কলাপাড়ায় কোচিংবাজ শিক্ষকের কাণ্ড!

গোফরান পলাশ, কলাপাড়া


poisha bazar

  • প্রতিনিধি, দৈনিক মানবকণ্ঠ
  • ১৬ মার্চ ২০২০, ১৭:০৯

'তুই ৫০ বার কান ধরে ওঠ-বস কর। বেয়াদব মেয়ে, আমার ক্লাস থেকে তুই বেরিয়ে যা’- এভাবেই সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী আদিবাকে শাসিয়ে বললেন খেপুপাড়া সরকারী মডেল মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক মো: দেলোয়ার হোসেন। আদিবার পূর্বে একই শ্রেণির শিক্ষার্থী ফাতিহা আক্তার জান্নাতি, জুলিয়া ফেরদৌসি তানহা, সৈয়দা মেরুনা, আনিকা তাবাসসুম নোভা, জোবায়দা জেসি, আয়শা সহ বেশ ক’জনকে হোম ওয়ার্ক’র মতো তুচ্ছ অজুহাতে ৫০ বার কান ধরে ওঠ-বস করান দেলোয়ার হোসেন।

এদের মধ্যে জুলিয়া ফেরদৌসি তানহা কান অপারেশনের রোগী হলেও ছাড় দেয়া হয়নি তাকে। আর আদিবা বিনা কারণে ৫০ বার কান ধরে ওঠ-বস করতে রাজী না হওয়ায় তাকে বেয়াদব বলে চেঁচিয়ে ওঠেন দেলোয়ার। এমনকি তিনি শ্রেণিশিক্ষক বলে পরীক্ষার নম্বর কমিয়ে দেয়ার হুমকী দেন- এমন অভিযোগ করেন শিক্ষার্থী আদিবা’র অভিভাবক সুফিয়া আক্তার।

তবে প্রতিষ্ঠানটির ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মো: আবদুর রহিম বললেন, এ ঘটনা তাঁর জানা নেই। কোনো অভিভাবক তার কাছে অভিযোগ করেননি। ইউএনও বললেন, অভিযোগের সত্যতা পেলে ব্যবস্থা নেয়া হবে।

জানা যায়, রবিবার (১৫ মার্চ) পটুয়াখালী জেলার কলাপাড়া উপজেলার খেপুপাড়া সরকারী মডেল মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সপ্তম শ্রেণির 'ক' শাখার ৫ম পিরিয়ডে অংক শিক্ষক মো. দেলোয়ার হোসেন তাঁর কাছে প্রাইভেট না পড়ার দরুন হোম ওয়ার্কের অজুহাত সৃষ্টি করে কয়েকজন শিক্ষার্থীকে ৫০ বার কান ধরে ওঠ বস করিয়ে মানসিক ও শারীরিক নির্যাতন করেন। এসময় শিক্ষার্থী জুলিয়া ফেরদৌসি তানহা কান অপারেশনের রোগী বলার পরও তাকে কান ধরে ওঠ-বস করতে বাধ্য করেন দেলোয়ার।

এমনকি তাঁর নিয়মে অংক না করলে পরীক্ষার খাতায় কোন নম্বর না দেয়ার হুমকী দেন শিক্ষার্থীদের। এভাবেই তিনি প্রতিবছর শিক্ষার্থীদের জিম্মি করে তাঁর পরিচালিত হোম প্রাইভেট ও কোচিংয়ে যেতে বাধ্য করেন। এতে যারা যেতে রাজী না হয় তাদের শ্রেণিকক্ষে প্রতিনিয়ত মানসিক ও শারীরিক নির্যাতন, পরীক্ষার হলে হয়রানী ও উত্তরপত্রে নম্বর কমিয়ে দিয়ে থাকেন তিনি। কেননা দেলোয়ার হোসেন (ইনডেক্স নং-২১৯৮১৫) ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের সহায়তায় ৭ম থেকে ১০ম শ্রেণি পর্যন্ত সকল ক্লাসে অংক ও বিজ্ঞান বিষয়ের শ্রেণিশিক্ষক।

