তার বাবা ছিলেন একজন হতদরিদ্র ও ক্ষুদ্র মৎস্য ব্যবসায়ী। চাকরি নেওয়ার দুই বছর পার হলেই ১৯৯৬ সালে বাবার পুরনো খড়ের ঘর ভেঙ্গে আনুমানিক প্রায় পাঁচ লাখ টাকা ব্যয় করে গৃহনির্মাণ করেন ভূমি কর্মকর্তা আশরাফ। অথচ তখন তার মাসিক সর্বমোট বেতন ছিলো চার হাজার টাকার কাছাকাছি। এরপর ১৯৯৬ সাল থেকে ২০০৪ সাল পর্যন্ত অর্থাৎ ৮ বছরে নামে-বেনামে কমপক্ষ ৫০ লাখ টাকার ধানি জমি ক্রয় করে ব্যাপক সম্পত্তির মালিক হয়ে যান আশরাফ। সেই সাথে তার স্ত্রী মোর্শেদারও ভাগ্যের চাকা ঘুরে যায়। তহশীলদার স্বামীর চাকুরির গুণে তিনিও হয়ে ওঠেন কোটি কোটি টাকার ও একাধিক বাড়ির মালিক।

জানা গেছে, আশরাফের স্ত্রী মোর্শেদার নামে স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংক পটুয়াখালী সদর শাখায় ২০১০ সালের ৮ অক্টোবর ১০ লক্ষ টাকা এফডিআর করা হয়। যার হিসাব নং ০৯৯৪২৮। এছাড়া ব্র্যাংক ব্যাংক লিমিটেড পটুয়াখালী সদর শাখায় ১০ লক্ষ টাকা এফডিআর করা হয়েছে। এছাড়া ২০০৫ সালে পটুয়াখালী সদর থানার (বর্তমানে পৌর শহরে) বনানী হোটেল সংলগ্ন এলাকায় তুষার ভিলা নামক একটি বাড়ি ১৫ লাখ টাকায় আশরাফ তার স্ত্রী মোর্শেদার নামে ক্রয় করে। বর্তমানে সেই তুষার ভিলা নামক বাড়িটি পাঁচতলা বিশিষ্ট একটি ভবনে রূপান্তরিত হয়েছে। এরপর ২০০৬ সালে পটুয়াখালী সদরে রুস্তুম মৃধা ব্রীজ সংলগ্ন রিয়াজুল জান্নাত মসজিদ সড়কের পাশে প্রায় ২ লাখ টাকা ব্যয়ে সাড়ে চার শতক জমি তার স্ত্রী মোর্শেদার নামে ক্রয় করেন। তহশীলদার আশরাফ নিজ গ্রামের বাড়িতে প্রায় ২০ লাখ টাকা ব্যয় করে ‘আসাদুজ্জামান তুষার নূরানী এবং হাফিজিয়া মাদ্রাসা ও এতিমখানা’ নির্মাণ করেন। তবে নির্মাণ ব্যয়ের জন্য কোন ধরণের সরকারি-বেসরকারি অনুদান তিনি পাননি। ওই প্রতিষ্ঠানে কোনো আয় না থাকলেও প্রতি মাসে প্রায় ২০ হাজার টাকা ব্যয় করতে হয় প্রতিষ্ঠাতা আশরাফকে। তাছাড়া ২০১৯ সালে দুর্নীতি থেকে রক্ষা পেতে নিজের প্রতিষ্ঠিত মাদ্রাসা ও এতিমখানার নাম ব্যবহার করে পটুয়াখালী চৌরাস্তা সংলগ্ন এলাকায় ৪৫ লাখ টাকায় ৯ শতাংশ জমি ক্রয় করেন ওই তহশীলদার। যাার জেএল নং ৩৮, এসএ খতিয়ান নং- ২১২৩, দাগ নম্বর ৭৯৬ ও ৮০৪।

সংশ্লিষ্ট অফিস সূত্রে জানা যায়, তহশিলদার আশরাফ আলী খান বর্তমানে সর্বসাকুল্যে ২৫ হাজার ৫৯৮ টাকা বেতন পান। আর তার স্ত্রী একজন গৃহিনী। তবে এই বেতন দিয়ে কিভাবে তিনি তার মাদ্রাসা ও এতিমখানায় প্রতিমাসে প্রায় ২০ হাজার টাকা দিয়ে আবার নিজের সংসার পরিচালনা ও সন্তানদের লেখাপড়া খরচ চালিয়ে যাচ্ছেন- এই প্রশ্ন জনমনে। একই সাথে আশরাফ দম্পতি বিভিন্ন ব্যাংকে এফডিআর ও সঞ্চয়ী হিসাব ছাড়াও অঢেল সম্পত্তির মালিকও হয়েছেন।

আশরাফের এলাকার লোকজন বিস্ময় প্রকাশ করে জানান, তহশিলদারী চাকরি নেওয়ার পর থেকেই আশরাফ ও তার স্ত্রীর ভাগ্যের অভাবনীয় পরিবর্তন ঘটে। যার ফলশ্রুতিতে খড়কুটার ঘর থেকে এখন কোটি কোটি টাকা ও বিস্তর সম্পত্তির মালিক আশরাফ দম্পতি।

এসব বিষয়ে অভিযুক্ত তহশীলদার অশরাফ আলী খানের ফোনে একাধিক বার ফোন দিলে রিসিভ না করা হয়। তিনি ফোন রিসিভ করেননি। পরে সংবাদ সংক্রান্ত বক্তব্য নেয়া জরুরি বলে ফোনে এমএমএস দিলেও তার সাথে যোগাযোগ করা যায়নি।

বাউফল উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) আনিচুর রহমান বালী জানান, খতিয়ান বাতিল করার এখতিয়ার তহশীলদারের নেই। অভিযোগ পেলে অবশ্যই তদন্ত সাপেক্ষে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

এদিকে দুর্নীতিতে অঢেল সম্পদের মালিক বনে যাওয়া আশরাফ আলী খান ও তার দুর্নীতির সঙ্গে যুক্ত এবং তাকে আশ্রয় প্রশ্রয় দেয়া ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের আশু দৃষ্টি কামনা করেছেন ভুক্তভোগীরা।

মানবকণ্ঠ/এইচকে/জসীম





ads







Loading...