নাচে-গানে-মাদলে সাঁওতালদের ‘বাহা পরব’

নাচে-গানে-মাদলে সাঁওতালদের ‘বাহা পরব’

poisha bazar

  • প্রতিনিধি, দৈনিক মানবকণ্ঠ
  • ০৪ মার্চ ২০২০, ১৭:২৬

গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জের সাঁওতাল সম্প্রদায় নিজস্ব ঐতিহ্যে নেচে-গেয়ে আনন্দের সঙ্গে বরণ করলেন ঋতুরাজ বসন্তকে। উপজেলার কামদিয়া ইউনিয়নের মোত্তালেব নগর উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে বাহা পরব বা বসন্ত উৎসবে মেতে ওঠেন আদিবাসী সাঁওতালরা। বুধবার (৪ মার্চ) অবলম্বনের আয়োজনে অনুষ্ঠানের সহযোগিতা করে মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন।

সকালে পূজা-অর্চনার পর বাহা পরবের প্রথম অংশে আলোচনা সভা ও পরে সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়। সাঁওতাল সাংস্কৃতিক দলের সঙ্গীত ও নৃত্য পরিবেশনা দর্শকদের মুগ্ধ করে। এতে সাঁওতাল জনগোষ্ঠীর ৬টি ইউনিয়নের ৮টি সাংস্কৃতিক দল অংশগ্রহণ করে।

বিভিন্ন বর্ণের আদিবাসী-বাঙালিদের আগমনে মিলন মেলায় পরিণত হয় গোবিন্দগঞ্জের সাঁওতাল গ্রামগুলো। বাহা পরব মানুষের সাথে প্রকৃতির এক অবিচ্ছেদ্য সম্পর্কের প্রতীক। সাঁওতালি ভাষায় বাহা মানে ফুল। বাহা পরব হল সাঁওতালদের ফুলের পার্বণ। ফাল্গুন মাস সাঁওতালদের বছরের প্রথম মাস। প্রতি বছর বসন্তের শুরুতে মানে ফাল্গুন মাসে এই পার্বণ উদযাপন করা হয় প্রতিটি সাঁওতাল গ্রামে।

এ সময় বেশীরভাগ গাছের নতুন পাতা, ফুল ইত্যাদি আসে তাই সাঁওতালিরা মনে করেন যে এই সময় গাছেরা প্রজননশীল হয়। তাই বাহা পরবের আগে তারা গাছের ফুল, ডাল ইত্যাদি ভাঙেন না। গ্রামের এই প্রান্তে ‘জাহের থান’ নামে এক পবিত্র স্থানকে কেন্দ্র করে বাহা পরবটি উদযাপন করা হয়।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার চেয়ারম্যান আব্দুল লতিফ প্রধান, উপজেলা নির্বাহী অফিসার রামকৃষ্ণ বর্মন, গাইবান্ধা জেলা উদীচীর সভাপতি জহুরুল কাইয়ুম, থানার ওসি মেহেদী হাসান, সাংস্কৃতিককর্মী দেবাশিষ দাশ দেবু, রণজিৎ সরকার, অবলম্বনের নির্বাহী পরিচালক প্রবীর চক্রবর্তী, ভূমি উদ্ধার সংগ্রাম কমিটির সভাপতি ফিলিমন বাস্কে, আদিবাসী নেত্রী কেরিনা হাসদা প্রমুখ। এতে সভাপতিত্ব করেন বাহা পরব উদযাপন কমিটির আহ্বায়ক এ্যামিলি হেমব্রম।

দীর্ঘদিন পর এ ধরনের উৎসবের সুযোগ পেয়ে সাঁওতালরা সন্ধ্যা থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত উৎসবের মহড়া দিতে থাকে। উৎসবের জন্য কেনা হয় নতুন কাপড়। উৎসবস্থল আদিবাসীদের বিভিন্ন দাবি দাওয়া সম্বলিত ফেস্টুনে সুসজ্জিত করা হয়।

বাহা পরব উপলক্ষে মেলায় আদিবাসীদের স্টলে তাদের নিজস্ব ঐতিহ্য সামগ্রী প্রদর্শিত হয়।

গ্রামের নাইকে অর্থাৎ পুরোহিত মঙ্গল টুডু বলেন, বাহা পরব ফাল্গুন মাসের পূর্ণিমা তিথিতে হয়ে থাকে। গ্রামের মানঝি (গ্রাম প্রধান) পরবের দিন ঠিক করেন। দুই-তিন দিনব্যাপী চলতে থাকে পরব। বাহা পরবের জন্য নির্দিষ্ট একটি পূজার স্থান থাকে। একে সাঁওতালরা জাহের থান বলে। তিনটি ছোট ছোট খড়ের ঘর দিয়ে জাহের থান তৈরি হয়। গ্রামের নাইকে অর্থাৎ পুরোহিত পরিষ্কার ধুতি পড়ে পূজা থানে যান। নাইকের হাতে কাঁসার থালাতে থাকে নতুন নতুন ফুল। এ সময় সাঁওতাল তিন দেবতা জাহের এঁরা (ফুলের দেবী), মারাঙবুরু (সাঁওতাল দেবতা প্রধান), পারগানা বঙ্গা (এলাকার দেবতা) এর পূজা করেন নাইকে। বাহা পূজার উদ্দ্যেশ্য হচ্ছে যে, আমরা যেনো আজ থেকে সারাবছর ভালােভাবে চলতে পারি। আমাদের যেনো কোনো অমঙ্গল না হয়, কষ্ট না হয় আর এই আনন্দ যেনো সারাবছর সবার সাথে একই রকম থাকে।

আদিবাসী নেত্রী কেরিনা হাসদা বলেন, বাহা পরব বা উৎসব সমতলের সবচেয়ে সংখ্যাদিখ্য আদিবাসী জাতি সাঁওতালদের দ্বিতীয় বৃহত্তম উৎসব। বাহা মানে ফুল। ফুল উৎসব যতক্ষণ না আদিবাসীরা করতে পারেন ততক্ষণ পর্যন্ত আদিবাসীর সমাজে নতুন ফুল ব্যবহার করা হয় না। আর মেয়েরাও তাদের খোপায়-মাথায় এই ফুল দিতে পারবে না। এ দেশের প্রকৃতির সাথে আদিবাসী সমাজ মিশে আছে। কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয় যেভাবে প্রকৃতি ধ্বংস হচ্ছে, যেভাবে বনজঙ্গল উজাড় হয়ে যাচ্ছে এবং আদিবাসীরা উচ্ছেদ হচ্ছে। সাঁওতালসহ অন্যান্য আদিবাসীদের ঐতিহ্যবাহী এসব সংস্কৃতি আগের সেই জৌলুস হারাতে চলেছে।

মানবকণ্ঠ/আরবি






ads