জেলেপল্লীতে মানবেতর জীবন

মো. রাজু খান, ঝালকাঠি

মানবকণ্ঠ
- ছবি: প্রতিবেদক

  • প্রতিনিধি, দৈনিক মানবকণ্ঠ
  • ৩০ জুন ২০২০, ১২:১৪

এ যেন পদ্মারপাড়ের সেই কেতুপুর গ্রাম। এখানেও দারিদ্র্য আর দুঃখ-সুখে কাটে অসংখ্য কুবের, মালা আর কপিলাদের দিন। আছেন হোসেন মিয়ারাও। ঝালকাঠি শহরের কোলঘেঁষে বয়ে চলেছে সুগন্ধা। পুরো শহর চারদিক থেকে ঘিরে রেখেছে শান্ত এ নদী। শহুরে সভ্যতার পূর্বে নদীবিধৌত উপক‚লীয় এ জেলাতে জেলে সম্প্রদায় সর্বপ্রথম বসতি স্থাপন করে। সভ্যতার ক্রমবর্ধমান ছোঁয়ায় আজকের বাণিজ্যিক শহর ঝালকাঠিতে সৃষ্টি হয়েছে সুউচ্চ অট্টালিকা, স্কুল-কলেজ, হাসপাতালসহ নাগরিক জীবনের সব সুযোগ-সুবিধা।

তবে ৩ শতাধিকের বেশি প্রাচীন এ জনপদের গোড়াপত্তনের দাবিদার জেলে সম্প্রদায়। এককালের সন্ধ্যা নদীর শাখা আজকের সুগন্ধা নদী ছোট্ট শহর ঝালকাঠিকে ঘিরে রেখেছে। বর্তমান শহরের পূর্ব চাঁদকাঠি গুরুধাম ও শ্মশানঘাট নদীসলগ্ন এলাকায় গড়ে ওঠে জেলেদের বসতি। যা আজও ঝালোপাড়া নামে পরিচিত। কৈবর্ত্য জেলেদের ঝালো বলা হতো এবং তাদের বসতির এলাকাকে বলা হতো ঝালোপাড়া। অনেকের ধারণা এ ঝালোপাড়া থেকেই ঝালকাঠি নামের উৎপত্তি। কবি বিজয়গুপ্ত মনসা মঙ্গল কাব্যেও জেলে সম্প্রদায়কে ঝালো নামে উল্লেখ করেছেন। পূর্বে প্রাচীন বাণিজ্যিক বন্দর ঝালকাঠির অধিকাংশ নাগরিকই ছিল জেলেসম্প্রদায়ের লোক।

অনেকের মতে, বর্তমান ঝালকাঠির পশ্চিম তীরে জেলেরা জঙ্গল পরিষ্কার করে বাসস্থান তৈরি করে। আর তা থেকে অপভ্রংশে ঝালকাঠি নামকরণ করা হয়েছে। এ জেলে ও জঙ্গলের কাঠি থেকেই উৎপত্তি হয় ঝালকাঠির নাম। তেমনি চাঁদকাঠি, কৃষ্ণকাঠি, বাউকাঠি, চরকাঠি, বিনয়কাঠি ইত্যাদি। যা বিস্তৃত রয়েছে স্বরূপকাঠি পর্যন্ত। বিশ্বরূপ সেনের একখানা তাম্রলিপিতে ঝালকাঠি ও নৈকাঠির নাম উল্লেখ রয়েছে। আর এ থেকেও ঝালকাঠি নাম জেলেদের কাছ থেকে এসেছে তার সমর্থন পাওয়া যায়। তবে ঝালকাঠি জেলার প্রাচীন নাম ছিল মহারাজগঞ্জ। কিন্তু ঝালকাঠি নামেই জেলার নামকরণ হয়। তিন-চারটি পরিবার থেকে আস্তে আস্তে শহরের চাঁদকাঠির সুগন্ধা পাড়ে জেলেপাড়া গড়ে ওঠে।

