কেরানীগঞ্জে মোটরসাইকেল বাহিনী আতঙ্ক

কেরানীগঞ্জে মোটরসাইকেল বাহিনী আতঙ্ক - মানবকণ্ঠ

poisha bazar

  • ছলিম উল্লাহ মেজবাহ
  • ১৫ মার্চ ২০২০, ০২:০৪,  আপডেট: ১৫ মার্চ ২০২০, ০২:০৬

রাজধানীর নিকটবর্তী কেরানীগঞ্জে আতঙ্ক এখন মোটরসাইকেল বাহিনী। স্থানীয়দের জমি দখল, বসতবাড়ি থেকে উচ্ছেদ, মাদকের ব্যবসা, সন্ত্রাস ও চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণ সবই করছে এই শক্তিশালী চক্র মোটরসাইকেল বাহিনী। চক্রের সদস্যরা কথিত ‘বড় ভাইদের কাছ থেকে পেয়েছেন মোটরসাইকেল। কাজ তুলে দেয়ার যোগ্যতা অনুযায়ী চক্রের দুই শতাধিক সদস্য মাসে সম্মানী পান সর্বনিম্ন ৫ হাজার থেকে সর্বোচ্চ ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত। এই চক্রের ভয়ে জমিজমা ছেড়ে স্থানীয়দের অনেকে এলাকা ত্যাগ করে ঢাকাসহ বিভিন্ন স্থানে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। 

ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, বড় ভাইদের অনুমতি ছাড়া এই এলাকায় কেউ নিজেদের জমিতে স্থাপনা নির্মাণ করতে পারেন না। অনুমতি কিংবা বোঝাপড়া ছাড়া কেউ এলাকায় কোনো প্রকল্প বা স্থাপনা করতে গেলে চক্রের নেপথ্যের ব্যক্তিদের হুকুমে ১০ মিনিটের মধ্যেই জড়ো হয়ে যান মোটরসাইকেল বাহিনী। শুরু করেন মারধর, ভাঙচুর ও উচ্ছেদ। সাম্প্রতিক সময়ে এলাকায় এই ধরনের একাধিক ঘটনা ঘটলেও স্থানীয় প্রশাসন ও আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী ব্যবস্থা নিয়েছেন খুব কম ক্ষেত্রেই। কেরানীগঞ্জ মডেল থানায় গত ৪ মার্চ এ রকমই একটি ঘটনায় থানায় মামলা করেন কাঁঠালতলী গ্রিন সিটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক দেলোয়ার হোসেন। মামলার এজাহারে দেলোয়ার অভিযোগ করেন, তার হাউজিং কোম্পানির অফিস নির্মাণকালে গত ৩ মার্চ বিকেল তিনটার দিকে কতিপয় লোকজন এসে বাধা দেয়।

একটি মাইক্রোবাস ও ২০-২২টি  মোটরসাইকেল যোগে এসে তারা লাঠিসোটা, রড, রামদা ও চাপাতি নিয়ে তার অফিসে প্রবেশ করে। তাকে না পেয়ে তারা তার অফিসের স্টাফ কাইয়ুম ও নাছিরসহ নির্মাণকাজে নিয়োজিত শ্রমিকদের অফিস থেকে বের করে দেয়। হাউজিং প্রকল্পের ভেতরে গ্রিল, নির্মাণকাজের সরঞ্জাম ও দেয়াল ভাঙচুর করে তারা। এতে তার ব্যাপক আর্থিক ক্ষতি হয়। যাওয়ার সময় ভাঙচুরকারীরা এই বলে হুমকি দিয়ে যায়, দেলোয়ারকে পেলে মেরে ফেলা হবে এবং তাদের অনুমতি ছাড়া যেন এখানে হাউজিং প্রকল্প করা না হয়।