প্রতিষ্ঠানটিতে একাধিক বিএসসি শিক্ষক থাকার পরও শিক্ষক দেলেয়ারকে প্রধান শিক্ষক ক্লাস রুটিনে বিজ্ঞান ও অংক বিষয় পড়াতে দেন। এমনকি অষ্টম শ্রেণির শারীরিক শিক্ষা ও দশম শ্রেণির বোর্ড পরীক্ষার সকল প্রাকটিক্যাল মার্কসের মালিক একমাত্র দেলোয়ার। এ নিয়ে অন্য শিক্ষকরা মুখ খুললে তাঁদের হয়রানী করা হয়। কেননা, শিক্ষার্থীদের জিম্মি করে উপার্জিত এসব অর্থের একটি অংশ পেয়ে থাকেন ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক। যে টাকায় দু’জনেরই শহরে বাড়ি নির্মাণের প্লট ও ব্যাংক ব্যালেন্স টইটম্বুর। এজন্য প্রতিষ্ঠানটি সরকারী হওয়ার পরও প্রধান শিক্ষকের যাতে পদায়ন না হয় সেজন্য প্রতিনিয়ত ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক সংশ্লিষ্ট দপ্তরে তদ্বির করছেন বলেও অভিযোগ পাওয়া যায়।

ভুক্তভোগী শিক্ষার্থী আদিবা’র অভিভাবক মোসা: সুফিয়া আক্তার বলেন, রবিবার অংক শিক্ষক দেলোয়ার হোসেন তুচ্ছ কারণে আমার মেয়ে আদিবাকে ৫০ বার কান ধরে ওঠ বস করতে বলেন। এতে সে রাজী না হওয়ায় তার সাথে যাচ্ছেতাই ব্যবহার করেন। এমনকি আদিবাকে বেয়াদব এবং শ্রেণিকক্ষ থেকে বের হয়ে যেতে বলেন। সোমবার শ্রেণিকক্ষে আমার মেয়ের সাথে তিনি কথা বলেনি। এমনকি আমার মেয়ে তার কাছে অংকের খাতা নিয়ে গেলে তিনি কোন ভ্রুক্ষেপ করেননি।

সুফিয়া আক্তার আরও বলেন, শিক্ষক দেলোয়ার হোসেন এর আগে আমার বাসায় এসে আমার মেয়ে আদিবাকে তার কাছে প্রাইভেট পড়ানোর জন্য বলেন। আমি এতে রাজী না হওয়ার পর থেকে তিনি শ্রেণিকক্ষে আমার মেয়ের উপর শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন শুরু করেন।

সুফিয়া আক্তারের মতো একই অভিযোগ শিক্ষার্থী জুলিয়া ফেরদৌসি তানহা’র মা মোসা. রাবেয়া বশরি ও শিক্ষার্থী ফাতিহা আক্তার জান্নাতি’র মা মোসা. নাসরিনের। তারা কোচিংবাজ শিক্ষক দেলোয়ার হোসেনের রোষানল থেকে কোমলমতি শিশুদের বাঁচাতে প্রতিষ্ঠানটির সভাপতি ইউএনও’র কাছে দু’এক দিনের মধ্যে লিখিত আবেদন করবেন বলে জানান।

এ বিষয়ে খেপুপাড়া সরকারী মডেল মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের অভিযুক্ত শিক্ষক মো: দেলোয়ার হোসেনের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি উত্থাপিত অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, একটি মহল আমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছে।

খেপুপাড়া সরকারী মডেল মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক আ: রহিম বলেন, তিঁনি এ বিষয়ে কিছুই জানেন না। কোনো অভিভাবক তাকে এ বিষয়ে অভিযোগ করেনি।

খেপুপাড়া সরকারী মডেল মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সভাপতি ও কলাপাড়া ইউএনও মো. মুনিবুর রহমান বলেন, তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে যথাযথ কতৃপক্ষের কাছে প্রেরণ করা হবে।

প্রসঙ্গত, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা ও উচ্চ আদালতের নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও কলাপাড়ায় এক শ্রেণির কোচিংবাজ শিক্ষক প্রাথমিক থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের জিম্মি করে তাঁদের পরিচালিত কোচিং বাণিজ্যে পড়তে যেতে বাধ্য করছেন। এরা বাসা-বাড়ি এমনকি শহরের অলি গলিতে শিক্ষার্থীদের নিয়ে প্রাইভেট কিংবা কোচিং বাণিজ্য করে বৎসরে কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন। ইতোপূর্বে গণমাধ্যমে কোচিং বাণিজ্য নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশের পর স্থানীয় প্রশাসন বেশ ক’জন শিক্ষককে ভ্রাম্যমাণ আদালতে দণ্ড প্রদান সহ কোচিংবাজ শিক্ষকদের হুঁশিয়ার করেন। এমনকি উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তার কার্যালয় থেকে কোচিংবাজ শিক্ষকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে নামের তালিকাও প্রেরণ করা হয় শিক্ষা মন্ত্রনালয়ে। কিন্তু ক’দিন বন্ধ থাকার পর কোচিংবাজ শিক্ষকরা ফের বেপরোয়া হয়ে উঠতে শুরু করেছে।

মানবকণ্ঠ/এইচকে/পলাশ





ads







Loading...