এখানকার জেলেরা ঝালো ও মালো এই দুই সম্প্রদায়ে বিভক্ত। সন্ধ্যার শাখা সুগন্ধা, বিষখালী, জীবনানন্দের ধানসিঁড়িসহ দূর-দূরান্তে সকাল-সন্ধ্যা কেটে যেত জেলেদের নৌকায় নৌকায়। আর নৌকা বোঝাই মাছ গঞ্জের হাটে বেচাকেনার পর চাল-ডাল, গৃহস্থালি নিয়ে বাড়ি ফিরত জেলেরা। সেসময় জেলেপাড়ায় নানা উৎসব-পার্বণ লেগে থাকত ১২ মাস। এ অঞ্চলের জেলেরা সনাতন ধর্মাবলম্বী। বারো মাসে তেরো পার্বণের মধ্যে জেলেপাড়ায় মনসা পূজা, বাস্ত পূজা, নীল পূজা, হোলি উৎসব আর গঙ্গা পূজার ঘটা লেগে যেত নির্ধারিত দিনের ৭-৮ দিন আগে থেকেই। সেসময় জেলেপাড়ায় সকাল আর সন্ধ্যা হতো তুলসী তলায় জেলে নারীর শাঁখের ধ্বনিতে। আজও জেলেপাড়ায় শাঁখের শব্দ বাজে, তবে এই শব্দে কান্নার নিদারুণ সুর ধ্বনিত হয়। মর্মস্পর্শী অনুভবে তা স্পষ্ট শোনা যায়। সুখ আর আনন্দে গাঁথা জেলেপাড়ায় সময়ের বিবর্তনে আজ চৈত্রের দাবদাহ। বর্ষা মৌসুম ছাড়া জেলেরা এখন মাছ দেখে না বললেই চলে। আর চরম দারিদ্র্যের দিনে নৌকা ও জাল সংগ্রহের অভাবে বেকার হয়ে পড়েছে জেলে যুবকরা। তাই পেশা হারিয়ে দিনদিন নিঃস্ব হয়ে পড়ছেন অনেকে। শিশু-কিশোর আর নর-নারীর মুখরিত জেলেপাড়া এখন প্রায় জেলেশূন্য। ৮-১০টি জেলে সম্প্রদায় এখনো পূর্বপুরুষের পেশা আঁকড়ে জীবনযুদ্ধে কোনোমতে টিকে আছে। রাতের অন্ধকার যেন তাদের ভয়াল দারিদ্র্যের ছোবল আর সকালের তেজোদীপ্ত সূর্যও যেন তাদের অনটনের অগ্নিকুণ্ড।

এনজিও, দাতা সংস্থাসহ সরকারি সংস্থার যেন জেলেদের এ দুর্দিনে কিছু করার নেই। অথচ জেলেপাড়া ছাড়িয়েই গড়ে উঠেছে শহুরে সভ্যতা। তাই হতদরিদ্র জেলেপাড়া এখন নিজেই যেন বলছে-‘ঈশ্বর থাকেন ওই ভদ্র পল্লীতে, এখানে তাহাকে খুঁজিয়া পাওয়া যাইবে না।’

জেলেপাড়ার বরুণ মালো বলেন, এ করোনার সময়ে শুনেছি সরকার ও বিত্তবানরা গরিবদের খাবার দেয়। আমাদের তো কেউ কিছু দিল না। এছাড়াও জেলার সুগন্ধা, বিষখালী, গাবখান ও হলতা নদীর তীরবর্তী কয়েকশ’ বাসিন্দা রয়েছেন যারা মৎস্যজীবী পেশায় জীবিকা নির্বাহ করেন।

ঝালকাঠি জেলা মৎস্য কর্মকর্তা বাবুল কৃষ্ণ ওঝা জানান, জেলায় মোট জেলের সংখ্যা ৪ হাজার ৬৩০ জন। এ সুগন্ধার জেলেরা প্রাচীন জনপদের ঝালো স¤প্রদায়ের বংশধর। আসলে লোকসংখ্যা ও জেলের সংখ্যা দুটোই বেড়েছে। আর ঝালকাঠি একটি পকেট জেলা। সাধ্যমতো জেলেদের সরকারি প্রণোদনা দেয়া হচ্ছে বলে তিনি দাবি করেন।

মানবকণ্ঠ/এইচকে



poisha bazar

ads
ads