দেলোয়ার তার এজাহারে এটা লেখার পাশাপাশি নিজের জীবন নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করেন। এজাহারে তিনি আসামি হিসেবে দুলাল খান, শরীফ, মোজাম্মেল, রুবেল, শাহাবুদ্দিন, মঞ্জু, নুরু, মকবুল, জহির, নাজিম উদ্দিন, মামুন, আসলাম, হিমেল ও কলিম উদ্দিনের নাম উল্লেখ করেন। আরো ২০-২২ জন অজ্ঞাত বলে দাবি করেন এজাহারে। দেলোয়ার জানান, মামলার পরদিন কিছু লোক তার বাড়িতে গিয়ে তাকে খোঁজ করে। তাকে না পেয়ে তার বাবাকে হুমকি দিয়ে যায়। আতঙ্কে তার বৃদ্ধ বাবা স্ট্রোক করে হাসপাতালে ভর্তি হন। গত ১০ মার্চ তিনি হাসপাতাল থেকে ছাড়া পান। প্রাণ বাঁচাতে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন জানিয়ে দেলোয়ার বলেন, আমাকে হুমকি দেয়া হয়েছে-যেখানেই পাওয়া যাবে গুলি করে মেরে ফেলা হবে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, কেরানীগঞ্জের কাঁঠালতলী, বেলনা, নয়াগাঁও ও ফামকান্দি- এই চারটি গ্রামের লোকজন মিলে গত বছরের জানুয়ারিতে ‘কাঁঠালতলী গ্রিন সিটি’ নামে একটি কোম্পানি প্রতিষ্ঠা করেন। জয়েন্ট স্টকে নিবন্ধিত কোম্পানিটির চেয়ারম্যান কবির হোসেন ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) দেলোয়ার হোসেন। কোম্পানির পরিচালক ১৩ জন। নিজেদের ও আত্মীয়-স্বজনদের জমি মিলে প্রায় ৫০০ বিঘা জমি নিয়ে তারা হাউজিং প্রকল্প শুরু করে সেখানে সাইনবোর্ড দেন। তিন মাস পর ‘মধু সিটি’ নামের আরেকটি হাউজিং কোম্পানির লোকজন গিয়ে কাঁঠালতলী গ্রিন সিটির সাইনবোর্ড তুলে ফেলেন। সেখানে তারা মধু সিটির সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে দেন। এমনকি দেলোয়ারের কেনা ব্যক্তিগত জমিতেও তারা সাইনবোর্ড লাগিয়ে দেন। এই ঘটনায় থানায় মামলা করতে গেলেও তখন মামলা নেয়া হয়নি বলে অভিযোগ করেন দেলোয়ার। জানা গেছে, মধু সিটির মালিক তিন ভাই সলিম, হাবিব ও আমিন। স্থানীয়রা জানান, আটিবাজারে একটি ব্রিজ নির্মাণ স্থানীয়দের দীর্ঘদিনের দাবি ছিল। সেখানে তীব্র যানজট থেকে মুক্ত হতে স্থানীয়দের দাবির প্রেক্ষিতে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদফতর (এলজিআরডি) ব্রিজ নির্মাণে অর্থ বরাদ্দ দেয়। তবে মধু সিটির স্বার্থ রক্ষায় কৌশলে আটিবাজারে ব্রিজ না করে বিলের পাশে করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুকে একজন জানান, এলাকার টোটাইল মৌজায় তিনি ১৪ শতাংশ জমি কেনেন। একটি হাউজিং কোম্পানি সেটি জোকরে দখল করে নেয়। ওই কোম্পানি আরও অনেকের জমি এভাবে দখল করে নিয়ে মাটি ভরাট করেছে। ভরাটের পর অর্ধেক জমি ছেড়ে দিতে চাপ দেয়া হয়। নিরুপায় হয়ে কেউ কেউ অর্ধেক জমি ছেড়ে দিতে রাজি হলেও বাকি অর্ধেক বুঝে পাননি। এছাড়া ওই কোম্পানির বিরুদ্ধে জয়নগর খালসহ একাধিক খাল ও সরকারের খাস জমিও বেদখল করার অভিযোগ করেছেন স্থানীয়রা। তাদের অভিযোগ, প্রতিবাদ করতে গেলেই ‘বেতনভোগী মাদকাসক্ত মোটরসাইকেল বাহিনী’ পাঠিয়ে ভয় দেখানো হয়। কাঁঠালতলী গ্রিন সিটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক দেলোয়ার হোসেনের মামলা প্রসঙ্গে কেরানীগঞ্জ থানার এস মো. রেজাউল করিম বলেন, উনার মামলার প্রেক্ষিতে ২ জনকে আসামিকে গ্রেফতার করা হয়। বাকি আসামিরা জামিনে রয়েছেন। অভিযোগ প্রসঙ্গে মধু সিটির মালিক সলিমকে একাধিকবার কল দিলেও তিনি ফোন রিসিভ করেনি।

মানবকণ্ঠ/এমএইচ






ads